রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৭

সংবিধানের শিরে সংক্রান্তি, পুলিশ পেটাচ্ছে সিবিআইকে!

অরুণাভ ঘোষ

কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে সিবিআইয়ের কর্মীরা জিজ্ঞাসাবাদ করতে যাওয়া নিয়ে কেন্দ্র বনাম রাজ্যের যে লড়াইটা হল তা ভারতীয় সংবিধানের জন্য ভয়ংকর।

পাঁচ বছরের কিছু বেশি সময় আগে চিটফান্ড কেলেঙ্কারির কথা জানা গিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই চিটফান্ড কাণ্ডের তদন্তের ভার পেয়েছে সিবিআই।

শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশের আগে রাজ্য সরকার এই তদন্তের জন্য একটা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশান টিম বা সিট গঠন করেছিল। সেই সিটের মাথায় ছিলেন কলকাতার বর্তমান পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার। সিবিআইয়ের অভিযোগ, সেই তদন্তের বেশ কিছু নথি রাজীব কুমারের কাছে রয়েছে। বারবার বলার পরও তিনি এই সব নথি সিবিআইকে দেননি।
অনেকেই অভিযোগ করছেন যে সিটের নেতৃত্ব দেওয়ার সময়ে এই চিটফান্ড কেলেঙ্কারির মূল অভিযুক্তদের আড়াল করার জন্য যা যা করা দরকার সব কিছুই করেছেন রাজীব কুমার।

সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানতে পারছি এই তদন্তের জন্য দীর্ঘ দিন ধরেই রাজীব কুমারকে ডেকে পাঠাচ্ছে সিবিআই। কিন্তু উনি যাননি। আমার ধারণা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারণ করেছেন বলেই উনি যাননি।
আইনে দু’রকম ধারা আছে। একটার মাধ্যমে তদন্তকারী সংস্থা যে কোনও কাউকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। আরেকটা ধারার মাধ্যমে তদন্তকারী সংস্থা যে কোনও লোককে তার কাছে থাকা সেই তদন্ত সংক্রান্ত সমস্ত কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।

ইন্ডিয়ান পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৬১ তে স্পষ্ট বলা আছে, যে কোনও তদন্তের জন্য পুলিশ প্রয়োজন মনে করলে কোনও অপরাধ দমনের স্বার্থে বা অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য জানতে কারও বাড়িতে এসে তার সঙ্গে কথা বলতে পারে। এই কারণেই সিবিআই তাঁর বাড়িতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েছিল।

পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল ও পুলিশের একাংশ বলছে সিবিআই রাজীব কুমারকে গ্রেফতার করতে গিয়েছিল। কিন্তু এই কথার পক্ষে কোনও প্রমাণ নেই।

এই ঘটনায় দেখা গেল রাজ্যের পুলিশ কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের কর্তব্যরত কর্মীদের মারছে। এক অভূতপূর্ব ঘটনা – পুলিশই পুলিশকে মারছে! এটা দেখে সাধারণ মানুষের কী ধারণা হবে? তারা কি ধরে নেবে না যে পুলিশকে চাইলে তারাও মারতে পারে?

আপনাদের হয় তো মনে আছে, এই চিটফান্ড কাণ্ডেই গ্রেফতার হওয়া তৃণমূল ঘনিষ্ঠ শ্রীকান্ত মোহতা কিছুদিন আগে পোর্ট ট্রাস্টের জমি বেআইনি ভাবে দখল করে রেখেছিলেন। তারপর পোর্ট ট্রাস্টের আধিকারিকরা যখন সেই জমি ফেরত চাইতে গেলেন তখন স্থানীয় গুণ্ডাদের দিয়ে পিটিয়ে তাঁদের বার করে দেওয়া হয়েছিল। শেষ অবধি কেন্দ্রীয় বাহিনী নামিয়ে এই শ্রীকান্ত মোহতাকে সরাতে হয়। এর পরেই পোর্ট ট্রাস্টের তৎকালীন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তিনি কয়েক কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। শেষ অবধি এই অভিযোগে তাঁকে সাসপেন্ড হতে হয়। এই তদন্তের মূল দায়িত্বে ছিলেন রাজীব কুমার।

