পৃথিবীর একমাত্র মানুষ, যাঁকে আটষট্টি বছর বাঁচিয়ে রেখেছে লোহার ফুসফুস

তিনি নিজেও ভাবেননি এতদিন বাঁচবেন।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ

তখনও আবিষ্কার হয়নি পোলিও রোগের টিকা। পোলিওমায়েলাইটিস ভাইরাসের আতঙ্কে কাঁপছিল আমেরিকা। প্রতি গ্রীষ্মে প্রায় ১৫০০০ শিশু পোলিওর কারণে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হচ্ছিল। অকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল হাজার হাজার শিশু। তবে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল ১৯৫২ সাল। সে বছর আমেরিকাতে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় ৫৮০০০ শিশু। এর মধ্যে শুধু টেক্সাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২১০০০। প্রাণ গিয়েছিল ৩১৩৫ জন শিশুর।

তাই সে বছর গ্রীষ্মের শুরু থেকেই টেক্সাসের রাস্তাঘাট, দোকানপাট, স্কুল কলেজ, অফিসকাছারি, চার্চ থেকে সিনেমা হল, সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল জনসমাবেশ। কেউ কারও বাড়ি যেতেন না। কার্ফু না থাকা সত্ত্বেও রাস্তা থাকত জনশূন্য। সম্পুর্ণ গৃহবন্দি হয়ে গিয়েছিলেন টেক্সাস শহরের মানুষ।

একই সঙ্গে টেক্সাসে সে বছর এসেছিল এক ভয়াবহ গ্রীষ্ম। তাপমাত্রা ছুঁয়েছিল প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি। টানা পঁচিশ দিন ধরে রাতের তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রির আশেপাশে। পোলিওমায়েলাইটিস ভাইরাসের আতঙ্ক এবং দুঃসহ গরম, নাজেহাল করে দিয়েছিল টেক্সাসবাসীদের। হাসপাতালের পোলিও ওয়ার্ডগুলি উপচে পড়ছিল অসুস্থ শিশুদের ভিড়ে। টেক্সাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল কীটনাশকের গন্ধ। আসলে প্রশাসন বুঝতে পারছিল না পোলিও রুখতে কী করা উচিত। তাই অবিশ্বাস্য পরিমাণে ছড়িয়ে দেওয়া ডিডিটি, বাতাসকে ভয়ঙ্করভাবে দুষিত করে তুলেছিল।

আরও পড়ুন: প্রাচীনতম দৈত্যাকার ডাইনোসরের জীবাশ্ম মিলল আর্জেন্টিনায়, হারিয়ে গিয়েছিল ১৪ কোটি বছর আগে

মুক্তির আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিল ছ’বছরের পল

টেক্সাসের বিখ্যাত ডালাস শহরের উপকন্ঠে, বাবা মা ও দাদার সঙ্গে থাকত ছ’বছরের পল আলেকজান্ডার। গৃহবন্দি থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছিল পল। জানলার কাচের বাইরে থেকে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত রোদে ঝলসে যাওয়া মাঠ, ম্যাপল গাছ ও ছোট্ট টিলা। জুলাই মাসে হঠাৎই একদিন আকাশ জুড়ে দেখা দিয়েছিল কালো মেঘ। ঝেঁপে বৃষ্টি নেমেছিল পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া ডালাসে। আনন্দে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন ডালাসের মানুষজন। শিশুদের ঘরে আটকে রেখে বড়রা নেমে এসেছিলেন রাস্তায়।

ডানপিটে পল বাড়ির পিছনের জানলার কাঁচ সরিয়ে নেমে পড়েছিল মাঠে। তিন মাস পর মুক্তির আনন্দে পাগল হয়ে উঠেছিল সে। কর্দমাক্ত মাঠে গড়াগড়ি খেয়েছিল। গাছে ঢিল ছুড়েছিল। বন্ধুদের বাড়ির সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করেছিল। প্রায় এক ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভেজার পর পিছনের জানলা দিয়েই নিজের ঘরে ঢুকেছিল পল। গা মুছে আয়নার দিকে তাকাতেই চমকে উঠেছিল সে। তার মুখের রঙ টকটকে লাল।

