মুসৌরীর বন-পাহাড়ের দেশে, কুয়াশামোড়া জগতে কেমন আছেন ভিক্টর

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

এখন তাঁর ঘুম ভাঙে হিমালয়ান বারবেট বা  ব্রেন-ফিভার কোকিলের কুহু কুহু ডাকে। হিমালয়ের কোলে তিনি বেছে নিয়েছেন তাঁর পছন্দের আশ্রয়। প্রকৃতির কাছাকাছি সবুজ প্রান্তরে ঘেরা তাঁর বাসস্থান। পাহাড়ি বক আর কাঠবিড়ালীদের খেলা দেখে তাঁর সময় কাটে। তিনি টলিউডের আশির দশকের এক নম্বর হিরো ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়। ভিক্টর সস্ত্রীক এখন মুসৌরীতে থাকেন। মিডিয়া সংবাদমাধ্যম বা গ্ল্যামার জগতে আর কোন টান অনুভব করেন না ভিক্টর। কোন অভিমানে তাঁর এই অন্তরাল?

যদিও অন্তরাল বলা ঠিক নয়। কারণ ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় বেছে কাজ করতে চান, তাই সিলেক্টিভ কাজ এলেই তিনি অফার নেন। কিন্তু বহুদিন তিনি কলকাতা ছাড়া বাংলা ছাড়া। তাঁর এই মুড নিয়ে অবশ্য ভালই ওয়াকিবহাল তাঁর একসময়ের পরিচালকরা।

আশির দশকে মহানায়কের মহাপ্রয়াণের পর টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির টেকনিশিয়ানদের ভাত জুগিয়েছিলেন ভিক্টর। উত্তম কুমারের সঙ্গে টক্কর দিয়ে খলনায়ক সহোদরের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন ভিক্টর ‘দুই পৃথিবী’ ছবিতে। তাঁর প্রথম সাফল্য সে ছবিরই হাত ধরে। সেই ছবি এত হিট করে যে মহানায়কের প্রয়াণের পর সেই ছবির বাণিজ্য করা সব টাকা শিল্পী সংসদের তহবিলে দান করার সিদ্ধান্ত নেয় টালিগঞ্জ পাড়ার কলাকুশলীরা।

রঞ্জিত মল্লিকের পাশাপাশি ভিক্টর একটা নিজের অ্যাংরি ইয়ং ইমেজ তৈরি করেন। তখন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সেকেন্ড লিড। রঞ্জিত, ভিক্টর, চিরঞ্জিত, তাপসরাই সামাল দিচ্ছেন টলিউডের বক্সঅফিস।

ভিক্টর অভিনীত ছবি ‘আক্রোশ’-এর পরিচালক সুজিত গুহ বা ‘প্রতিকার’, ‘প্রতিদান’, ‘তুমি এলে তাই’, ‘লাঠি’র পরিচালক প্রভাত রায়– এই দুজনের সঙ্গেই যোগাযোগ করা হলে তাঁরা বলেন “ভিক্টর এরকমই। ওঁর ইচ্ছে না হলে ও কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। সেভাবে অতীতচারী ভিক্টর নয়। আমাদের সঙ্গে  হিট ছবি ভিক্টরের, কিন্তু ও আমাদের সঙ্গেও সেভাবে যোগাযোগ রাখে না।”

রাজনীতি, দলাদলি, বাকবিতণ্ডা বা পুজোয় ফিতে কাটার বিলাসিতা থেকে প্রকৃতির কোলে সহজ, সরল জীবনের স্বাদ পাওয়া যেন ভগবানের কাছে বাস করা। তবে শুধু নিজের জীবন নয়, পাহাড়ি মানুষদের দুর্দশা নিয়েও ভাবিত ভিক্টর। ভাগীরথী-সহ হিমালয়ের সব নদীতে বাঁধ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ফলে হাজার হাজার দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষ, যাঁরা এই নদীগুলোর পাড়ে বা কাছে থাকেন, তাঁদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সামান্য ক্ষতিপূরণ হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাঁদের ভিটেমাটিচ্যুত করা হচ্ছে। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন ভিক্টর।

