টিউলিপের ফুলসজ্জায় বাসযোগ্য পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা

সুষ্মিতা রায়চৌধুরী, নিউ জার্সি

“এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।” কবি সুকান্তর লেখা এ বাক্যটি আজ বড্ড প্রাসঙ্গিক সর্বতোভাবেই। পৃথিবী আজ অসুস্থ। মারণব্যাধিতে হাহাকার শোনা যায় বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।

নিউজার্সিতে বসে মৃত্যুমিছিল দেখেছিলাম আগের বছর এই সময়টায়, তখন মনে হত এই বুঝি ভয়াবহতার চুড়ান্ত পর্যায়ের সম্মুখীন হলাম আমরা। কিন্তু বছর ঘুরতেই বুঝতে পারলাম যেটাকে সবথেকে কঠিন সময় ভেবেছিলাম তা আসলে কিছুই না। এখন যখন একদিনে ভারতবর্ষের করোনা সংক্রমণের সংখ্যাটা বেড়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ, অক্সিজেন সিলিন্ডার, হাসপাতাল বেড, ভ্যাকসিন না পেয়ে ত্রাহি রব তুলছে আমার দেশ, আমার নিজের পাড়া, আর আমরা অসহায়ের মতো বসে দেখছি, তখন বুঝতে পারছি “ট্রিপল মিউটেশন স্ট্রেন”-এর সঠিক অর্থটা কী।

আজ তাই মনে হয়, দগ্ধ পৃথিবীকে একটু শান্ত করতে, ভরসা শুধুই ফুলের যত্ন। তবে যদি কিছুক্ষণর জন্য আরাম পায় বিশ্ব! কয়েক দিন আগেই পেরিয়েছে ২০২১-এর “আর্থ ডে” বা ধরিত্রী দিবস। এই সময়টাতেই বসন্তের আগমনে শীত পুরোপুরি না গেলেও, আমেরিকা সেজে ওঠে নববধূর ফুলসজ্জায়। “চেরি ব্লসম ফেস্টিভাল” এখানের বহু চর্চিত একটি উৎসব।

উৎসবই বটে, কারণ লাখে লাখে মানুষ আসেন শুধুমাত্র ফুলের আবিরে নিজেকে সাজাতে। ওয়াশিংটন ডিসি-র ‘টাইডাল বেসিনকে’ সম্ভবত বলা হয় আমেরিকার সবথেকে আলোচ্য এবং বিখ্যাত চেরি ব্লসম দেখার শহর। তিনহাজারের বেশি গাছ আছে এই স্থানে। সাথে আছে ম্যাগনোলিয়া, লিলি, সূর্যমুখী। তবে শুধু দ্রষ্টব্য স্থান বলে নয়, এই সময় বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে, বারান্দায়, পাড়ার অলিতেগলিতে ভরে যায় চেরি ব্লসম আর ম্যাগনোলিয়া।

কিন্তু লোকের মুখেমুখে আমেরিকার চেরি ব্লসমের কথা যতটা প্রচলিত, তার থেকে কিছুটা কম জানান দিয়ে যায় যার রঙিন আগমন, তা হল টিউলিপ। ২০১৬ সালে আমস্টারডামের বিশ্ববিখ্যাত কেউকেনহোফ উদ্যান ঘুরে আসার পর তাই এবার গন্তব্য ছিল নিউজার্সির টিউলিপ ফেস্টিভ্যাল। এখানে ভ্যাকসিন নিয়ে অনেকটাই সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করছে জীবনযাপন। ফাইজার বা মোডার্না নিয়ে প্রথমে অনেক অজানা আশংকা থাকলেও এখন বেশিরভাগই ‘ভ্যাকসিনেটেড’।

‘হল্যান্ড রিজ ফার্ম’ নিউজার্সির বেশ চর্চিত একটি ফুলের উদ্যান। প্রতিবছর এখানে শয়ে শয়ে মানুষ ভিড় করেন শুধুমাত্র টিউলিপ দেখতে। আসলে টিউলিপ ফোটার সময় এবং প্রক্রিয়া দুই-ই খানিক জটিল। “ফল সিজন” অর্থাৎ অক্টোবরের কাছাকাছি টিউলিপ বাল্ব লাগাতে হয় এবং তা ফোটে মার্চ-এপ্রিলে। মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহ থাকে টিউলিপ, কারণ আবহাওয়ার হাল্কা পরিবর্তনে টিউলিপ আর থাকতে পারে না। অতএব টিউলিপ সাম্রাজ্য ক্ষণস্থায়ী।

আমস্টারডমের টিউলিপ মরসুমে কেউকেনহোফ ভ্রমণ করা ডাচ স্প্রিংটাইমের প্রধান বিষয়। প্রতিবছর এই বিস্তৃত পার্কে মিলিয়নেরও বেশি টিউলিপ বাল্ব রোপণ করা হয় এবং এর ইংরেজি ধাঁচের ল্যান্ডস্কেপ উদ্যানগুলি রূপকথার মতো ফুলের কুচকাওয়াজের গল্প শোনায়। হল্যান্ড রিজ ফার্মের নামটিতে নেদারল্যান্ডস থাকলেও, আয়তনে সে অনেকটাই ছোট। এখন কোভিডের দাপটে স্থির করা হয়েছে তিনটি স্লট, তিনটি বিভিন্ন সময়ে। তাই প্রবেশ সংখ্যা সীমিত।