নেমে এসেছিল আতঙ্কের ছায়া

পল ছুটে গিয়েছিল মায়ের কাছে। চমকে উঠেছিলেন মা। পলকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলেন। তার গলা এবং মাথা খুব ব্যাথা করছিল। এসে গিয়েছিল ধুম জ্বর। পলের বাবা মা ফোন করেছিলেন পারিবারিক চিকিৎসকে। তিনি বলেছিলেন সমস্ত উপসর্গই পোলিওর। তবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। কারণ হাসপাতালের পোলিও ওয়ার্ড উপচে পড়েছে, পোলিও আক্রান্ত শিশুরা চিকিৎসা না পেয়েই মারা যাচ্ছে। তাই বাড়িতে চিকিৎসা করলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

কিন্তু সেদিন রাত্রিবেলা পলের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়েছিল। কথা বলার ক্ষমতা, হাত দিয়ে কিছু ধরার ক্ষমতা, খাবার গেলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল পল। এমনকি কাশতে গেলেও সমস্যা হত তার। আলেকজান্ডার দম্পতি পলকে রাতেই নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় পার্কল্যান্ড হাসপাতালে। নতুন পোলিও রোগী নেওয়ার অবস্থায় ছিল না হাসপাতাল। ভর্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। কারণ রোজ প্রচুর শিশু মারা যাচ্ছিল। বেড খালি হলে পলের চিকিৎসা হবে। অচৈতন্য পলকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন মা। কোনও মায়ের কোল খালি হলে তবেই জুটবে পলের বেড।

ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছিল পল

শ্বাস নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল পল। মুখের রঙ নীল ও ঘোলাটে, চোখের তারা ক্রমশ স্থির হয়ে আসছিল। স্বাস্থ্যকর্মী ও ডাক্তারদের হাতে পায়ে ধরছিলেন আলেকজান্ডার দম্পতি। কেউ তাঁদের কথায় গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। হঠাৎই এক তরুণ চিকিৎসক মায়ের কাছ থেকে পলকে ছিনিয়ে নিয়ে ছুটেছিলেন অপারেশন থিয়েটারের দিকে। জরুরীকালীন ভিত্তিতে তিনি পলের ‘ট্রাকিয়োটমি’ অপারেশন করেছিলেন। ফুসফুসে জমে থাকা ফ্লুইড বের করে এনেছিলেন।

কিন্তু ততক্ষণে পক্ষাঘাতে অসাড় হয়ে গিয়েছিল পলের ফুসফুস। তাই ছ’বছরের পলকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল সিলিন্ডার আকৃতির প্রকাণ্ড এক মেশিনের ভেতর। যে মেশিনটি কৃত্রিম ফুসফুসের কাজ করে। তাই মেশিনটিকে বলা হত ‘আয়রন লাং’ বা লোহার ফুসফুস। চিকিৎসকরা বলতেন ট্যাঙ্ক ভেন্টিলেটর বা ড্রিঙ্কার ট্যাঙ্ক। যে মেশিনটি ১৯২৮ সালে আবিষ্কার করেছিলেন ফিলিপ ড্রিঙ্কার নামে একজন মেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার।

লোহার ফুসফুস

কী এই ‘আয়রন লাং’

