যে গান, আলোর, তবু শোনা যায় রাতে

বেবী সাউ

 যে গান রাতের।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

সিগনেট

প্রচ্ছদ ঃ দেবাশিস সাহা

মূল্য- ১০০টাকা

“বলেছিলাম আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই  

বলেছিলাম গ্রহণ করো আমায় 

তুমি ছুড়ে দিলে একমুঠো আগুন 

জল থেকে উঠে এলে শান্তিপ্রস্তাবের মতো 

বলেছিলাম ভেসে যেতে দাও 

তুমি জন্ম দিলে আবার” ( ভাষা)

একটা আশ্চর্য দুনিয়া। ধরে নেওয়া যাক, নিজস্ব আবেগে সে স্তব্ধ হয়ে আছে। বিরাট নৈঃশব্দ। অথচ,  তার মনের ভেতর চলছে অজস্র অনুরণন। প্রতিধ্বনি। হাঁটছে সে একা একা। কথা বলছে একা একা। নিঃশব্দে। এতটাই শব্দহীন যাতে ভেসে উঠছে, বিরাট একটা পৃথিবী। দৃশ্যের জগত। একলা আধিপত্য জমিয়ে ওঠা, এই নৈঃশব্দের রাজত্বে তৈরি হচ্ছে এক ‘স্ব-শব্দ’ অবয়ব। হ্যাঁ, স্ব-শব্দ। বাইরের শব্দ সেখানে ক্ষীণ। বারবার ঠোক্কর খেয়ে পড়ছে। আর ছোট্ট শিশুর মত তৈরি করা এই স্ব- শব্দের রাজত্বে কবি হিন্দোল ভট্টাচার্য রাজ্যশাসন করছেন। তাঁর নিজস্ব আবেগ, ক্ষত, দুঃখ, অভিমান, রাজনৈতিক চেতনা, মূল্যবোধ-  সব নিয়ে তৈরি এক রাজত্ব। বুকে ভরে আছেন “যে গান রাতের” কবিতার বইটি। একাকী, হেঁটে যাচ্ছেন নিঃশব্দ, অন্ধকার শহরের দিকে। ভীড় নেই অথচ ভীড়ের দাগ থেকে গেছে। কথা নেই অথচ শব্দের অনুরণন এখনও ভাসছে বাতাসে। বিরাট অন্ধকারে একটা গাড়ি চলে যাওয়ার পরে আলোর রেশ যেমন থেকে যায় কিছুক্ষণ, ঠিক সেভাবেই রাজপথে মিশে আছে আলোর রেখা। আর কবি বিছিয়েছেন তাঁর আপনার মানচিত্র। হাঁটছেন। দৃঢ় ভঙ্গিতে; কখনও হতাশা ছুঁয়ে যাচ্ছে। খোঁজ? উঁহু! উপভোগ করছেন। দেখছেন। কখনও শিউরে উঠছেন ভয়ে,  শঙ্কায়। কখনও ভালোলাগার আবেশে আবিষ্কার করছেন নতুন জন্মের কৌশল। এই অসমতল শহরের সত্যকে বোঝার চেষ্টায় শুধু চোখ পেতে আছেন। দেখছেন। কীভাবে প্রতিটি সরণ ফিরে ফিরে কেন্দ্রে এসে মেশে! কীভাবে দিনকে দিন পাল্টে যাচ্ছে প্রতিদিনকার শহর! জন্ম থেকে মৃত্যুর অনুভূতি; কখনও বা মৃত্যুকে ভেঙে গড়ে উঠছে নতুন জন্মান্তরবোধ।

#ধর্ম#

মাটি ও ধুলোর দিকে চেয়ে থাকি, মনে পড়ে আমি

একমুঠো ধুলোর চেয়ে বেশি কিছু নই

আমার পায়ের নীচে আমি

আমার শরীর ঘিরে আমি

এ জগৎ আমি, যাকে তুমি ভাবছ শান্ত পঞ্চভূত

তুমিও আমার রূপ, আমিও তোমার

 

আমাদের মৃত্যু নেই, জরা নেই, জন্ম নেই

আমরাই অনন্তকাল, মুহূর্ত আমরাই, চিরকাল।

 

