গুঁড়িয়ে দিলেই কি হারিয়ে যায়?

অমিতাভ রায়

উনিশশো পঞ্চাশের দশক। দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে গঠনমূলক কর্মকাণ্ড। গড়ে উঠছে আধুনিক ইস্পাত প্রকল্প, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, নদী-বাঁধ থেকে শুরু করে আইআইটি, আইআইএম ইত্যাদি। ভারত সরকারের অধীনে চলতে থাকা এইসব ক্রিয়াকর্মাদির জন্য প্রয়োজনীয় নকশা প্রণয়ন, নিয়মিত অর্থ যোগানো, নজরদারি প্রভৃতি কাজের জন্য একে একে সৃষ্টি হল বিষয়ভিত্তিক মন্ত্রক। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, পরিবহণ, নগর উন্নয়ন মিলিয়ে অনেক মন্ত্রক এইভাবেই প্রয়োজনের নিরিখে গড়ে উঠেছে। পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অর্থাৎ প্রয়োজনের তাগিদে সংযুক্ত হয়েছে অন্যান্য অনেক মন্ত্রক।

প্রত্যেক মন্ত্রকের দায়িত্ব পালনের জন্য মন্ত্রী রয়েছেন। সঙ্গে রয়েছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী, সচিব, আধিকারিক, নানান স্তরের কর্মীবাহিনী নিয়ে বিশাল ব্যাপার। রাষ্ট্রপতি ভবনের দুই পাশে অবস্থিত নর্থ ব্লক আর সাউথ ব্লকে বসে তো আর সব মন্ত্রকের কাজ চালানো সম্ভব নয়। অর্থ, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়কে আবার নর্থ ব্লক আর সাউথ ব্লকে জায়গা না দিয়ে উপায় নেই। বাদবাকিরা যায় কোথায়?

উত্তর খুঁজে দিল প্ল্যানিং কমিশন। একমাত্র প্ল্যানিং কমিশনের পক্ষেই এই সমস্যার সমাধান করা সহজ ছিল। দেশভাগের অনেক আগেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৮-এ ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দেশনির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে গঠিত হয় ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটি। কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পেলেন জওহরলাল নেহরু। বিভিন্ন বিষয়ের রূপরেখা প্রণয়নের জন্য গঠিত হল অনেকগুলি সাব-কমিটি। প্রতিটি সাব-কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করলেন দেশের বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞবৃন্দ। মেঘনাদ সাহা, এম বিশ্বেসরাইয়া, ক্ষিতিশচন্দ্র নিয়োগী প্রমুখ বিশেষজ্ঞ ১৯৪৬-এ সাজিয়ে ফেললেন দেশনির্মাণের নীলনকশা। কাজেই ১৯৫০-এর ২৬ জানুয়ারি দেশে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরপরই প্ল্যানিং কমিশন গড়ে তুলতে অসুবিধা হয়নি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৫০-এর ১৫ মার্চ জন্ম নিল প্ল্যানিং কমিশন। সংস্থার অধ্যক্ষ হলেন পদাধিকারবলে দেশের প্রধানমন্ত্রী। সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হলেন বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞবৃন্দ। স্বভাবতই অন্যান্য মন্ত্রক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সাজিয়েগুছিয়ে বসার অনেক আগেই নিজের বাড়িতে থিতু হয়ে গেল প্ল্যানিং কমিশন। স্থায়ী ঠিকানা, যোজনা ভবন, সংসদ মার্গ, নতুন দিল্লি। সময়টা ছিল ১৯৫৪।

‘সেন্ট্রাল ভিস্টা’ প্রকল্পের নকশা।

প্ল্যানিং কমিশনের পরামর্শে এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনসাপেক্ষে শুরু হল কয়েকটি সরকারি ভবন নির্মাণের প্রাথমিক কাজ। কেন্দ্রীয় সরকারের নিজস্ব সিপিডব্লিউডি দায়িত্ব পেল। বিভাগীয় প্রধান স্থপতি আর আই গেহলোটের নেতৃত্বে প্রণীত হল কৃষি ভবন এবং উদ্যোগ ভবনের নীলনকশা। রাষ্ট্রপতি ভবনের দু’পাশে নর্থ ব্লক আর সাউথ ব্লক তৈরি হয়েছিল। অনেকটা যেন সেই ভাবনাকে মাথায় রেখে রাজপথের দুই পাশে নির্মিত হল কৃষি ভবন আর উদ্যোগ ভবন। স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে ফুটে উঠেছে ভারতের চিরায়ত ঐতিহ্য। রাষ্ট্রপতি ভবন, নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লকের সঙ্গে এতটাই সাযুজ্য রয়েছে এই দুটি সরকারি ইমারতের যে, বলে না দিলে বোঝার উপায় নেই যে অন্তত তিরিশ বছরের ব্যবধানে গড়ে উঠেছে কৃষি ভবন এবং উদ্যোগ ভবন। ১৯৫৭-য় এই দুটি বাড়ির নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হয়।

