প্লাস্টিক ও সবুজের অনন্য মিশেল! শহরের বুকে পরিবেশ রক্ষার ইতিহাস গড়ছেন বৃদ্ধ

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ও, ওই পাগলটা? রাস্তা থেকে শিশিবোতল কুড়োয়? –বাড়ি খুঁজতে গিয়ে এরকমই প্রতিক্রিয়া পেলাম এলাকাবাসী এক পথচারীর কাছে। কিন্তু এক শিল্পী তথা পরিবেশপ্রেমী মানুষের বাড়ি খুঁজতে গিয়ে এমনটা কেন শুনতে হবে!

পৌঁছনোর পরে ভুল ভাঙল। নাকি ভুল বাড়ল!

জারিকেন যখন শিল্পিত টব। নীচে ডান দিকে, সবুজ জারিকেনে অভিনন্দনের মুখের আদল।

দমদম স্টেশন থেকে মিনিট সাত-আটের হাঁটা পথ। ২৬ নম্বর ব্লকের সেভেন ট্যাঙ্কস লেন। সাদামাঠা দোতলা বাড়ি। হালকা নীল রং করা, বহু পুরনো। কিন্তু খোদ কলকাতা শহরের বুকে যে এমন একটা বাড়ি থাকতে পারে, নিজে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না। একটা বাড়িতে, অন্তত হাজার পাঁচেক গাছ রয়েছে, ছোট-বড় মিলিয়ে। প্রতিটি গাছ পরিপাটি, যত্নে ভরপুর। এবং সেই গাছ রয়েছে মাটিতে বা টবে নয়, প্লাস্টিকের বোতল, টিনের ক্যান, চামড়ার টায়ার, প্লাস্টিকে জার– ইত্যাদি আধারে। প্রতিটা গাছ রাখার জায়গা আবার সুন্দর করে রং করা, নানা রকম ছবি আঁকা। শুধু তাই নয়। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে যে কত রকম শিল্প তৈরি করা যায়, ভাবা যায় না!

বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি মা দুগ্গা।

জারিকেনের হাতলটিকে নাক বানিয়েছেন তিনি। পাশে দু’টো জলের বোতলের ঢাকনা হয়েছে চোখ। ছোট-ছোট দশটি বোতল দিয়ে হাত। ভাঙাচোরা সিডির টুকরো দিয়ে সারা গায়ের সাজ। ঘরে ঢোকার মুখেই, প্লাস্টিকের বর্জ্য দিয়ে তৈরি স্বয়ং মা দুগ্গা আপনাকে ওয়েলকাম করবেন এভাবেই।

একটা বোতলও ফেলা যায় না।

পরিবেশের কথা ভেবে অবশ্য এ কাজের শুরু নয়। কাজের শুরু আপন খেয়ালে। ছবি আঁকতে ভালবাসতেন তিনি। আর ভালবাসতেন গাছ। বিশ্বাস করতেন, গাছের মতো ভাল বন্ধু হয় না। এই ভালবাসা থেকেই বাগান করা শুরু। সে অনেক বছর আগের কথা। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা পরিবেশ বাঁচানোর বিষয়গুলো নিয়ে তখন এমন থেকে থেকে আলোচনা হতো না হাটে-বাটে-ইন্টারনেটে। তখন থেকেই শুরু এই কাজ। এক দিকে ফেলে দেওয়া বর্জ্যকে শিল্পের রূপ দেওয়া, অন্য দিকে সেই শিল্পের গায়েই সবুজ প্রাণের জন্ম দেওয়া। এক অসাধারণ মেলবন্ধন তৈরি করে ফেলেন নিজের অজান্তেই!

