চিলের মত অতর্কিতে আক্রমণ চালাতেন এই ‘কোচ’ মহাবীর, নাম তাই ‘চিলা রাই’

ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের অনেক আগেই, গেরিলা যুদ্ধকে শত্রু নিধনের কাজে সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন এই কোচ রাজকুমার।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

বর্তমান অসমের ধুবড়ি থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার উত্তরে ছিল চিকনবাড়ি এলাকা। এই এলাকাটিকে ঘিরে ছিল সঙ্কোশ ও চম্পাবতী নদী। পঞ্চদশ শতাব্দীতে সেখানে বাস করত বারোটি প্রভাবশালী কোচ ও মেচ পরিবার। সেই বারোটি পরিবারের একটি পরিবারের প্রধান ছিলেন হরিয়া মেচ। তিনি ছিলেন মেচ উপজাতির অবিসংবাদী নেতা। তাঁর স্ত্রী ছিলেন হিরা। তিনি ছিলেন কোচ উপজাতির প্রধান ‘হাজো’-এর কন্যা। এঁদের পুত্র ছিলেন বিশ্ব সিংহ। তিনি ছিলেন এক দুঃসাহসী বীর।

পূর্ব ভারতের এই এলাকাটিতে বসবাস করা শান্তিপ্রিয় উপজাতি মানুষদের ওপর, শত শত বছর ধরে চলে আসছিল ভূস্বামীদের শোষণ। সবুজ পাহাড় ও ঘন অরণ্যের অন্ধকারে ধুঁকতে থাকা উপজাতি গ্রামগুলিতে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল বিদ্রোহের আগুন। ভূস্বামীদের শোষণ সহ্যের শেষ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর, উপজাতিদের ক্ষোভের আগুনকে দাবানলের পরিণত করলেন বিশ্ব সিংহ। কোচ, মেচ ও গারো উপজাতিদের একত্রিত করে ডাক দিয়েছিলেন এক মহাবিদ্রোহের। বিভিন্ন উপজাতির সেরা সেরা যোদ্ধাদের নিয়ে বিশ্ব সিংহ গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব সেনাবাহিনী।

প্রতীকী চিত্র

১৫০৯ সালে, সেই উপজাতীয় সেনাবাহিনী নিয়ে এলাকার বেশিরভাগ ভূস্বামীকে একের পর এক যুদ্ধে পরাস্ত করতে শুরু করেছিলেন বিশ্ব সিংহ। কয়েক বছরের মধ্যেই বরানদী ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী স্থানে গড়ে তুলেছিলেন স্বাধীন ‘কোচ’ রাজ্য। ১৫১৫ সালে সেই রাজ্যের রাজা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন বিশ্ব সিংহ। রাজ্যের রাজধানী নিজের এলাকা চিকানা থেকে সরিয়ে, নিয়ে গিয়েছিলেন কামতাপুরে।

‘কোচ’ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা বিশ্ব সিংহের স্ত্রী ছিলেন গৌড়ের কন্যা পদ্মাবতী। তাঁদের ছিল তিন পুত্র। প্রথম পুত্র মল্লদেব, দ্বিতীয় পুত্র শুক্লধ্বজ ও তৃতীয় পুত্রের নাম ছিল গোঁহাই কমল। ১৫১০ সালের মাঘী পূর্ণিমার রাতে জন্ম নিয়েছিলেন মেজ রাজকুমার শুক্লধ্বজ। চাঁদনি রাতে ভুমিষ্ঠ হওয়ায়, সদ্যজাত সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল শুক্লধ্বজ।

ছোটবেলা থেকেই রাজকুমার শুক্লধ্বজ ছিলেন বাবা বিশ্ব সিংহের মতই দুঃসাহসী। অন্যদিকে তাঁর দাদা মল্লদেব ও ভাই গোঁহাই কমল ছিলেন ধীরস্থির ও বিচক্ষণ। তিন রাজকুমারের প্রতিভার অভিমুখ অনুযায়ী তাঁদের গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রাজা বিশ্ব সিংহ। শাস্ত্রশিক্ষার পাশাপাশি রাজকুমারদের শিখতে হত অস্ত্রচালনাও। শাস্ত্রশিক্ষা থেকে অস্ত্রশিক্ষা, সবেতেই বাকি রাজকুমারদের থেকে এগিয়ে ছিলেন শুক্লধ্বজ। বালক শুক্লধ্বজের তীর নিক্ষেপ, অসিচালনা ও অশ্বারোহণের নৈপুণ্য দেখে অবাক হয়ে যেতেন তাঁর প্রশিক্ষকেরাও।