বিদ্যুতচালিত লোহার ফুসফুসগুলি দেখতে ছিল অনেকটা সাবমেরিনের মত। এক একটির ওজন ছিল প্রায় ৩০০ কেজি। মেশিনটির ভেতরে রোগীর চিত হয়ে শোয়ার ব্যবস্থা ছিল। তবে রোগীর মাথাটি থাকতে হবে সিলিন্ডারের বাইরে। রোগীর পায়ের দিকে সিলিন্ডারটির প্রান্তে লাগানো ছিল চামড়া দিয়ে তৈরি হাপর। যেটি হারমোনিয়ামের বেলোর মতো কাজ করে সিলিন্ডারের ভেতরের বাতাসের চাপ কমাত ও বাড়াত। ফলে কৃত্রিমভাবে রোগীর ফুসফুস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখত।

সাধারণত কোনও পোলিও আক্রান্ত শিশুকে দুই সপ্তাহ রাখা হত লোহার ফুসফুসের মধ্যে। তার মধ্যে শিশুটির ফুসফুস কাজ করা শুরু করলে ভাল, না হলে তার মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তাকে বের করে আনা হত মেশিন থেকে। পরের শিশুটিকে বাঁচবার সুযোগ দেওয়া হত।

পলের জ্ঞান ফিরেছিল তিনদিন পর

হাত পা একদমই নাড়াতে পারছিল না। পল ভেবেছিল সে মারা গিয়েছে। তাকে কবরের মধ্যে শুইয়ে রাখা হয়েছে। হাত পা নাড়াতে না পারলেও ঘাড় ঘোরাতে পারছিল। সে দেখেছিল লম্বা হলঘরটিতে রাখা আছে সারি সারি সিলিন্ডার। সেগুলি থেকে বেরিয়ে আছে তারই বয়সি অনেক ছেলেমেয়ের মাথা। প্রত্যেকের মুখ অস্বাভাবিক রকমের নীল।

কথা বলতে পারত না পল। তবুও চোখের ইশারায় ভাব জমাত পাশের সিলিন্ডারে থাকা শিশুটির সঙ্গে। চোখের ইশারায় ও মুখের অভিব্যক্তিতে চলত আলাপচারিতা। হয়ত একে অপরকে এভাবেই সাহস যোগাত তারা। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব বেশি দিন স্থায়ী হত না। কারণ কয়েকদিন পরপরই সিলিন্ডার থেকে বের করে নেওয়া হত পলের নতুন বন্ধু বা বান্ধবীকে। সাদাকাপড়ে ঢাকা ছোট্ট শরীরটি নিয়ে মর্গের পথে ছুটত ট্রলি।

পোলিও ওয়ার্ডে লোহার ফুসফুসের সারি

“আর কতদিন বাঁচবে এটা”

পলের কানে আসত নার্সদের বিরক্তি ভরা গলা, “এটা আর কতদিন।” রেগে যেত পল। বাঁচার ইচ্ছাটা আরও বেড়ে যেত। একসময় প্রাথমিক সংক্রমণ কাটিয়ে উঠেছিল সে। তবে তার ঘাড়ের নীচ থেকে পুরো শরীরটা পক্ষাঘাতে অবশ হয়ে গিয়েছিল। সারাক্ষণ সে চিত হয়ে শুয়ে থাকত মেশিনে। নার্সেরা তার দিকে আর তেমন আর মনোযোগ দিতেন না।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা মলমূত্র মেখে মেশিনের মধ্যে পড়ে থাকত পল। যখন মলমূত্র পরিষ্কার করা হত বা জামা কাপড় বদলানো হত, ওই কয়েক মুহূর্ত পলকে নিশ্বাস বন্ধ করে থাকতে হত। কারণ তখন মেশিন এক মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হত। শ্বাস বন্ধ করে থাকতে প্রচন্ড কষ্ট হত পলের। ভাবত তাকে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। চিৎকার করত প্রাণপণে।