৬৫ বছরের পার্থসারথি গঙ্গোপাধ্যায়। দমদমের ২৬ এফ সেভেন ট্যাঙ্কস লেনের আদি বাসিন্দা। হাওড়া কোর্টে চাকরি করতেন, এখন অবসরপ্রাপ্ত। এলাকায় পরিচিত ভালদাদু নামেই। তবে আড়ালে যে লোকে পাগল বলে না, তা নয়। আমি নিজেই তো প্রমাণ পেয়েছি! স্বীকার করলেন পার্থবাবু নিজেও। “হবে না? চোখ তো থাকে রাস্তার দিকে, ময়লার স্তূপে। বোতল, প্লাস্টিক কনটেনার– কিছু পেলেই এদিক-ওদিক তাকিয়ে টুক করে তুলে নিই। বাড়িতে এনে ধুই, মুছি, রং করি, আর তাতে গাছ লাগিয়ে দিই।”– বললেন প্রবীণ পার্থ।

প্রবীণ শব্দটা অবশ্য পার্থবাবুর শরীরের বয়সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চারণ করা যায় কেবল। মনের দিক থেকে তিনি এখনও নবীন। কাঁচা। সবুজ। সতেজ। তাই তো গলা খুলে বলতে পারেন, “আমি যে কতটা ভাল আছি, তা আর কারও পক্ষে বোঝা সম্ভবই নয়।  চ্যালেঞ্জ করে বলছি, আমি পৃথিবীর সব চেয়ে সুখী মানুষ।”

দেখুন, কী বলছেন তিনি।

বলেন কী! ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে, কলকাতা শহরে বাস করা একটি মানুষ এমন বলতে পারেন এখনও! প্রতিটা জীবন যখন নানা রকম ব্যক্তিগত শোকে আচ্ছন্ন, গোটা পৃথিবী যখন ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে এগোচ্ছে, তখন একটি মানুষ ভিড়ে ঠাসা, ব্যস্ত, দূষণ-জর্জরিত শহরের মাঝে দাঁড়িয়ে দাবি করছেন, তিনি বিশ্বের সব চেয়ে সুখী মানুষ!

এই সুখী মানুষের জীবনের দুঃখের গল্প কিন্তু চমকে দেওয়ারস মতো। ১৯৮৬ সালে, ৩৬ বছর বয়সে ধরা পড়ল ভোকাল কর্ডে ক্যানসার। জটিল অস্ত্রোপচারের পরে সারল অসুখ। তবে বারণ ছিল জোরে কথা বলা, বারণ ছিল ধূমপান করা। আরও নানা অনুশাসনের শর্তেই ছুটি দিয়েছিলেন ডাক্তার।

পাঁচ লিটারের জলের বোতল দিয়ে বানানো শিল্প।

“২০১২ সালে আবার গলা ভাঙতে শুরু করল। কেমন যেন অস্বস্তি বোধ হতো। চেনা অস্বস্তি। পরীক্ষা করে ধরা পড়ল, আবারও ফিরে এসেছে ক্যানসার। এবার তার তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। সবাই ভেঙে পড়েছিল। ডাক্তাররাও বলেছিলেন, রে আর কেমো ছাড়া উপায় নেই। তবে তা আমি নিতে পারব কি না, তাই নিয়েও সন্দেহ ছিল।”– বলছিলেন পার্থ। নিতে পেরেছিলেন তিনি। ৩৩টা রে, ৬টা কেমো। প্রায় মিশে গিয়েছিলেন বিছানার সঙ্গে, মৃত্যু এসে কড়া নেড়েছিল দরজায়, কিন্তু তবু কোনও এক অদম্য মনের জোরে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

টায়ার, জারিকেন, বোতল– সকলেই গাছের এবং শিল্পের আধার।

বলছিলেন, “এক ফোঁটা থুতুও গিলতে পারতাম না। কথা বলতে পারতাম না। কয়েক বছর কোনও খাবার খেতে পারিনি, খাবারের গন্ধে বমি আসত।” শেষমেশ সেরেছেন এখন। কথা বলতে পারেন, তবে গলার স্বর ভাঙা। বেশি চেঁচানো এখনও বারণ। “গাছেদের সঙ্গে মিশলে তো কোনও তর্কবিতর্ক হয় না, চেঁচাতে হয় না, ঝগড়া করতে হয় না। ওরা তো রাজনীতিও করে না, ক্রিকেটও খেলে না…”– নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে ওঠেন পার্থ।