ষোড়শ শতাব্দীর তৃতীয় দশক থেকেই রাজ্য শাসন থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবছিলেন বিশ্ব সিংহ। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, রাজ্যশাসনের উপযুক্ত হলেই প্রথম পুত্র মল্লদেবের হাতে তুলে দেবেন কোচ রাজ্যের ভার। এবং মধ্যম পুত্র শুক্লধ্বজের হাতে তুলে দেবেন কোচ রাজ্যের সুরক্ষার দায়িত্ব। কারণ দেবাদিদেব মহাদেব ও দেবী দুর্গার পুজারী মহারাজা বিশ্ব সিংহকে ডাক দিয়েছিল তাঁর আধ্মাত্মিক চেতনা।

প্রতীকী চিত্র

সনাতন ধর্মের গভীরে ডুবে যেতে চাইছিলেন তিনি। অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল যার প্রস্তুতি পর্ব। কনৌজ ও মিথিলা থেকে প্রচুর শাস্ত্রী ও পুরোহিতকে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর রাজ্যে। বসত ও কৃষিজমিও দান করেছিলেন তাঁদের। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ করেছিলেন অসংখ্য মন্দির।

সনাতন ধর্মের অন্যতম পবিত্রভূমি বারানসীর সঙ্গেও গভীর যোগাযোগ ছিল মহারাজের। তাই তিনি মল্লদেব ও শুকধ্বজকে উচ্চতর শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন বারানসীতে। সেখানে সাধক বিষ্ণুপুরীর শিষ্য ব্রহ্মানন্দ স্বামীর গুরুকুলে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন দুই রাজকুমার। সংস্কৃত, সাহিত্য, জ্যোতির্বিদ্যা ও আইন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষালাভ করে, দুই ভাই ফিরে এসেছিলেন কোচ রাজ্যে।

বারানসী

আগেই নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মহারাজা বিশ্ব সিংহ প্রথম পুত্র মল্লদেবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন কোচ রাজ্যের শাসনভার। বেছে নিয়েছিলেন আধ্মাত্মিক জীবন। তবে তাঁর জীবনে একটিই দুঃখ রয়ে গিয়েছিল। অত্যাচারী ভূস্বামীদের পদদলিত করে স্বাধীন ‘কোচ’ রাজ্য গড়ে তুলতে পারলেও, উচিত শিক্ষা দিতে পারেননি অহোম রাজবংশকে।

যুদ্ধে জেতার মত অবস্থায় পৌঁছেও কোচদের পরাজিত হতে হয়েছিল। কেবলমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে ঠিক সময়ে রসদ পৌঁছয়নি বলে। দুর্গম পর্বতশ্রেণী ও বিপদসংকুল অরণ্যের ভেতর দিয়ে যাওয়া সংকীর্ণ পথ ছিল এর জন্য দায়ী। তাই সিংহাসন ছাড়ার আগে পুত্রদের বলেছিলেন, যদি কোনও দিন অহোমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক আসে, তারা যেন প্রস্তুত হয়েই যুদ্ধে নামে।

কোচ রাজ্যের সিংহাসনে বসেছিলেন রাজকুমার মল্লদেব। হয়েছিলেন মহারাজা নর নারায়ন। রাজ্যশাসনের জন্য একটি সুসংবদ্ধ পরিচালকমণ্ডলী তাঁর রাজত্বকালেই গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন মহারাজা বিশ্ব সিংহ। কোচ মহারাজের অধীনে থাকতেন বারো জন মন্ত্রী। তাঁদের বলা হত ‘কার্জিস’। বারোটি উপজাতির প্রধানকে ‘কার্জিস’ পদে নিযুক্ত করা হত। দু’জন বয়স্ক ও অভিজ্ঞ কার্জিস এবং একজন যুবরাজকে নিয়ে গঠন করা হত উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা। তাই সিংহাসনে বসার পর মহারাজা নর নারায়ণকে সামান্যতম অসুবিধায় পড়তে হয়নি।

