রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৪

ছবির মতো নিঃশব্দ গ্রামে জনা ৩০ বুড়োবুড়ি, আর শ’চারেক পুতুল

চৈতালী চক্রবর্তী

নদীর ধারে ছিপ ফেলে বসে থাকা লোকটাকে গ্রামের রাস্তা জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয় না। পরনে তাপ্পি দেওয়া চেক-চেক প্রিন্টের শার্ট, ঢোলা পাতলুন, মাথায় বেতের টুপি। খোঁচা খোঁচা দাড়ির ফাঁকে আধখানা চাঁদের মতো হাসি ধরে রেখে ফ্যালফ্যাল করে শুধু চেয়ে থাকে। পাহাড়ের বাঁকে কমলালেবুর ঝুড়ি নিয়ে বসে ঢুলছে টুকটুকে বৃদ্ধা। একমাথা সাদা চুল চূড়ো করে বাঁধা। আশ্চর্য তাঁকে শুধোলেও মুখে কুলুপ। বাঁক ঘুরতেই শুরু হচ্ছে গ্রামের পথ।

সুনসান রাস্তা। যতদূর চোখ যায় জনমনিষ্যি নেই। পাহাড়ের কোল ঘেঁষা গ্রাম যেন প্রকৃতির ক্যানভাস। রঙ-তুলি দিয়ে প্রকৃতি সেই ক্যানভাসে আপন মনের খেয়ালে সৃষ্টি করে চলেছে একের পর এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যপট। মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই দিকে দেখা ছাড়া অন্য কোনও উপায় থাকে না।

ঝকঝকে গ্রামের রাস্তাঘাট, নৈসর্গিক প্রকৃতি আর পথেঘাটে একদল না কথা বলা মানুষ। ঘুপচি ঘরের সামনে, বাগানের বেঞ্চিতে, স্কুলের দালানে শুধু নির্বাক মানুষের ভিড়। তাদের চোখে শূন্য দৃষ্টি, মুখে অস্ফুট বুলি। মানুষ?  না, মানুষ নয়। এই নির্বাক সারির প্রতি জন মানুষের আদলে বানানো পুতুল। এতটাই নিখুঁত তাদের হাতের নখ থেকে মাথার চুল, যে এক ঝলকে মানুষ ভ্রম হয়। গ্রামের আনাচ কানাচে মানুষের মাঝেই মিশে রয়েছে এইসব পুতুলেরা। তাদেরই একজন হয়ে।

নিজের কর্মশালায় সুকিমি আয়োনো।

জাপানের শিকোকু দ্বীপের লিয়া উপত্যকা। পাহাড়ের কোল ঘেঁষা ছবির মতো গ্রাম নাগোরো। স্থানীয়রা বলেন ‘নাগোরু।’ আর বিশ্বের কাছে ‘The Valley Of Doll।’ পুতুলদের গ্রাম। গোটা গ্রাম জুড়েই পুতুলদের ভিড়। অপার নৈঃশব্দ আর অগাধ সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে যেন বসে আছে নাগোরো। ‘Silence is golden’ গ্রামে পা দিলে এই কথাটাই সত্যি বলে মনে হবে।

পুতুলদের মধ্যেও বৈচিত্র্য রয়েছে। শিশু, কিশোর, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নানা বয়সের পুতুল। মানুষও যে নেই তা নয়, তবে তাঁদের সংখ্যা বড়ই কম। গ্রামজুড়ে মানুষের সংখ্যা সাকুল্যে ৩০। অধিকাংশই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। গ্রামের সবচেয়ে কম বয়সীর নাম সুকিমি আয়োনো। বয়স সাতষট্টির আশপাশে। পুতুল-গ্রামের রহস্য তাঁরই সঙ্গে বাঁধা। কারণ পুতুলগুলি তাঁরই তৈরি। আস্ত একটা গ্রামকে তিনি ভরিয়ে দিয়েছেন পুতুল দিয়ে। মানুষের অভাব পূরণ করছে পুতুলরাই।

সুকিমির শৈশব কেটেছে নাগোরোতে। পড়াশোনা ও পরে পেশার খাতিরে গ্রাম ছাড়েন। ওসাকাতে দীর্ঘদিন কাটিয়ে ১১ বছর আগে গ্রামে ফিরে তাঁর মাথা ঘুরে যায়। কোথায় সেই পরিচিত গ্রাম? মাকে হারিয়েছেন ছেলেবেলাতেই। বাবাও গত হয়েছেন। আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ কোত্থাও নেই। গুটিকয়েক চেনা-অচেনা মুখের সারি। সেই চেনা পথঘাট জনশূন্য। স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়া সেই চেনা গলি, নদীর বাঁকের মুখের বাজার কিছুই নেই। চারদিক জনবিরল, নিঃস্তব্ধ, শ্মশানের শূন্যতা যেন গ্রাস করেছে নাগোরোকে। সুকিমি জানিয়েছেন, মানুষ নয়, বরং প্রকৃতির এই নিঃসঙ্গতা দূর করতেই তিনি পুতুল বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক যেমন ভাবে গ্রামের মানুষগুলোকে দেখেছিলেন একসময়, তাঁদের আদলে বানানো শুরু করেন পুতুল।

