লেখা লিখতে না পারার লেখা অথবা প্রেরিত কবিতা

যশোধরা রায়চৌধুরী

লেখার কাছে ফিরে আসা ছাড়া আমার কোন ফিরে আসা নেই।
ফিরে আসার পথটুকু শুধু কাদা আর জল আর কান্না , নর্দমা খোঁচানোর কাঁটা,
এমনকি কোন কোদালের আয়োজনও নেই
মাটি কোপানোও নেই
মাটি কুপিয়ে বীজবপনের পর অপেক্ষা করারও আমার হিম্মত নেই।
হিম্মত নেই
ফুল ফুটিয়ে তোলার
মাটি কোপানোর
ঝিরি ঝিরি করে লাউ কেটে ঘন্ট রান্না করার।

 

লেখার কাছে ফিরে আসা ছাড়া আমার কোন পরিত্রাণ নেই
অথচ প্রতিটি অক্ষর এখনো সেদ্ধ না হওয়া, দাঁতে আটকে থাকা

 

লেখার কাছে ফিরে আসা ছাড়া কোন উপায় নেই
হোক না লেখাটা আড়ষ্ট, হোক না লেখার  পিঠে ব্যথা
হতে পারে লেখাটার শরীর খারাপ হতে পারে লেখাটা বিছানা থেকে উঠতেই পারছে না
হতে পারে এ লেখা লেখা হয়নি বলে
নিজে নিজে চলে গেছে চারতলার ছাতের কিনারায়

 

বিষাদ এখনো ফরফরাসের মত জ্বলে
কান্না এখনো ঠিকঠাক সেদ্ধ করে
তাই এদের ব্যবহার করা আমি নিষিদ্ধ করেছি
সেন্টু দেব না বলে আমি শুকনো রেখেছি সব
লেখাটাতে নির্জন একটা হাত রাখা হোক আমি চাই
কিন্তু সেই হাতটির জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটা দরকার জেনে
আমি বসে পড়েছি লাল ইঁটের টুকরো পেতে
রাস্তার ধারে

 

লেখার কাছে ফিরে আসব বলে
নিজস্ব আকাশের কাছে পেতে দেব বলে
শিউলিগাছের তলায় বিছিয়ে রাখব বলে
টাটকা সবুজ  সকালের সামনে ধরে রাখব বলে
আমিই আবার হেঁটেছি মাইলের পর মাইল।

 

তারপরও এইসব ফিরে আসার লেখা
কতটা অবশ, কতটা সাড়হীন
যেন ও আমার অন্যমনে বসানো ভাত
ঠিক মাপে জল না হওয়া প্রেশার কুকারের অনর্থক সিটি
আর গলে যাওয়া, তলায় ধরে যাওয়া সেই সব বিফল ভাত
লেখাটা সেই ভাতের দানা
আমার হাঁড়ির ভেতরে লেগে থাকে এখনো

লেখা কেবলি এক ঝরে যাওয়া থেকে আরেক ঝরে যাওয়া
মেঘ। সকাল। এক ঝলক ধোঁয়া। দুধ উথলে ওঠা।
কেবলি বেঁচে থাকার প্রমাণ এইসব প্রতিটি অক্ষর
চাপা শ্বাসের মত বেরিয়ে আসা স্টিম।

 

আর এইসব লেখার কাছে ফিরে আসার পর

প্রেসার কুকারের সিটি হয়ে বেরিয়ে যাওয়া আর্তনাদ আমি।

প্রেরিত কবি। কী হয় সেটা
জানা নেই তবু আমাকেও কে যেন প্রেরণ করে
কে করে, বেদনা না বিক্ষোভ?
না ভেতরে টিক টিক করে চলা কোন মোটর
ফেটে পড়তে চাইছে এমন বোমা হঠাৎ একদিন গলে যাওয়া ব্যাটারির মত
শুধু টকস্বাদ টকগন্ধ,
শুধু কেমিকাল লিক হয়ে যাওয়া বসে যাওয়া এক ব্যাটারির মত।

 