কোচ রাজ্যের পতাকা

কোচ রাজ্যের সুরক্ষার জন্য মহারাজ বিশ্ব সিংহ গড়ে তুলেছিলেন এক সুবিশাল সেনাবাহিনী। সেনাদের বলা হত পাইক। বিভিন্ন ধাপে বিন্যস্ত ছিল সেই সেনাবাহিনী। সবার ওপরে থাকতেন সেনাধক্ষ্য। তাঁর অধীনে থাকতেন অসংখ্য ‘নওয়াব’, ওমরা, শইকিয়া ও ঠাকুরিয়া। একজন নওয়াবের অধীনে থাকত ৬৬ হাজার পাইক। একজন ওমরার অধীনে থাকত ৩ হাজার পাইক। একজন শইকিয়ার অধীনে থাকত ১০০ পাইক ও একজন ঠাকুরিয়ার অধীনে থাকত ২০ জন পাইক।

সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের নিয়েছিলেন রাজকুমার শুক্লধ্বজ। দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল কোচ সেনাবাহিনীর সবকিছু ঠিক ঠাক নেই। সেনাবাহিনীর কোনও কোনও অংশে সংস্কার করা প্রয়োজন করেছিলেন। সেই সময় সেনারা নিয়মিত বেতন পেতেন না। শুক্লধ্বজ অনুভব করেছিলেন, শুধু দেশপ্রেমের কথা বলে সেনাদের উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব নয়। আর্থিক দিক থেকে চিন্তায় থাকা সেনাদের দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। তাই শুক্লধ্বজ সবার আগে সেনাদের নিয়মিত বেতন দেওয়া শুরু করেছিলেন। সেনা পরিবারের জন্য দিয়েছিলেন বসত ও কৃষি জমিও। তিনি জানতেন তাঁর বীর সেনারাই কোচ মহারাজার অদম্য শক্তির প্রথম ও শেষ উৎস।

 রাজকুমার শুক্লধ্বজ

এরপর পদাতিক, অশ্বারোহী ও নৌ-বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন আরও দুটি নতুন বাহিনী। কয়েক হাজার হাতি নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন গজারুঢ় বাহিনী। এছাড়া তৈরি করেছিলেন গেরিলা যুদ্ধে পটু দুর্ধর্ষ এক ঘাতক বাহিনী। যে বাহিনীর সদস্যেরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে, রাতের অন্ধকারে শত্রুপক্ষের ওপর ওপর প্রাণঘাতী আঘাত হানত।

রাজকুমার শুক্লধ্বজ নিজেও গেরিলা যুদ্ধের নিপুণ এক যোদ্ধা ছিলেন। তাই নিজে বেছে নিতেন তাঁর বাহিনীর গেরিলা যোদ্ধাদের। এরপর ঘন অরণ্যে রাতের অন্ধকারে নিজেই গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতেন। ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের অনেক আগেই, গেরিলা যুদ্ধকে শত্রু নিধনের কাজে সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন কোচ রাজকুমার শুক্লধ্বজ।

মহারাজা নর নারায়ণ ও রাজকুমার শুক্লধ্বজ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিলেন নির্দিষ্ট লক্ষ্যটির দিকে। পেশিবলে অহোম রাজকে হারিয়ে প্রতিষ্ঠা করতেই হবে কোচ রাজত্বের আধিপত্য। ছোট ভাই গোঁহাই কমল মাত্র দুই বছরের মধ্যে বানিয়ে দিয়েছিলেন কোচবিহার থেকে উত্তর লখিমপুর পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তা। যে রাস্তা দিয়ে অহোম রাজের ওপর চুড়ান্ত আঘাত হানার জন্য দিকে এগিয়ে যাবে কোচ সেনারা। যে রাস্তা দিয়ে অনায়াসে রণক্ষেত্রে পৌঁছনো যাবে বিপুল পরিমাণ রসদ। সেই রাস্তারটিরই একটি অংশ আজও আছে।

