রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৪

ব্লগ: হ্যারিসন রোড ৩/ ইয়ামাশিরো

একরাম আলি

সত্তরের দশকের ডামাডোলে মেস-মালিকদের তৎপরতা বেড়ে যায়। ততদিনে তাঁদের কানে সেই ধুরন্ধর মৌমাছিগুলো গুনগুন করতে শুরু করেছে, আগেভাগে যারা বাজার বুঝতে পারে। ব্যবসাটির মোড় তাঁরা ঘোরাতে উঠে পড়ে লাগেন। মেসগুলোকে হোটেলে উন্নীত করার উচ্চাশা আর কী। একটা-একটা করে ঘর খালি করার চেষ্টায় তক্কে তক্কে থাকার সেই শুরু। চুয়াত্তরের অক্টোবরে প্যারামাউন্টের আঠারো/কুড়িটা ঘরের অন্তত গোটা পাঁচেক দিব্যি ফাঁকা করতে পেরেছিলেন ম্যানেজার এবং সেগুলো ভাড়ায় খাটছিল যাকে বলে ফ্লাইং কাস্টমারদের জন্যে। অর্থাৎ হোটেল-কাম-মেস যেন-বা। তাতে স্থায়ী বোর্ডারদের ক্ষতি কিছু হয়নি, বরং কখনও তেমন অস্থায়ী অতিথি জুটলে একঘেয়ে মেস-জীবনে একটু ঢেউ খেলে যেত।

একবার হল কী, বাড়ি থেকে ফিরছি; হাওড়া স্টেশনে পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে চটি, পিঠে ফুল-পাঞ্জাব বডি মাপের রুকস্যাক, এক মঙ্গোলীয় চেহারার লম্বা তরুণ হাঁটছে। হাতে পকেট ডিকশনারি। কী মনে হতে এগিয়ে এল ছেলেটি। ডিকশনারি থেকে একেকটা শব্দ তুলে এনে ‘চৌরিঙ্গি’ কী ভাবে যাবে এবং সেখানে সস্তায় হোটেল পাওয়া যাবে কিনা—এই ছিল তার জিজ্ঞাস্য। পালটা প্রস্তাব ছিল, সস্তায় থাকতে চাইলে সে সঙ্গী হতে পারে। অনেকেই যে-ভুলটা করে, সেও করল। বিশ্বাস করে ফেলল। তারপর ঢকাংঢক ট্রাম। এবং মেস।

ততক্ষণে পরস্পরের পরিচয় হয়েছে খানিকটা। ছেলেটি জাপানি। নাম মাসায়েকি ইয়ামাশিরো। তোয়ামা ইউনিভার্সিটিতে হিস্ট্রি পড়ে। বাড়ি তোয়ামা সিটিতেই। নেশা ট্যুরিজম। এবার সে ঘুরতে এসেছে বৌদ্ধস্থানগুলো দেখতে। নেপাল হয়ে ভারত। তারপরের গন্তব্য পাকিস্তান। সেখান থেকে আফগানিস্তান। তখন তো আর তালিবানদের জন্ম হয়নি, বামিয়ান বুদ্ধ তখনও তপস্যামগ্ন। ইয়ামাশিরো কলকাতায় এসেছে দিন সাতেক শুয়ে থাকতে।

ম্যানেজারবাবু তাকে বুঝিয়েছিলেন মেসে থাকার অসুবিধেগুলো। ছেলেটি, মানে ইয়ামাশিরো, বুঝতে চায়নি। থাকার ঘর ঠিক হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একগাদা জামাকাপড় নিয়ে সে জানতে চাইল, টয়লেটের দরজাটা কোনদিকে। এতটা রেল জার্নি করে এত-এত জামাকাপড় কাচবে! ঘণ্টাখানেক পর বেরিয়ে বারান্দায় আমাকে দেখে একটু হাসল। ছোট্ট করে ‘বেশ নোংরা!’ কথাটা এমনভাবে বলল, যেন সুপটা তত গরম নয়।

