বন্যাত্রাণের মিছিলে বিকাশ রায় টক্কর দিলেন উত্তম কুমারকে

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বিকাশ রায় এক অদ্বিতীয় নাম। যাঁর সম্পর্কে মাধবী মুখোপাধ্যায় বলেন ‘অনেক অভিনেতাই এলেন কিন্তু বিকাশ রায়ের মতো অভিনেতা আর পেলাম না।’ যাঁর ফ্যান ছিলেন পাহাড়ি সান্যাল থেকে উত্তমকুমার। অথচ বিকাশ রায় প্রথম যুগে নায়ক হলেও উত্তম যুগে নেগেটিভ শেডস চরিত্র বেশি করেছেন। বিকাশ রায় ভিলেন হয়ে উঠেছিলেন হেমেন গুপ্তর ‘৪২’ ছবিতে এক অত্যাচারী পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করে। যা দেখে দর্শক জুতো ছুঁড়ে মেরেছিল পর্দায়। এই ঘটনাকে বিকাশ রায় দর্শকের অভিনন্দন হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু পর্দার ভিলেন বিকাশ রায় বাস্তবে ছিলেন যেমন উচ্চশিক্ষিত তেমনি জনদরদী।

‘৪২’ এর নির্মম ভিলেন বিকাশ রায়

একবার তর্ক হল বিকাশ রায় না উত্তম কুমার কার জনপ্রিয়তা বেশি! ঘটনার প্রমাণ কিছুদিনের মধ্যেই পাওয়া গেল। কী ছিল সেই ঘটনা?

১৯৬১ সাল। পশ্চিমবঙ্গের দুটি জেলা ভয়াবহ বন্যায় ভেসে গেছে। শ’য়ে শ’য়ে ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছে। অনাহারে আর নানা ব্যাধিতে তারা আক্রান্ত। অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, নেই ওষুধ-পথ্য।
সরকারি সাহায্য দেওয়া হচ্ছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়। বাংলার সাধারণ মানুষ এগিয়ে এলেন বন্যার্ত মানুষের ত্রাণের সাহায্যে। ফিল্ম জগতের মানুষেরাও পিছিয়ে রইবেন কেন? তাঁরাও এগিয়ে এলেন সাহাযার্থে।

বন্যাত্রাণের জন্যে চলচ্চিত্র মহল ঠিক করল অর্থ সংগ্রহের জন্য কলকাতার রাজপথে তাঁরা মিছিল করে বেরোবেন। কীভাবে কী করা হবে, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব পড়ল অভিনেতা পরিচালক বিকাশ রায়ের ওপর।

কিন্তু সেই পথপরিক্রমার জন্যে শিল্পীদের যে তালিকা তৈরি হল তাতে উত্তমকুমারের নাম বাদ রাখা হল। কারণ দেখান হল, উত্তমকুমার রাস্তায় নামলে এত ভিড় হবে যে তা সামলাতে হিমসিম খেতে হবে। ফলে অর্থসংগ্রহের আসল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে।

খবর পেয়ে উত্তম কুমার জেদ ধরলেন, তিনিও রাস্তায় নামবেন।
বললেন— “কেন, আমি কি পীর ঠাকুর নাকি? সবাই রাস্তায় নামবে আর আমি ঘরে বসে থাকব। তা হবে না।” তখন উত্তম কুমার রোগভোগ থেকে উঠেছেন। শ্যুটিং বিরতি নিয়েছিলেন। উত্তমকুমারকে অনেক বোঝানো হল। ওঁর সাম্প্রতিক অসুস্থতার অজুহাতও দেখানো হল।
কিন্তু উত্তম নাছোড়বান্দা। বিকাশ রায়ের সহকারী সুনীল রায় চৌধুরীকে উত্তম বললেন—”তোমাদের মতলবটা কী বল তো সুনুদা। আমাকে কী সবাই মিলে এক ঘরে করতে চাইছ?”