পাঠকও হাঁটে কবির সঙ্গে। কবিতার সঙ্গে। একে ধরে ফেলে অন্ধকারের নিগূঢ় তত্ত্ব। “যে গান রাতের” কাব্যগ্রন্থটির সঙ্গে তাই পাঠক চারপাশের দৃশ্যকে মেলাতে কষ্ট হয়না একটু। সহজেই বেঁধে ফেলে কবির সঙ্গে নিজেকে। কাব্যগ্রন্থটি পাঠের সময় তাই কখনও গাঢ় হয় মৃত্যুচেতনা। আবার কখনও মনে হয়েছে কবিতাগুলি রাজনৈতিক কবিতা। আবার কাব্যগ্রন্থটির শেষ অংশে পৌঁছে মনে হয়, আশাবাদী কবিতা। বিষন্নতা ভরে আছে প্রতিটি কবিতার লাইনে। এই বিষন্নতা নাগরিক জীবনের বিষাদ। কষ্ট। হাহাকার। কিন্তু প্রতিকার হিসেবে কখনও পালিয়ে যাওয়া স্পষ্ট নয়। বরং সবটুকু বিষন্নতা হেঁটে যাচ্ছে আলোর উৎসমুখে। যেন মন মেনে নিতে পেরেছে; বাস্তবে তো এসব থাকবেই! তা বলে, থেমে যেতে হবে! কখনোই না। কবিতা গুলি পাঠের সময়; ওই বিষন্নতার খোঁজ উৎসাহী মন মাত্রেই পেতে চায়। তখন মনে হয়,   কবির ব্যক্তিগত অভিঘাত কী এখানে প্রতিফলিত হয়েছে? নাকি এই উত্তাল সামাজিক প্রেক্ষাপট দায়ী? নাকি অন্যকিছু…

 

” #অসময়#

 

ছুরি ও হত্যার মধ্যে যতটা দূরত্ব, আমি ততটাই বেঁচে থাকতে জানি

ঠোঁট ও চুম্বন জানে না কীভাবে নিজেদের ধ্বংস করতে হয়

তারা ভোগ করে, আর আস্তে আস্তে দূরে সরে যায়

হত্যা ও নিহতের মধ্যে এ দূরত্ব থাকে না, তারা একে অপরের হত্যাকারী

যেমন ঘড়ির মধ্যে সময় রুদ্ধশ্বাস নিজেকে প্রস্তুত করে, একা। ”

 

হাঁটতে হবে ভেবেই যদি পথকে পরিমাপ করা যায়, তবে পথের বিশালত্ব বাড়বেই। কোনও অধিকার ছাড়াই, পেয়ে বসে অসন্তোষ। অভিযোগ। চারপাশের দৃশ্য হারায়। আভিজাত্যও হারায়। দুপাশ অন্ধকার; পথটাই একমাত্র সত্য। বৈরাগ্য আসে।অ-স্পৃহা উৎপন্ন হয়। কিন্তু থেমে থাকা চলে না। জীবনের ধর্ম হয়ত এটাই। মরণের ভয় আছে। কিন্তু বাঁচার নেশাও প্রবল। তাইতো, প্রবাদ বাক্যে দেখা যায় ‘মরেও বাঁচি’। আর কবি বলেন—

 

“# আগামী# 

 

সে আমাকে ডেকে তোলে। বলে, এসো, নদী সব শুকিয়ে গিয়েছে।

শহুরে বিছানা থেকে উঠে যাই, দেখি সব গাছগুলি মৃত

শোক সভা বসিয়েছে তীব্র দাবদাহ আর অট্টালিকাগুলো।

আকাশ চাঁদোয়ার মতো ঝুলে আছে মনে হয়- কী ধূসর নীল-

আমি ভয়ে ভয়ে হাত বাড়াই, দেখি সব মানুষের হাতে

গাছ পোড়ানোর গন্ধ, মাটি শুকানোর হিংসা, নদীহননের অহংকার।

ফিরে যেতে চাই। বলি, ঘুম পাঠাও,  কোথায় ওষুধ?

