বরফমোড়া বৈকালের বুকে যেন রঙিন প্রজাপতি আশি বছরের ‘বাবুস্কা’, এক দুরন্ত স্বেচ্ছা-নির্বাসন

দশ বছর একলা বাস করেন, লেক বৈকালের তীরে থাকা সম্পূর্ণ জনমানবহীন এক স্থানে।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বিশ্বের গভীরতম হ্রদ ‘বৈকাল’। সাইবেরিয়ার দক্ষিণের পাহাড়ি এলাকায়, ৩১ হাজার ৭২২ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে আছে হ্রদটি।  দৈর্ঘ্যে ৬৩৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থে ৭৯ কিলোমিটার। আড়াই কোটি বছর আগে সৃষ্টি হওয়া এ হ্রদটি বিশ্বের প্রাচীনতমও বটে। এর সর্বাধিক গভীরতা ৫৫৮০ ফুট। শুধু তাই নয়, পৃথিবীর প্রায় ২৩ শতাংশ মিষ্টি জলের ভাণ্ডার হল রাশিয়ার এই অর্ধচন্দ্রাকৃতি হ্রদ, কারণ নিজেদের মিষ্টি জলের সুধা দিয়ে লেক বৈকালের বুক ভরিয়ে দিয়েছে ৩৩০টি নদী।

লেক বৈকাল

গ্রীষ্মকালে বৈকালের ঘন নীল জলরাশি ও তীরের শ্যামলিমা, মন্ত্রমুগ্ধ করে তোলে পর্যটকদের। শীতের ছ’মাস অবশ্য ‘বৈকাল’ ঘুমিয়ে পড়ে দুধসাদা বরফের নীচে। বৈকালের রুদ্ধশ্বাস শ্বেতশুভ্র সৌন্দর্য দেখতে তখনও আসেন বহু পর্যটক। জমে যাওয়া বৈকালের বুকে ‘আইস স্কেটিং’ করেন, কুকুরে টানা স্লেজে চড়েন। গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১২-১৪ ডিগ্রি ও শীতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাইনাস ৩০-৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে ঘোরাফেরা করে

এই বৈকাল হ্রদেরই পশ্চিম তীরে আছে ইর্কুস্ক-ওবলাস্ট রাজ্যের ওলখনস্কি জেলা। বাস করেন মাত্র ৯৪৪৬ জন মানুষ। জেলাটির প্রত্যন্ত একটি গ্রাম শাখাইউর্তা। সেই গ্রাম থেকে উত্তর দিকে আরও আধঘণ্টার পথ পার হলে আসবে একটি ক্ষুদ্র জনবসতি। একটি অনুচ্চ টিলার ওপরে তিন চারটি কাঠের বাড়ি। সামনেই দিগন্তবিস্তৃত বৈকাল হ্রদ।

এই সেই জনপদ, ডানদিকে বরফ জমা বৈকাল

বাড়িগুলি থেকে ভেসে আসে গরু, কুকুর এবং মুরগির ডাক। তাহলে কি এই ক্ষুদ্র জনপদে মানুষ থাকে না! হ্যাঁ থাকেন, একজনই। আশি বছরের এক দুঃসাহসী নারী। নাম লুবভ মরেখোডোভা। প্রায় একশো বর্গ কিলোমিটার নির্জন এলাকায় একেবারে একা বাস করেন তিনি।

কাছাকাছি গ্রামগুলির মানুষজন ভালবেসে তাঁকে ডাকেন ‘বাবা লুবা’ বলে। মাথায় স্কার্ফ বাঁধা প্রৌঢ়াকে রাশিয়াতে বলা হয় ‘বাবুস্কা'(Babuska)। তাই সারা রাশিয়ায় লুবভ বিখ্যাত ‘বাবুস্কা অফ বৈকাল’ বলে। কারণ বৈকালের তীরে একাকী বাস করা এই নারীর মাথায় সব সময় বাঁধা থাকে নিজেরই বানানো স্কার্ফ।