না পল পৃথিবী ছাড়েনি

মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে করতে, চিকিৎসক ও নার্সদের বিরক্তিভরা মুখ দেখতে দেখতে, কেটে গিয়েছিল দেড় বছর। না পল মারা যায়নি। বরং সিলিন্ডারের ভেতর তার ওজন বেড়েছিল। পলের বাবা মা পলকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তার জন্য কিনে ফেলেছিলেন লোহার ফুসফুস। ১৯৫৩ সালের ক্রিসমাসে পার্কল্যান্ড হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছিল পল। যে ট্রাকে লোহার ফুসফুসে ভরে পলকে নিয়ে আসা হয়েছিল, সেই ট্রাকে মেশিনটি চালানোর জন্য লাগানো হয়েছিল জেনারেটার।

নিজের বাড়ি ফিরে পল খুব খুশি হয়েছিল। তার বন্ধুরা দেখতে এসেছিল। এসেছিলেন স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারাও। রাতে বাবা মা লোহার ফুসফুসের পাশে শুতেন। সারা রাত প্রায় জেগেই থাকতেন তাঁরা। মেশিনের ‘হুশ হুশ’ শব্দটা খেয়াল রাখতেন। কারণ মেশিন বন্ধ হওয়া মানেই পলকে হারিয়ে ফেলা। যখন বিদ্যুৎ চলে যেত, তখন পলের বাবা মা দুই হাত দিয়ে পাম্প করতেন মেশিনের হাপরটিকে। ক্লান্ত হয়ে গেলে প্রতিবেশীদের ডাকতেন। প্রতিবেশীরা পালা করে পাম্প করে যেতেন, যতক্ষণ না বিদ্যুৎ আসে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই পলের জন্য কেনা হয়েছিল জেনারেটার।

 ঈশ্বরের প্রতিনিধি হয়ে এসেছিলেন এক নারী

১৯৫৪ সাল। আট বছরের পলের জীবনে ঈশ্বর হয়ে এসেছিলেন ফিজিওথেরাপিস্ট মিসেস সুলিভান। তিনি পলকে শিখিয়েছিলেন কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেওয়ার একটি কৌশল। কৌশলটির নাম ‘ফ্রগ-ব্রিদিং’ বা ‘গ্লসোফ্যারিঞ্জিয়াল ব্রিদিং’। কৌশলটি হল নাক মুখ দিয়ে বাতাস নিয়ে গিলে ফেলা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মেশিন বন্ধ করে শুরু হয়েছিল ‘ফ্রগ- ব্রিদিং’ ট্রেনিং। প্রচণ্ড কষ্ট হত পলের। চিৎকার করত।

উৎসাহ দিতেন ফিজিওথেরাপিস্ট মিসেস সুলিভান। লোভ দেখাতেন বিভিন্ন উপহারের। একদিন তিনি একটি সুন্দর কুকুরছানা নিয়ে এসেছিলেন। বলেছিলেন পল যদি ‘ফ্রগ- ব্রিদিং’ শিখে নেয় তাহলে কুকুরছানাটি তিনি পলকে উপহার দেবেন। একবছরের চেষ্টায় পল রপ্ত করে নিয়েছিল ‘ফ্রগ- ব্রিদিং’। উপহার পাওয়া কুকুরছানাটির নাম রেখেছিল ‘জিঞ্জার’।

ফ্রগ-ব্রিদিং রপ্ত করার পর, পলকে কয়েক মিনিটের জন্য মেশিনের বাইরে বের করতে শুরু করেছিলেন মিসেস সুলিভান। হুইলচেয়ার করে পলকে নিয়ে যাওয়া হত বারান্দায়, লনে, বাড়ির অনান্য ঘরে। আনন্দে থর থর করে কাঁপত পলের ঠোঁট। বাবা মা দাদার সঙ্গে কথা বলত পল, বাতাস গেলার ফাঁকে ফাঁকে।

শুরু করেছিল মূলস্রোতে ফেরার এক অসামান্য প্রচেষ্টা

তিন বছর পর, বেশ কয়েক ঘণ্টা সিলিন্ডারের বাইরে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল পল। রোজ সকালে বারান্দায় নিয়ে যাওয়া হত তাকে। পাড়ার বন্ধু বান্ধবীরা স্কুলে যেত পলের দিকে হাত নাড়িয়ে। পলের খুব স্কুলে যেতে ইচ্ছা করত। কিন্তু ঘাড়ের নীচ থেকে পুরো শরীর অবশ। খাতায় লিখবে কী করে! বই ধরবে কী করে! পরীক্ষাই বা দেবে কী করে!

