মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ছিল অতুলনীয়, বেশ মনে আছে কুতুবউদ্দিনের কথা

0

জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী
(অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনা প্রধান)

তখন আমি ভারতীয় সেনার একজন মেজর। ডিফেন্স স্টাফ কলেজ থেকে কোর্স শেষ করে বেরিয়ে সবে নতুন পোস্টিং পেয়েছি।

আচমকাই বদলির অর্ডার। যেতে হবে কলকাতা। চলেও এলাম চটজলদি। কলকাতায় এসে দেখি বাঙালি সেনা অফিসারে ভরে গিয়েছে ফোর্ট উইলিয়াম। দেশের নানা প্রান্ত থেকে বাঙালি অফিসারদের ইস্টার্ন কমান্ডে নিয়ে আসা হল। যাকে বলে ঝেঁটিয়ে নিয়ে আসা। আমরা তো অবাক। অনেকেই ভালো পোস্টিংয়ে ছিল। কেউ নর্থ ইস্টে, কেউ কাশ্মীরে একবারে ফ্রন্টলাইনে পোস্টেড ছিল। আমারই সব ব্যাচমেট। জিজ্ঞাসা করলাম, তুই এখানে কেন? তুই তো কাশ্মীরে ছিলি। বলল, হ্যাঁ, ভাই আমাকে ওভার নাইট এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। আর এক বন্ধু, সে ছিল লখনউ-এর বাঙালি। পদবি সেনগুপ্ত। কিন্তু এক বর্ণ বাংলা জানে না। সে রিকোয়েস্ট করে, ‘মুঝে তো বাংলা নহি আতা হ্যায়। মুঝে কিউ ভেজ রহে হো।’ ওকে বলেছে, ‘তুম সেনগুপ্তা। তুমে জানা পরে গা।’

 

অনেক পরে জেনেছিলাম, এটাও ছিল যুদ্ধের একটা কৌশল। পূর্ব পাকিস্তানেও পাক সেনার বড় অংশই ছিল উর্দুভাষী। বাঙালি জওয়ান-অফিসার ছিলেন হাতেগোনা। বাঙালি সেনার বেশিরভাগেরই পোস্টিং দেওয়া ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। এদিকে মুক্তি বাহিনীর কেউ আবার এক বর্ণ হিন্দি-উর্দু বোঝে না। আমাদের মত তরুণ বাংলাভাষী অফিসারদের আগেভাগে ইস্টার্ন কমান্ডে বদলি করা হয়েছিল ভাষার সমস্যার কথা মাথায় রেখেই। আমার দায়িত্ব ছিল মুক্তি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করা।

ওদের সঙ্গে কাজ করা, যুদ্ধের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে মন খুশিতে ভরে যায়। নিজের দেশের সেনা বাহিনীর হাতে অত্যাচারিত একটা জাতি যে এভাবে দেশকে স্বাধীন করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন। আমি তা দেখেছি। মুক্তি বাহিনীর তরুণ ছেলে মেয়েদের মধ্যে সাহস এবং দেশপ্রেম ছিল অতুলনীয়। নইলে একটা সেনার বিরুদ্ধে এভাবে লড়াই করা যায় না। ভারতীয় সেনা তাঁদের পাশে ছিল একথা সত্যি। তাই বলে মুক্তিবাহিনীর কৃতিত্বকে খাটো করা হলে ভুল হবে।

ফোর্ট উইলিয়ামে কিছুদিন কাটানোর পর আমাদের সীমান্তের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হল। আমি ছিলাম নদিয়া সীমান্তে, সেখান থেকে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনার দায়িত্ব পালন করত আমাদের সেক্টর। যুদ্ধের কৌশল হিসেবেই অনেক সময়ে সাদা পোশাকে থাকতে হত। তার কারণ, কিছু লোক পাক সেনার হয়ে কাজ করত। তাদের খবরাখবর পৌঁছে দিত। একটা ঘটনা মনে আছে, একদিন রাস্তায় ভারতীয় জওয়ানেরা রোকো রোকো বলে দৌঁড়ে এসে আমার জিপ দাঁড় করালো। জানতে চাইল, কন হ্যাঁয় তুম? কাঁহা যানা হ্যায়? সাদা পোশাকে থাকায় ওরা আমাকে চিনতে পারেনি। আমার গাড়ি চালকও ছিলেন মুক্তিবাহিনীর একজন জওয়ান। এলাকা চিনতে মুক্তিবাহিনীর স্থানীয় যোদ্ধাকে গাড়ির চালক হিসাবে দেওয়া হয়েছিল।

