বাংলার হেঁশেল (ফুলকপির জোড়া রেসিপি)

0

সাবিনা ইয়াসমিন রিঙ্কু

গ্রীষ্মকালের শাকসবজি শীতে খেয়ে মজা নেই। ঋতুর আনাজপাতি সেই নির্দিষ্ট ঋতুকে খেলে তবেই আসল স্বাদটা ঠিকঠাকভাবে পাওয়া যায়। অনেক বছর আগের কথা। তখন সারা বছর ফুলকপি, বাঁধাকপি পাওয়া যেত না। কোনও কোনও কৃষকভাই দুর্গাপুজোয় অষ্টমীর বাজার ধরার জন্য নিয়ম ভেঙে একটু আগে থেকেই ফুলকপির চাষ শুরু করে দিতেন। ভালোভাবে শীত পড়তে শুরু করলে বেলডাঙার বিখ্যাত ফুলকপি স্থানীয় বাজারে আসতে শুরু করত। ভোরে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে চড়ে সেই ঠাসা ফুলকপি কলকাতা রওনা দিত। শেয়ালদার পাইকারি বাজারে সেই কপির বস্তা যখন খোলা হত, তখন কপির গায়ে শিশির না লেগে থাকলেও একসঙ্গে অত ফুলকপি আনার জন্য ফুলকপিগুলো শীতেও ঘেমেনেয়ে যেত।  প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি সকালে বাজারে যে শাকসবজিগুলো দেখতে পান টাটকা, আধা শুকনো, পুরো শুকনো– সবগুলোই কিন্তু আগের দিনের বিকেলে বা সন্ধেয় সংগ্রহ করা। অনেকে সবজি শাকপাতা তুলে উঠোনে বা টালির চালে তুলে রাখেন। সারারাত শিশিরে ভিজে শাকসবজিগুলো তাজা হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে অবশ্য শাকসবজির ওপর বারবার জল ছিটিয়ে তাদেরকে তাজা রাখতে হয়।তো যা বলছিলাম, বেলডাঙার ফুলকপি এতটাই জমাট যে ফুলের কোয়াগুলো আলাদা করা মুশকিল হয়ে পড়ে। আর স্বাদ! তখনকার ফুলকপির একটা আলাদা গন্ধ ছিল, এখন সেই গন্ধটা আর পাইনা। বেলডাঙার কপিতেও পাই না। বারোমেসে গাঁদাফুলের মতো এখন ফুলকপিও সারাবছর পাওয়া যায়। ভাপিয়ে জল ফেলে খেতে হয়। শাহী গরম মশলা ফসলা দিয়ে আকর্ষণীয় করে তুললে তবেই মুখে তোলা যায়।
ফুলকপির পাতার আকার দেখে অনেকেই চিনে নেন এটা ধাপার না সুর্যপুরের। পাতার বিন্যাসে দেশি বা হাইব্রিডও বোঝা যায়। ফ্যাকফেকে সাদা নাকি একটু ঘিয়ে রঙের, কোন কপিটা খেতে বেশি সুস্বাদু খাদ্যরসিকেরা ঠিক বুঝে নেন।
ঋতুর যেকোনও সবজি যখন বাজারে প্রথম আসতে শুরু করে, তখন তারা মহার্ঘ্য। ২০০ গ্রামের বেশি নেওয়া যায় না। এত্ত দাম কেন’র উত্তরে প্রত্যেকবার একই জবাব- বৃষ্টিতে ফসল মার খেয়েছে। শিম ২০ টাকা শ, ফুলকপি ৬০ টাকা পিস। টমেটো ১০০ টাকা কেজি। হিমঘরের মটরশুঁটি ৩০ টাকা শ। চারটে কচি মুলো ১০ টাকা। ৫টাকার ধনেপাতা চাইলে বিক্রেতা বিরক্ত হন।
এত মূল্যের শাকসবজির কিছুই ফেলতে মন চায় না। মূল্যবৃদ্ধি আমাদের ফেলে ছড়িয়ে খাওয়ার অভ্যেসটা অনেকটা কমিয়ে দিতে পেরেছে।৬০ টাকার ফুলকপি এখন আপাতত ৪০ টাকায় নেমেছে। কোথাও বা পঁয়ত্রিশ। কপিকে ঘিরে কচি পাতা। আর পাতার শিরা প্রায় ডাঁটার মতো মোটা। ফুলকপিটা ভাজুন, ঝোল করুন অথবা কোর্মা বানিয়ে খান, পাতার ডাঁটিগুলো যেন ফেলবেন না ! ডাঁটি থেকে পাতাগুলো আলাদা করে নিন। কচি পাতাগুলো কুচিয়ে পালংশাকের ঘন্টতে দিতে পারেন। অথবা ভাপিয়ে জলটা ফেলে বেটে নিয়ে তেলে ফোড়ন ছড়িয়ে একটু নেড়েচেড়ে খেতে পারেন। একটা ফুলকপির ৬০ টাকা দাম! কিচ্ছু না ফেলে মাথা খাটিয়ে কিছু না কিছু অবশ্যই বানিয়ে ফেলুন।