গোঁহাই কমলের বানানো রাস্তার বর্তমান রূপ

কুমার শুক্লধ্বজের নেতৃত্বে অহোম আক্রমণ করে ছিল মহারাজ নর নারায়নের শক্তিশালী সেনাবাহিনী। প্রথমবার ১৫৪৬ সালে ও দ্বিতীয়বার ১৫৬২ সালে। দ্বিতীয়বারের প্রচেষ্টাটি সফল হয়েছিল। ১৫৬৩ সালের জুন মাসে কুমার শুক্লধ্বজের নেতৃত্বে কোচ সেনারা ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে দখল করে নিয়েছিল অহোম রাজত্বের রাজধানী গড়গাঁও। পিতৃপ্রতিজ্ঞা পালন করেছিলেন মহারাজা নারায়ণ ও কুমার শুক্লধ্বজ।

এই যুদ্ধে কুমার শুক্লধ্বজের অভুতপূর্ব রণকৌশল বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল অহোম সেনাদের। আকাশ থেকে দ্রুতগতিতে শিকার ধরতে নেমে আসা চিলের মতই হঠাৎ রণক্ষেত্রে প্রবেশ করতেন শুক্লধ্বজ। আকস্মিক এই আক্রমণে হতভম্ব হয়ে যেত শত্রুসেনা। শত্রুপক্ষের কয়েকশো সেনার প্রাণহীন দেহ, রক্তেরাঙা মাটিতে ফেলে রেখে, চিলের মতই চকিতে উধাও হয়ে যেতেন কুমার শুক্লধ্বজ। তাই গেরিলা যুদ্ধের কিংবদন্তি যোদ্ধা কুমার শুক্লধ্বজের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘চিলা রাই’ ( চিল রাজা)। কখন কোন দিক থেকে আক্রমণ করবেন চিলা রাই, তার ভয়ে তটস্থ থাকতেন শত্রু সেনারা।

কুমার শুক্লধ্বজের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘চিলা রাই’

অহোম রাজ্য জয় করার পর, মহারাজা নর নারায়ণের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কোচ রাজত্ব বিস্তারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন চিলা রাই। কোচ রাজ্যের রাজধানী কামতাপুরকে সুরক্ষা দিতে একই সঙ্গে নির্মাণ করে চলেছিলেন অসংখ্য দুর্গ ও প্রাচীর। কারণ তাঁদের শত্রুর সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। কিন্তু চিলা রাইয়ের দুর্ভেদ্য রণকৌশলের শত্রুসেনারা এঁটে উঠতে পারত না। কোচ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতে বসিয়ে ছিলেন নজর মিনার ও সেনা চৌকি। কেটেছিলেন পরিখা।

সুবিশাল প্রান্তরগুলির মাঝে মাঝে চিলা রাই খনন করে রেখেছিলেন বিশাল বিশাল পুষ্করিণী। এর পিছনের ছিল এক সাংঘাতিক রণকৌশল। শত্রু সেনারা যদি বিশাল সৈন্যদল নিয়ে এগিয়ে আসে কোচ রাজ্যের দিকে, বিশাল প্রান্তরগুলির মধ্যে দিয়েই শত্রুপক্ষের সেনাবাহিনীকে এগোতে হবে। প্রান্তরের মাঝে ফেলতে হবে সেনাশিবির। রান্না ও পানের জন্য প্রয়োজন হবে জলের। জল নিতে শত্রুপক্ষের সেনাদের আসতেই হবে পুষ্করিনীগুলিতে। জলে মেশানো থাকবে বিষ। শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাবে যুদ্ধ। রক্ষা পাবে কোচ রাজ্য। এছাড়াও চিলা রাই গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব গোয়েন্দাবাহিনী। যারা শত্রুপক্ষের প্রতিটি পদক্ষেপের খবর দিত শত্রুশিবিরে বসেই।