সবাই জানেন, জেনারেল শ্যাম মানেকশ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর জন্য কিছুদিন সময় চেয়েছিলেন। সামরিক কৌশল হিসেবে সেটা একেবারেই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। ১৯৭১-এর মার্চের শেষ দিকে পাক সেনা পূর্ব পাকিস্তানে খতম অভিযান শুরু করে। আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী চেয়েছিলেন, এপ্রিলেই পাকিস্তান আক্রমণ করুক আমাদের সেনা। জেনারেল মানেকশ প্রধানমন্ত্রীর মুখের উপর বলেছিলেন, যুদ্ধ শুরু করাই যায়। কিন্তু বিজয়ের গ্যারান্টি দিতে পারব না। যুদ্ধ জিততে হলে প্রস্তুতির জন্য সময় দরকার।

এটা ঠিক যুদ্ধের কৌশল যুদ্ধভূমির কথা মাথায় রেখে স্থির করতে হয়। পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ নদী নালায় ভরা। কীভাবে ভারতীয় সেনা সেখানে অপারেট করবে তা ছকে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ যুদ্ধ শুরুর পর চিন কী ভূমিকা নেয় সেটাও মাথায় রাখতে হয়েছিল জেনারেল মানেকশ-কে। শেষ পর্যন্ত আমাদের বিজয় হয়েছে এবং চিরশত্রু পাকিস্তানকে আমি দু-টুকরো করে দিতে পেরেছি।

মুক্তি বাহিনীর প্রসঙ্গে ফিরে যাই। এই বাহিনী ছিল পাকিস্তানের কাশ্মীর কৌশলেরই একটা প্রতিরূপ। দেশভাগের পর থেকেই পাকিস্তান চেষ্টা চালিয়েছে, সাধারণ কাশ্মীরিদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ওই ভূখণ্ড কেড়ে নিতে। পাকিস্তান সফল হয়নি। কিন্তু ওদের জবাব দিতে একই কৌশলে তৈরি হয়েছিল মুক্তি বাহিনী। ওদের নাগরিকেরাই দেশটাকে দু-টুকরো করে পৃথক একটা দেশের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেশ কয়েকবার আমার ওদেশে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। যে সব জায়গায় যুদ্ধ করেছি, সেই কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সুন্দরবনে গিয়েছি।

আমি অবসর নেওয়ার মুখে শেখ হাসিনার সরকার একবার আমন্ত্রণ জানায়। আমি তখন সরকারকে বলেছিলাম, আমি অবসরের মুখে। সরকার চাইলে অন্য কাউকে পাঠাতে পারে। আমাকে জানানো হয়, ওই দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বললাম, বেশ, উনি যখন ডেকেছেন, অবশ্যই যাব।

বাংলাদেশ সফর সব সময়ই খুব আনন্দের। গেলেই নানা সভা-অনুষ্ঠানে শুনতে হত, ‘স্যার মনে আছে? স্যার মনে আছে?’ সবাইকে তো আর মনে রাখা সম্ভব নয়। একটা সফরে হঠাৎ আমার ড্রাইভার এসে হাজির। তাঁর নাম কুতুবউদ্দিন। কুতুব বলে ডাকতাম। তিনি ছিলেন মুক্তি বাহিনীর জওয়ান। যুদ্ধের সময় কিছুদিন আমার গাড়ির চালক ছিলেন। আমার থেকে বয়সে বড়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে উনি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে চাকরি করতেন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেন। ওঁর সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল দারুণ একটা মুহুর্ত। বেশ মনে আছে ওঁর কথা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার এ বছর ৫০ বছর। আমাদেরও একাত্তরের যুদ্ধ বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী। নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নতি ঘটিয়েছে। ছোট খাটো কিছু দেশীয় শিল্প ছাড়া ওঁদের প্রায় কিছুই ছিল না। আজ আমরা যে আত্মনির্ভরতার কথা বলছি, বাংলাদেশ তার অনেকটাই অর্জন করেছে। এটা ভারতের জন্য যেমন আনন্দের তেমন ওদের কাছ থেকে শেখারও বটে। তাই দু’দেশের সম্পর্ক আরও মজবুত করা দরকার বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে ফরাক্কা, তিস্তার জল বন্টন প্রসঙ্গে আমাদের কূটনীতি রাজনীতিক রাষ্ট্র পরিচালকদের উদার মনোভাব নিতে হবে বলে আমার মত।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর। ঢাকায় পরাজয় স্বীকার করল পাকিস্তান। জন্ম নিল নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ১৩ দিনের মুখোমুখি যুদ্ধের সূচনা হয় ৩ ডিসেম্বর। মুক্তি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানকে দু-টুকরো করে দেয় ভারতীয় সেনা। ভারতীয় সেনার তৎকালীন মেজর শঙ্কর রায়চৌধুরী পরবর্তীকালে দেশের সেনা প্রধান হন। দেশের সেনা বাহিনীর সেই বিজয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে যুদ্ধের দিনগুলির কথা দ্য ওয়াল-কে শুনিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা প্রধান।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.