প্রেরিত হই আমিও ত
সকালে শোবার ঘর থেকে বাথরুমে
বাজার থেকে বাজারে
অক্লান্তি থেকে ক্লান্তিতে
বিষাদ থেকে আরো বড় বিষাদের দিকে

 

আমিও নিজের ততটাই কাছাকাছি থাকি
যতটা কাছে থাকে নিজস্ব সংলাপ প্র্যাকটিস করা অভিনেতা
আয়নার

 

শুধু আমার নিজের কাছাকাছি থাকার অভ্যাস ব্যর্থ
সে এক গরম জলের ভাপে ঝাপসা হয়ে যাওয়া আয়না শুধু

 

আঙুল বুলিয়ে লিখে দিই ক, খ।
তাছাড়া আর কিছু পড়া যায়না

 

নিজের মুখাবয়ব নিজেই যখন পড়া যায়না
অন্যেরা পড়বে কী!

ও আমার কীটদষ্ট  ও আমার খুঁতযুক্ত
ও আমার শৈত্য প্রবণ
বাত্যাবিক্ষুব্ধ ও হে ও আমার অপলাপবিদ্ধ অহং
আজ মূর্খ কাল প্রাজ্ঞ পরশু ঋদ্ধ কবিতারা এস
দুয়োরে পেতেছি পাটি শিয়রে রেখেছি মাটি
 প্রদীপের করুণ উৎসাহ

 

সে প্রদীপ নিভে যাবে জেনে
সে আনন্দ লোপ পাবে ভেবে
সে মাদুর ছিঁড়ে কুটিকুটি

 

তবু আমি বেহদ্দ জেনেছি
তুমি ছাড়া হয়না আপন আর কেহ।

 

ও আমার কীটযুক্ত ও আমার কষ্টকর
ও আমার অসহ্য জীবন
সমস্ত হীনতা আমি খুঁড়ে আনছি
ও আমার কবিতা, তোমাকে দিচ্ছি…
মাটি থেকে গড়ে তোল কিছু একটা অন্তত, সামান্য এক দেহ।

 

এক ঝোলে ফেলা দুরকম মাছ
আমি আর তুমি দুজনেই আজ
শুয়ে আছি কাঠে । তোষক  দুভাঁজ
রাখা আছে পাশাপাশি

 

যেভাবে কাব্যে আলাদা মেজাজ
বিষণ্ণ আর নিম- আন্দাজ
শব্দ ও  বৃথা ছন্দের কাজ
ক্লান্ত এবং বাসি

 

সেভাবে আমিও অক্ষররাজ
সহ্য করতে অরাজি। সমাজ
একদিনে দিক মুক্তি-স্বরাজ
আমিও তাহাতে রাজি

 

তুড়ি মেরে তাই উঠে আসি আজ
ঢেলে দিই মুখে সততার ঝাঁঝ
ঝোল থেকে তুলে ফেলে দিই মাছ

 

 

মাছটিকে
ফের
ভাজি

যশোধরা রায়চৌধুরী বাংলা ভাষার একজন উল্লেখযোগ্য কবি। দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর  প্রেসিডেন্সি / কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস সার্ভিসে কর্মরত। কর্মসূত্রে সারা ভারতের বিভিন্ন অংশে বসবাস। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ নিবন্ধ ও গল্প উপন্যাস ছাপা হয়েছে কৃত্তিবাস, দেশ , কালপ্রতিমা, প্রমা , আজকাল প্রভৃতি পত্রপত্রিকায়। পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার, বাংলা আকাদেমির অনিতা-সুনীলকুমার বসু পুরস্কার এবং সাহিত্য সেতু পুরস্কার , তা ছাড়া বর্ণপরিচয় সাহিত্য সম্মান । প্রকাশিত কবিতার বই চোদ্দটি, গল্পগ্রন্থ চারটি, নভেলা একটি। অনুবাদ করেন মূল ফরাসি ভাষা থেকে, অনূদিত বই লিওনার্দো দাভিঞ্চি (আনন্দ)।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More