তাই কালক্রমে কোচ রাজকুমার চিলা রাই হয়ে উঠেছিলেন অপরাজেয়। অহোম জয় করার পর চিলা রাই জয় করেছিলেন উত্তর কাছাড় জুড়ে থাকা হিড়িম্বা রাজ্য, মনিপুর, জয়ন্তিয়া রাজ্য, ত্রিপুরা, খৈরাম, সিলেট ও ডিমারুয়া রাজ্য। মাত্র চার বছরের (১৫৬২-৬৫) মধ্যে অপ্রতিরোধ্য চিলা রাই দখল করে নিয়েছিলেন ভারতের প্রায় পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চল। কোচ রাজত্বের অধীনস্থ রাজারা মহারাজা নর নারায়ণকে বাৎসরিক কর দিতেন। স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা, হাতি, ঘোড়া ও বিভিন্ন শিল্পসামগ্রী পাঠাতেন।

এই সুবিশাল এলাকা ছিল চিলা রাইয়ের দখলে

মহারাজা নর নারায়ণের বশ্যতা স্বীকার না করে কোনও রাজ্যের রাজা যদি যুদ্ধ করতেন, সেই অপরাধের জন্য রাজাকে দিতে হত বিরাট ক্ষতিপূরণ। একটি উদাহরণ থেকে বোঝা যাবে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ। কোচদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন সিলেটের রাজা। নতুন রাজা হয়েছিলেন তাঁর ভাই। ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি নর নারায়ণকে দিয়েছিলেন ১০০টি হাতি, ১৮০টি ঘোড়া, ৩ লক্ষ রৌপ্য ও ১০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা।

রাজ্য বিস্তারের ফাঁকে ফাঁকে চলছিল চিলা রাইয়ের সাহিত্যচর্চা। রণক্লান্ত রাজকুমার চিলা রাই অনুবাদ করে ফেলেছিলেন জয়দেবের ‘গীত গোবিন্দ’। ক্রমশ যেন নিজেকে সঁপে দিচ্ছিলেন শ্রীবিষ্ণুর চরণে। আঁকড়ে ধরছিলেন বৈষ্ণব ধর্মকে। ঠিক তখনই উত্তর পূর্বে উত্থান হচ্ছিল অসমের ধর্ম ও সংস্কৃতির ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের। ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের নব্য-বৈষ্ণব ধর্ম। যার প্রভাব পড়েছিল চিলা রাইয়ের ওপরও।

কিন্তু শ্রীমন্ত শঙ্করদেবকে রুখতে অপপ্রচার শুরু করেছিলেন সংস্কারবিমুখ পণ্ডিত ও পুরোহিতেরা। তাঁরা মহারাজা নর নারায়ণকে বলেছিলেন, দেবী কামাখ্যার পূজা করতে বারণ করেছেন শঙ্করদেব। যা ছিল সর্বৈব মিথ্যা। কিন্তু সংস্কারবিমুখ পণ্ডিত ও পুরোহিতদের প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন মহারাজা নর নারায়ণ। শ্রীমন্ত শঙ্করদেবকে কয়েদ করার আদেশ দিয়েছিলেন মহারাজা। কিন্তু শ্রীমন্ত শঙ্করদেবকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, কারণ তাঁকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন স্বয়ং চিলা রাই।

মহাপুরুষ শ্ৰীমন্ত শঙ্করদেব

পরবর্তীকালে মহারাজা নর নারায়ণের দরবারে হওয়া এক উন্মুক্ত বিতর্কসভায়, শ্রীমন্ত শঙ্করদেব বিতর্কে পরাজিত করেছিলেন সংস্কারবিমুখ পণ্ডিত ও পুরোহিতদের। চিলা রাইয়ের অনুরোধে শ্রীমন্ত শঙ্করদেবকে আশ্রম গড়ার জন্য ভেলাডাঙায় জমিও দিয়েছিলেন মহারাজা নর নারায়ন। চিলা রাইয়ের বিবাহও হয়েছিল শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের ভাগনির সঙ্গে। চিলা রাইয়ের নাম শঙ্করদেব দিয়েছিলেন ‘পরম রসিক গুরু রাজা’। ধীরে ধীরে শ্রীমন্ত শঙ্করদেব প্রবর্তিত নব্য-বৈষ্ণব ধর্ম হয়ে উঠেছিল কোচ রাজ্যের ধর্ম।