তবে এ হেন শিল্পী এবং রসিক মানুষও কিন্তু রাগতে জানেন। গাছ কেটে ফেলা নিয়ে কেউ কোনও সওয়াল করলেই তেলেবেগুনে জ্বলে যান তিনি। “মানুষের পাপে সারা পৃথিবী ভরে যাচ্ছে, এ তাকে খুন করছে, সে তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, আৎ মানুষের যত সমস্যা, গাছের পাতা উঠোনে পড়লে! কেন! আরও খারাপ কারা জানেন? যারা রোজ মুখে বলেন গাছ লাগানোর কথা, কিন্তু কাজের সময়ে ভাবেন, ‘ও লাগাক। আমি লাগাবো না।’ এ কী! এরকম করে পরস্পরকে ঠেললে হবে? আজ গোটা পৃথিবীর প্রয়োজন গাছের, সবাই জানি। তা হলে সবাই কেন দায়িত্ব নিয়ে লাগায় না!”

পার্থবাবুর বিশ্বাস, এমন দিন খুব তাড়াতাড়ি আসবে, যে দিন গাছ কাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। গাছ না লাগালে তাকে সমাজে একঘরে করে দেওয়া হবে। তবে এ শহরে যে গাছ লাগানোর জায়গা নেই, মাটি নেই– এ সব অজুহাত মানতে একেবারেই রাজি নন তিনি। “মাটি চাইলেই পাওয়া যায়। রবিবার গ্যালিফ স্ট্রিটের হাটে গেলেই হয়! ৫০ টাকা মাটির বস্তা। আর লাগানোর জায়গা? কেন, আমি লাগাইনি? বোতল, বালতি, টায়ার, ক্যান– গাছ লাগাতে চাইলে জায়গার অভাব হয়? আমার বাড়ির বাইরেটা তো দেখা যাচ্ছে, আর তিলধারণের জায়গা নেই। কিন্তু আমি এখনও চাইলে আরও কয়েকশো গাছ লাগাতে পারি।”– দৃঢ় প্রত্যয়ে রীতিমতো ধমকে দিলেন পার্থ।

প্লাস্টিকের বোতলের অংশ।

এই ধমক আসলে সারা শহরের দূষণ-মুখর মানুষের প্রতি। গাছের প্রতি ভালবাসা না থাকা জীবনগুলোর প্রতি। বা ভালবাসা থেকেও নিজের বাড়িতে আদৌ গাছ না লাগানো লোকজনের প্রতি। তাই তো ধমকের সুর বদলে যায় আফশোসেও– “গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা মানুষ কমে যাচ্ছে… কে বাঁচাবে এই পরিবেশ-পৃথিবী-প্রাণ!”

পার্থবাবুর এই প্রশ্নের হয়তো উত্তর মেলাতে পারলাম না। কিন্তু যেটুকু পারলাম, তা-ই বা কম কী! শিল্প আর সবুজ একসঙ্গে হাত ধরলে যে সুখের সূচক চড়চড়িয়ে বাড়তে থাকে, তা তো পার্থবাবুই শেখাচ্ছেন। আর এ কথা জেনেছেন এলাকার জমাদারেরাও। তাই তো তাঁদের ময়লা ফেলার গাড়িতে রোজ যত প্লাস্টিকের কনটেনার ফেলা হয়, সে সব তাঁরা এসে জমা দেন ভালদাদু পার্থর বাড়িতে। তাঁরা জানেন, নতুন রূপে সেজে উঠে, নতুন কোনও গাছের জায়গা হয়ে উঠবে তারা!

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More