রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৭

কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে… খোলা প্রশ্ন তুললেন শহিদ বায়ুসেনার স্ত্রী

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমি গরিমা অ্যাবরল… শহিদ স্কোয়াড্রন লিডার সমীর অ্যাবরলের স্ত্রী।– সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভাবেই পোস্টটি লিখতে শুরু করেছেন তিনি। সেই পোস্টই এক দিনের মধ্যে লাইক করেছেন হাজার দশেক মানুষ। শেয়ার করেছেন ছ’হাজার জন। মন্তব্যও করেছেন কয়েক হাজার নেটিজেন। তাঁর কথাগুলি সকলকে এতই ছুঁয়ে যায়, যে সোশ্যাল মিডিয়ার বেশ কয়েকটি পেজে ভাইরাল হয়ে যায় গরিমার এই পোস্ট। তাঁর ওই পোস্টে গরিমা প্রশ্ন করেছেন, আরও কত প্রাণ গেলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গলদ নিয়ে সচেতন হবে মানুষ!

গরিমা লেখেন, “আমার চোখের জল এখনও শুকোয়নি… তুমি যে চলে গেছো, এটা এখনও মেনে নিতে পারিনি আমি। কী করে পারব, আমার প্রশ্নটার উত্তর তো কেউ দিতে পারছে না। তুমিই কেন?!”

গরিমার স্বামী সমীর অ্যাবরল ভারতীয় বায়ুসেনার এক প্রশিক্ষিত পাইলট ছিলেন। বেঙ্গালুরুর কাছে ইয়েমালুয়ারে হিন্দুস্তান এরোনটিকস লিমিটেড বিমানবন্দরে একটি পরীক্ষামূলক উড়ানের জন্য নিযুক্ত ছিলেন তিনি। শুক্রবার সকাল ১০.৩০ মিনিট নাগাদ ভেঙে পড়ে বায়ুসেনার সেই পরীক্ষামূলক বিমান মিরেজ ২০০০। এয়ারপোর্ট থেকে টেক-অফ করার ঠিক পরেই ভেঙে পড়ে বিমানটি। দুই আসনের বিমানটিতে থাকা দুই পাইলটকে জ্বলন্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে গুরুতর জখম অবস্থায় বের করা হলেও পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় তাঁদের। তাঁদেরই এক জন গরিমার স্বামী সমীর অ্যাবরল। অন্য জনের নাম সিদ্ধার্থ নেগী।

মিরেজ ২০০০ বিমানটি থেকে বেরোতে গিয়েই এই ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে সেনা। এ ধরনের বিমানে জিরো- জিরো নামক এক বিশেষ সুবিধা থাকে। এর মানে জিরো স্পিড জিরো অল্টিচিউড। এই বিশেষ  সুবিধা থাকলে পরিস্থিতি ভাল না হলে বিমান দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেও চালক বা বিমানে থাকা অন্যরা বেরিয়ে আসতে পারবেন। সেটা করতে গিয়েই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গিয়েছে।

“আমার স্বামী ভারতীয় হিসেবে গর্ব বোধ করতেন প্রতি মুহূর্তে। আমিও সেই একই গর্বের সঙ্গে রোজ সকালে ওঁখে চা করে দিতাম, মাথা উঁচু করে ওঁকে পাঠাতাম দেশের সেবা করার জন্য।”– ফেসবুক পোস্টে স্মৃতির নুড়ি উপুড় করে দিয়েছেন গরিমা।

দেখে নিন গরিমার সেই ফেসবুক পোস্ট।

I am Garima Abrol…..I am the wife of Martyr Squadron Leader Samir Abrol….whose tears are still not dry…It still hasn’t…

