সংযুক্তার ‘মর্দানি’, এই মহিলা আইপিএসের নামে থরথর করে কাঁপে জঙ্গিরা

1

চৈতালী চক্রবর্তী

জলপাই রঙা উর্দি, হাতে একে-৪৭ নিয়ে যখন ঠান্ডা চোখে তাকান সংযুক্তা, প্রাণ উড়ে যায় জাঁদরেল বড়ো জঙ্গিদের। মহিলা অফিসার তখন দুই সন্তানের মা নন, সন্ত্রাসদমনে দেবী দুর্গার মতোই তাঁর তেজ। গুলিতে এঁফোড় ওফোঁড় করে দিচ্ছেন জঙ্গিদের। দুর্গম জঙ্গল পেরিয়ে নিঃশব্দে জঙ্গিদের গোপন ডেরায় গেরিলা হামলা চালাচ্ছেন। বুঝে ওঠার আগেই খতম হয়ে যাচ্ছে আততায়ীরা। অথবা আতঙ্কে অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করছে।

সলমন খানের ‘দাবাং’ সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানিয়ে দেবে এই মহিলা আইপিএস অফিসারের সাহসিকতার প্রত্যেকটা কাহিনী। ঠিক যেন ‘মর্দানি’ সিনেমার রানি মুখোপাধ্যায় ওরফে শিবানী শিবাজি রাও। এসব তো রিল লাইফের কথা। আইপিএস সংযুক্তা পরাশর বাস্তবেরই দাবাং। আসামের এই মহিলা আইপিএসের ভয়ে কাঁপে বড়ো জঙ্গিরা। তাঁর হুঙ্কারেই অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করেছে বহু জঙ্গি।

অসমের শোণিতপুর জেলার পুলিশ সুপার সংযুক্তা জোরহাটের এসপি ছিলেন আগে। ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনে ৮৫ র‍্যাঙ্ক করা একটি মেয়ে আরামের ৯টা-৫টার চাকরির মায়া ছেড়ে জঙ্গি দমনকেই জীবনের লক্ষ্য করে নিয়েছেন। রাতের আঁধারে বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে জঙ্গিদের গোপন ডেরা খুঁজে বেড়ান সংযুক্তা। নাশকতার গন্ধ পেলেই হাজির হয়ে যান সেখানে। তাঁর আক্রমণের স্ট্র্যাটেজি মুগ্ধ করে দুঁদে পুলিশ অফিসারদেরও। একসময় সিআরপিএফ বাহিনীর নেতৃত্বও দিয়েছিলেন সংযুক্তা। সেনা-পুলিশে লিঙ্গ বৈষম্যের ভেদটা ঘুচিয়ে দিয়েছেন আগেই। এই মহিলা অফিসার বুঝিয়ে দিয়েছেন, সংসার সামলে, দুই সন্তান আগলেও অপরাধ দমন করা যায়। প্রাণের তোয়াক্কা না করে জঙ্গিদের রাইফেলের সামনেও অকুতোভয় সংযুক্তা পরাশর।

সাহস আর মেধার মেলবন্ধন। স্কুলের সমস্ত স্পোর্টস ইভেন্টে প্রথম সারিতে থাকা মেয়েটা একদিন জঙ্গি-নাশ করবে, এমন কল্পনাও করেননি সংযুক্তার অভিভাবকরা। দিল্লি ইউনিভার্সিটির আইপি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক করে, জেএনইউ থেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন নিয়ে মাস্টার্স করেছেন সংযুক্তা। মার্কিন ফরেন পলিসি নিয়ে এমফিল ও পিএইচডিও করেছেন। আইপিএস সংযুক্তা তাই ডক্টর সংযুক্তাও বটে।

sanjukta6

পড়াশোনা, গবেষণা শেষ করে ইউপিএসসি পরীক্ষাতেও র‍্যাঙ্ক করেন। ২০০৬ সালের আইপিএস ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী মেয়ে ছিলেন ডক্টর সংযুক্তা পরাশর। ২০০৮ সালে মাকুমে অ্যাসিন্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট হিসেবে তাঁর পোস্টিং হয়। বড়ো জঙ্গি ও বাংলাদেশি জঙ্গিদের খতম করার চ্যালেঞ্জ নেন সংযুক্তা।