কয়েকবছর আগে ভিক্টর কেদারনাথেও থাকতেন। সেখানেও ঈশ্বর আর প্রকৃতির মেলবন্ধন খুঁজতে খুঁজতে নিজের মুক্তি খুঁজে পেয়েছেন অভিনেতা। উত্তরাখণ্ডের গঢ়বাল আর কুমায়ুনের মতো বিস্ময়কর জায়গায় রোজ নতুন নতুন স্বপ্ন আবিষ্কার করছেন তিনি। তাই তাঁর কাছে রূপোলি জগতের আজকালকার কাজ আর সেভাবে টানে না।ভিক্টরের সিদ্ধান্ত হয়তো ঠিক, নিজের ছন্দে জীবনকে এভাবে কাটাতে ক’জন পারেন?

তবে, একেবারেই ছবির জগতকে বিদায় জানিয়েছেন ভিক্টর তা নয়। আর্জেন্তিনার পরিচালক  পাবলো সিজারের রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বন্ধুত্ব নিয়ে ছবি ‘থিঙ্কিং অফ হিম’-এ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়। ভিক্টোরিয়ার ভূমিকায় আর্জেন্টিনার অভিনেত্রী ইলিওনোরা ওয়েক্সনার৷ শান্তিনিকেতনের কমলি নামে এক কন্যার চরিত্রে রাইমা সেন৷ ছবির শ্যুটিং হয়ে গেছে রিলিজের অপেক্ষা।

এছাড়াও নেতাজী সম্পর্কিত ‘সন্ন্যাসী দেশনায়ক’ ও ‘Tryst with Destiny’ ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। যেগুলোও রিলিজের অপেক্ষায়।

ভিক্টরের আসল নাম পার্থসারথি বন্দোপাধ্যায়। জন্ম ১৫ অক্টোবর, ১৯৪৬। সেন্ট জেভিয়ার্সের সাহিত্যের ছাত্র ভিক্টর পরবর্তীকালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা করেন। এবং শেষমেষ বিদেশে উচ্চপদস্থ চাকরিও পেয়ে যান।

কিন্তু চাকরিতে মন টেকে না নাটক প্রেমী পার্থসারথির। তাই চলে আসেন কলকাতায়। পার্থসারথি নাম বদলে ভিক্টর। এরপর সত্যজিৎ রায়ের শতরঞ্জ কি খিলাড়ি বা পিকু, ঘরে-বাইরে, ডেভিড লিনেরের প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া বা মৃণাল সেনের মহাপৃথিবী। পাশাপাশি একান্ত আপন, আগুন, দেবতা, মহান, ব্যবধান প্রভৃতি সুপারহিট ছবি দিয়ে ভিক্টর আজও সবার প্রিয়। স্টার জলসার শুরুর সময় অভিনয় করেছিলেন ‘বন্ধন’ সিরিয়ালে।

এখন মুসৌরির জলবায়ুতেই বিদেশিনি স্ত্রী মায়াকে নিয়ে থাকেন। দুই মেয়ে কেয়া ও দিয়া কর্মসূত্রে অন্যত্র। দেরাদুনের রামকৃষ্ণ মিশনে যুক্ত রয়েছেন ভিক্টর। শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের চরণাশ্রয়ে নিজের মনকে উৎসর্গ করেছেন এবং বিবেকান্দর মতো আজও ভিক্টর পরিব্রাজক।

কিন্তু এখানকার পরিচালকরা কি ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাংলা ছবিতে নেওয়ার কথা ভাবেন না? ভিক্টরই বা কবে মেটাবেন তাঁর অভিমানী অন্তরাল? ভাল চিত্রনাট্যে ভাল বাংলা ছবিতে ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিগনেচার মার্ক দেখতে চাওয়া দর্শক আজও আছেন। তাঁজের মনে পড়ে, ভিক্টরের লিপে  সেই’দেবতা’ ছবির গান, “কী করে জানলে তুমি ভুলে যাব তোমায়! আমারই প্রাণ যে তুমি, তাকে কি গো ভোলা যায়!”

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More