‘৬২-র ভোট : গণরোষের প্রতিফলন নেই ভোটে, জয়জয়কার সেই কংগ্রেসেরই

দ্য ওয়াল ব্যুরো : পশ্চিমবঙ্গে তিন নম্বর বিধানসভা নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি ছিল আগের থেকে আলাদা। ততদিনে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা আর আগের মতো নেই। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।

স্বাধীনতার পরে প্রথম এক দশক বিরোধীরা সরকারের সমালোচনা করতে গেলেই কংগ্রেস বলত, শিশু রাষ্ট্রের কিছু ভুলচুক হতেই পারে। অর্থাৎ তারা বলতে চাইত, ‘৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের জন্ম হয়েছে। এখনও তার বয়স বেশি নয়। এই অবস্থায় সরকার পরিচালনায় নানা খামতি থাকতেই পারে। তা নিয়ে বেশি সমালোচনা বা আন্দোলন করা উচিত নয়।

সাধারণ মানুষও সেই শিশু রাষ্ট্রের তত্ত্বে বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু ‘৫৭-‘৫৮ সাল নাগাদ সুর কাটতে শুরু করল। ওই দু’বছর ভাল বৃষ্টি হয়নি। ফসল হয়েছিল কম। ফলে খাদ্যাভাব দেখা দিল। গ্রাম ছেড়ে বহু লোক খাদ্যের সন্ধানে শহরে পালিয়ে আসতে লাগল। প্রায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হল।

কমিউনস্টরা খাদ্যের দাবিতে বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে চেষ্টা করছিল। বিধান রায় দেখলেন, এমনিতেই সরকার খাদ্য সংকট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তার ওপরে যদি ধর্মঘট, অবরোধ শুরু হয়, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। তাই পুলিশ কয়েকজন প্রথম সারির কমিউনিস্ট নেতাকে গ্রেফতার করল।

তখন খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন প্রফুল্ল সেন। তিনি স্থির করলেন, চালকল মালিকদের থেকে চাল কিনে রেশনে সস্তায় গরিবদের দেবেন। কিন্তু চালকলের মালিকরা সরকারি দরে চাল বিক্রি করতে রাজি হল না। অনেকেই মজুত করা চাল লুকিয়ে ফেলল। খাদ্য সংকটের সমাধান হল না।

সুযোগ বুঝে বাম দলগুলির দ্বিতীয়, তৃতীয় সারির নেতারা ৩১ অগাস্ট রাইটার্স অভিযানের ডাক দিল। সেই অভিযানে অংশ নিতে গ্রাম থেকে এল হাজার হাজার মানুষ। ওইদিন দুপুরে নানা জায়গা থেকে ছোট ছোট মিছিল এসে জড়ো হচ্ছিল মনুমেন্টের নীচে। সেখান থেকে একটা বড় মিছিল করে রাইটার্সে যাওয়ার কথা ছিল। সেই মিছিল কিছুদূর গিয়ে দেখল রাস্তা বন্ধ। পুলিশ ব্যারিকেড করেছে। মিছিলের লোকজন ব্যারিকেড ভেঙে এগোতে চেষ্টা করল। পুলিশও লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপরে।

সিপিআই এবং সিপিএমের মতো দল এখনও দাবি করে, ১৯৫৯ সালের ৩১ অগাস্ট পুলিশের লাঠিতে ৮০ জন মারা গিয়েছিলেন। যদিও সেই ৮০ জনের নাম ঠিকানা তারা দেখাতে পারে না। মাঝে বাম দলগুলি ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল। তখন তারা ইচ্ছা করলেই মৃতদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারত। কিন্তু করেনি।

৮০ জনের মৃত্যুর ব্যাপারটা অতিকথন মনে হয়। যদিও সেদিন পুলিশের লাঠিতে বেশ কিছু মানুষ হতাহত হয়েছিলেন সন্দেহ নেই। তার রেশ কয়েকদিন ধরে ছিল। কলকাতার রাস্তায় কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক ছাত্ররা তৈরি করেছিল ব্যারিকেড। বোমা, ইটপাটকেল নিয়ে হামলা করেছিল পুলিশের ওপরে।

‘৫৯ সালেই চিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের গুরুতর অবনতি ঘটে। অশান্তির তাৎক্ষণিক কারণ ছিল তিব্বত। চিনের লাল ফৌজ ১৯৫১ সালে তিব্বত দখল করেছিল। পরিণামে সেখানে দেখা দেয় বিদ্রোহ। তিব্বতিরা লাল ফৌজের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। তাদের অস্ত্রশস্ত্র দিত আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।

চিনাদের সন্দেহ হল, গোপনে বিদ্রোহীদের মদত দিচ্ছেন দলাই লামা।

দলাই লামা একসময় ছিলেন তিব্বতের শাসক। সেখানকার মানুষ তাঁকে জীবন্ত ভগবান মনে করত। চিনারা তাঁকে কৌশলে বন্দি করে বেজিং-এ নিয়ে যেতে চেয়েছিল। দলাই লামা ধরা না দিয়ে গোপনে পালিয়ে আসেন তিব্বত থেকে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর। দীর্ঘদিন ধরে অরণ্যের মধ্যে দিয়ে হেঁটে তাঁরা পৌঁছান ভারতে। জহরলাল নেহরু দলাই লামাকে আশ্রয় দেন। তাতে বেজায় চটে যায় চিনারা। তখন থেকেই তারা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

১৯৬২ সালে যখন পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট হচ্ছে, ততদিনে চিন সীমান্তে শুরু হয়েছে ছোটখাটো সংঘর্ষ। তা নিয়ে খবরের কাগজেও প্রায়ই খবর বেরোতে শুরু করেছে।

কমিউনিস্টরা আশা করেছিল, ১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলনের প্রভাব পড়বে ১৯৬২-র ভোটে। কংগ্রেস সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে মানুষ তাদের ভোট দেবে। বাস্তবে সেই আশা সফল হয়নি।

সেবার ভোট হয়েছিল ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ও ভোটের পার্সেন্টেজ দুই-ই বেড়েছিল। তারা পেয়েছিল ১৫৭ টি আসন। মোট ভোটের ৪৭.২৯ শতাংশ ছিল তাদের দখলে। কমিউনিস্ট পার্টির আসনও আগের চেয়ে বেড়েছিল তিনটি। ১৯৫৭ সালে তারা ১৭.৮১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ১৯৬২ সালে পেল ২৪.৯৬ শতাংশ। এছাড়া প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টি, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি সকলেই কিছু কিছু আসন পেয়েছিল। অধুনা বিলুপ্ত দু’টি দল লোকসেবক সংঘ ও সংযুক্ত বিপ্লবী পরিষদও প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল বিধানসভায়।

এইসময় রাজ্য রাজনীতিতে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল হিন্দুত্ববাদীরা। ‘৬২ সালে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা এবং ভারতীয় জনসংঘ একটি আসনও পায়নি।

সেবার ভোটেও কংগ্রেসের কাণ্ডারী ছিলেন অশীতিপর বিধান রায়। ভোটের কয়েকমাস পরেই, নিজের জন্মদিনে তিনি প্রয়াত হন। সেদিনও সকালে রোগী দেখেছিলেন। এরপরে মুখ্যমন্ত্রী হন প্রফুল্ল সেন।

তারও কয়েকমাস পরে, অক্টোবরে হিমালয়ের গিরিপথ দিয়ে হানা দেয় চিনা ফৌজ।

 

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More