শেষ পর্যন্ত ঠিক হল, উত্তমকে সঙ্গে নেওয়া হবে, কিন্তু রাস্তায় নামতে দেওয়া হবে না। উনি একটা লরির ওপর থাকবেন কৌটো হাতে নিয়ে। লরিতে জনা বিশেক ব্যায়ামবীর ব্যক্তিকে রাখা হবে সাধারণ মানুষের উদ্দাম ভালোবাসার হাত থেকে উত্তমকুমারকে রক্ষা করবার জন্যে। এছাড়া কিছু সাদা পোশাকের পুলিশও থাকবে ওঁর লরির আশেপাশে।
পুলিশ বিভাগ থেকে ইউনিফর্মধারী পুলিশ দেবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিকাশ রায় সে প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন।
বলেছিলেন— “তাহলে তো হাঙ্গামার ভয়ের মানুষজন অর্থ সাহায্য করতে এগোবেই না মিছিলের দিকে।”

অর্থ সংগ্রহের প্রথমদিন উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার থেকে বিডন স্ট্রিট পর্যন্ত অঞ্চলটিকে বেছে নেওয়া হল। সকাল ন’টা নাগাদ দেশবন্ধু পার্কের সামনে থেকে পদযাত্রা শুরু হবে।

উত্তমকুমারকে তোলা হল একটি লরিতে। আরো চার-পাঁচটি লরিতে রাখা হল মহিলা শিল্পীদের। বাকি পুরুষ শিল্পী এবং কলাকুশলীরা সবাই পদাতিক।

তখনকার জনপ্রিয় সিনেপত্রিকা ‘উল্টোরথ’ এর কর্ণধার প্রসাদ সিংহ আর তাঁর সহযোগী গিরীন্দ্র সিংহ তাঁদের কনসাল্ গাড়িটা নিয়ে মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে চললেন যদি কেউ পথশ্রমে আর রোদের তাপে অসুস্থ হয়ে পড়েন তবে তাঁকে গাড়িতে তুলে নেবার জন্যে।

বিখ্যাত পরিবেশক ‘ছায়াবাণী’র কর্ণধার অসিত চৌধুরী আগেই ঘোষণা করেছিলেন, এবারের এই মিছিলে যিনি সবচেয়ে বেশি কালেকশন করতে পারবেন তাঁকে একটি দামি উপহার দেবেন। সেই কারণে মিছিলকারীদের মধ্যে একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছিল কে কতটা অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। সেই প্রতিযোগিতার রেশ এসে পড়ল সব শিল্পীদের মধ্যেও। বাদ পড়লেন না বিকাশ রায় ও উত্তম কুমার। কার জনপ্রিয়তা বেশি? কাকে দেখে জনতা বেশি অর্থ দেয়।

জতুগৃহ ছবিতে উত্তম বন্ধু বিকাশ

সবারই দৃঢ় ধারণা উত্তমকুমারই এবার হাইয়েস্ট কালেক্টার হবেন। এই যে রাস্তার দু দিকে ছাপিয়ে এত ভিড়, সে তো উত্তমকুমারকে দেখার জন্যেই।

বিকাশ রায় কিন্তু ভালো ফুটবল খেলোয়াড়। ঠিক ফুটবলের মারপ্যাঁচ পথ পরিক্রমায় খেলতে শুরু করলেন তিনি। ঠিক যেমন কখনও স্ট্রাইকার পজিশনে, কখনও মিডফিল্ডে, আবার কখনও ডিপ ডিফেন্সে উঠে- নেমে খেলেন, বিকাশ রায়ও কখন মিছিলের পুরোভাগে চলে আসছেন, কখনও বা রাইটে কিংবা লেফ্টে, আবার কখনও একেবারে মিছিলের ল্যাজের কাছে চলে যাচ্ছেন। কখনও একেবারে উধাও। অথচ উত্তম কুমার সেই লরিতেই বন্দী।

ভিড় জনতার মাঝে হঠাৎ বিকাশ রায় বলে উঠলেন এবং জনতার হাতে ধরা এক দু’টাকার নোটগুলি প্রায় ছিনিয়ে নিতে নিতে বলতে লাগলেন—”উত্তমের কৌটোর ভ্যালু কি ওই এক টাকা দু-টাকা নাকি?
তার জন্য পাঁচ-দশ টাকার নোট বের করুন। এগুলি সব আমার প্রাপ্য।”
বিকাশ রায় এবার আশেপাশের বাড়ির ছাদ আর বারান্দার দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বললেন—”দূর থেকে বিনে পয়সায় মজা করে আর্টিস্ট দেখা হচ্ছে। দেখাচ্ছি মজা।”

বলেই বিকাশ রায় রাস্তা ছেড়ে একখানা পাঁচতলা বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলেন। সে বাড়ির ভদ্রমহিলা এসে দরজা খুলে দিলেন বিরক্ত মুখে। বিরক্ত হবারই কথা, বেশ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আর্টিস্ট দেখছিলেন, সেই সময় আবার কে এল জ্বালাতে।

কিন্তু দরজা খুলে বিকাশ রায়কে দেখেই অবাক। চোখের সামনে ‘ছেলে কার’, ‘রত্নদীপ’ ছবির নায়ক!

