‘হোঁদল-কুতকুত’ শালীনতা-বর্জিত অসাধু বাক্য, বলছেন রাজ্যের বিশিষ্টজনেরা

শ্যামলেশ ঘোষ

‘এই দেশে এখন দুটো নেতা। একটা নেতা হচ্ছে হোঁদল-কুতকুত। …আর একটা নেতা হচ্ছে কিম্ভুতকিমাকার।’ এই কথাটাকে একটা তুচ্ছ মন্তব্য বা হালকা টিটকিরি বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই, যখন বক্তা এক মুখ্যমন্ত্রী। এবং নাম না করে তাঁর মন্তব্যের লক্ষ্য যখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী। রাজ্য জুড়ে নির্বাচনের গরম আবহ। রাজনীতি ছেড়ে ব্যক্তিগত তথা একান্ত ব্যক্তিগত এই আক্রমণকে ‘বডি শেমিং’ হিসেবেই দেখতে চাইছে মিডিয়া। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এহেন ভাষাপ্রয়োগের রীতিমাফিক প্রতিবাদ করেছে কেন্দ্রের শাসকদল। নিন্দা জানিয়েছেন রাজ্যের সচেতন, শিক্ষিত সমাজ। ‘শালীনতা-বর্জিত অসাধু বাক্য’, বলেছেন রাজ্যের বিশিষ্টজনেরা।

কথায় আছে, ‘এক দেশের গালি, আর এক দেশের বুলি।’ আবার এর উল্টোটাও বলা হয়ে থাকে। মনের ভাব প্রকাশের জন্য প্রত্যেক ভাষাভাষীই নানা ধরনের শব্দ, শব্দবন্ধ বা বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। সেসব কথার অনেক ক্ষেত্রে আভিধানিক অর্থ কিছু নেই। যদিও তা অন্যের কাছে বিব্রতকর বা হাস্যকর হতে পারে। নানা ভাষার দেশ ভারতে এমন কথার আয়োজন বিস্তর এবং তা নিয়ে অনেক সময় বাগবিতণ্ডার অবকাশ থেকেই যায়। বাংলায় সেই বিবাদের সাম্প্রতিক সংযোজন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হোঁদল কুতকুত’ ও ‘কিম্ভুতকিমাকার’ নামক ‘অনুচিত’ শব্দপ্রয়োগ। দুটি শব্দই বাংলায় প্রচলিত। সাধারণ অর্থে শারীরিক অসামঞ্জস্য ও বিকৃতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয় এমন সম্ভাষণ।

কাকে বলে ‘হোঁদল কুতকুত’? ‘কিম্ভুতকিমাকার’ কী? ‘বডি শেমিং’-ই বা কেমন ধারা খোঁটা বা গঞ্জনা? আসুন, দেখে নিই। প্রথমে আসি ‘হোঁদল’ শব্দে। অভিধান বলছে, হোঁদল শব্দের অর্থ পেটমোটা। স্থূলোদর, ভুঁড়িওয়ালা, নাদাপেটা মানুষ ও প্রাণীর উদ্দেশে এই বিশেষণ প্রয়োগ করা হয়। আবার কুতকুত (স্থানবিশেষে, কিতকিত) একটি গ্রামীণ খেলাবিশেষ। কিন্তু যেই না ‘হোঁদল-কুতকুত’ বা ‘হোঁদল-কুৎকুৎ’ হল তখনই তা হয়ে গেল বিশেষ্য পদ। মানে, কুৎসিত, পেটমোটা ঘোর কৃষ্ণবর্ণ কাল্পনিক জন্তু বা সম চেহারার মানুষ। ‘হোঁদল-কুতকুত’ উচ্চারণেই মিশে থাকে তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রূপ ও ঘৃণা। মানে না বুঝলেও গায়ে এসে বেঁধে। ‘কিম্ভুতকিমাকার’ চেহারা সাধারণভাবে কদাকার অর্থে প্রয়োগ হয়। জীবিত প্রাণী এবং প্রাণহীন বস্তুর অবস্থা বোঝাতেও এর ব্যবহার আছে।