Garima Abrol এতে পোস্ট করেছেন রবিবার, 10 ফেব্রুয়ারি, 2019

গরিমা আরও জানান, প্রতিটা সেনাকর্মীর স্ত্রীয়ের জীবনের সব চেয়ে বড় ভয়ের মুহূর্ত হল, কখন তাঁর স্বামীকে সীমান্তের ফ্রন্টলাইনে ডাকা হবে, যুদ্ধ করতে হবে স্বামীকে। গরিমা লিখেছেন, “আমারও একই ভয় কাজ করত। কত বার এমন হয়েছে, খারাপ স্বপ্ন দেখে কেঁদে উঠেছি আমি। কিন্তু সমীর সব সময়েই আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে, সান্ত্বনা দিয়ে বলেছে, দেশের জন্য লড়াই করাটাই ওঁর প্রথম আর প্রধান কাজ। ও চাইত আমি আরও সাহসী হই। ও যেমন সাহসী সৈন্য ছিল, দেশপ্রেম যেমন ওর মনের গভীর থেকে আসত, আমিও যেন তেমনটাই হই।”

এক জন সেনার তো এটাই কাজ। এই কাজ তাকে যশ দেয় না, খ্যাতি দেয় না। এই কাজ করতে গিয়ে যদি কাউকে পৃথিবী ছাড়তে হয়, তা হলে পরিবার ছাড়া তার জন্য কেউ কাঁদারও থাকে না। সংবাদমাধ্যম কয়েক দিন উৎসাহ দেখায়, এবং তার পরেই ভুলে যায়, ঠিক যেমন সমীরের আগে যিনি শহিদ হয়েছিলেন তাঁকেও ভুলে গিয়েছে। তার পরে সকলেই এক সময়ে ভুলে যায় সব কিছু।— আক্ষেপ উপচে পড়ে শোকার্ত গরিমার কলমে।

গরিমা সটান প্রশ্ন তোলেন, “আরও কত পাইলটকে এভাবে প্রাণ দেওয়ার পরে এটা বিশ্বাস করা হবে যে এই সিস্টেমে সত্যিই গলদ আছে! আর কতগুলো মৃত্যুতে নড়ে বসবে সরকার!” তিনি আরও লেখেন, পাইলট হওয়ার পেছনে অনেক লড়াই থাকে, অনেক পরিশ্রম থাকে। “এক জন পাইলট এক দিনে পাইলট হন না। বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ ও অভ্যাস তাঁকে পাইলট হিসেবে তৈরি করে। এই প্রশিক্ষণ শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। এভাবে পাইলট হয়ে ওঠার পরে আর কত জনকে প্রাণ দিতে হবে, মানুষের চোখ খোলার জন্য?”

গরিমার পোস্ট অনেকগুলো প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে দেশবাসীর সামনে। অনেকেরই মনে পড়ে গেছে রং দে বসন্তী সিনেমার কথা। সিস্টেমের দুর্নীতির ফাঁসে এভাবেই প্রাণ দিতে হয়েছিল সনিয়ার (সোহা আলি খান) বাগদত্ত তরুণ বায়ুসেনা পাইলট অজয় সিং রাঠোরকে  (মাধবন)। প্রশ্ন উঠেছিল, শহিদ হওয়ার গৌরবকে সামনে রেখে যাঁরা একের পর এক প্রাণ হারাচ্ছেন, তাঁদের নিরাপত্তা কোথায়!

একই কথা বলেছেন গরিমাও। তিনি লেখেন, “আমি চাই না সেনা পরিবারের সদস্য অন্য কোনও বোন আমার মতো যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাক। প্রিয়তম মানুষটাকে ছেড়ে একা থাকা যে কতটা কষ্টের, সেটা কথায় প্রকাশ করা যায় না।

যতই কষ্ট থাক, আমি প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই…”

সব শেষে গরিমা লেখেন, “অনেকের জন্য হয়তো এটা কেবলই আরও পাঁচটা দুর্ঘটনার মতোই একটা দুর্ঘটনা, কিন্তু আমি হাল ছাড়ব না। তোমায় কেন আমায় ছেড়ে চলে যেতে হল, সেই কারণটার জন্য আমি শেষ অবধি লড়াই করব।”

Shares

Comments are closed.