রোজভ্যালির মালিক গৌতম কুণ্ডু আজ অবধি যতজনের নাম করেছেন তাদের সবাইকে এখন অবধি জেরা করা হয়নি। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে কি চিটফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে মুখ খুলেছেন?
এই ধরনের কোনও মামলায় সব থেকে বেশি সাজা হতে পারে সাত বছরের। সারদার মালিক সুদীপ্ত সেন এরই মধ্যে পাঁচ বছর জেল খেটে ফেলেছেন। শোনা যাচ্ছে তিনি নাকি নিজেই জেল থেকে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন। বেরোলেই নাকি তাঁর প্রাণ সংশয় হতে পারে।

উপেন বিশ্বাসের নেতৃত্বে বিহারে লালুপ্রসাদ যাদবকে গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। কই সেই সময় তো এরকম কোনও মারপিট দেখা যায়নি! কদিন আগেই তো দিল্লিতে আপের নেতা-মন্ত্রীদের দফতরে ঢুকে জেরা করা হয়েছে। কই তখন তো অরবিন্দ কেজরিওয়াল এমন কিছু করেননি। এমনকি, নরেন্দ্র মোদী গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় তাঁকেও প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে জেরা করেছিল সিবিআই। কই সেই সময় তো গুজরাত পুলিশ তাদের আটকাতে যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট যদি নির্দেশ দেয় যে কোনও বড় নেতা বা মন্ত্রীকে জেরা করতে হবে, তাহলে স্থানীয় পুলিশ গায়ের জোরে তাদের আটকাতে যাবে নাকি! রাষ্ট্রশক্তি থাকলেই যদি সুপ্রিম কোর্টের রায় না মানা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষই বা কেন শীর্ষ আদালতের রায়কে মানতে যাবে?

একটা কথা মনে রাখার দরকার চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে আজ অবধি যতজন গ্রেফতার হয়েছেন সকলেই কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। কিন্তু তিনি নিজে কি এই চিটফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছেন?

রাজীব কুমারকে সিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদ করা নিয়ে ধর্ণায় বসে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য পুলিশের ডিজি থেকে শুরু করে কলকাতার পুলিশ কমিশনারের মতো আইপিএস অফিসাররা সবাই সেই ধর্ণায় গিয়ে বসে পড়লেন। কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা কী করে এই ভাবে যোগ দেয়? ভাবুন তো কাল দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর কোনও ধর্ণায় যদি সিবিআইয়ের প্রধান গিয়ে বসে পড়েন, তাহলে এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই কী বলবেন?

এই নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী যা করলেন তাতে এমনও মনে হতে পারে যে কাল কোনও পুলিশকর্মীর বাড়িতে কোটি কোটি টাকা থাকলেও, কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে আয়কর বিভাগ রেড করতে পারবে না। এমনটা আদৌ হয় নাকি?

দুর্নীতিদমন আইনের আওতায় একটি রীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তনের বিষয়টি জেনে রাখা এ ক্ষেত্রে খুব প্রাসঙ্গিক। আগে কোথাও কোনও অভিযানের আগে উপর মহলের অনুমোদন নেওয়া হতো। কিন্তু হালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে তেমন তেমন বিশেষ জরুরি পরিস্থিতিতে এই অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। এই মর্মে আইনেও পরিবর্তন হয়েছে। সেক্ষেত্রে অভিযানের পরে অনুমোদন নিয়ে নেওয়া যায়। এই পরিমার্জনের মূল কারণ, যাতে অনুমোদন প্রাপ্তির কালক্ষেপে অভিযুক্ত ব্যক্তি টাকাকড়ি বা তথ্যসাবুদ নিয়ে ভেগে না পড়তে পারেন।

আমার মতে সাংবিধানিক রীতিনীতির প্রশ্নে এত উদাসীন কোনও মুখ্যমন্ত্রী ভারতে এর আগে আসেননি।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
লেখক আইনজীবী ও ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের নেতা

Shares

Comments are closed.