‘সুপারম্যান’ ডক্টর জোসেফের আলিঙ্গনে যেন কষ্ট ভোলেন রোগীরা, টানা ২৬৭ দিন ছুটি নেননি তিনি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বের নানা প্রান্তে যুগে যুগে অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসকদের অসংবেদনশীলতার। এখন গত এক বছর ধরে তারই সমান্তরাল অতিমারী বিধ্বস্ত পৃথিবীতে এক অন্য রূপে ধরা পড়ছেন তাঁরা। নিজেদের নিরাপত্তার পরোয়া না করে, ঝুঁকির মুখে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে  কোভিডের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত লড়াইয়ে সামিল চিকিৎসকরাই।

এমনই এক সময়ে সামনে এসেছে আমেরিকার চিকিৎসক ডক্টর জোসেফ ভারনের কথা। হাউস্টনের ইউনাইটেড মেমোরিয়াল মেডিক্যাল সেন্টারের চিকিৎসক গত ২৬৭ দিন ধরে একটানা কাজ করে চলেছেন হাসপাতালে। সেই মার্চ মাস থেকে একটা দিনও ছুটি নেননি ৫৮ বছরের এই চিকিৎসক।

Meet the "Covid Hunter" of Houston - BBC News

একটি সাক্ষাৎকারে ভারন বলেছেন, “আমায় এটা করতেই হতো। আমার সারা দেশ মহামারীতে তোলপাড়, রোজ হাজার মানুষ মরছেন, আমার হাসপাতালে রোগীরা ধুঁকছেন, আমায় তো এটা করতেই হতো! আমি তো পারি না এ সময়ে ছুটি নিতে।”

তিনি আরও বলেন, “এটা একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি। আমরা যেন অপেক্ষা করছি, কখন পরের বোমাটা পড়বে। আমাদে যা আছে তাই দিয়েই লড়তে হবে। আকাশ থেকে হঠাৎ কোনও সমাধানের সূত্র এসে পড়বে আমাদের হাতে, এমনটা তো হবে না। তাই সর্বোচ্চ দিয়ে লড়তে হবে।”

'Covid Hunter' US Doctor Has Not Had A Single Day Off Since March

মেক্সিকো সিটিতে জন্ম জোসেফের। নিউমোনোলজি, ইনটেনসিভ কেয়ার, ইন্টারনাল মেডিসিন এবং জেরিয়াট্রিক্সে বিশেষজ্ঞ তিনি। ১৯৮৫ সালে যখন জোসেফ মেক্সিকো সিটির একটু বড় হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করছেন, তখন মেক্সিকোতে আছড়ে পড়েছিল ৮.১ ম্যাগনিটিউডের ভয়াবহ ভূমিকম্প। সে সময়ে বহু মানুষের শুশ্রূষা করেছিলেন তিনি, মারাও যেতে দেখেছিলেন অনেককে।

তিনি বলেন, “আমি সারা জীবন ধরে আমার চোখের সামনে বহু বিপর্যয় দেখেছি। কিন্তু এই করোনার মতো ভয় আমি আগে কখনও পাইনি। এটাকে আগে থেকে বোঝা যাচ্ছে না, বোঝার পরেও অনেক সময়েই কিছু কাজ করছে না। হু হু করে রোগী আসছে।”

তবে সাধারণ মানুষ আরও সচেতন হলে, সামাজিক দূরত্ব মেনে চললে, মাস্ক পরলে এ পরিস্থিতি একটু ভাল হতে পারত বলে মনে করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জোসেফ বলেন, “এ যেন আমি চোখের সামনে দেখছি মানুষ ড্রাগ নিচ্ছে, তাদের বলে চলেছি, যে এই ড্রাগ তাদের মৃত্যুর কারণ হবে, কিন্তু তবু তারা আমারই চোখের সামনে ড্রাগ নিয়েই চলেছে। কষ্ট হয়, খুব কষ্ট হয়।”

COVID crisis in Texas: An 'overwhelming' battle to save lives - ABC News

একজন চিকিৎসক যখন সব ফেলে ২৬৭ দিন ধরে একটানা ডিউটি করছেন, চোখের সামনে মানুষের মৃত্যু দেখছেন, চেষ্টা করেও হেরে যাচ্ছেন, তখন মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ যে তাঁকে ব্যথা দেবে, সেটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, “মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমার ভয় করছে, সকলে ভাবছেন, ভ্যাকসিনই হয়তো উত্তর। এই ভেবে তাঁরা সব নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে উঠে গেছেন। আমাদের সকলকে সব বিধি মানতে হবে, এটাও অতিমারী নিয়ন্ত্রণের একটা মূল ধাপ।”

জোসেফের এই লাগাতার পরিশ্রম এবং ঝুঁকির সামনে অসহায় তাঁর স্ত্রীও। ৩৪ বছরের তরুণী তাঁকে জানিয়েছেন, “তুমি তো সুপারম্যান নও!” জোসেফ উত্তর দেন, “এই সময়ে আমায় তাই হতে হবে, উপায় নেই।”

তাঁর রসবোধের জন্যও তিনি পরিচিত গোটা হাসপাতালে। নিজের পিপিই কিটে নিজের একটা ছবি সেঁটে নিয়ে রোগী দেখেন তিনি। কারণ ডাক্তারের মুখ দেখাটা রোগীর জন্য জরুরি। পিপিই-র বোঝায় সে উপায় তো সেই! এভাবেই তিনি ভাগ করে নেন তাঁদের সমস্ত সুখ, দুঃখ, হাসি কান্না।

Doctor in heartbreaking Covid-19 photo pleads with public to slow the spread - CNN

দিন কয়েক আগেই তাঁরই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এক বৃদ্ধ। স্ত্রীকে ছেড়ে হাসপাতালে ভীষণই একাকীত্বে ভুগছিলেন তিনি। করোনা আইসিইউ-তে ঢুকতে গিয়ে অসহায় সেই বৃদ্ধকে দেখতে পান ডক্টর জোসেফ। দেখেন, ওই বৃদ্ধ নিজের বেড থেকে নেমে বেরোনোর চেষ্টা করছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধকে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন তিনি।

জোসেফের কথায়, ‘‘উনি বারবার বলছিলেন, স্ত্রীর কাছে যাওয়ার কথা। শুনে আমি ওঁকে জড়িয়ে ধরেছিলাম বুকের মধ্যে। উনি কেবলই কাঁদছিলেন। তবে আমার আলিঙ্গনের পর একটু একটু করে কান্না কমে গিয়েছিল। আসলে উনি একটা ঘরে দিনরাত বন্দি হয়ে আছেন, যেখানে সকলেই তাঁর অচেনা।’’

এই করোনার সময়ে সকলেই যখন সকলের থেকে দূরে, তখন করোনা আক্রান্ত রোগীকে জড়িয়ে ধরা চিকিৎসকের সেই অমূল্য মুহূর্তটি লেন্সবন্দি করে ফেলেন ফোটোগ্রাফার গো নাকামুরা। ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায় তখনই। এর পরেই সামনে এল ডক্টর জোসেফের এই অসাধারণ কীর্তির কথা।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More