আর আই গেহলোটের নেতৃত্বে সিপিডব্লিউডি-র স্থপতি এবং প্ৰযুক্তিবিদরা ১৯৬২-তে গড়ে তুললেন বিজ্ঞান ভবন এবং রেল ভবন। কোনও বহিরাগত বিশেষজ্ঞ ছাড়াই সরকারি স্থপতি এবং প্রযুক্তিবিদরা এমন দৃষ্টিনন্দন ইমারত নির্মাণের দায়িত্ব পালন করলেন যা পারিপার্শ্বিককের পুরনো স্থাপত্য অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি ভবন, নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লক সর্বোপরি সংসদ ভবনের সঙ্গে মানানসই।

এই মহল্লার পরবর্তী সংযোজন নির্মাণ ভবন, শাস্ত্রী ভবন, পরিবহণ ভবন, শ্রম-শক্তি ভবন ইত্যাদি। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষলগ্নে এইসব ঐতিহ্যবাহী ইমারতের মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়ে গেছে। নতুন সংসদ ভবনের শিলান্যাস ও ভূমিপূজা ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন মহলের ধারাবাহিক আপত্তিতে আপাতত কোনও ভাঙাচোরা বা নির্মাণের কাজ এখনই শুরু করা যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কারণ এই সংক্রান্ত একগুচ্ছ মামলা ঝুলছে কোর্টে। তবে সদ্য প্রণীত ‘সেন্ট্রাল ভিস্টা’ নামের প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাস্টারপ্ল্যান তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি সংস্থাটির তরফে জানানো হয়েছে যে, নির্মাণকাজ শুরু হলেই প্রথমে ভাঙা হবে শ্রম-শক্তি ভবন ও পরিবহণ ভবন। সেখানে তৈরি হবে সাংসদদের দপ্তরের জন্য একটি নতুন অট্টালিকা। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, সংসদ চত্বরের সঙ্গে সাংসদদের দপ্তরের অট্টালিকা ভূগর্ভস্থ পথের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। নতুন সংসদ ভবনের লোকসভায় ৮৮৮ জন এবং রাজ্যসভায় ৩৮৪ জনের বসার বন্দোবস্ত থাকবে বলে প্রকল্পের নীলনকশায় আগেই জানানো হয়েছিল।

সংসদ ভবন।

পুরনো বাড়ি ভাঙা শুরু হলেও সরকারের কাজকর্ম মসৃণভাবে চালাতে যাতে কোনও অসুবিধে না হয়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ীভাবে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর জন্য দিল্লির গোল মার্কেট, কস্তুরবা গান্ধি মার্গের পাশাপাশি আফ্রিকা অ্যাভিনিউ এবং তালকাটোরা স্টেডিয়ামের কাছাকাছি চারটি এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাড়ি ভাঙার কাজ হবে।

শ্রম-শক্তি ভবন ও পরিবহণ ভবনের পাশাপাশি শাস্ত্রী ভবন, উদ্যোগ ভবন, নির্মাণ ভবন, কৃষি ভবনের মতো বাড়িগুলিও ভাঙার কথা শোনা যাচ্ছে। নয়া প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের সমস্ত অফিসগুলিকে এক ছাদের নীচে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। তার জায়গা তৈরি করতেও ভাঙতে হবে পুরনো ইমারত।

পুরাতন বর্জন। নতুনকে বরণ। এটাই তো চিরকালের রীতি। সারা বিশ্বে এই পদ্ধতির প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। ঐতিহাসিক এবং ঐতিহ্যবাহী অট্টালিকার সংরক্ষণ সর্বত্র স্বীকৃত সংস্কৃতি। কিন্তু সম্পূর্ণ প্ৰপতন? হয়তো এক এবং একমাত্র ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। তবে গুঁড়িয়ে দিলেই কি সবকিছু হারিয়ে যায়?

(অমিতাভ রায় পরিকল্পনা বিশারদ। প্রাক্তন আধিকারিক, প্ল্যানিং কমিশন, ভারত সরকার।)

চেনা দিল্লির অচেনা কাহিনি জানার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

লা জবাব দেহলি

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More