লতা মঙ্গেশকর, শচীনকে কি এবার পুলিশ জেরা করবে?

কথায় আছে, বন্ধু যখন শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, তখন সে হয় সবচেয়ে বিপজ্জনক। বিজেপির বহুদিনের পুরানো বন্ধু ছিল শিবসেনা। মতাদর্শগতভাবে দুই দলই হিন্দুত্ববাদে বিশ্বাসী। সবাই ধরে নিয়েছিল তারা স্বাভাবিক মিত্র। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে শুরু হয়েছে শত্রুতা। সেই শত্রুতা বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় পৌছেছে যে, কাউকে বিজেপির সমর্থক বলে সন্দেহ হলেই তার বিরুদ্ধে শিবসেনা সরকার তদন্তের হুকুম দিচ্ছে। এমনকি সেই ব্যক্তি যদি ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত হন, তা হলেও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না।

কৃষক আন্দোলন সম্পর্কে কয়েকজন ভারতীয় সেলিব্রিটির টুইট নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা-কংগ্রেস জোট সরকার। টুইট যুদ্ধ প্রথমে শুরু করেছিলেন বিদেশি সেলিব্রিটিরা। আমেরিকার পপ তারকা রেহানা বা বিশ্বজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ কৃষকদের সমর্থন করেছিলেন। পাল্টা টুইট করেছিলেন কয়েকজন ভারতীয় সেলিব্রিটি। তাঁদের মধ্যে দু’জন ভারতরত্ন আছেন। লতা মঙ্গেশকর ও শচীন তেণ্ডুলকর।

শচীন তেণ্ডুলকর লিখেছিলেন, ‘ভারতের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনও আপস নয়। ভারতীয়রা নিজেরাই নিজেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে জানে। আসুন আমরা জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ থাকি।’ লতা মঙ্গেশকর লিখেছেন, ‘ভারত এক গৌরবময় জাতি। … একজন গর্বিত ভারতীয় হিসাবে আমি মনে করি, যে কোনও সমস্যা আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ পথে সমাধান করতে পারব।’ অভিনেতা অক্ষয় কুমার লিখেছেন,কৃষকরা দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যারা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়, তাদের উপেক্ষা করাই শ্রেয়। আমি চাই, সমস্যার বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান হোক। সাইনা নেহাওয়ালও লিখেছেন, যাবতীয় বিরোধের বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধানই তিনি কামনা করেন।

লক্ষণীয় বিষয় হল, আমাদের সেলিব্রিটিরা সরাসরি কৃষক আন্দোলনের বিরোধিতা করেননি। কোথাও বলেননি যে, যারা দিল্লির সীমান্তে রাস্তা আটকে রেখেছে, তাদের মেরে তুলে দাও। কিংবা সবাইকে জেলে পোর। তাঁরা শুধু বলেছেন, কৃষি আইন নিয়ে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার ‘অ্যামিকেবল সলিউশন’ অর্থাৎ বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান চান। এতেই কংগ্রেস ও শিবসেনার হয়েছে রাগ।

শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিক হিসাবে তাঁরা আর কী বলতে পারতেন? তাঁরা যদি সরকার ও কৃষকদের মধ্যে বন্ধুত্বের বদলে শত্রুতা চাইতেন, তাহলেই কি শিবসেনা বা কংগ্রেসের মনঃপুত হত? মনে রাখতে হবে, কংগ্রেসের সাংসদ শশী তারুরের নামে জনগণের বিরুদ্ধে শত্রুতা সৃষ্টির অভিযোগে মামলা করেছে দিল্লি পুলিশ।

বিরোধীরা বেশ কয়েকবছর ধরে ভোটে বিজেপির সঙ্গে সুবিধা করতে পারছে না। চলতি বছরেই পশ্চিমবঙ্গ সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বিধানসভা ভোট আছে। সেই সব রাজ্যেও বিরোধীদের অবস্থা টলমল। অনেক সময় বিরোধীরা জনসমর্থন হারালে গোলমাল পাকিয়ে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করে। কাউকে যদি শত্রু মনে করে তার ওপরে প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস-শিবসেনা সরকারের আচরণে সেই মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে।

সোমবার জানা যায়, মহারাষ্ট্রের কংগ্রেস নেতা শচীন সাওয়ান্ত ফোনে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, সেলিব্রিটিরা যেভাবে সবাই মিলে একইসঙ্গে টুইট করেছেন, তাতে মনে হয় তাঁরা বিজেপি সরকারের চাপে পড়ে এই কাজ করেছেন। পরে অনিল দেশমুখ বলেন, সেলিব্রিটিরা প্রায় একই ভাষায় টুইট করেছেন। কেন এমন হল তা নিয়ে তদন্ত করা হবে।

ইংরেজিতে একটা ইডিয়ম আছে, গ্রেট মেন থিংক অ্যালাইক। এই কঠিন সময়ে দেশের সেরা শিল্পী ও খেলোয়াড়রাও একই রকম চিন্তা করছেন। তাঁরা চাইছেন কৃষক আন্দোলন নিয়ে যেন আর অশান্তি না হয়। সব কিছু ভালয় ভালয় মিটে যায়। ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি একই ভাবনা নিয়ে লিখলে ভাষার মধ্যে মিল তো আসবেই। অনিল দেশমুখ কি এটা বোঝেন না? নাকি বুঝতে চাইছেন না?

তিনি কীরকম তদন্ত করার কথা বলছেন? পুলিশ কি এবার লতা মঙ্গেশকর, শচীন তেণ্ডুলকরদের বাড়িতে হানা দেবে? লতা নিশ্চয় পপ স্টার রেহানার মতো ধনী নন। তিনি দরিদ্র দেশের কন্যা। কিন্তু কণ্ঠসম্পদে তাঁর তুল্য গায়িকা সারা বিশ্বে কমই আছে। পুলিশ কি এখন সরস্বতীর বরপুত্রীকে প্রশ্ন করবে, আপনি অমন টুইট করলেন কেন?

শচীন তেণ্ডুলকর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেট প্রতিভাদের একজন। পুলিশ কি তাঁর কাছে জানতে চাইবে, আপনি কৃষক আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছেন কেন?

গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের বিরোধিতা করার স্বাধীনতা নিশ্চয় আছে। কিন্তু সরকারের পক্ষে বলার স্বাধীনতাও কি নেই? তাছাড়া কৃষি আইন নিয়ে দু’টি ভিন্ন মত আছে। অনেকে যেমন তার বিরোধিতা করেছেন, পক্ষেও বলেছেন অনেকে। গতবছর আইএমএফের চিফ ইকনমিস্ট গীতা গোপীনাথ কৃষি বিলকে সঠিক পদক্ষেপ বলেছিলেন। তিনি কি কিছু না বুঝেই বলেছিলেন?

সত্যি যদি সেলিব্রিটিদের পুলিশি তদন্তের মুখে পড়তে হয় তাহলে বলতে হবে দেশে অসহিষ্ণুতা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌছেছে। বিরোধীরা প্রায়ই মোদীকে গাল দিয়ে বলেন, তিনি নাকি ভিন্ন মত সইতে পারেন না। কিন্তু যাঁরা একথা বলেন, তাঁরা নিজেরা যে কী, তা এবার দেশের মানুষ বুঝতে পারবেন।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More