অভিষেকের কথায় ফোসকা পড়ছে কেন?

0

শঙ্খদীপ দাস

গত শনিবার ডায়মন্ড হারবারে গিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন স্থানীয় সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এলাকায় কোভিড নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ছিল বৈঠকের মূল অ্যাজেন্ডা। তার পর বৈঠক সেরে বেরিয়ে অভিষেক সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রশাসনের কর্তাদের তিনি বলেছেন, আগামী দু’মাস যেন ডায়মন্ড হারবারে সমস্ত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ থাকে। কোভিড নিয়ন্ত্রণের জন্য ডায়মন্ড হারবার এলাকার হাটে বাজারে দুটো করে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা, ভ্রাম্যমান চিকিৎসকের বন্দোবস্ত করা ইত্যাদি বিবিধ নিয়ম চালু করার সিদ্ধান্তও হয়েছিল সেই বৈঠকে।

বৈঠকের পর অভিষেক সাংবাদিকদের এও জানান, তাঁর ব্যক্তিগত মত হল বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন করা ঠিক নয়। “বড়দিন, দুর্গাপুজো, আর যা যা উৎসব আছে সব পরে হবে। আগে মানুষের জীবন। মানুষ যদি না বাঁচেন তাহলে উৎসবের আর কী থাকবে!”

অভিষেক এ কথা বলার পরই রাজ্য রাজনীতিতে হই হই শুরু হয়েছে। তা শুধু শাসক দলের বাইরে নয়, এ নিয়ে আন্দোলিত তৃণমূলের অন্দরমহলও। কেন? কারণ, এক, তাঁদের প্রশ্ন হল, একজন সাংসদ হিসাবে অভিষেক কি জেলা প্রশাসনের কর্তাদের বৈঠকে ডেকে এ ভাবে নির্দেশ দিতে পারেন? সেই এক্তিয়ার কি তাঁর রয়েছে? দুই, পার্ক স্ট্রিটে বড়দিনের উদযাপন বা গঙ্গাসাগর মেলার আয়োজন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কথা বলেছেন, প্রকারান্তরে তারই বিরোধিতা করেছেন অভিষেক। এতে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবমাননা হল না? কিংবা এই বার্তাই কি যাচ্ছে না যে তৃণমূলে দ্বিতীয় ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হয়েছে!

জেলার ডিএম-এসপিদের নিয়ে ডায়মন্ড হারবার প্রসঙ্গে অভিষেকের বৈঠক ডাকা ও তাঁর মন্তব্য নিয়ে এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে বিস্ময় জাগছে বইকি। এমন কী করেছেন অভিষেক যে শাসক-বিরোধী অনেকেরই ফোসকা পড়ছে! বাংলায় কি এই প্রথম কোনও সাংসদ জেলা প্রশাসনের কর্তাদের ডেকে বৈঠক করলেন! অতীতে বাম জমানায় সিপিএম সাংসদরা কি ডিএম-এসপিদের কখনও বৈঠকে ডাকতেন না। তাঁরা কি জেলাশাসক বা পুলিশ সুপারদের কোনও নির্দেশ দিতেন না? শুধু বাম জমানা কেন, গত দশ বছরে তৃণমূল শাসনে তো এমন ঘটনা বারবারই দেখা গিয়েছে। অভিষেক ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তিনি যা কিছু আলোচনা করেছেন তা ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রিক। এবং স্পষ্ট জানিয়েছেন, এর বাইরে অন্য এলাকার জন্য কোনও নির্দেশ দেওয়ার এক্তিয়ার তাঁর নেই।

কিন্তু এর আগে জেলার পর্যবেক্ষক হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী, অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিমরা কী করতেন? তাঁরা কি কখনও জেলার ডিএম-এসপিদের নির্দেশ দেননি? বিভিন্ন জেলার ডিএম-এসপিরা কি এই সব পর্যবেক্ষদের নির্দেশ পালন করতেন না! বরং সাধারণ ধারণা হল অনেক ডিএম, এসপি-ই এই সব নেতাদের কথাতেই চলতেন। কিছু পদক্ষেপ করার আগে তাঁদের ছুঁয়ে নিতেন। তা হলে কেন তখন হই হই হয়নি?

