বন্ধুদের বাড়িই তো চেঞ্জ করার সব থেকে কমফর্টেবল জায়গা

সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়

পুরো বিষয়টাতেই আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই, আগ্রহ নেই। শবরীমালা ইস্যুতে পক্ষে, বিপক্ষে কোন মন্তব্য করাটাই চূড়ান্ত অর্থহীন আমার কাছে। যদি মন্দিরে বিশ্বাস থাকে, ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকে, হিন্দু ধর্মের দেব-দেবীর অস্তিত্বে, তাদের ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিশ্বাস থাকে, পুরাণের গল্পগাছাকে সত্যি বলে মনে হয়, শাস্ত্র কিংবা মিথ বা হাজার হাজার বছরের এই কিংবদন্তীর প্রতি আস্থা থেকে থাকে; যদি আয়াপ্পান চিরকুমার, তিনি বিবাহ করেননি, নারীসঙ্গ, স্পর্শ, উপস্থিতি থেকে দূরে থাকাই পছন্দ করেন, এই গল্পটা বিশ্বাস করি তাহলে আর দশ থেকে পঞ্চাশ বয়সি নারীদের কেন মন্দিরে প্রবেশাধিকার নেই, এই প্রশ্নটা আমি অন্তত করব না। করা উচিতও না। এটাও মেনে নেওয়া উচিত। কারণ যা নেই, যার অস্তিত্বই নেই, যেটা একটা গল্প মাত্র তার সঙ্গে গল্পের নিয়মকানুন মেনেই চলতে হবে বইকি। গল্পটা তো ওরকম ভাবেই তৈরি হয়েছে। তার আবার রিফর্মেশন কিসের?

আজ আমি যদি ঠাকুমার ঝুলির গল্প পড়ে দৈত্যপুরীর দৈত্যদের বিশ্বাস করি কিন্তু ঝিলের কালো জলে নীল পদ্মের মধ্যে লুকোনো কৌটোয় দানবীর প্রাণ ভ্রমরা লুকিয়ে থাকতে পারে কিনা তার যুক্তিসঙ্গত উত্তর খুঁজতে ভুরু টুরু কুঁচকে চরম ইন্টেলেকচুয়াল প্রশ্ন করে বসি তাহলে তো সেটা একটা দুঃখজনক রকম হাস্যকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। জীবনে আসল দুঃখের শেষ নেই। হাস্যকর দুঃখের মধ্যে ভাঁড়ামি ছাড়া কিছু থাকে না। যে নারীরা আয়াপ্পান আছেন এবং ওই মন্দিরেই আছেন, ওখানে গিয়ে পুজো করলে তার আশীর্বাদ পাওয়া যাবে, বর পাওয়া যাবে বিশ্বাস করছেন তাদের আর এর মধ্যে নারীবাদ ঢোকানোর ও নিজেদের বঞ্চিত মনে করে মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পেতে চাওয়ার কোনও মানে হয় না। ফলে আমি এই অধিকার চাওয়ার পক্ষেই নই।

আরও পড়ুন: “ভেজা স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে কি বন্ধুর বাড়ি যান? তা হলে শবরীমালায় কেন?”

আমার এসব দাবী দাওয়ার কথা শুনলে হাসি পায়। ধর্ম নিয়ে আমার কোন, কোন উৎসাহ নেই। ধর্ম নিয়ে কোন কান্ড কারখানাই আমার সহ্য হয় না। একদিকে মন্দিরে প্রবেশাধিকার আর তার বিপরীতে প্রতিরোধ, দুটো করতে গিয়ে যা হয় হোক, ভন্ডামিতে ভন্ডামিতে লাগুক লড়াই। তাই লাগছে।

এখন এর ওপর স্মৃতি ইরানি একটা নতুন কথা বলে ফেলেছেন। বলেছেন যে আমরা কি রক্তমাখা ন্যাপকিন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যাই? যেমন অশিক্ষিত দেশ, তেমনি অশিক্ষিত তরজা। হ্যাঁ, আমরা তো রক্তমাখা ন্যাপকিন নিয়েই বন্ধু বান্ধবদের বাড়িতে যাই। অফিস কাছারি করি। স্কুল কলেজ করি। যে লেডি ডক্টর নতুন শিশুর জন্ম নিশ্চিত করছেন, মায়ের পেট কেটে শিশুকে বের করে আনছেন, বা নর্মাল ডেলিভারি করাচ্ছেন তিনি হয়ত তখন রজঃস্বলা। হয়ত তখন তার ন্যাপকিন টিপ টিপ টিপ টিপ রক্তে ভিজে উঠছে। আমাদের পিরিয়ড হয়, কিন্তু তাই বলে তো আর আমাদের কাজ, কর্ম, মজা, আনন্দ কিছু থেমে থাকে না। খুব বেশি ভিজে গেলে ন্যাপকিন চেঞ্জ করার জন্য আমরা ছটফট করি। বন্ধুর বাড়ি তো সেক্ষেত্রে সবচেয়ে কমফর্টেবল জায়গা। বন্ধুকেই তো বলা যায়, নিড টু চেঞ্জ। বলা যায়, একটু দেখিয়ে দে তো কোথায় ডিসপোজ করব ইউজড ন্যাপকিন। মাঝে মাঝে হতচকিত হয়ে ভাবি যে এই স্মৃতি ইরানি টিরানিরা নারী তো। রোবট নন নিশ্চয়ই।

ফেসবুকে না থাকলে জানতেই পারতাম না আধুনিক মেয়েরা পিরিয়ড চলাকালীন পুজো করার অধিকার চেয়ে সমাজের সঙ্গে লড়াই করছেন। জানি না এই সমাজে এই সব অধিকার কে কার হাতে তুলে দেবে। অন্য দিকে স্মৃতি ইরানিদের এরকম অবাস্তব কমেন্ট। একটা সমাধান অবশ্যই বাতলে দিতে পারি। শবরীমালা মন্দিরের কাছাকাছি কোথাও একটা প্যাড ভেন্ডিং মেশিন বসানো হোক। এবং ভালো রেস্টরুম তৈরি করে দেওয়া হোক মেয়েদের জন্য। যাতে ন্যাপকিন চেঞ্জ করে ভালো করে হাত টাত ধুয়ে তাঁরা ঈশ্বর বন্ধুর সঙ্গে নিরুদ্বিগ্ন হয়ে দেখা করতে পারেন। আধুনিক মেয়েরা অর্থ ভালোই উপার্জন করেন। আশা করি প্রণামী তাঁরা ভালোই দিতে পারবেন।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

লেখক সাহিত্যিক

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More