মহারাজা নর নারায়ণ শান্তি চাইছিলেন, কিন্তু তাঁর মনে আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছিল কোচ রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্তে থাকা গৌড়। গৌড় তখন শাসন করছিলেন সুলেইমান খান কারনানি। এই কারনানি সুলতানেরা ছিলেন পাশতুন। তাঁরা এসেছিলেন আফগানিস্থান থেকে। উত্তরে কোচ রাজ্যের সীমান্ত, দক্ষিণে উড়িষ্যার পুরী, পশ্চিমে শোন নদী, পূর্বে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল গৌড়। গৌড়ের সুলতানদের নজর ছিল কোচ রাজ্যের দিকে। তাই কারনানি সুলতানেরা কোচ রাজ্য আক্রমণ করার আগেই গৌড় আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন চিলা রাই।

চিলা রাই

সুবিশাল সৈন্যদল নিয়ে ১৫৬৮ সালে চিলা রাই আক্রমণ করেছিলেন গৌড়। কিন্তু লাগাতার ছ’বছর ধরে যুদ্ধ করে ক্লান্ত কোচ সেনারা সেই যুদ্ধে জিততে পারেনি। সেই প্রথম নিদারুণ পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন চিলা রাই। বন্দি হয়ে ছিলেন শত্রু সেনার হাতে। তবে মুক্তি পেয়েছিলেন কিছুদিন পর। কিন্তু এই পরাজয় দগদগে ক্ষত সৃষ্টি করেছিল চিলা রাইয়ের হৃদয়ে। সুযোগ খুঁজছিলেন বদলা নেওয়ার জন্য। সুযোগ এনে দিয়েছিল মুঘলেরা।

আফগানি সুলতানদের সরিয়ে গৌড় দখল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল মুঘলেরা। সম্রাট আকবর গৌড় দখলের জন্য মহারাজা নর নারায়ণের সাহায্য চেয়েছিলেন। মুঘল ও কোচ সেনারা একসাথে আক্রমণ করেছিল গৌড়। প্রথম যুদ্ধটি হয়েছিল, ১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ। মেদিনীপুর ও জলেশ্বরের মাঝখানে থাকা টুকারোই এলাকায় হয়েছিল সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল তৎকালীন গৌড়ের সুলতান দাউদ খান কারনানির সেনারা।

দ্বিতীয় যুদ্ধটি হয়েছিল রাজমহলে (বর্তমানে ঝাড়খণ্ড)। ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই হওয়া সেই যুদ্ধে গৌড়ের সুলতানের সেনাবাহিনীকে তছনছ করে গৌড় জিতে নিয়েছিল মুঘল ও কোচ বাহিনী। গৌড়ের কিছু অংশ প্রবেশ করেছিল কোচ রাজ্যের সীমানার মধ্যে। যুদ্ধ শেষে, ১৫৭৭ সালে রাজ্যে ফেরার পথে, গঙ্গার ধারে শিবির পেতেছিলেন চিলা রাই। এর কিছুদিন আগেই বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল গুটি বসন্ত। সেই গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলেন চিলা রাই। আর কোচ রাজ্যে ফেরা সম্ভব হয়নি তাঁর। গুটি বসন্তের কাছে হার মেনেছিলেন তিনি।

তবে কোচ রাজত্বের সিংহাসনে না বসেও, চিলা রাই থেকে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। রামানুজ লক্ষ্ণণের মত দাদা নর নারায়ণের পদতলে বসে থেকেছেন আজীবন। অথচ তিনিই ছিলেন সুবিশাল কোচ রাজ্য গঠনের মূল কাণ্ডারী। তাই বুঝি ভাইয়ের মৃত্যুর পর দাদা নর নারায়ণ দুই ভাগে ভাগ করছিলেন কোচ রাজত্বকে। পূর্বে গড়ে উঠেছিল কোচ বিহার ও পশ্চিমে কোচ হাজো রাজ্য। নিজের কাছে কোচ বিহার রেখে, কোচ হাজো রাজ্যটির সিংহাসনে বসিয়েছিলেন কোচ রাজত্বের মহাপরাক্রমশালী রাজকুমার ও কিংবদন্তি গেরিলা যোদ্ধা চিলা রাইয়ের পুত্র রঘুদেবকে।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More