৩ বছরে আত্মহত্যা ১৩১ জওয়ানের, অভিনব কাউন্সেলিং চালু সিআরপিএফে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কাঁধে আগ্নেয়াস্ত্রের ভার। শিরদাঁড়া ঋজু। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় টানটান। সতর্ক হয়ে না চললে যেকোনও সময় চলে যেতে পারে প্রাণ। সেনাবাহিনীর জীবন যে এমনই। দেশকে সুরক্ষিত রাখাই তাঁদের একমাত্র ব্রত। সীমান্ত রক্ষায়, যুদ্ধ জয়ে সদা তৎপর এই মানবজাতির সামাজিক জীবন বলে কিছুই নেই। গত তিনবছরে ১৩১ জন ভারতীয় জওয়ান আত্মহত্যা করেছেন হতাশায়। সে খবর হয়ত জানা নেই দেশবাসীর।

সেন্যরা কেবল সমাজবিচ্ছিন্ন প্রতিরক্ষা-যন্ত্র নন। তাঁরা দেশের আর পাঁচজন মানুষের মতোই সুস্থ জীবনের অধিকারী। এমনটা মনে করানোর সময় এসেছে আজ। সময় এসেছে তাঁদের দিকে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার, এমনটাই জানালেন শ্রীনগরের সিআরপিএফ অফিসার হাওলাদার বিনোদ কুমার।

সম্প্রতি বিনোদ কুমার সহ শ্রীনগরে কর্মরত একদল সিআরপিএফ অফিসার সেনাদের মন ও স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখার সংকল্প করেছেন। মুষড়ে পড়া জওয়ানদের জন্য একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে সকলে মন খুলে কথা বলতে পারবেন। চেপে রাখা যন্ত্রণা সকলের সম্মুখে এনে হৃদয়ভার লাঘব করার এই প্রচেষ্টা হয়ত তরুণ সৈন্যদের জীবনের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে, এমনটাই আশা করছেন অফিসাররা।

পরিবারের সঙ্গে বছরের পর বছর বিচ্ছিন্ন। প্রিয়জনের মুখ দেখা নেই। একই ঘরে গাদাগাদি করে সৈন্যরা থাকেন। কোনও প্রাইভেসির বালাই নেই। সৈন্যদলে নিযুক্ত হওয়া তরুণ মুখগুলো এভাবে অন্য এক বাস্তবের ভয়াবহতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। একসময় স্বপ্ন দেখতেও ভুলে যান তাঁরা। সেখান থেকেই জন্ম নেয় অবসাদ। আত্মহত্যার পথ বেছে নেন কেউ কেউ।

এছাড়াও সেনাবাহিনীতে লিঙ্গ বৈষম্যের বিদ্বেষ এখনও তুঙ্গে। মহিলা সেনাদের প্রতি পুরুষ সেনারা  সেসবও একধরনের মানসিক জটিলতাই। এগুলোর আশু সমাধানই আমাদের লক্ষ, এমনটাই জানালেন মহিলা ইন্সপেক্টর সিআরপিএফ চারু সিনহা।

এবছর মার্চ মাসে ১৪দিন চলেছিল সেই কর্মশালা। জানা গেছে, কেবল শ্রীনগরেই নয়, বিভিন্ন সিআরপিএফ ক্যাম্পে ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি এখন থেকে কাউন্সেলিং এবং ওয়ার্কশপের ব্যবস্থা করা হবে। পুরুষ সেনা এবং মহিলা সেনারা একই সঙ্গে সেখানে অংশ নেবেন। তাঁদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য ঘুচিয়ে পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি স্বাভাবিক করতেই এই উদ্যোগ।

আশার খবর এই যে, শ্রীনগরে আয়োজিত কর্মশালাটি থেকে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন অভিজ্ঞ অফিসাররা। একটি বড় ঘরে কাচের বয়াম রাখা থাকে। তাতে ভর্তি কাগজের ভাঁজ করা চিরকুট। সেনারা একে একে এসে তুলে নেবেন সেই চিরকুট, ভাঁজ খুলে পড়বেন ভেতরের লেখা। সে বিষয় পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য কিনা তা সকলের উদ্দেশ্যে আগে জানাবেন।  এদিন চিরকুট তুলে ২৩ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা জানালেন  অফিসার বিনোদ কুমার। তাঁর হাতের চিরকুটে লেখা ছিল ‘অর্থ উপার্জন এবং বিনিয়োগ’। বিনোদ শুরুতেই বলে নেন, এটি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। এরপর তিনি শুরু করেন ,”কঠোর জীবন ট্রেনিংয়ের অঙ্গ, যা আমায় পজিটিভ থাকতে শিখিয়েছে। আমার স্ত্রী হিমাচলে সেলাইয়ের দোকান চালান। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকলেও মন পরে থাকত বাড়িতেই। সেটাই আমাকে আনন্দ দিত। ট্রেনিংয়ে থাকলেও হতাশা আমায় গ্রাস করেনি। সবসময় আশাবাদী ছিলাম।”

কাউন্সেলিংয়ের দ্বিতীয় দফায় প্রায় ২৫০০০ জন জওয়ানকে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করানো হয়। কর্মশালা পরিচালনার জন্য ৫০০ অফিসারকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

সেনাদের কাউন্সেলিংয়ের জন্য এই অভিনব কোর্সটি বানিয়েছে ব্যাঙ্গালোরের অমৃতা বিশ্ব বিদ্যাপীঠ। সাতদিনের ওয়ার্কশপে চিন্তা এবং অনুভূতির পাঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়াও, জ্ঞানের বিকৃতি রোধ করে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মবিশ্বাস অর্জনের পাঠ এতে রয়েছে। সর্বোপরি, সেনাদের পারিবারিক যোগাযোগ যাতে অক্ষুন্ন থাকে সেদিকও নজর দেওয়া হবে। সামাজিক মূল্যবোধগুলো সুরক্ষিত থাকলে তবেই জীবনের হাত ধরতে পারবেন তাঁরা, এমনটাই জানিয়েছেন কোর্স নির্মাতারা। মানবিকতার ছোঁয়ায় যদি সমাজের অংশ করে তোলা যায় জওয়ানদের, তবে কী জীবনের স্রোতে ফিরতে পারবেন না তাঁরা? অফিসাররা আশাবাদী।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More