এবং তাঁকে আরোও অবাক করে দিয়ে বিকাশ বলে উঠলেন— “কই মাসিমা দশ- বিশ- পঞ্চাশ কী আছে নিয়ে আসুন। আমার একদম দাঁড়াবার সময় নেই।”
বিকাশ রায়ের বহুপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে বারান্দা খালি করে মেয়ে-বৌরা সব হুড়মুড় করে হাজির হল দরজার সামনে। বিকাশ তাদের দেখে বলে উঠলেন— “বৌদি, আপনিও যা পারেন নিয়ে আসুন তাড়াতাড়ি। দাদার পকেট মেরে অনেক তো জমিয়েছেন সিনেমা দেখার জন্যে। এখন সিনেমা আর্টিস্ট দেখার বাবদ তার কিছু ছাড়ুন।”

দুটি অল্পবয়সী মেয়ে ইতিমধ্যেই অটোগ্রাফ খাতা মেলে ধরেছেন বিকাশের সামনে। বিকাশ তাই দেখে বলে উঠলেন— “উঁহু, আজ বিনে পয়সায় নো অটোগ্রাফ। আজ অটোগ্রাফ নিতে গেলে পাঁচ টাকা করে দিতে হবে।”
তাই করলেন মহিলারা। বরং বেশিই দিলেন।

ততক্ষণে উপস্থিত মহিলা মহলের তরফ থেকে অনুরোধ এসেছে ভেতরে গিয়ে একটু চা খাবার জন্যে। বিকাশ রায় বলে উঠলেন—”ওরেঃ সর্বনাশ! সে জো কি আজ আর আছে মাসিমা। দলছুট হয়ে যাব যে। কথা দিচ্ছি আর একদিন এসে খেয়ে যাব।”

উত্তর ফাল্গুণী ছবিতে মণীশ বিকাশ রায়

সেই সময় পাঁচ টাকার অনেক মূল্য। এখনকার হিসেবে অনেক টাকা। তাই দিলেন সব মহিলারা।

বেলা বারোটা নাগাদ মিছিল শেষ হল, ‘উল্টোরথ’ এর কর্ণধার প্রসাদ সিংহ’র ৩৪/১ বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে এসে। ক্লান্ত ঘর্মাক্ত বিধ্বস্ত শিল্পীদের চা-জল খাওয়ানোর ব্যবস্থা করলেন উল্টোরথের কর্মীরা। তারপর প্রসাদ সিংহের স্ত্রী-র তরফ থেকে পাঁচশো এক টাকা ডোনেট করা হল। আর সেটা পড়ল উত্তমকুমারের কৌটোয়।
তা দেখে বিকাশ রায় হাসতে হাসতে বলে উঠলেন—
“এটা কী হল ভাই প্রসাদ? তোমরা সবাই মিলে আমাকে এভাবে কর্নার করতে চাইছ কেন বল দেখি? ঠিক আছে ভাই, যত পারো তেলা মাথায় তেল দাও। তবে আমিও বলে রাখছি এভাবে আমাকে কম্পিটিশনে হারানো যায়না, যাবেও না।”

উত্তম কুমার সব শুনে হাসতে হাসতে বললেন
“ও বাবা, এর মধ্যে আবার কম্পিটিশন টম্পিটিশন হচ্ছে নাকি? আমি ওর মধ্যে নেই বিকাশদা।”

বিকাশ রায় বললেন “আমিও নেই রে উত্তম।”

বিকেলে ছায়াবাণী অফিসে ঘোষণা হবে হাইয়েস্ট কালেকশন কার?

ঘোষণার ফল বেরলো,
আজকের মিছিলে সবথেকে বেশি টাকা পড়েছে বিকাশ রায়ের কৌটোয়। বিকাশ রায় প্রথম আর উত্তম কুমার দ্বিতীয় স্থানাধিকারী। ‘উল্টোরথ’ এর তরফ থেকে বিকাশ রায়কে বিশেষ উপহার দিয়ে কনগ্র্যাচুলেশন জানানো হল।

সত্যি সেদিন বিকাশ রায়কে হারানো গেল না। বুদ্ধি করে খেলে তিনিই হলেন ফার্স্ট।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More