শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৬

বেড়ালের মতো কিলবিল করছে চিতাবাঘ, আমাদের এই উত্তরবঙ্গেই

দ্য ওয়াল ব্যুরো, আলিপুরদুয়ার:  মজার কাণ্ড জলদাপাড়ায়। ক্যামেরা বসানো হয়েছিল গোটা জঙ্গলজুড়ে। গন্ডার বা হাতি নয়, রয়্য়াল বেঙ্গল টাইগার খুঁজতে। একটা দুটো নয়। গুনে গুনে ২৭৫টা ক্যামেরা। আর বেশিরভাগ ক্যামেরাতেই নাকি বাঘ বা হাতি বা গণ্ডার নয়, ধরা পড়েছে চিতাবাঘের ছবি।

শুধু জলদাপাড়া নয়, উত্তরবঙ্গের সব জঙ্গলেই নাকি ছবিটা এক। বন  লাগোয়া এলাকায় চিতাবাঘের দৌরাত্ম্য রীতিমতো ঘুম কেড়েছে বাসিন্দাদের। অনেকেই বলছেন, বেড়ালের মতোই যেন পায়ে পায়ে ঘুরছে চিতাবাঘ।  ফলে মানুষ আর চিতাবাঘের মোলাকাত হচ্ছে নিত্যই। এতে চিতাবাঘ যেমন মানুষের বিপদ বাড়াচ্ছে  তেমনই বিপদে পড়ছে তারা নিজেরাও।

লোকালয়ে ঢুকে পড়ার শাস্তি হিসেবে পিটিয়ে, বিষ খাইয়ে চিতাবাঘ মেরে ফেলার ঘটনা ঘটছে আকছার। লেগে আছে দুর্ঘটনাও। মঙ্গলবারই, কার্শিয়ঙের রোহিনীর কাছে  গাড়ির ধাক্কায় মৃত্যু হল রাস্তার উপর উঠে আসা একটি চিতাবাঘের।

গত তিন মাস ধরে চিতাবাঘের হামলায় নাভিশ্বাস উঠেছে মাদারিহাটের হাণ্টাপাড়া, গ‍্যারগাণ্ডা, ধুমচিপাড়া ও  রামঝোড়া চা বাগানের বাসিন্দাদের। তিন মাসে চিতাবাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন দুই শিশু ও এক কিশোর। জখম হয়েছেন চারজন। তাঁদের মধ্যে একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধ। এক কিশোরও রক্তাক্ত হয়েছিল চিতাবাঘের থাবায়। বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছে সে। খাঁচা পেতে, ২৪ ঘণ্টা টহলদারির ব্যবস্থা করেও কোনও মতেই চিতাবাঘের হানা রুখতে পারছিল না বন দফতর।

তবে গত আটদিনে ছ’টি চিতাবাঘকে খাঁচাবন্দি করতে পেরেছে বনদফতর। এরমধ‍্যে রামঝোড়া চা বাগান থেকেই খাঁচাবন্দি করা হয়েছে তিনটি চিতাবাঘকে। আজ সকালেও মাদারিহাটের রামঝোড়া চা বাগানের ৫ নং সেকশনে বন দফতরের পাতা খাঁচায় ধরা পড়ে পূর্ণবয়স্ক একটি পুরুষ লেপার্ড।

লঙ্কাপাড়ার রেঞ্জার বিশ্বজিৎ বিষয়ী বলেন, “প্রথমদিকে চিতাবাঘের হানা রুখতে আমরা সফল হইনি। কিন্তু পরে আমরা চিতাবাঘ চলাচলের রাস্তা ট্র্যাক করি এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনামাফিক খাঁচা পাতা হয়। এতেই সাফল‍্য আসে এবং গত আট দিনে ছ’টি চিতাবাঘ  খাঁচাবন্দি হয়।”

বনদফতর সূত্রে জানা গেছে, উত্তরবঙ্গে জঙ্গলের আটটি ডিভিশন রয়েছে। ডুয়ার্সে এই সব বন লাগোয়া ১৫২ টি চা বাগান রয়েছে। তরাইয়ে রয়েছে ৪২ টি চা বাগান। বাচ্চা প্রসবের সময় চা বাগানের নালাগুলোই মা চিতাবাঘদের প্রিয় আশ্রয়। কারণ পুরুষ চিতাবাঘ যেহেতু শাবকদের খেয়ে ফেলে, সেই কারণে বাবাদের কাছ থেকে পর্যন্ত শাবকদের লুকিয়ে রাখে মা। এখন চা বাগানে যেমন মানুষ বেড়েছে, জঙ্গলে বেড়েছে চিতাবাঘের সংখ্যা। আবার জঙ্গল ছোট হয়ে যাওয়ায় শাবকদের নিয়ে লুকিয়ে থাকার জায়গাও কমছে। মানুষের সঙ্গে চিতাবাঘের দেখা হয়ে যাচ্ছে ঘনঘনই। জঙ্গলে খাবার না মেলাতেও বারবার চা বাগান লাগোয়া শ্রমিক বস্তিতে চলে আসছে চিতা বাঘ। জলদাপাড়ার ডিএফও কুমার বিমল বলেন, “ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার গুনতে জলদাপাড়ার জঙ্গলে ২৭৫ টা ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল। এরমধ্যে ৯০ শতাংশ ক্যামেরায় চিতাবাঘের ছবি ধরা পড়েছে।”

 

অথচ উত্তরবঙ্গের কোন জঙ্গলে কত চিতাবাঘ রয়েছে তার কোনও পরিসংখ্যান নেই বনদফতরের কাছে। তাই চিতাবাঘের গণনা যে জরুরি হয়ে উঠেছে তা স্বীকার করছেন বনদফতরের আধিকারিকরা। উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ বিভাগের মুখ্য বনপাল উজ্জ্বল ঘোষ বলেন, “ অন্যান্য প্রাণীদের মতো চিতাবাঘের গণনার প্রয়োজন আমরাও অনুভব করছি। খুব তাড়াতাড়ি রাজ্য বনদফতর এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা চাই চিতাবাঘ গণনা হোক।”

জানা গেছে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক থেকেও সম্প্রতি চিতাবাঘপ্রবণ এলাকাগুলি চিহ্নিত করার নির্দেশ পাঠানো হয়েছে।

Shares

Comments are closed.