কেন্দ্রীয় বাহিনী এসে কী লাভ হল

ভোটের নামে এসব হচ্ছেটা কী? প্রকাশ্য রাস্তায় মহিলা প্রার্থীকে লাঠি-বাঁশ নিয়ে তাড়া করছে জনতা। কোথাও আবার পুলিশের সামনেই গলাধাক্কা দেওয়া হচ্ছে মহিলা প্রার্থীকে। প্রার্থীর একটা সম্মান আছে। তার ওপরে প্রার্থী যদি মহিলা হন, তাঁর সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আরও বেশি শালীনতা বজায় রাখা উচিত। কিন্তু এখনকার রাজনৈতিক কর্মীরা সেসবের তোয়াক্কা করেন না।

এযুগে ভোটের আগে প্রচারের সময় অকথা-কুকথার বন্যা বয়। আর ভোটের দিনে সব পক্ষই রেডি থাকে লাঠিসোঁটা নিয়ে। শত্রুপক্ষের কাউকে একবার বাগে পেলেই হল।

আমরা শুনেছি, এবার ভোটে ৭০৪ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এসেছে। প্রতি কোম্পানিতে ৮০ থেকে ১০০ জন লোক থাকে। কথা ছিল, তারা ভোটে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করবে। কেউ গোলমাল পাকাতে এলে তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেবে। কিন্তু তারা থাকা সত্ত্বেও তো সব দলের বীরপুঙ্গবরা লাঠি-বাঁশ হাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাহলে কেন্দ্রীয় এসে লাভটা কী হল?

মঙ্গলবার রাজ্যে তৃতীয় দফার ভোট ছিল। সকালেই আরামবাগের আরান্ডি অঞ্চলে একদল লোক তৃণমূল প্রার্থী সুজাতা মণ্ডল খাঁ-কে তাড়া করে। একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একদল লোক লাঠি, বাঁশ নিয়ে সুজাতার পিছু পিছু ছুটছে। সুজাতা প্রাণভয়ে পালাচ্ছেন। ধানক্ষেত পেরিয়ে কোনও গ্রামে ঢুকে তিনি রাস্তার ওপরে বসে পড়েন।

গ্রামের মহিলারা সুজাতাকে ঘিরে ধরেন। তাঁকে জল খাওয়ান। বাতাস করেন। ভিডিও ক্লিপে শোনা যাচ্ছে, কাকে যেন ফোন করে সুজাতা বলছেন, “দাদা ভোটটা বয়কট করো দাদা…ওরা আমাকে প্রচণ্ড মেরেছে…”। প্রার্থীর অভিযোগ, পুলিশ বিজেপির হয়ে ভোট করাচ্ছে। তার মানে, শাসক দলের প্রার্থীই পুলিশের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলছেন। এতদিন আমরা দেখেছি, বিরোধীরা এই অভিযোগ তোলে। এবার ভোটে দেখা যাচ্ছে উল্টো।

আরান্ডি এলাকার বিজেপি নেতারা বলছেন, সেখানে সুষ্ঠুভাবে ভোট হচ্ছিল। মানুষ নিজের ভোট নিজে দিচ্ছিলেন। তৃণমূল প্রার্থী নিজের লোক ঢুকিয়ে ভোট করাতে চেয়েছিলেন। স্থানীয় জনতা তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

এই গণপ্রতিরোধের কথাটা আগে সিপিএম নেতারা খুব বলতেন। যখন ক্যাডারদের হানায় বিরোধী দলের লোক মারা পড়ত, নেতারা বলতেন, সমাজবিরোধীরা গোলমাল পাকাতে গিয়েছিল। মানুষ তাদের প্রতিরোধ করেছে। এবার বিজেপি নেতাদের গলায় সেই সুর শোনা যাচ্ছে। হয়তো এই নেতারা আগে সিপিএম করতেন। এখন যুগের হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গেরুয়া পার্টিতে ভিড়েছেন। কিন্তু পুরানো দলের বোলচাল ছাড়তে পারেননি।