Body Shaming কী? সোজাকথায়, কোনও মানুষের শরীর নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য। কেউ যদি কারও দেহের আকৃতি, ওজন বা আয়তন নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা বা এমন কোনও মন্তব্য করেন যাতে সেই মানুষটি লজ্জাবোধ করেন বা অপমানিত হন, তবে তাকে বডি শেমিং হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। বিশ্বের প্রায় সব সমাজে ব্যক্তি তথা ব্যক্তিশরীর ঘিরে প্রকারান্তরে এইধরনের সমালোচনা ও বিদ্রূপ প্রচলিত। পারিবারিক ও সামাজিক প্রশ্রয়ে সেই কটূক্তি জলহাওয়া পেয়ে একটি চলমান সামাজিক অনুশীলনের ফলস্বরূপ বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। এবং আশ্চর্যের কথা, এই ‘সংস্কৃতি’ আমাদের পরিবার-পরিধি, স্কুল, টিউশন-ক্লাস ছাপিয়ে সোসাল মিডিয়ায় এবং এমনকি আমাদের বন্ধুবৃত্তেও ডালপালা মেলেছে।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, লেখক, গবেষক ও ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র সরকার বলেছেন, সবাই জানে যে এধরনের কথা বলা যায় না, এইধরনের অসাধু বাক্য প্রয়োগ উচিত নয়। গালাগাল দেওয়া এমন ব্যাপার যে ঢিল মারলে পাটকেল ছুটে আসে। একতরফা গাল দিয়ে রেহাই পাওয়া যায় না। নির্বাচন আসছে। উত্তেজনার সময়। অনেকে সুযোগ নিতে চাইবে। আমরা চাইব না আমাদের নারী মুখ্যমন্ত্রীকে কেউ অশোভন কথা বলে চলে যাক। তিনি তো আমাদের মাথার ‘পরে থেকে রাজ্যশাসন করছেন। তাঁর একটু মাথাটা ঠান্ডা রাখা উচিত। আমি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, ভাষাপ্রয়োগে তিনি আরও শান্ত ও সংযত হোন।

শিক্ষাবিদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী বলেছেন, হোঁদল কুতকুত একটা কল্পিত চরিত্র। চেহারার ভিত্তিতে কাউকে অসম্মান করাটা সঠিক নয়। মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রবণতাটা রুচিবোধের অভাব থেকে হতে পারে। আবার এমন হতে পারে যে, তিনি ভেবে দেখছেন না বা এই ভুলটা তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার লোকের অভাব রয়েছে। কারও রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম, নীতির নিশ্চয়ই সমালোচনা করা যেতে পারে তথ্য দিয়ে কিন্তু এভাবে শালীনতা-বর্জিত ব্যক্তিগত আক্রমণ সমীচীন নয়। মুখ্যমন্ত্রী হয়তো তাঁর অনুগামীদের কাছে বোঝাতে চেয়েছেন ‘কাউকে পরোয়া করি না’। নিজেকে বড় করে দেখাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এই ধরনের একটা অপসংস্কৃতি দায়িত্ব সহকারে প্রচার করা একেবারেই যুক্তিযুক্ত নয়।

আবার নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক প্রবীণ সাংবাদিকের বক্তব্য, রাজনেতারা কুকথায় দড় হবেন সে আর আশ্চর্য কী! কম-বেশি সব রাজনৈতিক দলের লোকজনই হাততালি পাওয়ার লোভে এমন অযৌক্তিক মন্তব্য করে বসেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কেষ্ট-বিষ্টুদের নিশানা করেছেন, সেই দলের লোকজনের কয়েক বছরের বয়ানবাজির ইতিহাস ঘাঁটুন। বিরোধীদলের নেতানেত্রী থেকে বুদ্ধিজীবী ও মুক্তচিন্তার মানুষ, সমাজকর্মী ও মানবাধিকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং বিশেষ করে মহিলা ও দলিতদের সম্পর্কে কুমন্তব্যে সম্ভবত সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরাই। যাঁরা প্রশ্ন তোলেন, বিজেপি বেছে বেছে তাঁদেরকেই নিশানা করে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর মুখে এমন কথা সঙ্গত নয়। ভেবেচিন্তে তো নয়ই, মুখ ফসকেও বলাটা প্রতিপক্ষের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার মতো।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More