দিন সাতেক ছিল সে। নির্ভেজাল শুয়ে-বসে। কেননা কলকাতায় দেখার কিছু নেই। শুনে বড্ড গায়ে লেগেছিল। ততদিনে কীভাবে যেন আমি নিজের একটা কলকাতা খুঁজে পেয়ে গেছি। মনে-মনে অপমানিত-আমি ওকে একদিন কফি হাউসে নিয়ে যাই। বন্ধুদের তুমুল আড্ডার গরমেও শীতঘুম ভেঙে তার জাপানি ফণা ওঠার লক্ষণটুকুও দেখা গেল না। হাতে রইল এসপ্ল্যানেড আর পার্ক স্ট্রিট এলাকা। কে সি দাশের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে লম্বাটে ইয়ামাশিরো—এই সেদিন যারা বেঁটে ছিল— এমনভাবে গোটা দক্ষিণটা দেখল, যেন মানিকতলা বাজারে সাজানো আড় ইলিশ চিতল বোয়াল কেঁদো রুইয়ের ওপর হেলায় চোখ বুলিয়ে সঙ্গের চাকরকে কর্তামশাই মুখের পান এ-গাল থেকে ও-গালে ঠেলে বলতে চাইছেন, ‘নাহ, পচন্দ হল নে রে।’

সঙ্গে জাপানি। মেসে সবাই পাত্তা দিচ্ছে। হলে হবে কী, ইয়ামাশিরোর কাছে খাটো হয়ে যাচ্ছি।

সেন্ট পলসের মাঠে এক রাতে দু-জনে আড্ডা দিচ্ছিলাম, অন্ধকারে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে কথা হচ্ছিল নিজেদের পরিবার নিয়ে। তাদের জমি আড়াই হেক্টর। বাবা-মা সকালে গাড়ি নিয়ে খেতে চলে যান। সেখানে একটা কটেজ আছে। যন্ত্রপাতি। সারা দিন খেতের কাজকর্ম করে রাতে ক্লাব হয়ে বাড়ি ফেরেন। আমার পরিবারের জমির পরিমাণ শুনে চোখ বড়ো-বড়ো করে ইয়ামাশিরোর বক্তব্য ছিল— তাহলে এমন একটা মেসে কেন থাক! জমির ফলন শুনে ইতিহাসের ছাত্রটি হেসে বলে, তবে-যে গতবছর ঢাকা ইউনিভার্সিটির একদল ছেলেমেয়ে তোয়ামায় গেয়ে এল— ও মাই গোল্ডেন বেঙ্গল, আই লাভ ইউ!

 

দিন তিনেক ভালোয়-মন্দয় কাটার পর যা হওয়ার, হল। মেসের ভাত-রুটি আর ট্যালটেলে রান্না খেয়ে নাকি কর্পোরেশনের ‘বিশুদ্ধ’ জল থেকে, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী আমাশয়ে সে না-পারে শুতে, না-পারে টয়লেটে যেতে। ঘণ্টা তিনেক যাকে বলে হাতের জল শুকোতে চায় না। তপন ছুটে বৈঠকখানা রোড গেল ডাক্তার করকে ডাকতে। ওদিকে ইয়ামাশিরো কাতরাচ্ছে– সে তো আর বাঁচবে না। সব চেষ্টা জলে যাবে। তার অন্তিম ইচ্ছা— তার চেয়ে তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হোক।

বলতে কী, করিন্থিয়ান থামে-ঘেরা মেডিকেল কলেজের গম্ভীর ছবিটা মুহূর্তের জন্যে চোখে ভেসেও উঠেছিল। এমন সময় ডাক্তার কর। মাথায় টাক-ভর্তি ডজনখানেক ছোটো-বড়ো টিউমার। সেই শিরোদেশে ইয়ামাশিরোর ভীত, বিস্মিত চাউনি। সেসব তোয়াক্কা না-করে শুরু হল চিকিৎসা। অতি সংক্ষিপ্ত। একটা প্রেসক্রিপশন লেখা হল খসখস করে। ডাক্তারবাবু চলে গেলে ইয়ামাশিরো বিস্ময় চেপে রাখতে পারেনি— এ ডাক্তার? মাথায় এতগুলো টিউমার নিয়ে অন্যের চিকিৎসা করছে? তপন বেশ জোরের সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছিল— ওগুলো টিউমার নয়, আঁব!