লুবভ মরেখোডোভা

লেক বৈকালের তীরে থাকা পৈতৃক বাড়িটিতেই জন্মেছিলেন লুবভ। বাবা নিকোলাই ছিলেন ফরেস্ট অফিসার। ঘর ও সাত ছেলে-মেয়েকে সামলাতেন মা ফিওনা। তবে বেগ পেতে হত লুবভকে সামলাতে। এই দস্যিপনার জন্য অবশ্য লুবভকে একটু বেশি ভালবাসতেন বাবা নিকোলাই। মেয়েকে নিয়ে জঙ্গলে প্রায়ই যেতেন বার্বিকিউ করতে।

গাছপালা, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ চেনাতেন। বালিকা লুবভকে বোঝাতেন, লেক বৈকাল কীভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে সারা রাশিয়াকে। এছাড়াও নিকোলাই মেয়েকে শিখিয়েছিলেন নানা শক্তপোক্ত কাজ। কাঠের বাড়ি মেরামতি, রঙ করা, কাঠ কাটা, বাগান করা, সবজি চাষ করা, গরু বাছুর সামলানো, নৌকা চালানো, ছিপ ও জাল ফেলে মাছ ধরা– সবই পারত সে। আর মা ফিওনা শিখিয়েছিলেন সেলাইয়ের কাজও।

শীতে যখন হি হি করে কাঁপত বরফে জমে যাওয়া লেক বৈকাল, বালিকা লুবভের আনন্দ তখন দশগুণ বেড়ে যেত। কাঠের তক্তায় দাঁড়িয়ে জমে যাওয়া বরফের ওপর হড়কে হড়কে এগিয়ে যেত বৈকালের গভীরে। বরফ জমা হ্রদের বুকে লুবভের স্কেটিং করার প্রবল ইচ্ছা দেখে, তার জন্য স্কেট বানিয়েছিলেন বাবা। বাড়িতে পড়ে থাকা একটি স্টিলের করাতকে দু’খণ্ড করে, খণ্ডদুটির সঙ্গে কাঠ লাগিয়ে তৈরি হয়েছিল লুবভের স্কেট।

সেটা ছিল ১৯৪৩ সাল, তখন লুবভের বয়েস মাত্র সাত। জুতোর নীচে চামড়ার দড়ি দিয়ে স্কেট বেঁধে, দুটো হাত দুদিকে হাত পাখির ডানার মত মেলে উদ্দাম গতিতে বরফ জমা বৈকালের ভেতর হারিয়ে গিয়েছিলেন লুভব। মা ফিওনা ভয় পেতেন। যদি বরফ ফেটে তলিয়ে যায় লুবভ! মেয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন বৈকালের তীরে। বাবা নিকোলাই হাসতেন। বলতেন, তাঁদের পদবি মরেখোডোভা। শব্দটির অর্থ হল, ‘যে মানুষ বরফ জমা সমুদ্রের ওপর হাঁটে’।

কিন্তু পরবর্তী কালে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানোর জন্য ‘মরেখোডোভা’ পরিবারটি চলে গিয়েছিল ২৯৬ কিলোমিটার দূরে থাকা ইর্কুক্স শহরে। লুবভ হয়েছিলেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। যোগ দিয়েছিলেন ইর্কুক্স শহরের ভারী যন্ত্রপাতি তৈরির ফ্যাক্টরি কুইবাইশেভে। সেই শহরেই প্রেম, বিয়ে এবং সংসার পাতা।

প্রায় ৪২ বছর চাকরি করে অবসর নিয়েছিলেন লুবভ মরেখোডোভা। সন্তানেরা চাইছিলেন তাঁদের সঙ্গেই থাকুন বাবা-মা। কথা শোনেননি লুবভ। স্বামী সার্গেইকে নিয়ে গ্রীষ্মকালে চলে এসেছিলেন লেক বৈকালের তীরের পৈতৃক বাড়িতে। হাতে তুলে নিয়েছিলেন করাত, বাটালি, হাতুড়ি ও কুঠার। নিজের হাতে বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন পরিত্যক্ত বাড়িটিকে। লুবভের হাতের স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল বাগান ও সবজি ক্ষেত।