তাও কিছুটা দোটানায় আমরা সপ্তাহের মাঝখানে অনলাইন টিকিট কেটেছিলাম টিউলিপ দেখার জন্য যাতে অফিসের দিনে ভিড়টা কম থাকে। কারণ এবছর প্রচন্ড ঠান্ডার দাপট  চলে যাওয়ার সাথেসাথেই ভ্যাকসিন নিয়ে সবাই আবার ঘরের বাইরে আসতে চায়, যদিও মাস্কের আড়ালে চোখদুটিই যা স্বাধীন।

বেশ মেঘলা থাকলেও পার্কিং লট থেকেই দেখতে পেলাম লাল গালিচা। তাহলে দর্শন দেবে সে এবার। সোশ্যাল ডিসটেনসিং এর বেশ কড়াকড়ি থাকলেও ফোটো তোলার ‘প্রপ’গুলো ব্যবহার করার মতো সাহস পেলাম না। কিছুটা পেরোতেই সবুজ আর মাটির আস্তরণ ভেদ করে দেখা পেলাম তার। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন অনেক রংয়ের একটা রাস্তা মিশেছে আকাশে। পরপর শুধু গোলাপি, হলুদ, লাল, কমলা টিউলিপের সুসজ্জিত ফুলসজ্জা। কয়েকটার রঙে আবার মিশে গেছে বৈচিত্র। একগুচ্ছ কচিকাঁচা দেখি খেলে বেড়াচ্ছে সেখানে। কতদিন পর আবার ওরা খেলতে পারছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের ডাকে স্যানিটাইজার স্নাত হয় শৈশব।

সেন্ট্রাল নিউজার্সির এই টিউলিপ উদ্যানে “টিউলিপ পিকিং”টাই সবথেকে বড় আকর্ষণ। প্রতি স্টেমের জন্য এক ডলারে নিজেই তুলে নাও পছন্দের টিউলিপ। সাজিয়ে নাও ঘরের কোণ পুষ্পশোভিত অলংকারে। ছোট, বড়, বুড়ো কেউ পিছিয়ে নেই এই টিউলিপ পিকিং-এ। ছবিওয়ালাদের স্বর্গ এই ফুলের উদ্যান। হেইরাইড চড়ে বেরিয়ে আসতে পারেন পুরোটা যদিও কোভিডের জন্য রাইড থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়।

আবার ‘অ্যানিমাল বার্ন’ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে ভেড়া, ঘোড়া বা মুরগির দল। তারা বড্ড আদুরে। আগেরবছর গাড়ির ভিতর থেকেই দেখা যেত এই স্বপ্নপুরী। এবার মাস্ক পরলে তবেই প্রবেশাধিকার গ্রাহ্য হবে। হঠাৎ চোখে পড়লো নববিবাহিত ফোটোশ্যুট। আকাশ ওদিকে মিশেছে টিউলিপের গালে। যেন আলতো চুমু খেয়ে যাচ্ছে রঙিন আদরে। পাপড়ি খুলছে নববধূর অবগুণ্ঠনে। রামধনু রঙে সাজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ওদের আলিঙ্গনাবদ্ধ জীবন। একটু কাছে গিয়ে দেখি টিউলিপ দিয়ে সাজানো ব্রাইডের ‘ভেইল’ আর গ্রুমের বুকপকেটে গোলাপের জায়গায় লাল টিউলিপ। সত্যি তবে টিউলিপ অক্ষরে লেখা হবে ওদের প্রেমকাব্য। ফুলের রাজ্যে কিছুক্ষণের  জন্য মুছে গেল সব ক্লান্তি। পৃথিবী তাহলে আবার শান্ত হতে পারে হয়তো!

আমরাই দায়ী আজ এই মহামারীর জন্য। কত সহ্য করত পৃথিবী! তার রোষ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় তাকে যত্নে রাখা। ফুলের আদরে হোক বা সচেতনতায়, সুস্থ চিন্তাধারা ছাড়া রক্ষা পাওয়া এখন অসম্ভব।

১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল  মার্কিন সেনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। কিন্তু সেদিন যেন প্রথমবার তার মর্ম বুঝলাম মনে-প্রাণে। রাজতন্ত্র, ক্ষমতা, মিথ্যাচার, লোভ সবকিছুই দায়ী এই অবস্থার জন্য। ধর্মের নামে ভোটব্যাঙ্ক বা সাধারণের ভাত মেরে রাজার মুকুট– ধরিত্রী মায়ের নজর এড়ায় না কিছুই। জঙ্গল দুমড়ে মুচড়ে ফ্ল্যাটবাড়ি হোক বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রকোপে আধুনিকতা, নিশ্বাস তো অনেককাল আগেই দূষিত। ভাইরাস কি পারবে চক্ষুলজ্জা আনতে? তবেই হয়তো সতেজতার সবুজে একটা বসবাসযোগ্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে পারব আমরা।

(নিউ জার্সির বাসিন্দা সুষ্মিতা রায়চৌধুরী একজন ব্লগার ও লেখিকা।)

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More