ততক্ষণে ওষুধ এসে গেছে। এবং তিনদিনের মাথায় জাপানপুঙ্গব পুরো ফিট।

ব্যাপারটা ইয়ামাশিরোর কাছে অবিশ্বাস্য। প্রথমত, অনেককিছুই খারাপ হতে পারে। কিন্তু, পেট! কী করে এমন বিচ্ছিরি রকমের গড়বড় হয়? হয় যদি, এরা হাসপাতালে না-দিয়ে নিজেরাই দেখভাল করে? এবং সে-দেখভাল এমনই যে, ক্লাস কামাই করে?

কলকাতার মেয়াদ শেষ। এবার সে যাবে মাদ্রাজ। দক্ষিণ ভারত ঘুরে তারপর পাকিস্তান। এক মাসের ট্যুর। খরচ সাত হাজার। এই টাকাটা সে সারা বছর কোথাও-না-কোথাও কাজ করে জমায়। জাপান এয়ারলাইনসের স্টুডেন্টস কনসেশন পেয়ে, অর্থাৎ সিঙ্গল ফেয়ার ডবল জার্নির সুযোগে, ইয়ামাশিরো প্রতি বছর বেরোয় ঘুরতে। কলকাতায় এসেছিল মাদ্রাজ মেল ধরবার আগে বিশ্রাম নিতে।  নিশ্চিত ছিল, এখানে তার ঘোরার মতো জায়গা নেই।

মাদ্রাজ মেলে তুলে দিতে গেছি। জানলার ধারে সে বসে। মুখ যতটা সম্ভব বাইরে। কিন্তু দেখার সত্যিই কিছু নেই। সেই একঘেয়ে হাওড়া স্টেশন। ভিড়। নোংরা প্ল্যাটফর্ম। খ্যাক করে কেশে কেউ এক খাবলা কফ ছিটিয়ে গেল। অনবরত ‘চায়, চায়’ হেঁকে যাচ্ছে চা-ওয়ালা। সবই যথাযথ। ট্রেন ছাড়ার আগে ওই তুমুল ছুটোছুটির মধ্যে আচমকা  গ্রুপ থিয়েটারের নাটকের শেষ দৃশ্যের চরিত্র হয়ে উঠলাম আমরা।

তপন দাঁড়িয়ে ছিল সামনে, জানলা ঘেঁষে। ইয়ামাশিরো তার হাতটা চেপে ধরে ভাঙা ইংরেজিতে যা বলছিল, সেগুলো এরকম: অনেক দেশ সে ঘুরেছে। কিন্তু এমন একটা দেশ যে আছে, জানতই না! শুধু আছে না, দেখবারও আছে অনেক কিছু।

–কী আছে দেখবার? কিছুই তো দেখলে না।

ইয়ামাশিরোর চোখের কোণ দুটো চিকচিক করছে না? ওপাড়ায় ঝানু না-হলে আজও সম্ভবত গ্লিসারিন লাগে। সে বলল– তোমরা। তোমাদের দেশের মানুষ।

 

(চলবে)

লেখক কবি ও প্রাবন্ধিক। লিখেছেন একটি উপন্যাস এবং একটি স্মৃতিকথা

আরও পড়ুন :

ব্লগ: হ্যারিসন রোড ২/ ম্যানেজারবাবু

Shares

Comments are closed.