Sanjukta Parashar a real life Superwoman - IndiaTV News | India News – India TV

দিনের পর দিন জঙ্গলে জঙ্গিদের ডোপন ঘাঁটি খুঁজে বেরিয়েছেন। দিনরাতের হিসেব করেননি। ২০১৪ সাল। জেহাদিদের কায়দায় অসমের পাঁচ থেকে ছ’টি জায়গায় হামলা চালায় এনডিএফবি (সংবিজিৎ) সংগঠনের বড়ো জঙ্গিরা। আদিবাসী অধ্যুষিত প্রত্যন্ত গ্রামে জঙ্গিদের স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান শিশু থেকে বয়স্করা। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন মহিলা ও শিশু। হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে।  হামলার জেরে বন্ধ করে দেওয়া হয় মানস ও নামেরি জাতীয় উদ্যান। জঙ্গিদের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে সেনাবাহিনী। অসমে পাঠানো হয় অতিরিক্ত আধাসামরিক বাহিনীও। সিআরপি, রাজ্য পুলিশের ‘ইউনিফায়েড কম্যান্ড’ বড়ো জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। কিন্তু হামলা থামেনি। বাড়ে বাড়েই গ্রামগুলিতে হামলা করে হত্যালীলা চালাচ্ছিল বড়ো জঙ্গিরা। এই সময় ডাক পড়ে সংযুক্তা পরাশরের।

IPS Officer Dr. Sanjukta Parashar's Story & Gender Philosophy Are Seriously Badass - Homegrown

বড়ো জঙ্গিদের আক্রমণের কৌশলে হকচকিয়ে গিয়েছিলেন নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানরাও। শোণিতপুরের বাতাসিপুর, পাভৈ, হাতিজুলি এবং কোকরাঝাড়ের পাখিরিগুড়ি, উল্টাপানি, মধুপুর, সেরফাংগুড়িতে হানা দিচ্ছিল জঙ্গিরা। তাদের লক্ষ্য ছিল অসহায় মহিলা ও শিশুরা। সংযুক্তা হঠকারিতা করেননি। ঠান্ডা মাথায় প্রত্যাঘাতের স্ট্র্যাটেজি ভেবে নিয়েছিলেন। তারপর আচমকা হামলা চালিয়েছিলেন জঙ্গি ঘাঁটিগুলিতে। গোপন ডেরা থেকে টেনে বের করে এনেছিলেন জঙ্গিদের। গর্জে উঠেছিল তাঁর হাতের রাইফেল। একসঙ্গে ছয় তেকে সাতজন জঙ্গিকে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিলেন গুলিতে।

Meet Assam's Bravehearted Woman IPS Officer Who Kicks Serious Insurgency Ass Everyday

এরপরেও একাধিকবার অভিযান চালিয়েছিলেন সংযুক্তা। খতম করেছিলেন আরও অনেক জঙ্গিকে। ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট অব বড়োল্যান্ড (এনডিএফবি) থেকে বহুবার হুমকি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু তোয়াক্কা করেননি সংযুক্তা। ১৫ মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ জন বড়ো জঙ্গিকে পাকড়াও করেছিলেন। বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল জঙ্গিদের কাছ থেকে। অসমে বেশ কযেকটা নাশকতার ছক বানচাল করে দিয়েছিলেন আইপিএস সংযুক্তা পরাশর।

Sanjukta Parashar Wiki, Biography, Age, Husband, IPS Officer, Images and More - News Bugz

sanjukta8

এতো গেল জঙ্গি দমনের কথা। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের গোড়া অবধি জোড়হাটের এসপি ছিলেন সংযুক্তা। চার বছরের মধ্যে একটা গোটা শহরকে প্রায় অপরাধমুক্ত করে দিয়েছিলেন। ইভটিজারদের ধরে ধরে শাস্তি দিয়েছিলেন। শহরে নারী ও শিশুদের ওপর অত্যাচার, যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই খবরের শিরোনামেও এসেছিল সে সময়। শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল।

৪১ বছরেও প্রতাপ কমেনি সংযুক্তা পরাশরের। এই ডাকাবুকো পুলিশ অফিসারের নাম শুনলে এখনও পিঠটান দেয় জঙ্গিরা।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.