শীতের বৈকালের বুক থেকে ভেসে আসা কনকনে হাওয়া লুবভকে মনে পড়িয়ে দিয়েছিল সেই ১৯৪৩ সাল। বাবার বানিয়ে দেওয়া স্কেট দুটি বের করেছিলেন, দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়েছিলেন তাঁর ভ্যালেঙ্কি বুটের নীচে। তারপর সেই ছোট্ট বেলার মত দু’দিকে হাত মেলে বরফ জমা বৈকালের বুকে প্রজাপতি হয়ে উড়ে গিয়েছিলেন লুভব। অপলকে তাকিয়েছিলেন স্বামী সার্গেই।

এভাবেই বৈকালের তীরে এক অসামান্য জীবন কাটাচ্ছিলেন দম্পতি। কিন্তু সব আনন্দই বুঝি ক্ষণস্থায়ী। স্বামী সার্গেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন ২০১১ সালে। ছেলেমেয়েরা মাকে বলেছিলেন শহরে চলে আসতে। তবে ছেলেমেয়েদের কথা এবারও শোনেননি লুভব। সমাজ থেকে স্বেচ্ছা-নির্বাসন নিয়ে রয়ে যান বৈকালের তীরের পৈত্রিক বাড়িতেই। একেবারে একা।

আজও সেখানেই আছেন আশি বছরের লুবভ। তবে সঙ্গীর সংখ্যা বেড়েছে। আজ তাঁর সঙ্গে বাস করে দু’টি মোরগ, চারটি কুকুর, একটি বিড়াল, দুটি বাছুর, পাঁচটি গরু এবং দুটি ষাঁড়। পোষ্যদের নিয়ে চরম ব্যস্ততায় দিন কেটে যায় লুবভের। গ্রীষ্মে বৈকাল হ্রদের বুকে নৌকা ভাসান লুবভ। মাছ ধরেন ছিপ দিয়ে, জাল ফেলে।

জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে নিয়ে এসে মজুত করেন শীতকালের জন্য।গরুদের জন্য খড় কুচিয়ে ডাঁই করে রাখেন। কুকুর বিড়ালদের জন্য মাছ শুকিয়ে রাখেন। কারণ শীতকালে এই অঞ্চল ঢাকা পড়ে যায় পুরু বরফের তলায়। পশুদের খাবার পাওয়া দুস্কর হয়ে ওঠে তখন। তাই আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রাখেন লুবভ।

 

শীতকালেও ভোর সাড়ে পাঁচটায় শুরু হয় তাঁর দিন। গরু, বাছুর ও ষাঁড়দের গরম জল খাইয়ে চরতে ছেড়ে দেন। পশুগুলি লেক বৈকালের বরফের ওপর দিয়ে চলে যায় দেড় কিলোমিটার দূরে থাকা পাহাড়গুলির দিকে। পাহাড়ের ঢালে বরফ জমে না। সেখানে ঘাস পাওয়া যায় সারা বছর। এর পর কুকুর, বিড়াল ও মুরগিদের খেতে দেন।

তারপর দুই হাতে দুটি বালতি নিয়ে লুবভ চলে যান পানীয় জল আনতে। তাঁকে পানীয় জল দেয় লেক বৈকালই। তবে শীতকালে ভীষণ অসুবিধা হয়। বরফে গর্ত খুঁড়ে জল নিয়ে আসতে হয়। রোজ প্রায় কুড়ি বালতি পানীয় জল লুবভ বয়ে নিয়ে আসেন টিলার ওপরে। নিজের ও পোষ্যদের জন্য।

তারপর রান্না বসান। রান্না বলতে আলু, টমেটো, গাজর, শালগম ও বাঁধাকপি কুচিয়ে স্যুপ এবং রুটি। খেয়ে নিয়ে দুপুরে আবার চলে যান বৈকালের তীরে। জুতোর নীচে বেঁধে নেন সেই স্কেট জোড়া। ছেলেমেয়েরা অত্যাধুনিক স্কেট দিলেও সেগুলি ছুঁয়েও দেখেননি লুবভ। কারণ এই স্কেটজোড়ার সঙ্গে মিশে আছে বাবা নিকোলাইয়ের স্মৃতি, স্নেহ। এই স্কেটদুটোতে ওঠা মানে যেন বাবার কোলে ওঠা।