গাছের কোটর যেন মায়ের জরায়ু, আমি শুয়ে পড়ি একা

একটি সামান্য বীজ হয়ে আমি ও পৃথিবী বাঁচাব তোমায়

জন্মান্তর হোক তবু মনে যেন না থাকে আমার

আমিই তোমার হত্যাকারী এই জন্মে আমি মানবসভ্যতা ”

 

আবার উল্টোটাও হয়। পথ অতিক্রমের চাহিদাটাই লক্ষ্য বিন্দুটাকে  তৈরি করে দিতে পারে। জাগিয়ে তোলে অতিক্রমের স্পৃহা। থেমে থাকা তখন বিলাসিতা মনে হয়। মনে হয়, এই সমস্ত এঁকে রাখা লক্ষ্মণরেখাটাই একটা মিথ। বাদবাকি সঅঅঅব সত্য। আর তখনই ‘চোখে চোখে জানলা খোলে/ ঘর ওঠে,ঘর ভেঙে যায়'(স্পর্শ)। কবিও এখানে ওই দ্বিতীয় পথের লক্ষ্যে হাঁটছেন। এগোতে এগোতে কুড়িয়ে নিচ্ছেন পথের ধুলো, মাটি। আর অপার আনন্দে তাঁর এই হাঁটাপথটুকু ভরে থাকছে। ফুটে উঠছে তাঁর কবিতা; চলন।

 

” #লাস্য#

 

শতাব্দী পুরনো ট্রেন ছুটে যায় গাঢ় অন্ধকারে

কী পিচ্ছিল সুড়ঙ্গ সে, কী আদিম তার সহচর

শুনি ধস নামল আজ পাহাড়ে পাহাড়ে

…. ..

…….

 

এদিকে ঝরনার জলে মুখ ধুয়ে নিচ্ছে উপত্যকা।

পাহাড়ি কুয়াশা আজ নীচে একমাঠ বৃষ্টি হল।”

 

আশ্চর্য এই কবিতার অভিমুখ। আশ্চর্য বুনন। অজস্র অন্ধকার ছুঁয়ে আছে এই পৃথিবীকে। ঝরঝরে বৃদ্ধ আজ এই পৃথিবী; শরীর। ভেঙে পড়ার শব্দ; অথচ বিরাট একটি জন্মের আশাকে ডেকে আনছে। তৈরি হচ্ছে বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ। চাষের উপযুক্ত জমি। জাগিয়ে তোলা হচ্ছে ঘুমন্ত প্রকৃতিকে। একে একে আড়মোড়া ভাঙছে, পাহাড়ের নিদ্রিত চূড়া; ঝরনার জলে মুখ ধুচ্ছে বাসি মুখ। আর নতুন উদ্যমে জেগে উঠছে রোপণকার্য। জন্ম খিলখিলিয়ে হাসছে।

শুধু মাঝখানের সময়টাই নিস্তব্ধের; একাকীত্বের।

 

এইযে শহর মেতে থাকছে চুমুর দৃশ্যে। সমস্ত গোঁড়ামি ভেঙে বেরোতে চাইছে প্রেম; শব্দ। আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে লুটিয়ে আছে রেপ হয়ে যাওয়া মেয়েটির ছিন্নভিন্ন দেহ। রাজস্থান যুদ্ধ করছে খরার সঙ্গে; অন্যদিকে ঐশ্বর্য রাই কীভাবে সামলাচ্ছেন শাশুড়ির কূটনীতি- – এসব আলোচ্য বিষয়। আসলে, মুখ্য কথা হল একটা সময়ের মধ্যে অনেক কটা বিচ্ছুরণ। পঞ্চায়েত ভোটের ধাক্কা কতটা হতে পারে ভেবে ভেবে, মুঠো মুঠো অ্যালপ্রাজোলাম বিক্রি হচ্ছে। আর এই ছুঁয়ে থাকাটা ঘিরে প্রকাশ পাচ্ছে বিরাট একটা সময়। কবি হাঁটছেন সেই সময়ের মধ্য দিয়ে। নাগরিক আদব-কায়দায় তাই তিনি কখনও শ্রান্ত। কখনও বিধ্বস্ত। এইসব কার্যকারণের সম্পর্ক কেমন একটা ধারাবাহিকতাকে পাল্টে দিতে পারে! দেখা যাক—

 

” তুমি আস্তে আস্তে সুন্দর হয়ে উঠছ, যারা চিনতে পারছে না, ডাকো তাদের।

পৃথিবী পরিষ্কার হোক, গাছ হোক সব মন, তারপর উৎসব হবে।” (সংক্রান্তি)

 