শুরুটা হয় একটা কাকতাড়ুয়াকে দিয়ে। তার পর একে একে নানা বয়সের পুতুল তৈরি শুরু হয়। বর্তমানে গ্রামে প্রায় ৪০০ রকমের পুতুল রয়েছে। ‘‘পুতুল বানাতে গিয়ে প্রথম বাবার কথা মনে পড়ে। বাবার আদলেই একটা পুতুল বানাতে শুরু করি। সেই শান্ত-সৌম মুখ, ঠোঁটের কোনায় হাসি,’’ সুকিমির চোখে-মুখে খুশি। বললেন, ‘‘সামান্য জিনিস দিয়েই পুতুল বানাই। খড়, পুরনো কাপড়, তুলো যা হাতের সামনে থাকে। তার পর সেগুলোকে রাঙিয়ে দিই। কারওর মুখে হাসি, কেউ বা খুব রাগী।’’

পুতুলদের মুখে অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা খুবই শক্ত কাজ। সুকিমির কথায়, বয়স্ক মানুষের মুখের অনুভূতি একরকম, আবার তরুণের অন্যরকম। জোড়ায় জোড়ায় বাগানে বসে প্রেম করছে যারা তাদের মুখের অনুভূতি আবার অন্যরকম। সুকিমির সবচেয়ে পছন্দ ‘নানী পুতুল।’ সাদা চুলের বয়স্কা মহিলা যেন তাঁর ছেলেবেলায় হারিয়ে যাওয়া মায়ের অভাব পূরণ করে।

ফেন্সিং ঘেরা ছোট ছোট জমিতে চাষ করছে চাষী-পুতুল, নদীতে মাছ ধরছে পুতুল, দমকল কর্মী থেকে পুলিশ— চারদিকে পুতুলের মেলা যেন। সুকিমি বললেন, দু’বছর আগেই গ্রামের স্কুলে তালা পড়ে গেছে। মানুষই তো নেই, পড়তে আসবে কারা!  খাঁ খাঁ করা স্কুলটাকেও তাই তিনি ভরিয়ে দিয়েছেন পুতুল দিয়ে। শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে সেই চেনা ইউনিফর্ম পড়া ছোট ছোট পুতুল বসে রয়েছে ক্লাসঘরে। তাদের সামনে পরিপাটি করে রাখা বই, খাতা, রঙ-তুলি, পেন্সিল। কেউ কেউ আবার হাতে পেন্সিল ধরে ড্রয়িং খাতায় সুকিমির ছোটবেলার সেই আদরের ফুল গাছের ছবি আঁকছে। ক্লাসে গম্ভীর মুখে পড়াচ্ছে শিক্ষক-পুতুল। গলায় টাই ঝুলিয়ে তার চোখে কড়া শাসন। ছোট্ট একটা সরকারি দফতর রয়েছে। তাতে চোখে চশমা এঁটে ফাইল খুলছে পুতুল। সামনে একরাশ বিরক্তি নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো খানকতক বয়স্ক পুতুল। বাস স্ট্যান্ডে, রেস্তোরাঁর ভেঙে পড়া টেবিলে, এমনকি সুকিমির নিজের আদলের পুতুলও রয়েছে। সে নাকি একটু বেশি ঘুমকাতুরে।

একসময় নাগোরোর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০। ২০১৫ সালে সেটা দাঁড়ায় ৩৫ জনে, ২০১৬ সালের হিসেবে ৩০ জনে। তরুণেরা পেশার জন্য গ্রাম ছেড়েছেন। টিকে রয়েছেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধারাই। বর্তমানে সেই সংখ্যা কততে ঠেকেছে সেটা নিজেই ঠিকমতো জানেন না সুকিমি। শুধু চোখের সামনে দেখেন ধূ ধূ প্রান্তর। ‘‘শূন্যতা অনেকটাই পূরণ করেছে আমার পুতুলরা’’ সুকিমির কথায় ‘‘এখন আর খুব একটা একা লাগে না। হাত বাড়ালেই কাউকে আঁকড়ে ধরা যায়। নাই বা হল সে মানুষ।’’

মৃত্যুকে আর এখন ভয় পান না সুকিমি। জানিয়েছেন, হাসপাতাল গ্রামের সীমানা থেকে বহুদূর। পৌঁছতে সময় লাগে ঘণ্টাখানেক। অসুস্থ হলে সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরিষেবা ও মানুষজন কেউই নেই। ২০১৪ সালে নাগোরো গ্রামকে নিয়ে ‘দ্য ভ্যালি অব ডল’ নামে একটি তথ্যচিত্র বানান ফ্রিৎজ স্ক্যুম্যান। তার পর থেকেই গ্রামে পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে। ক্যামেরা হাতে মাঝে মধ্যেই ভিড় জমান সাংবাদিকরা।

মানুষের সঙ্গ থেকে পুতুলদের সঙ্গই এখন বেশি পছন্দ করেন সুকিমি। প্রতিটা পুতুলের আয়ু তিন মাস। ফের সেই কাঠামোয় তৈরি হয় নতুন পুতুল। নতুন স্বপ্ন নিয়ে তারা পৃথিবীর আলো দেখে। জানিয়েছেন, এই পুতুলরাই তাঁর সন্তান। তাঁর পরিবার। এটা তাঁর নিজের দুনিয়া। প্রতিযোগিতা, অনাবশ্যক হিংসা, কূটনীতি এই দুনিয়ায় নেই। এখানে সকলেই একে অপরের সঙ্গী। নিজেদের যন্ত্রণা আর একাকীত্ব মেটাতে পরস্পরের হাত ধরে রয়েছে।

আরও পড়ুন:

ঘরে ঘরে, জোড়ায় জোড়ায়, আটশো যমজ শিশু নিয়ে রহস্যে মোড়া কেরলের এই গ্রাম

ঘরে ঘরে, জোড়ায় জোড়ায়, আটশো যমজ শিশু নিয়ে রহস্যে মোড়া কেরলের এই গ্রাম

Shares

Comments are closed.