সিলিন্ডারের ভেতর শুয়ে, প্লাস্টিকের ছোট রডের মাথায় পেন বেঁধে, মুখ দিয়ে খাতায় লেখা অভ্যাস করেছিল। মা বাবা পড়াতে শুরু করেছিলেন। দাঁতে তুলি কামড়ে খুব সুন্দর ছবি আঁকত সে। মুগ্ধ হয়ে যেতেন সবাই। কিছু ছবিতে ফুটে উঠত বালক পলের স্বপ্ন। কোনও ছবিতে সে বাস্কেটবল খেলছে। কোনও ছবিতে সে বেসবল খেলছে। যদিও পল জানত ছবিতে ফুটে ওঠা স্বপ্নগুলি আর কোনও দিনই সত্যি হবে না।

ছবি এঁকেছে বালক পল

ছোটার মত মন থাকলে, বাধার পাহাড় পথ ছেড়ে দেয়

অনেক লড়াইয়ের পর, পলকে বাড়ি থেকে পড়াশোনা করার অনুমতি দিয়েছিল ডালাসের শিক্ষা দফতর। ১৯৬৭ সালে একুশ বছর বয়সে ডালাস হাইস্কুল থেকে ১২ ক্লাসের গন্ডি পেরিয়েছিল পল। বায়োলজি ছাড়া সব বিষয়ে পেয়েছিল ‘এ’ গ্রেড। বায়োলজিতে পেয়েছিল ‘বি’, কারণ সে গিনিপিগ কাটতে পারেনি। স্কুল পাশ করে ভর্তি হয়েছিলেন সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিতে।

আইনজীবী পল, লোহার ফুসফুসের বাইরে

সেখান থেকে স্নাতক হয়ে, ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন পল। তখন তার যুবা বয়স। আইনজীবী হয়ে প্র্যাকটিস শুরু করেন ১৯৮৪ সাল থেকে। হুইল চেয়ার নিয়ে কোর্টে যেতেন। দুঁদে আইনজীবীর মতই মামলা লড়তেন ‘ফ্রগ-ব্রিদিং’ করতে করতে। কিছুদিনের মধ্যেই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন আইনজীবী হিসেবে। চেম্বারে ভিড় লেগেই থাকত। পোর্টেবল ভেন্টিলেটর অনেক আগেই আবিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তবুও পল ত্যাগ করেননি তাঁর রাতের সঙ্গী লোহার ফুসফুসটিকে। যাঁকে পল আদর করে ডাকতেন “ওল্ড আয়রন হর্স”।

প্রেম একবার এসেছিল নীরবে

প্রেম এসেছিল পলের জীবনেও। কলেজে পড়া অবস্থায় ক্লেয়ার নামে একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন পল। মেয়েটি বাড়ি এসে পড়াশোনায় পলকে সাহায্য করতেন। ক্লেয়ারও পলকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। ‘ফ্রগ ব্রিদিং’ করতে করতে ক্লেয়ারকে পল জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এই ভালোবাসা করুণা নয়ত।” কোনও উত্তর না দিয়ে পলের ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিলেন ক্লেয়ার। পলের জীবনের সেটাই প্রথম ও শেষ চুম্বন।

একজন পক্ষাঘাতগ্রস্থ যুবকের সঙ্গে মেয়ের প্রেম মেনে নিতে পারেননি ক্লেয়ারের মা। প্রায় জোর করেই ক্লেয়ারকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন অন্য শহরে। ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন পল। বুঝতে পেরেছিলেন প্রতিবন্ধকতার আসল বাসা তথাকথিত সুস্থ সবল মানুষদের মনে। সমাজের মূলস্রোতে প্রতিবন্ধীদের ফেরবার অধিকার নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন নাছোড়বান্দা পল।

