একটানা বই লিখে ও অনলাইনে বেচে ১০ লক্ষাধিক টাকার ত্রাণ তুলেছেন ‘ফেবুলেখক’! কুর্নিশ জানাচ্ছেন নেটিজেনরা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পেশায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হলেও, লেখালেখি বরাবরের ভালবাসা। ‘ফেবুলেখক’ তকমাটা গায়ের সঙ্গে সেঁটে গেছে যেন। তাতে অবশ্য পরোয়া করেননি অভীক দত্ত। তাঁর লেখার ইচ্ছে এবং সে লেখা মানুষকে পড়ানোর ইচ্ছের মধ্যে কোনও বাধা রাখেননি তিনি। নিজেই বই ছেপে, নিজেই তা কুরিয়ার করেছেন একসময়ে। পরবর্তী কালে ফেসবুকে পাঠকদের নিয়ে গ্রুপ তৈরি করেছেন, টাকার বিনিময়ে লেখা পড়তে পারার শর্তে। লকডাউন হওয়ার পরে একের পর এক পিডিএফ বার করেছেন নিজের লেখা বইয়ের। আর এই করেই রীতিমতো নজির গড়েছেন তিনি। ১০ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি টাকা তুলে দিয়েছেন উমফান ত্রাণ তহবিলে।

ফেসবুক জগতে তরুণ লেখকের এই কীর্তি যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল, সদিচ্ছা আর প্রতিভা একসঙ্গে হাত ধরলে ভাল কাজে বাধা হয় না কিছুই। এই ঘটনায় যেন সাধারণ মানুষেরও আরও একবার জানা হল, বাংলা বই কিনে পড়ার ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে পড়েনি বাঙালিরা। নইলে মাত্র কয়েক মাসে এত লক্ষ টাকার বই বিক্রি করা যায়!

এই বিপুল অঙ্কের টাকা তুলে উমফান-বিধ্বস্তদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশিই তিনি সুপার সাইক্লোনে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া কলেজ স্ট্রিট বই পাড়া সংস্কারেও সাহায্য করেছেন। নিম্নবিত্ত দু’টি পরিবারের ক্যানসার আক্রান্ত বাচ্চাদের চিকিৎসায় সাহায্যও করেছেন।

এবার লক্ষ্য, উত্তরবঙ্গে বন্যাবিধ্বস্তদের সাহায্য করা। ফের কলম ধরেছেন অভীক। নতুন করে লিখতে শুরু করেছেন টানটান রুদ্ধশ্বাস এক থ্রিলার, যার পটভূমি কাশ্মীর। সে উপন্যাসের নাম ‘অপারেশন জন্নত’। এই উপন্যাসই অভীকের এই ‘সাহায্য অপারেশন’কে সফল করবে কিনা তা জানা কেবল সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু তাঁর এতদিনের এত লেখা যে মানুষকে রীতিমতো মুগ্ধ করেছে, তা বোঝা যায় বইযের বিক্রির পরিসংখ্যানেই।

তাঁর ‘ব্লু ফ্লাওয়ার’ (১, ২, ৩), ‘অনিন্দ্য’, ‘শুভম সমগ্রর’র মতো একাধিক বিভিন্ন স্বাদের গল্পের বই ইতিমধ্যেই ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত। বিক্রিও হয়েছে সেগুলি। এখন অবশ্য বই ছাপিয়ে বিক্রি করা সম্ভব নয়, তাই শুরু পিডিএফ আকারে বিক্রি করা। ডিজিটাল মাধ্যমে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পাঠকের মন জয় করলেন তিনি।

এর শুরু অবশ্য উমফান বিপর্যয়ের আগেই। লকডাউনের জেরে যখন বহু মানুষের কাজ বন্ধ, তখন থেকেই কমিউনিটি কিচেনগুলিতে টাকা দেওয়ার জন্য বইয়ের পিডিএফ বিক্রি করতে শুরু করেন তিনি। মূল্য ২০ টাকা থেকে শুরু। তার উপর অভীকের লেখাও পাঠকদের মধ্যে সুপরিচিত। বিক্রি হতে সময় লাগেনি।

এর পরেই এসে গেল উমফান। চতুর্দিকে ত্রাণ নিয়ে হইচই। স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন মানুষের পাশে থাকতে। অভীকেরও ইচ্ছে করেছিল। সেই ইচ্ছের পালেই হাওয়া লাগিয়েছে এই পিডিএফ বিক্রির পরিকল্পনা। সশরীরে মানুষগুলির পাশে গিয়ে দাঁড়াতে না পারলেও, যাঁরা দাঁড়াচ্ছেন তাঁদের হাতে অর্থসাহায্য তো তুলে দিতে পারেন!

এই করেই শুরু। সে অঙ্ক এখন ১০ লক্ষ ৩৪ হাজার। রাজ্য সরকার থেকে শুরু করে ভারত সেবাশ্রম হয়ে অসংখ্য ছোট-বড় সংগঠন মিলিয়ে কোথায় কত টাকা দিয়েছেন, সে পরিসংখ্যানও নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে পোস্ট করেছেন অভীক। ফেসবুকে তাঁর মোট কত ফলোয়ার কোন গ্রুপ ও পেজ থেকে কীভাবে আয় হয়, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।

অভীকের কথায়, “কাজটা শুরুর সময়ে ভাবিনি, এতটা সাফল্য পাব। মানুষ এগিয়ে এসেছেন বলেই সম্ভব হয়েছেন। পিডিএফ কিনে বাংলা বই পড়েছেন সকলে। মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এ এক বিরাট প্রাপ্তি। এই খারাপ সময়ে মনুষ্যত্বের উন্মেষ ঘটানোই সবচেয়ে জরুরি।”

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More