জলের অক্ষর পর্ব ৬

কুলদা রায়

ছেলেবেলা থেকে আমি রোগা পটকা বলে আমার ঠাকুর্দা আমাকে নজরুল পাবলিক লাইব্রেরিতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। সেখানে প্রতিদিনই গল্প পড়ি। গল্প পড়ে রাতে ঘুমানোর সময়ে আমার বড়দিদির বলা গল্পের সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করেছি।

একটু বড় হলে আমাকে মুদি-দোকানি বাবার ক্যাশবই লিখতে হয়েছে। আরেকটু বড় হলে লিখেছি পাশের বাড়ির দাদাজান আবদুল হকের চিঠিপত্র। এই চিঠিপত্র লিখতে লিখতে বুঝি, নব্বই উত্তীর্ণ দাদাজান তাঁর প্রবাসী ছেলেপুলেদের কাছে আত্মজীবনীটিই বলে যাচ্ছেন একটি দীর্ঘ গানের মতো করে।

৭৭ সালের ৩রা এপ্রিলের ঝড়ে আমাদের শহরটি যখন একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়, সেইক্ষণ থেকে আমাদের শহরের ধীরেন মাস্টারমশাই তার গরুটির তল্লাশ করার সময় আমাকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করি, মাস্টারমশাই আমাকে গরুটির কাছে বলা কথাগুলিই পাড়ছেন। তার মধ্যে কোনও এক সুভদ্রাসুন্দরীর কথা আছে। তিনি বিল থেকে শাপলা তুলতে গেছেন। এই শাপলা তুলতে গিয়ে তাঁকে সাপে কেটেছে। চেয়ে দেখি সাপে কাটার কথা পাড়তে পাড়তে মাস্টারমশাইয়ের চোখ থেকে জল ঝরছে। এই অপরাহ্ণ বেলায় সেই জল থেকে কুল কুল শব্দ হয়। কান পাতলে শোনা যায়। সেই কুল কুল ধ্বনিটি আমার কান থেকে যেন ক্রমেই মর্মে পশে যায়।

এরপরও পরে যখন আরও খানিক বড়ো হয়েছি, তখন ময়মনসিংহের কাঁঠাল গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার চাচাজান ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছেন, নানা কোণ থেকে, নানা ভঙ্গিতে। হাত তুলে দেখাচ্ছেন, বুঝলে, ঐ যে তেঁতুলগাছটি ডান পাশে আছে, তাকে বামপাশে নিতে পারলে ভালো হত। কিন্তু তিনি বুড়ো হয়েছেন। খাল পেরিয়ে তেঁতুলগাছটিকে তুলে বামদিকে রেখে আসার সামর্থ্য নেই। আমি তরুণ পায়ে খাল পার হয়ে তেঁতুলগাছটিকে ভালো করে দেখি। গাছটি তখন একটি কিশোর ছেলের মতো ঝাঁকড়া মাথায় বলে ওঠে, ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে। ধান দেবো মেপে।’

আর তক্ষুনি আকাশ ফুটো হয়ে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। মরা ব্রহ্মপুত্র ভরে ওঠে। তার কূল ছাপিয়ে ছল ছল করে সেই জল আমাদের পায়ে এসে লাগে। এর মধ্যে কয়েকটি শেয়াল জ্বলজ্বলে চোখ মেলে আমার পাশ দিয়ে শুকনো ডাঙার দিকে ছোটে। নাইব চাচা বলেন, যাও সবুজ জামা পরে এসো। লুঙ্গি পরে এসো।

সেই সাদা বৃষ্টির ভেতর চাচা যে ছবিটি তোলেন, দেখে বুঝতে পারিআমি আর শ্যামলা মানুষ নই, সবুজ হয়ে গেছি। এই যে আকার বদলে দেওয়া, রং পালটে দেওয়া, এগুলো ঠিক ম্যাজিকের মতো লাগে।

 

গান শোনা আমার প্রিয় কাজ।

ছেলেবেলায় আমার ঠাকুরদা গান করতেন উঠোনের পেয়ারাগাছের নীচে মাদুর বিছিয়ে। পাড়ার ছেলেমেয়েরা আমার বোনদের সঙ্গে ঠাকুরদার গান গাইত। আর শুনতাম আমাদের পাথুরে কালীবাড়িতে পদাবলী কীর্তন। অষ্টপ্রহর জুড়ে নানা সম্প্রদায় গান করত। সারা বছর জুড়েই বোষ্টমরা আমার মাকে গান শুনিয়ে যেত। তার বিনিময়ে চালটা কলাটা। বারুণীতে শোনা যেত নমঃশুদ্রদের মতুয়াগান, আর নাম-কীর্তন। এর সঙ্গে আলাই গান, আগমনী গান, জারি গান, সারি গান, কাইজা গানও শুনছি।

