২৭ বছরের পথ চলায় ইতি, বিল গেটস ও মেলিন্ডার বিচ্ছেদের ঘোষণা, সম্পত্তির বাঁটোয়ারা নিয়ে বাড়ছে জল্পনা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবন। একসঙ্গে পথ চলা। মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তি দুনিয়ায় সামনের সারিতে আনা। এ ছাড়াও জনহিতকর নানান কর্মসূচিতে বিপুল আর্থিক বিনিয়োগ। বিশ্বের অন্যতম ধনকুবের বিল গেটস এবং তাঁর স্ত্রী মেলিন্ডার যৌথ জীবন কম বর্ণময় নয়। ২৭ বছর হাতে হাত রেখে এগোনোর পর এবার বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা। রীতিমতো গভীর ভাবনাচিন্তার পরেই দূরে সরে যাচ্ছেন— ট্যুইটারে বিবাহবিচ্ছেদের ঘোষণায় এমনটাই জানালেন গেটস দম্পতি।

সোমবার ট্যুইটে বিল ও মেলিন্ডা লেখেন, ‘তিনটি সন্তানকে আমরা ভালোভাবে মানুষ করেছি। গড়ে তুলেছি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা দুনিয়াজুড়ে মানুষের সেবায় ও সকলের ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বার্থে নিরলস কাজ করে চলেছে।’ গতকালের এই সংক্ষিপ্ত বার্তায় খুব একটা খেদ ধরা পড়েনি। বরং পেশাদারি মেজাজে তাঁরা একযোগে ঘোষণা করেছেন, এই ভাঙন ব্যক্তিগত। তা কোনওভাবেই মাইক্রোসফট কর্পোরেশন কিংবা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের কাজে এতটুকু আঁচ ফেলবে না।

Bill and Melinda Gates divorce after 27 years of marriage - BBC News

সামাজিক সুরক্ষা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় বহু বছর ধরে কাজ করে চলেছেন তাঁরা। কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াই, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা প্রচার কিংবা নারী-স্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল— গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে বরাবরই সরব এই ফাউন্ডেশন। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের সমীক্ষা বলছে, এই সংগঠনের সম্পত্তি সময়ের অনুপাতে বেড়েছে এটা সত্যি। হিসেবমতো যার আর্থিক মূল্য বর্তমান বাজারে প্রায় ১৪৬ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এর উল্টো দিকে দানধ্যানের অঙ্কেও পিছিয়ে নেই তাঁরা। প্রাক্তন দম্পতির ফাউন্ডেশন এতদিন ধরে ৫০ বিলিয়নেরও বেশি অর্থ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করেছে। বিশেষ করে, জনহিতকর কাজে মেলিন্ডার ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। মাইক্রোসফটের প্রাক্তন ম্যানেজার মেলিন্ডা কাজ থেকে আগাম অবসর নিয়ে নারীসাম্য এবং মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষার ময়দানে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরেছিলেন।

কিন্তু বিচ্ছেদের পর এতশত কর্মসূচি চালানো কিংবা বড়ো সংস্থার ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে অশান্তি দেখা দেবে না তো? প্রথম প্রশ্নে ইতিমধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন। সংস্থার মুখপাত্রের তরফে সাফ জানানো হয়েছে, কাজ যেমন এগোচ্ছিল, সেভাবেই এগোবে। দুজনে যে ভূমিকা পালন করতেন, তার বদল হবে না।

Bill Gates and Melinda announce divorce after 27 years of marriage

কিন্তু সম্পত্তির হিসেব? তার কী হবে?

এই প্রশ্নে অনেকে বছর দুই আগে অ্যামাজন কর্তা জেফ বেজোস এবং তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী ম্যাকেঞ্জি স্কটের বিচ্ছেদের ঘটনাকে টেনে আনছেন। সম্পর্ক ভাঙার পর তাঁদের যৌথ সম্পদ ভাগাভাগি হয়। শর্ত অনুযায়ী, অ্যামাজনের ৪ শতাংশ শেয়ারের মালিক হন ম্যাকেঞ্জি। যার মূল্য ছিল প্রায় ৩৫০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে অতিমারির সময়ে অ্যামাজনের শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। ফলে তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ আরও বেড়ে গিয়ে ৫ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। অনেক ধনকুবেরকে পেছনে ঠেলে ধনীদের তালিকায় সামনে চলে আসেন ম্যাকেঞ্জি।

গেটস দম্পতির ক্ষেত্রেও তেমনটা হবে নাকি? এই প্রশ্নে অবশ্য মাইক্রোসফট কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট ডিভোর্স অ্যাটর্নি— সকলেই কুলুপ এঁটেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারকার সমীকরণ কিছুটা আলাদা। তার কারণ, বিল গেটস মাইক্রোসফট থেকে সম্পত্তি বাড়িয়েছেন ঠিকই। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে নিজের শেয়ারের অংশ বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা ফাউন্ডেশন এবং অন্যান্য খাতে কাজে লাগিয়েছেন। এরই মধ্যে মাইক্রোসফট কর্পোরেশনের বোর্ড থেকে গত বছর বেরিয়ে যান বিল। ফলে এখন তাঁর সম্পদের আনুমানিক হিসেব করাটাও বেশ কঠিন। তাই বিচ্ছেদে কার লাভ, কার ক্ষতি— সেই অঙ্কও জটিল হয়ে পড়েছে।

Bill and Melinda Gates: A life in pictures - BBC News

জটিলতা আরেকটা কারণ রয়েছে। বিল এবং মেলিন্ডা তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী নিতে চলেছেন, সেটা কেউ অনুমান করতে পারছেন না। ওয়াশিংটনে যে বাড়িতে তাঁরা এতদিনে ছিলেন, তার ভাগাভাগির হিসেব বিয়ের আগে কীভাবে লেখা হয়েছিল, ফাউন্ডেশনে দু’জনের ভূমিকা কী হতে চলেছে— এগুলোও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তাই মুখ বন্ধ রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মেনে নিয়েছেন তাঁরা।

দাম্পত্য জীবনের শেষটা অঙ্কের মারপ্যাঁচে মোড়া। এর শুরুটাও কিন্তু আঁক কষেই হয়েছিল। গল্পটা খোলসা করেছিলেন মেলিন্ডা নিজে। নেটফ্লিক্স ডকুমেন্টারি ‘ইনসাইড বিল’স ব্রেইন’-এ। আশির দশক। তখনও বিয়ের সিদ্ধান্ত নেননি তাঁরা। কিন্তু প্রেমপর্ব চুটিয়ে চলছে। একসঙ্গে থাকবেন কি থাকবেন না— ধোঁয়াশায় মেলিন্ডা। বিলকেও বেশ চিন্তান্বিত দেখাচ্ছে। হঠাৎ একদিন বেডরুমে ঢুকতেই মেলিন্ডার নজরে এল বিশাল হোয়াইটবোর্ডে দু’টো আলাদা ছক কেটেছেন বিল। একদিন লেখা ‘ডুস’। অন্যদিকে ‘ডোন্টস’। বিয়ে করলে কোন, কোন ফ্যাক্টর কাজ করবে আর করবে না— মাথা খাটিয়ে তারই তালিকা করেছিলেন তিনি। এরপর পাওয়া-না পাওয়ার তাল-মিলে কেটে গেছে ২৭ বছর। বিচ্ছেদের পর এবার নতুন অঙ্ক। হিসেবের নিক্তিটা কিন্তু একই— লাভ না ক্ষতি? পাওয়া নাকি না-পাওয়া?

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More