হাত ধরেছিলেন ক্যাথি

কালের নিয়মে পলের জীবন থেকে একে একে হারিয়ে গিয়েছিলেন বাবা, মা দাদা ও বন্ধুরা। একাই লড়াই করে চলেছিলেন। হঠাৎ জীবনে এসেছিলেন তাঁর আইন কলেজের সহপাঠিনী ক্যাথি। ডায়াবেটিসের কারণে ক্যাথি তখন তাঁর দৃষ্টিশক্তির প্রায় নব্বই শতাংশ হারিয়ে ফেলেছেন। দুই বন্ধু জীবন সায়াহ্নে এসে একসঙ্গে থাকবেন বলে ঠিক করেছিলেন। আজ প্রায় দুই দশক একই ছাদের তলায় আছেন ক্যাথি ও পল। আছে লোহার ফুসফুসটিও।

ক্যাথি ও পল

২০১৫ সালে লোহার ফুসফুসটিতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু যন্ত্রাংশ মিলছিল না। মিলবেই বা কী করে, অর্ধ শতাব্দী আগেই যে লোহার ফুসফুসের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এগিয়ে এসেছিলেন ডালাসের এক ইঞ্জিনিয়ার। মেরামত করে দিয়েছিলেন লোহার ফুসফুসটি। ভাগ্যিস করে দিয়েছিলেন। কারণ ২০১৬ সাল থেকে পল আবার চব্বিশ ঘণ্টার জন্য বন্দি হয়ে গিয়েছেন লোহার ফুসফুসের মধ্যে। কারণ ফ্রগ-ব্রিদিংও তিনি আর করতে পারছিলেন না। ছোট্টবেলার ভয়াবহ স্মৃতি ফিরে এসেছিল পলের মনে। সেদিনের মতোই পলকে বাঁচিয়েছিল লোহার ফুসফুস।

নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন পল

পলের বাবা, মা ও সুলিভানের জায়গা এখন নিয়েছেন ক্যাথি। দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থাকলেও, ক্যাথিই নার্সদের বলে দেন কীভাবে পলকে দেখভাল করতে হবে। কখন পলের জামা কাপড় পাল্টাতে হবে। পলের আঙুল ও মুখে হাত দিয়ে ক্যাথি দেখে নেন পলের নখ ও দাড়ি কাটার সময় হয়েছে কিনা। তবে পলকে রোজ নিজের হাতে খাইয়ে দেন ক্যাথি। এই দায়িত্বটা কাউকে দেন না। একা হাতে পলের সংসার সামলাচ্ছেন সত্তরোর্ধ ক্যাথি। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে।

পলকে খাইয়ে দিচ্ছেন ক্যাথি

সাংবাদিকেরা যখন পলকে বলেন, ক্যাথির সঙ্গে আপনার কী প্রেমের সম্পর্ক! পল উল্টে প্রশ্ন করেন,”শুধু এইটুকুতেই বেঁধে ফেললে দু’জনের সম্পর্ককে!” সত্যিইতো পল ও ক্যাথির সম্পর্ককে কোনও গতানুগতিক বিশেষণে বাঁধা যায় না। তাই তো পল আজও ক্যাথিকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখেন। কোভিড আতঙ্ক কেটে গেলেই ক্যাথিকে নিয়ে বিশ্ব সফরে বেরোবেন। হ্যাঁ, সঙ্গে নিয়ে যাবেন লোহার ফুসফুস ওরফে ‘ওল্ড আয়রন হর্সকেও’। যে জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় মৃত্যুকে হারিয়ে পল বেঁচে আছেন আটষট্টিটা বছর।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More