ফুলকপির ডাঁটার চচ্চড়ি
উপকরণ: ভাপিয়ে নেওয়া এক বাটি ফুলকপির ডাঁটা, আলু, বেগুন, মুলো, ফুলকপি, শিম, কুমড়ো- সব সবজি তিন চার টুকরো করে, শুকনো লংকা ২ টো, কাঁচা লংকা ৫টা, পাঁচফোড়ন ১ চা চামচ, নুন পরিমাণ মতো, হলুদগুঁড়ো, চিনি অল্প, সর্ষের তেল।প্রণালী: কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে পাঁচফোড়ন আর শুকনো লংকা ফোড়ন দিন। ফোড়নের সুগন্ধ বের হলে প্রথমে আলুর টুকরোগুলো দিয়ে একটু ভেজে নিন। তারপর মুলো, ফুলকপি, কুমড়ো, শিম, বেগুন সব ভেজে নিন। ফুলকপির ডাঁটাগুলো দিয়ে দিন। নুন, হলুদ দিন। নেড়েচেড়ে একটু জল দিন। চিনি দিন অল্প। অল্প আঁচে ঢেকে দিন। মাখো মাখো হয়ে এলে কাঁচা লংকা আর এক চা চামচ কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিন।

ফুলকপির বড়া
উপকরণ: ফুলকপি ছোটো ছোটো পিস করে কেটে নেওয়া এক বাটি, আদাবাটা আধ চা চামচ, নুন, হলুদ, কাঁচালংকা কুচি ১ টেবিল চামচ, সিকি চামচ সয়া স‍্যস, এক চা চামচ টমেটো স‍্যস, বেসন, চালের গুঁড়ো, সাদা তেল।প্রণালী: বেসন, চালের গুঁড়ো আর তেল ছাড়া একটা কড়াইতে সব উপকরণ দিয়ে ফুলকপি মেখে রাখুন কিছুক্ষণ। তারপর একটু ভাপিয়ে জলটা শুকিয়ে নিন। এবারে, একটা বড় বাটিতে বেসন ১ কাপ আর চালের গুঁড়ো আধ কাপ নিয়ে থকথকে করে গুলুন। গোলায় নুন, হলুদ গুঁড়ো এবং একটু লঙ্কার গুঁড়ো দিন। ইচ্ছে হলে কালো জিরে আর এক চুটকি খাওয়ার সোডাও দিতে পারেন। সেদ্ধ লংকাগুলো ফুলকপি থেকে তুলে গোলায় দিয়ে দিন। সেদ্ধ কাঁচা লংকার একটা আলাদা টেস্ট আছে। এবার ফুলকপির টুকরোগুলো বেসন ও চালের গুঁড়োর গোলায় চুবিয়ে গরম তেলে সোনালি করে ভেজে নিন।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

বাংলার হেঁশেল- চুনো মাছের দুই পদ

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.