আরও একটা কথা এখানে প্রাসঙ্গিক। তা হল, গ্রামোন্নয়নের প্রশ্নে জেলার ডিএম-এসপিদের সঙ্গে স্থানীয় সাংসদের বৈঠকের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এমনিতেই রয়েছে। এলাকার সাংসদ তাঁর এলাকার প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সমষ্টিগতভাবে যদি ইতিবাচক পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেন, তাতে অন্যায় কোথায়! বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবারের জন্য যে পদক্ষেপ করা হয়েছে, তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।

দ্বিতীয় বিস্ময়ের কারণ ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিরোধিতা’ করা। সেক্ষেত্রে বলতে হয়, যাঁরা মনে করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করছেন অভিষেক বা সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, তাঁরা হয়তো ভুলই ভাবছেন। হিন্দিবলয়ে একটি কথার খুব চল রয়েছে। তা হল রাবড়ি প্রক্রিয়া। অর্থাৎ নীচের থেকে গরম দাও, উপর থেকে ঠাণ্ডা। মানে সব দিক রেখে চলা। এখানেও তাই হয়েছে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসক হিসাবে উৎসবপ্রেমীদের ভাবাবেগ রক্ষা করে চলার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে অভিষেক চেষ্টা করেছেন প্রগতিশীল ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন শ্রেণির আস্থাকে ধরে রাখার। অর্থাৎ এ হল নিতান্তই রাজনৈতিক কৌশল।

তবে হ্যাঁ, এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে বিষয়টি যদি এতটাই সাদামাটা হয়, তা হলে শাসক দলের মধ্যেই অনেকে অভিষেকের কথায় এতটা অসন্তুষ্ট কেন! কেন তাঁরা হঠাৎ বিপ্লবী হয়ে বলছেন, যে এভাবে প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধাচারণ করে উনি ঠিক করেননি? উত্তরে বলতে হয় যে তৃণমূলে একটা বড় অংশের নেতার ভূমিকা এখন দলে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। এতদিন তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে একচ্ছত্র বা একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কালীঘাট আর কাউকে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দিতে নারাজ। ফলে এই শ্রেণির নেতাদের দর কমেছে। তাঁদের স্বার্থেও আঘাত লেগেছে। ফলে তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কত অনুগত, কতটা আবেগপ্রবণ তা তুলে ধরে অভিষেকের বিরুদ্ধে ঘরে বা কদাচিত সাহস করে বাইরে অসন্তোষ উগরে দিচ্ছেন।

সর্বোপরি রইল দ্বৈত ক্ষমতার কেন্দ্রের প্রসঙ্গ। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এই ব্যবস্থাপনা একেবারেই নতুন নয়। বাংলাতেও নয়। বর্তমানে দেশের প্রধান শাসক দলের কথাই ধরা যাক। সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী সচিবালয় যেমন ক্ষমতার কেন্দ্র, তেমনই সংশয়াতীত ভাবেই আরেকটি ক্ষমতার কেন্দ্র অধিষ্ঠান করছেন নাগপুরে। অটলবিহারী বা়জপেয়ী থেকে নরেন্দ্র মোদী সবাইকেই সেখানে পুজো দিয়েই চলতে হয়েছে।

অতীতে কংগ্রেস জমানাতেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হলেও জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদের সভানেত্রী পদে থেকে ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র ছিলেন সনিয়া গান্ধী। শুধু তাই নয়, মনমোহন সিং সরকারের আনা বিল সাংবাদিক বৈঠকে ছিঁড়ে ফেলে রাহুল গান্ধীও প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন যে তিনিও আরেকটি ক্ষমতার কেন্দ্র।

বাংলায় বাম জমানায় জ্যোতি বসুর উচ্চতার সামনে আলিমুদ্দিন বরাবরই খাটো ছিল। কিন্তু তাও আলিমুদ্দিনের কথা শুনে বহু সময়েই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে বা বদলাতে হয়েছিল জ্যোতিবাবুকে। বুদ্ধদেব ভটাচার্য জমানায় তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

তবে এসবের মানে এই নয় যে অভিষেকের ভূমিকা পুরোপুরি সমালোচনার ঊর্ধ্বে। সেই অবসর অবশ্যই রয়েছে। গত প্রায় মাসাবধি ডায়মন্ড হারবারে অভিষেকের পৌরোহিত্যে এমপি কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়েছে। বিশেষ করে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আর ফাইনালের দিন আয়োজনের আতিশয্য ছিল দেখার মতো। সেই ঠেলাঠেলি ভিড়ে সোশাল ডিস্টেন্সিংই হারিয়ে গিয়েছিল। সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কা তখনও ছিল। কোভিড নিয়ে সাংসদের এখনকার সিরিয়াসনেস সেদিন দেখা যায়নি।

মজার ব্যাপার হল, তা নিয়ে বিরোধী রাজনীতিকদের অনেকেই বিশেষ কিছু বলছেন না। কারণ, দিলীপ ঘোষ যেমন তাঁর কর্মসূচিতে কোভিড বিধি শিকেয় তুলে রেখেছেন, তেমনই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দেখা গিয়েছে দিন-রাতের ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করতে। এ ব্যাপারে সবাই সমান!

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.