এখানে কবি আলোর আগমন সম্পর্কে আশাবাদী। অন্ধকারের রাজত্ব ভেঙে জেগে উঠবে আলোর কারুকাজ। সংক্রান্তি অর্থাৎ অন্তিমকাল এখানে অন্ধকারের। অন্ধকার পৃথিবীর।  আস্তে আস্তে সেই ধোঁয়া মাখা বিচ্ছিন্নতা সরে যাচ্ছে। আলো আসছে। আর সেও সুন্দর হয়ে উঠছে। এই সৌন্দর্যের প্রকাশ যারা অনুভব করতে পারছে না, ধরছে পারছে না এই পরিবর্তন সেখানেও তৈরি হচ্ছে সুন্দরের আকার। শুধু দেখার জন্য চাই একটি স্বচ্ছ চোখের। আর এই সৌন্দর্যকে অনুভব করে জেগে উঠবে পৃথিবী– আনন্দগানে।

 

কিন্তু পরমুহূর্তে যেন কবিও নিজেকে হারিয়ে ফেলেন গহন অন্ধকারে। পথভ্রষ্ট। আশাভ্রষ্ট। ঠিক ঠাহর করতে পারেন না রাস্তা। হাঁটছেন। এই মধ্যরাতের শহরে ঝলসে উঠছে মৃতদেহের শব্দ। শেয়ালের চিৎকার। নির্বাসিত হায়নারা ফিরে এসেছে শহরে। চারপাশে মৃত্যুর উল্লাস। আর ভীত সন্ত্রস্ত কবি, তখনই হারিয়ে ফেলেন মানচিত্র। পথের ঠিকানা। মধ্যরাতের এই জার্নি অনিশ্চয়তায় ভোগে। কবি দেখেন দেশ ছাড়িয়ে, সীমারেখা ভেঙে, মূল্যবোধ বিক্রি হচ্ছে তথাকথিত আলো ভর্তি দেশগুলিতে। এই তৃতীয় বিশ্বে তবে অনুসরণ করা কাকে? কাকে দেখে শেখা? আমরা কি বারবার শুধু মৃত্যুকেই আহ্বান করবো?—-

লন্ডন, জুন, 2017 

পাশে বুলেটের দাগ, রক্তছোপ,  আর ছেঁড়া রাতের গিটার

… …. ….

পড়ে আছে স্তব্ধ দেহ কোনও শীতল আবাসে

… ….. ….

একাকী নেকড়েরা জানে মৃত্যুই তাদের ধর্ম, মোক্ষ, পরিবার।

এই মৃত্যু ধর্মহীন, এই মৃত্যু চির অন্ধকার।”

আর যখন এই পৃথিবী ভরে ওঠে ধ্বংসের স্তুপে। কালো কালো অন্ধকার হাত ছেয়ে আসে গলা টিপে ধরবে বলে— মানুষ খানিক চমকে যায় ঠিকই। কিন্তু পরমুহূর্তে খুঁজে নেয় একটি প্রকৃত আশ্রয়। নিশ্চিন্ত হয়ে, ভরসা করতে পারে এমন এক আশ্রয়। আদ্যন্ত নাগরিক কবি হিন্দোল ভট্টাচার্য নাগরিক সমাজের অন্ধকার দিকটিতে ভীত-সন্ত্রস্ত। দেখছেন, সামনে সেই অন্ধকারময় মৃত্যুর সংকেত। ফেরার পথ খুঁজে পেতে তিনি মরীয়া। তখনই যেন তাঁর মনে পড়ে, মায়ের কথা। আশ্রয়ের কথা। হাজারো মৃত্যুর হাত থেকে সেই মানবীর তাঁকে একমাত্র অভয় দিতে পারেন। একমুঠো আলো দিতে পারেন এই অন্ধকারময় ভ্রমণ পথে। শুধু কবি নন, ‘মা’ কবিতাটিকে পাঠকও যেন সেই চিরস্নিগ্ধময়ী মাতৃরূপের সন্ধান পায়। আশ্রয়ের নামে দু’দণ্ড বসে। কথা বলে। আশার আলো প্রাণে সঞ্চার করে ফেরে।

“#মা #

যে-কোনও ভাসান দেখলে মনে হয় আমিই সে স্রোত

যা তোমায় মোহনায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।

তুমি তো পৃথিবী আর আমি তো জলের ধর্ম জানি;

