ভোট লুঠ কি রোখা গেল? তৃণমূলের খাস তালুকেই ভোট পড়ল বেশ কম

শঙ্খদীপ দাস

মঙ্গলবার হাওড়া, হুগলি ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মূলত গ্রাম ও মফস্বল এলাকাগুলিতে ভোট ছিল। এবং সেই ভোটে এ বার বেনজির দৃশ্য দেখা গেল! কী সেই দৃশ্য? দেখা গেল, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় অন্যতম দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা শওকত মোল্লা সাত সকালেই অভিযোগ-অসন্তোষের কথা জানাচ্ছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ নেতা বলে পরিচিত শওকতের অভিযোগ, ক্যানিং পূর্ব আসনে আব্বাস সিদ্দিকির লোকেরা তাঁর অনুগামীদের মারছে, বুথে এজেন্ট বসতে দিচ্ছে না।

টাইম মেশিনে চড়ে পিছনের দিকে গেলে হয়তো দেখা যেতে পারে ২০১৬ সালে ক্যানিং পূর্ব আসনে ভোটের দিনের ছবিটা। শওকতের বিরুদ্ধে সেবার বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী ছিলেন কংগ্রেসের ইব্রাহিম মোল্লা। ভোটের দিন ইব্রাহিম ও তাঁর অনুগামীরা বার বার অভিযোগ করেছিলেন শওকতের বিরুদ্ধে। বলেছিলেন, ভোটে সন্ত্রাস চালিয়েছেন শওকত। বুথ জ্যাম, ভোট লুঠ, ছাপ্পা কিছুই বাদ দেননি। এ বার সেই শওকতই আক্রান্ত। বেনজির নয়?
ব্যাপারটা এই ক্ষুদ্র ছবিতে দেখলে হয়তো কোথাও ভুল হবে। ২০১৬ সালে ক্যানিং পূর্ব আসনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। সেই ভোটের প্রায় ৬০ শতাংশই পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জিতেছিলেন শওকত। এ বার সঠিক ভাবে ক্যানিং পূর্ব আসনের ভোট শতাংশ কমিশন মঙ্গলবার জানায়নি। তবে দক্ষিণ ২৪ পরগনার যে ১৬টি আসনে ভোট হয়েছে, তাতে গড় ভোট পড়েছে ৭৭.৬৮ শতাংশ। শেষ পর্যন্ত হিসাব করে তা আরেকটু বাড়বে। অর্থাৎ ৭৯ শতাংশ হতে পারে।

তাৎপর্যপূর্ণ হল, এই সব আসনে ২০১৬ সালের ভোটে সব জায়গাতেই ৮০ শতাংশের অনেক বেশি ভোট পড়েছিল। এই দফায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্ব, ক্যানিং পশ্চিম, বাসন্তী, কুলতলি, কুলপি, মন্দিরবাজার, রায়দিঘি, জয়নগর, বারুইপুর পূর্ব, বারুইপুর পশ্চিম, মগরাহাট পূর্ব, মগরাহাট পশ্চিম, ফলতা, ডায়মন্ড হারবার, সাতগাছিয়া ও বিষ্ণপুরে ভোট হয়েছে।

ষোল সালের ভোটে বারুইপুর পূর্ব, বারুইপুর পশ্চিম, ক্যানিং পশ্চিম, মগরাহাট পশ্চিম, মন্দিরবাজার, কুলতলি, সাতগাছিয়া আসনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৮৬ শতাংশ, মন্দিরবাজার, কুলপি, মগরাহাট পূর্বে ভোট পড়েছিল ৮৭ শতাংশ, ডায়মন্ড হারবার, রায়দিঘি, ফলতায় ভোট পড়েছিল ৮৯ শতাংশ, জয়নগরে ৮৫ শতাংশ, বিষ্ণুপুরে ৮২ শতাংশ, বাসন্তীতে ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ গড়ে এই আসনগুলিতে ৮৬ শতাংশ ভোট পড়েছিল। যার অর্থ এ বার প্রতিটি আসনে গড়ে ৭ শতাংশের মতো ভোট কমেছে। মানে হিসাব মতো প্রতিটি আসনে পনেরো থেকে আঠারো হাজার ভোট কম পড়েছে।

প্রশ্ন হল, ভোট শতাংশ কমল কেন? আপাত ভাবে মনে হতে পারে, ভোটাররা কম সংখ্যায় ভোট দিতে গিয়েছেন বলেই ভোট শতাংশ কম হয়েছে। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের অনেকের মত ভিন্ন। তাঁদের মতে, বিপুল সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকার কারণে একে তো অবাধ ভোট লুঠ ও ছাপ্পা হয়নি। দুই, এ বারের ভোটে দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় বিজেপি এবং সংযুক্ত মোর্চার সমর্থকরা রুখে দাঁড়িয়েছেন। এক তরফা ছবি কোথাও ছিল না। গত বিধানসভা ভোটে এই সব জায়গায় অধিকাংশ বুথে এজেন্ট দিতে পারেননি বিরোধীরা। এ বার প্রায় প্রতি বুথে কোনও না কোনও বিরোধী দলের এজেন্ট ছিলেন। তা ছাড়া দেখা গিয়েছে, ক্যানিং পূর্ব, আরামবাগের মতো তৃণমূলের দুর্গে তৃণমূলই অভিযোগ করেছে বিজেপি, সংযুক্ত মোর্চার বিরুদ্ধে। আবার উলুবেড়িয়াতে পাপিয়া অধিকারীকে হেনস্থা করার কারণও বোধগম্য।

শুধু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা কেন, আরামবাগ, উলুবেড়িয়া সহ হাওড়া, হুগলির আসনেও আগের দু’দফার তুলনায় ভোট শতাংশ ছিল কম। এ দিন বিকেল ৫ টা পর্যন্ত হাওড়া ও হুগলিতে গড়ে ভোট পড়েছে ৭৭.৯৩ এবং ৭৯.৩৬ শতাংশ।

বাংলার নির্বাচনে অতীতে বামেদের বিরুদ্ধে তৃণমূল অভিযোগ করে বলত, লুঠের ভোটই ওদের মূল ভিত্তি। অবাধ, লুঠ, সন্ত্রাস, ছাপ্পা, বুথ দখল রুখে দিতে পারলে বামেদের পরাজয় নিশ্চিত। এগারো সালের ভোটে দেখা গিয়েছিল নির্বাচন কমিশন ছিল অতিশয় সক্রিয়। তৃণমূলও কম বেশি প্রায় সব জায়গায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিল। পরে ষোলো সালের ভোটে দেখা যায়, সেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে ছাপ্পা ও ভোট লুঠের অভিযোগ উঠছে। তার পরেও বহু আসনে খুবই কম ব্যবধানে জিতেছিল তৃণমূল। বিরোধীদের দাবি, এ বার সেই লুঠ ও ছাপ্পা রুখে দিতে পারলে খেলা বন্ধ হয়ে যাবে।

তবে কি এ বার ভোটে লুঠ ও ছাপ্পা কম হল? সেই কারণেই ভোট শতাংশ কমে গেল অনেকটা। ষোল ও একুশের মধ্যে এই ভোট শতাংশের ফারাক কোনও ভাবে খাটো করে দেখা ঠিক নয় বলেই মত বহু বিশ্লেষকের। প্রকৃতই সেখানে কী হয়েছে, তা জানা যাবে ২ মে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More