বিকালে আর একটা ভিডিও ফুটেজ দেখা যায়। এবারের ঘটনা আরও খারাপ। পুলিশের সামনে প্রবীণ অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারীকে গলাধাক্কা দিচ্ছে এক যুবক। পাপিয়া অধিকারী উলুবেড়িয়া দক্ষিণ কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী। অভিযোগ, এদিন সুশান্ত মণ্ডল নামে এক বিজেপি কর্মীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায় দুষ্কৃতীরা। পাপিয়া অধিকারী ও তাঁর অনুগামীরা হাসপাতালে সুশান্তকে দেখতে যান। সেখানে আকবর শেখ নামে এক তৃণমূল নেতার অনুগামীরা উপস্থিত ছিল। তারা হাসপাতালের গেট বন্ধ করে পাপিয়া অধিকারীদের হেনস্থা করে।

ভিডিওয় দেখা যাচ্ছে, তুমুল হট্টগোলের মধ্যে কয়েকজন যুবক পাপিয়াদেবীর ওপরে চড়াও হয়েছে। দু’জন পুলিশ হাত বাড়িয়ে প্রার্থীকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু শুধু হাতে কি মারমুখী ছেলেদের ঠেকানো যায়? পুলিশের হাত এড়িয়ে এক যুবক প্রার্থীর গলায় ধাক্কা দিল।

পুলিশ খালি হাতে ছেলেগুলোকে আটকানোর চেষ্টা করছিল কেন? কেউ যদি প্রার্থীর গায়ে হাত দিতে আসে, তাকে তো এমনি ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বিশেষত যদি কোনও মহিলা আক্রান্ত হন, সেক্ষেত্রে পুলিশের আরও কড়া হওয়া উচিত। তারা ছেলেগুলোকে মেরে তাড়ায়নি কেন? দুষ্কৃতীরা শাসকদলের ছত্রছায়ায় আছে বলেই কি পুলিশের এমন নরম মনোভাব?

মঙ্গলবার দিনভর আরও অনেক জায়গায় গণ্ডগোলের খবর পাওয়া গিয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বিষ্ণুপুরে এক মধ্যবয়সী মহিলা যখন ভোট দিতে যাচ্ছিলেন, এক যুবক তাঁর পথ আটকায়। তাঁকে ভোট দিতে যেতে বারণ করে। মহিলা বলেন, আমি ভোট দিতে যাবই। তখন ছেলেটি রাস্তার ওপরে তাঁকে হেনস্থা করে। অভিযোগ, ছেলেটি তৃণমূলের সমর্থক।

বিষ্ণুপুরের ১২৩ নম্বর বুথ থেকেও অভিযোগ ওঠে, তৃণমূলের প্রায় ১০০ ছেলে লাঠিসোঁটা নিয়ে মহিলাদের ভয় দেখিয়েছে। তাঁদের ভোট দিতে যেতে দেয়নি।

ভোটের পরে আরও নানা জায়গা থেকে গোলমালের খবর আসছে। বোঝা যাচ্ছে, যে যেখানে সুযোগ পেয়েছে, প্রতিপক্ষের ওপরে গায়ের জোর ফলিয়েছে। গা জোয়ারির ব্যাপারে ঘাসফুল আর পদ্মফুলে কোনও প্রভেদ নেই। যে করেই হোক ভোটে জিততে হবে, এই হল সবার মনোভাব।

এরকম ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বাহিনীর কিছু করার নেই। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না থাকে, সবাই যদি ভোট চুরির তালে থাকে, তাহলে রক্ষীরা কী করবে? তারা কতজনকে সামলাবে? প্রত্যেক রাজনৈতিক কর্মীর পিছনে কি একজন করে রক্ষী ফিট করা হবে?

ভোটে যে অশান্তি হচ্ছে, তাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসাবে দেখা ঠিক নয়। এ হল নৈতিক সমস্যা। যতদিন না রাজনৈতিক দলগুলির রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে, ততদিন এরকম চলতেই থাকবে।

Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More