বরফের ওপর দিয়ে স্কেটিং করে লুবভ পৌঁছে যান পাহাড়গুলির নীচে। গ্রীষ্মকালে লুবভকে বৈকালের তীর দিয়ে পাহাড়ের কাছে পৌঁছতে হাঁটতে হয় তিন কিলোমিটার। শীতকালে সাহায্য করে লেক বৈকাল। কমিয়ে দেয় অর্ধেক দূরত্ব। লুবভকে দেখে ছুটে আসে গরু বাছুর ও ষাঁড়গুলি।

তাদেরকে আদর করে, ঘুরতে শুরু করেন বৈকালের বুকে। ঘণ্টা দুয়েক বৈকালের বুকে উল্কাগতিতে স্কেটিং করে, পশুগুলিকে নিয়ে ফিরে আসেন ঘরে। তারপর কুকুর, বিড়াল, মুরগিদের পরিচর্যা করে ঢোকেন নিজের ঘরে।গরম কফির কাপ নিয়ে বসেন কাঁচের জানলার সামনে। সাক্ষী থাকেন লেক বৈকালের বুকে হওয়া এক অবিশ্বাস্য সূর্যাস্তের।

সন্ধ্যাবেলা স্কেটজোড়াটির পরিচর্যা করেন, ঘর গোছান, সেলাই করেন। নিজেই তৈরি করে নেন নিজের পোশাক। নতুন পোশাক তৈরি হয়ে গেলে পরদিন সকালে যান বৈকালকে দেখাতে। শিশুর মতো দু’দিকে হাত মেলে বলেন, “আমাকে কেমন লাগছে বলো তো বৈকাল!”

মাঝেমাঝে আধ ঘণ্টা স্কেট করে লুবভ চলে যান পাশের গ্রামে। দোকান থেকে নিয়ে আসেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। গ্রীষ্মকালে লুবভের কাছে আসেন ছেলেমেয়ে, নাতিপুতিরা। তবে আসবার শর্ত একটাই, সবাইকে বাধ্যতামূলক ভাবে শিখতে হবে কাস্তে দিয়ে ঘাস কাটা, খড় কুচোনো, কাঠ কাটা, সবজি চাষ করা, নৌকা চালানো, জাল ফেলে মাছ ধরা। লুবভের কাছে এসে বসে থাকলে চলবে না। খেটে খেতে হবে।

লুভবের কথা দু’বছর আগেও কেউ জানতেন না। দু’বছর আগে একদিন তাঁর অফিসের বন্ধু আলেক্সি ভাসকভ গিয়েছিলেন লুবভের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি লুবভের একটি ভিডিও আপলোড করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সারা বিশ্ব কয়েক ঘণ্টায় জেনে ফেলেছিল লুবভের কথা।

একদিন পরেই লুবভকে স্টুডিওতে ডেকেছিল মস্কোর ফেডারেল টিভি চ্যানেল। লুবভ বলেছিলেন, “আমি খ্যাতি চাই না। আমি আছি আমার কাজ নিয়ে, তোমরা তোমাদের কাজ নিয়ে থাকো না। আমার দম ফেলার সময় নেই, আর তোমরা আমাকে ৪৩৪২ কিলোমিটার দূরের মস্কোয় যেতে বলছ। আমি গেলে আমার পোষ্যদের দায়িত্ব কি তোমরা নেবে?”

গজগজ করতে করতে চ্যানেলের দূতকে পত্রপাঠ বিদায় দিয়েছিলেন লুবভ।

কয়েকদিন পর ‘কোপেইকা’ সংবাদপত্র থেকে ওলগা ইগোশেভা এবং বরিস স্লেপনিয়ভ নামে দু’জন নাছোড়বান্দা সাংবাদিক গিয়েছিলেন লুবভের কাছে। তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছিলেন গোটা একটা দিন। জনমানবশূন্য এলাকাটিতে একলা বাস করা লুবভকে তাঁরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, একলা থাকতে ভয় করে কিনা।

কারণ লেক বৈকালের আশেপাশের জঙ্গলে বাস করে স্নো-লেপার্ড, নেকড়ে, ভাল্লুক, বুনো শুয়োর, শিয়াল, পোল ক্যাট, শ্বেত নেউল, বন্য কুকুর আরও কত প্রাণী। শীতকালে খাবারের ভীষণ অভাব। তাই তারা খাবারের খোঁজে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ঘুরে বেড়ায়। হামলা চালায় মানুষের বাড়ি ও গোয়ালে।