বাড়িতে একটা রেডিও ছিল। থাপ্পড় দিলে চলত। আবার থাপ্পড় দিলে বন্ধ হয়ে যেত। তখন শুনতাম বিবিধভারতী। দুপুরে চাষিভাইদের অনুষ্ঠান। ওটা দুপুর একটায়। এরপরেই পঞ্চকবির গান। সাড়ে চারটেয় শুনতাম গ্রামোফোন রেকর্ডের গান। পুরাতনী গান আর রম্য গীতি। রেডিও বাংলাদেশ শুনতাম সৈনিক ভাইদের জন্য দুর্বার। বাড়িতে একটা গ্রামোফোন রেকর্ডার ছিল। সেটা ভাঙা। কখনও বাজিয়ে শোনা হয়নি। তবে অসংখ্য রেকর্ড ছিল হিজ মাস্টার্স ভয়েসের। তার গায়ে, প্যাকেটে গান লেখা থাকত। সেগুলো পড়ে আরাম পেতাম।

আর ছিল পূজার সময় মান্না দে’র ‘ও ললিতা’। ললিতা আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে ও ঘাটে জল আনতে যেত। কারও মানা শুনত না। আর জগন্ময় মিত্রর চিঠি শুনতে হত হাহকারের মত।

যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়েছিতখন তো জুতো কেনারই পয়সা ছিল না। তবে ফ্রি’তে গান শোনা যেত হলের টিভিতে, সংগঠনের অনুষ্ঠানে। 

একতা পত্রিকা ফেরি করে একটা ছোটো ক্যাসেট প্লেয়ার কিনেছিলাম। সেই-ই আমার একমাত্র নিজের যন্ত্র। এই সময়ই আমার শিক্ষক আ বা ম নূরুল আনোয়ার জ্যোৎস্না রাতে ব্রহ্মপুত্রে ডেকে নিয়ে শোনাতেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। ফাহমিদা খাতুনের কাছে শোনা হত– ‘কাদের কুলের বউ গো তুমি’,  পুরাতনী। 

আর রাগ সঙ্গীত চেনাতেন নাইবচাচা। নাইবচাচার সঙ্গেই শুনেছি বেগম আখতারকে। তিনি গাইবেন বলে রাত্রি নেমে আসত বাড়ির উঠোনে।

কাঠগোলাপের ঝাড় ভেদ করে জ্যোৎস্না নেমে আসবে, ফুটে উঠবে নাইট কুইন। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে খিচুড়ির ঘ্রাণ। জ্যোৎস্না উঠতে উঠতে আর ওঠে না। দেখা দিতে দিতে আর দেখা দেয় না। তখন বেগম আখতার গেয়ে উঠছেন– ‘জোছনা করেছে আড়ি / আসে না আমার বাড়ি
গলি দিয়ে চলে যায় / লুটিয়ে রূপোলি শাড়ি।’

এই গান শুনতে পেয়ে কুদ্দুস স্যার ঘুমোতে পারছেন না। পুকুরের উত্তর পাড়ের বাসা থেকে নেমে এসেছেন। চুপি চুপি এসে দাঁড়িয়েছেন ব্লিডিং হার্টের লতার আড়ালে। পিয়া ভোলো অভিমান/ নিশিরাত বয়ে যায়– গানটির মুখরা শুরু হতে না হতেই তাঁর চোখ ভিজে এসেছে। ধীরে ধীরে তিনি ফোঁপাতে শুরু করেছেন। কান্না শুনে নাইবচাচা এগিয়ে গিয়ে তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছেন, এটা গান, গান শুনে কাঁদতে নেই। 

আমরা অবাক হয়ে দেখতে পাই, অভিমান ভুলে জ্যোৎস্না ফিরে এসেছে। নাইট কুইন ফুটে উঠেছে। নিপুন আর পান্থ দুভাই প্লেটে করে খিচুড়ি নিয়ে এসেছে। আর নাইব চাচাও কুদ্দুস স্যারের সঙ্গে কাঁদতে কাঁদতে হেসে উঠেছেন। খিচুড়ি মুখে দিয়ে বলে উঠেছেন, অমৃত…

পরে ইস্ট রিভারের পাড়ে স্প্যানিস সালসা গান শুনিয়েছিল আব্রাহাম রড্রিগোজ …

তার মা, শেষবার হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পরে স্ট্রেচারে শুয়ে গেয়ে শুনিয়েছে– 

Y yo, desesperando

Y tú, tú contestando

Quizás, quizás, Quizás. 

এরপর বুড়ি রড্রিগোজ চোখ বুজেছে। সেই চোখ আর খোলেনি। ফ্যাস ফ্যাস করে বলেছে, আদিউস… বিদায়, মাই সান। 

তাঁর কষ্ট মুছে গেছে। ঈশ্বর নিজে এসে তাঁর হাত ধরেছেন। এরপর কষ্ট থাকে কী করে!

গান এলে ঈশ্বরও কাছে এসে বসেন। চোখ বন্ধ করে সেই গানের সুরে বাঁশি বাজান। সেই পোড়া বাঁশি শুনে ঘরে থাকা দায়। আমাদের বাঁশবাগান থেকে বাঁশ নিয়ে ঈশ্বর এই বাঁশি বানাতেন। ঈশ্বর আসবেন এই জন্য আমার মা সায়ংকালে বাঁশবাগানে ধূপের গন্ধ রেখে আসতেন। আমিও তাঁর সঙ্গে গান গাই। 

এই গান থেমে নেই, কখনও থামে না।

(লেখক নিউইয়র্ক নিবাসী গল্পকার)

(স্কেচটি করেছেন তাজুল ইমাম)

পরের পর্ব আগামী  সংখ্যায়…

জলের অক্ষর পর্ব ৫

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More