রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৭

কাল ছিল জল ভরা, আজ পলি যায় ছেয়ে! কয়েক দিনে মিলিয়ে গেল আস্ত এক নদী!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: আন্দিজ পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে, কলম্বিয়ার উর্বর জমির মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে সে নদী চলে গিয়েছে ক্যারিবিয়ান সাগর পর্যন্ত। কাউকা নামের এই নদীর দৈর্ঘ্য এক হাজার ৩৫০ কিলোমিটার। মাঝে একটা সময়ে অবশ্য ম্যাগডালেনা নদীর সঙ্গে মিশে গিয়েছে কাউকা।

কয়েক দিন আগেও এমনই পরিচয় ছিল কাউকা নদীর। কিন্তু এখন সে নদী নেই। নেই মানে ভ্যানিশ, উধাও! প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যনির্মিত দুই কারণের মেলবন্ধনে অদ্ভুত ভাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় উধাও হয়ে গিয়েছে গোটা নদীটি।

এমনই চেহেরা ছিল কাউকা নদীর।

গোটা ঘটনাটা বিস্তারিত জানলে চমকে যেতে হয়। কাউকা নদীর উপরে কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় হাইড্রো-ইলেকট্রিক প্রকল্প, ইটুয়াংগো বাঁধ নির্মিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনার সময়ে আন্দাজ করা যায়নি, এই বাঁধই গোটা দেশের জন্য বিপর্যয় তৈরি করবে।

গত বছরের মে মাসে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়েছিল কলম্বিয়ায়। সেই সময়েই নদীর উপরে তৈরি হচ্ছিল ইটুয়াংগো বাঁধ। কাউকা নদীর উপরে অবশ্য এটাই প্রথম বাঁধ নয়। কাউকা নদীর দীর্ঘ যাত্রাপথে রয়েছে আরও অনেক হাইড্রো-ইলেকট্রিক বাঁধ। নদীর দু’পাড়ে গড়ে উঠেছে বহু শিল্প-কারখানা, নগর-বন্দর-গ্রাম। লাখ লাখ কৃষক আর মৎস্যজীবীর জীবন চলে এই নদী এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর উপরে নির্ভর করে। পরিসংখ্যান বলছে, কাউকা নদীর দু’তীরে বাস করে প্রায় এক কোটি মানুষ, যা কলম্বিয়ার মোট জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ।

এমনই ছিল নদীমাতৃক কলম্বিয়া।

তবে বছরের পর বছর ধরে নদীকেন্দ্রিক কলম্বিয়া দিব্যি ছিল। বিপত্তি ঘটল ইটুয়াংগো বাঁধ নির্মাণের সময়ে। মে মাসের ভরা বর্ষায় এই বাঁধ নির্মাণের সময় আচমকা একটা বড় ত্রুটি দেখা দিল। আর সেই কারণেই হঠাৎ বন্যা হলো কলম্বিয়ার দু’তীর জুড়ে। লাখ লাখ মানুষ সেই বন্যায় তাদের বাড়ি-ঘর ছাড়তে বাধ্য হলো।

ইটুয়াংগো বাঁধ নির্মাণেই সমস্যার শুরু।

ডিসেম্বর মাসে শান্ত হল বন্যা পরিস্থিতি। জল নামল। কাদামাটি থিতোল। আর তখনই দেখা গেল, অত বড় কাউকা নদীর প্রায় অস্তিত্বই নেই! মাসতিনেক পরে, এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে পুরোপুরি শুকিয়ে গেল সেই নদী।হাইড্রোলজিস্টরা বলছেন, নদীর জল এতটাই কম, যে তাঁরা আর মাপতেও পারছেন না!

সূত্রের খবর, ইটুয়াংগো বাঁধ নির্মাণের কাজটি করছে ইপিএম নামে একটি কোম্পানি। এই বাঁধের জন্য কাউকা নদীর জলের গতিপথ বদলানোর প্রয়োজন হয়। সেই কারণে তৈরি করা হয় তিনটি টানেল। কিন্তু মে মাসের সাত তারিখে সেই টানেল তৈরি করতে গিয়েএকটি বিরাট খাদ তৈরি হয়। শুরু হয় প্রবল ধস। আর সেই ধসের ফলে টানেলগুলোর মুখ বন্ধ হয়ে যায়। ইপিএম সংস্থার প্রযুক্তিকারিগরেরা জানান, তাঁরা অনেক চেষ্টা করেও এর পরে কিছু করতে পারেননি।

বন্যার পরে নদীর তীরের চেহারা।

নদীর পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে বাঁধের অন্য পাশে জলের চাপ বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই বিরাম ছিল না বৃষ্টিপাতের। দশ দিন পরে প্রচণ্ড জলের চাপে একটি টানেলের মুখ আবার খুলে যায়। এর ফলে এতই তীব্র বেগে ওই টানেল দিয়ে জল ছুটতে থাকে যে, যে গোটা এলাকায় ব্যাপক বন্যা তৈরি করে। কয়েক হাজার মানুষ নদীর আশপাশ ছেড়ে পালিয়ে যায় নিরাপদ আশ্রমে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এর ফলে ইটুয়াংগো বাঁধের সমস্যা আরও জটিল রূপ নিল। পরবর্তী সপ্তাহগুলোয় টানা ভারী বৃষ্টি হলো। এর ফলে নদীর তলদেশে প্রচুর পলি জমা হওয়ায় উঁচু হয়ে যায় নদী। বাঁধের উপর দিয়ে জল উপচে পড়তে শুরু করল। এই অবস্থায় বাঁধটি আরও দুর্বল হয়ে গিয়ে পুরো বাঁধটাই ধসে পড়ার মতো আশঙ্কা তৈরি হল। 

তখনও বইছিল নদী।

কয়েক দিন আগেই পরপর দু’বার বড় বিপর্যয়ে নদীর পাড় ছেড়ে উঠে যেতে হয়েছে বহু মানুষকে। বাঁধ ভেঙে পড়লে আবার তৃতীয় বার একই অবস্থা হবে। উপর্যুপরি এই বিপর্যয়ে কলম্বিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোই মুশকিল হতে পারে। তাই এই অবস্থায় নদীর জল ছাড়ার উপায় একটাই। বাঁধের উচ্চতায় পৌঁছনো জল বার করার জন্য কিছু ফ্লাডগেট তৈরি করে তা খুলে দেওয়া।

ফেব্রুয়ারি মাসের পরে চিহ্ন রইল না কাউকা নদীর।

সে যাত্রা এমন করে বিপদ কাটল। কিন্তু হু হু করে জল ছেড়ে দেওয়ার ফলে জলের উচ্চতা নেমে গেল অনেক নীচে। জল কমতে থাকায় এ বছরের ১৬ই জানুয়ারি জলের পরিমাণ নেমে যায় প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ৩৯৫ কিউবিক মিটারে। শেষমেশ ৫ই ফেব্রুয়ারী একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল জলের স্রোত।

কার্যত, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল আস্ত কাউকা নদী।

Shares

Comments are closed.