যে-কোনও আগুন মিশে যায় এই জলে

হাজার বছরের নাভি ভেসে যায় দিকচক্রবালে।

আমিই ভাসাই আর আমিই তোমার সামনে হাত পেতে বলি— জন্ম দাও।

তুমি শুধু চুপ করে থাকো আর দুঃখ পেতে জানো।

প্রথম মায়ের মতো তুমি জানো মিথ্যে সবকিছু,

সত্যি শুধু ইচ্ছেটুকু, আর তাই মায়াবী শরীর

বয়স মানে না আর, আগুনের মধ্যে ছুটে যায়।

সন্তানের মুখ চেয়ে তুমি জ্বলে ওঠো যেন এভাবেই পুড়ে পুড়ে

আলো হয়ে থাকবে চিরদিন।

আলো যত ক্ষুদ্র হোক, তবুও সে আলো।

অনেক হয়েছে দেখা, এবার নতুন করে জন্ম দাও, আবার কোথাও,

তোমাকে ভাসিয়ে দিলে মন ভেসে যায়।

আমাকে আশ্রয় দাও, হে ঈশ্বরী, আমার পূজায়। ”

একটা গল্প সারা বইটিতে ফুটে উঠেছে। একজন মানুষ যেন মধ্যরাতে বেরিয়েছেন ঘর থেকে; অভিমানী। আর তখনই এই নগরীর প্রকৃত রূপ তিনি অনুধাবন করেন। উলঙ্গ শহরের মুখোমুখি হন। আর হতাশায় ভেঙে পড়েন। বিষাদ এসে পড়ে। কারণ, “এসো না এখন, সব গল্প শেষ হয়ে গেছে প্রায় / জলে মিশছে জলের পোকারা”। ছোট ছিল তাঁর গল্প। সামান্য সংসার। ঘরদোর। রোজকার বাজারের ফর্দ এইসব নিয়ে ছিল তাঁর জীবনের গান। কিন্তু আজ তাকে বেরোতে হয়েছে পথে। রাস্তায়। অনিশ্চয়তার দিকে। আর যেহেতু” গল্প গুলি ছোট, তাই শুরু নেই, শেষ নেই কোনও”, তিনিও শহরের নিঃশব্দ রাস্তা থেকে কুড়িয়ে তুলছেন, ধুলো, মাটি, রক্ত, জন্ম। কেননা, দিনের আলোয় শহর বড় অস্পষ্ট। অচেনা। মুখোশধারী। আবার রাতের অন্ধকারে ততটাই নিঃসঙ্গ। বিষন্ন একটা মানুষ ফুরানোর গল্প নিয়ে অন্ধকার পথে হাঁটে। নিজেকে নিজের সম্মুখে বসায়। একটা একটা ” মানুষের মুখের  দিকে তাকিয়ে/ আমরা ডেকে উঠছি–মানুষ কোথায়?/ … আর ভেঙে পড়ছি কান্নায়/ সে এক শুকনো কান্না, চোখ দিয়ে জল পড়ে না। মানুষ হো হো করে হাসছে/ আর পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে শয়তান”। কিন্তু এই বিষাদ, আশাভঙ্গ পথিক কবিকে ফুরানোর গল্প দেয়নি। পথে পেরোতে গেলে যেরকম মানুষ বিভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতির স্বীকার হয়; “যে গান রাতের” কাব্যগ্রন্থটির কবিতাগুলিও তাই।  বাঁকা, পিচ্ছিল পথ এসে থামে ” যেন আমি ভোরবেলা উঠে দেখি/ প্রথম ট্রামের মতো কেউ এল তোমার সংসারে।” আলোর সোপানে। যে কথা কবি বলতে চেয়েছিলেন তাঁর মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি এবং প্রথম কাব্যগ্রন্থ তুমি, অরক্ষিত-এর কবিতাগুলিতে, সেই কথার এক ভিন্ন বহুমাত্রিক প্রকাশ আমরা দেখতে পাই  সিগনেট থেকে প্রকাশিত ‘যে গান রাতের’ কাব্যগ্রন্থটিতে। বুঝতে পারি, তিনি এক ধারাবাহিক জার্নিতে পথ হাঁটছেন। ভোরের স্নিগ্ধতা এসে ভরিয়ে দেয় পথিককে; কবিকে; পাঠককে। কবি আজ এই পথের দোসর। তাই তার বুক থেকে একটা একটা করে তুলে ফেলছেন মন্দ লাগা, ভালোলাগার জার্নি টুকুকে। এখানেই “যে গান রাতের” হয়ে উঠেছে ভোরের দিকে যাত্রার গান…অন্ধকার ভেঙে আলোর অবগাহন…

(বেবী সাউ মূলত কবি। তাঁর সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘গান লেখে লালনদুহিতা’।)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More