প্রশ্নের উত্তর লুবভ বলেছিলেন, “আমি জানি না ভয় কাকে বলে। ওরাও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচছে, আমিও। রাতে নেকড়ের পাল আসে এলাকায়। তবে আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় আসে না। হয়তো ভাবে এই বাড়িতে তাদের থেকে ভয়ঙ্কর কোনও প্রাণী থাকে।” বলেই হেসে ফেলেছিলেন লুবভ। বলে ফেলেছিলেন স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থাকার আসল কারণ।

লেক বৈকালকে একই সঙ্গে দেবতা এবং সখা হিসেবে দেখেন লুবভ। প্রাণ ঢেলে ভালোবাসেন বৈকালকে। তাঁর নাম যে লুভব। যার অর্থই যে ‘ভালবাসা’। লুবভ মনে করেন লেক বৈকালের অলৌকিক ক্ষমতা আছে। লেক বৈকাল ও তাঁর স্কেট জোড়াই তাঁর জীবনীশক্তির উৎস।

তাই লুবভ মরেখোডোভা যেন লেক বৈকালের অতন্দ্র প্রহরী। বছরের প্রত্যেকটা দিন খেয়াল রাখেন বৈকালের জল দূষিত হল কিনা। এই কারণেই তাঁর সঙ্গে প্রায়ই ঝামেলা লেগে যায় পর্যটকদের। পর্যটকেরা এসে নোংরা ফেলে বৈকালের পরিবেশ নষ্ট করে যান। তবে লুবভের নজরে পড়লেই, গ্রীষ্মে নৌকা ও শীতে স্কেট নিয়ে তাড়া করেন। বলেন, “ওহে তোমার জঞ্জাল তোমার সঙ্গে করে নিয়ে যাও। এলাকা যেমন ছিল তেমন করে দিয়ে যাও। বৈকালকে খুন করতে দেব না।”

এক শীতে তাঁর পাড়ে রাখা নৌকা উলটে দিয়েছিল মাতাল পর্যটকেরা। গুলি করে মেরে ফেলেছিল দুটি কুকুরকেও। হাতে কুঠার নিয়ে, স্কেটে চড়ে তাড়া করেছিলেন লুবভ। ধরতে পারলে কাঠ চ্যালা করার মতোই, মাতালগুলোর মাথা চ্যালা করে দেওয়ার পণ নিয়ে। গাড়ির গতির সঙ্গে পেরে সেদিন ওঠেনি তাঁর স্কেটজোড়া। তবে এরপর কমে গিয়েছিল পর্যটকদের অসভ্যতা। লুবভের এলাকায় যাওয়া পর্যটকদের আগে থেকে বলে দেওয়া হয় তাঁর কথা। বৈকালের বাবুস্কা অখুশি হন এমন কোনও কাজ করা যাবে না।

সাংবাদিকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এই বরফের তেপান্তরে একা থাকেন, মাঝে মাঝে বিরক্ত বা হতাশ লাগে না!” আকাশ থেকে পড়েছিলেন লুবভ। বলেছিলেন, “হতাশ হতে গেলেও সময় লাগে, আমার সময় কই। হতাশ শব্দটা আসলে হতাশ মানুষের তৈরি করা। পশুপাখিদের হতাশ হতে দেখেছ কোনওদিন। যার জীবনে লেক বৈকাল আর এই স্কেটজোড়া আছে সে হতাশ হবে! হাসালে তোমরা।”

যে বয়েসে চার দেয়ালের ভেতরে নিরাপত্তা খোঁজেন মানুষ। বাঁচার থেকেও বেশি করেন মৃত্যুর চিন্তা। সেই বয়েসে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে থেকে, ঘণ্টায় ষাট কিলোমিটার গতিতে বরফজমা বৈকালের বুকে প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়ান আশি বছরের বাবুস্কা, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পৃথিবীর স্বাদ নেওয়ার জন্য

চিত্র কৃতজ্ঞতা: www.dw.com, www.siberiatimes.com

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More