একুশে অভিষেক অবিসংবাদী, আর কোনও দ্বন্দ্ব রইল না

শোভন চক্রবর্তী

একুশের ভোটে বাংলায় যতবার দিদি শব্দটা উচ্চারিত হয়েছে, তার চেয়ে বেশি হয়েছে পিসি-ভাইপো। দিলীপ ঘোষ থেকে শুভেন্দু অধিকারী, কৈলাস বিজয়বর্গীয় থেকে অর্জুন সিং—প্রায় প্রত্যেক নেতাই সকাল-রাত ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজিয়ে গিয়েছেন, “ওটা আর দিদির পার্টি নেই। পিসির পার্টি হয়ে গিয়েছে। ওখানে ভাইপোই সব।”

ভাইপো তথা যুব তৃণমূল সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আক্রমণে বিদীর্ণ হতে হতে অবিসংবাদী হয়ে উঠলেন। একুশের ভোটের ফল স্পষ্ট করে দিল, তৃণমূলে এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর নম্বর টু তিনিই। আর কেউ নেই। কেউ না। কঠিন পরীক্ষায় লেটার মার্কস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তরুণ নেতা। সমালোচনায় পুড়ে, আঘাত সামলে, রোদে ঝলসে তরুণ অভিষেক আর যুব নন। তিনি এখন মজবুত ও পোড় খাওয়া নেতা। এ ব্যাপারে আর বোধহয় কোনও দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংকোচ থাকার অবকাশ রইল না।

ইতিমধ্যেই অনেকে বলতে শুরু করেছেন, এবারের ভোটে তৃণমূলের জয়ে অন্যতম বড় ভূমিকা নিয়েছেন ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোর এবং তাঁর সংস্থা আইপ্যাক। উনিশের লোকসভা ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর প্রশান্ত কিশোরকে এনেছিলেন অভিষেকই। এই নির্বাচন পর্বে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়া নেতারা বারবার একটা কথা বলেছেন, পার্টিটাকে কর্পোরেটের হাতে সঁপে দিয়েছেন ভাইপো। বেশ কয়েক দফা ভোট হয়ে যাওয়ার পর অভিষেক বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারে সেই প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করার জন্যই আইপ্যাককে আনা। প্রশান্ত কিশোর কিছু সহযোগিতা করেছেন, প্রচারের কৌশল নির্ধারণ করেছেন। পার্টির নেতৃত্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই।”

নরেন্দ্র মোদী থেকে অমিত শাহ, স্মৃতি ইরানি—বাংলায় যত বার এসেছেন ততবার বলেছেন ভাইপো তোলাবাজ, ভাইপো বালি-কয়লা-গরু পাচার , সিঙ্গল উইন্ডো দিয়ে টাকা যায় ভাইপোর কাছে, সিন্ডিকেট রাজ ইত্যাদি প্রভৃতি। আর তার জবাব দিতে গিয়ে অভিষেক রোজ একটাই কথা বলেছেন, “ওদের দম নেই তাই নাম করে বলে না। আমি বলছি অমিত শাহ বহিরাগত, দিলীপ ঘোষ গুণ্ডা, কৈলাস বিজয়বর্গীয় বহিরাগত! হিম্মত থাকলে মামলা করুক!”

অনেকের মতে, যে কায়দায় বাংলায় এসে মোদী, শাহরা অভিষেকের উদ্দেশে আক্রমণ শানিয়েছেন চাঁচাছোলা ভাষায়, তাতে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের উচ্চতা বেড়ে গিয়েছে কয়েক গুণ।

রাজনীতিতে একটা কথা চালু রয়েছে। অনেকে বলেন, অনেক দিন পা না ঘষলে নেতা হওয়া যায় না। অর্থাৎ মোদ্দা কথা হল, ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে না গেলে, পরীক্ষিত না হলে নেতার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনেকে এতদিন অভিষেকের ব্যাপারে সেই কটাক্ষ করতেন।

বিশেষত তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়া নেতারা বলতেন, ২০১১-র আগে কোথায় ছিলেন ভাইপো? উড়ে এসে জুড়ে বসে এখন পার্টিটাকে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি বানিয়েছেন! এ প্রশ্নের জবাব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও দিয়েছেন। বলেছেন, “ওকে তো আমি বলেছিলাম তুই রাজ্যসভা থেকে সাংসদ হ, ও বলেছিল না আমি মানুষের ভোটেই হব!”

কিন্তু একুশের ভোটে যে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হল অভিষেককে তা বোধহয় ৩২ বছর বয়সী বাংলার নেতাকে কোনও কালে দিতে হয়নি। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন এই বয়সে যুব কংগ্রেস করতেন তখনও বোধহয় নির্বাচনী লড়াইয়ে এত কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়নি দিদিকে। এক তৃণমূল নেতার কথায়, “ভাবুন তো কী কী আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে ওঁকে! দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসে আক্রমণ শানিয়েছেন, ওঁর স্ত্রীকে হেনস্থা করতে বাড়িতে সিবিআই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কী হল!”

রবিবারের ফলাফলের পর আরও একটি বিষয় স্পষ্ট। তা হল অভিষেক আর শুধু বাংলার নেতাই রইলেন না। সর্বভারতীয় রাজনীতিতেও উত্তরণ ঘটে গিয়েছে তাঁর।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More