বঙ্গ সিপিএম শুধুই ফেসবুকে, বিধানসভায় নেই, ডিজিটাল রাংতায় কৌশলের ঘুঁটে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১০ বছর আগেও পার্টিটা সরকার চালাত। দু’দিন আগেও কয়েক ডজন বিধায়ক ছিল তাদের। কিন্তু একুশের ভোট গণনা হতেই সিপিএম ভ্যানিশ। বিধানসভায় যেতে পারলেন না একজনও সিপিএম তথা বাম প্রার্থী। রক্তক্ষরণ চলছিল। উনিশের লোকসভার পর রক্তশূন্যতার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। আর একুশের ভোটে সিপিএম যেন কঙ্কাল!

কিন্তু সিপিএম কি নেই?

অনেকে বলছেন, আলবাৎ আছে। সিপিএম আছে ফেসবুকের ওয়ালে, সিপিএম আছে বিচ্ছিন্ন টুইটারে, সিপিএম আছে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। শুধু বিধানসভায় নেই।

কেন নেই?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়তো খুব শিগগির গুরুগম্ভীর পর্যালোচনা বৈঠক ডাকবেন সূর্য মিশ্র। জেলাগুলি থেকে গাড়ি চেপে রাজ্য কমিটির বৈঠকে যাবেন নেতারা। কিন্তু তাতে আর কী হবে! গতকাল বিকেল থেকেই অনেক সিপিএম কর্মী বলতে শুরু করেছেন, ‘আমাদের পার্টিটাকে এসইউসি বানিয়ে দিলেন নেতারা।’

এবারের ভোটে সিপিএম আলোচনায় থেকেছে ব্যাপক ভাবে। তা মূলত সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচার নিয়ে। ব্রিগেডের আগে যার শুভ মহরৎ হয়েছিল। টুম্পা সোনার প্যারোডি হু হু করে ভাইরাল হয়েছিল ইনবক্সে ইনবক্সে। তারপর হরতেক রকম পোস্টারের সেট, ডজন খানেক প্যারোডি গান বেঁধে সিপিএম হইহই ফেলে দিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু ইভিএম খুলতেই নিকষ নীরবতা। ভোট কই?

অনেকে ইতিমধ্যেই বলতে শুরু করেছেন, ডিজিটাল রাংতায় মোড়া ছিল ভুল কৌশল। উপরটা চিকনচাকন হলেও ভিতরে আসলে ঘুঁটে ছিল। ইভিএম খুলতেই তা বেরিয়ে পড়েছে। সিপিএমের অধিকাংশ জেলার নেতাকর্মীদের এখন আক্রমণের মুখে মহম্মদ সেলিম। তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বইছে। তাঁদের মতে, সেলিমের নেতৃত্বেই মুসলমান ধর্মগুরুকে চিত্রনাট্য মুখস্থ করিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সাজানো হয়েছিল। তৃণমূলের দখলে থাকা সংখ্যালঘু ভোট ভাঙার যে কৌশল আলিমুদ্দিন নিয়েছিল তা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাতে যেটা হয়েছে সেটা হল, বাম এবং কংগ্রেসের শক্তি থাকা মালদহ, মুর্শিদাবাদেও সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের দিকে পুঞ্জীভূত হয়েছে।

গতকাল ভোটের ফল প্রকাশের পরেই সিপিএম নেতা তথা উত্তর দমদমদমের বিদায়ী বিধায়ক তন্ময় ভট্টাচার্য সরাসরিই বলেছেন, এক পলিটব্যুরোর সদস্য আইএসএফ-কে চাপিয়ে দিয়েছিল ঘাড়ে। তাঁর দায় নেতৃত্বকেই নিতে হবে। তন্ময়ের টার্গেট কে তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি।

প্রসঙ্গত, আব্বাসউদ্দিন সিদ্দিকিকে নিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর বিস্তর আপত্তি ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের অনেকের মতে, সিপিএম কার্যত ভাইজানকে জোটে রাখতে চাপ দিয়েছিল। আব্বাসও অধীর-বিরোধী অবস্থান নিয়ে চলেছেন বরাবর। ব্রিগেডের মঞ্চেও সেই দূরত্ব চোখে পড়েছিল।

২০১৬ থেকে সিপিএম-কংগ্রেস জোট ধাক্কা খাচ্ছে বাংলায়। ১৬-র ভোটের পর পার্টি কংগ্রেসের সঙ্গে দোহাই দিয়ে জোট ভেঙে দিয়েছিল আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। তারপর আবার উনিশের ভোটের আগে জোট আলোচনা শুরু করেন সূর্য মিশ্র-অধীর চৌধুরীরা। কিন্তু তাও ধাক্কা খায়। আলোচনা শেষ হওয়ার আগেই প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে দেয় বামেরা। তারপর জোট আর হয়নি।

আবার একুশের আগে গত বছর জুলাই থেকে দৌত্য শুরু করে বামেরা। তখন সোমেন মিত্র জীবিত। বামেদের বিধান ভবনে যাওয়া, কংগ্রেস নেতাদের আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে আসার মধ্যে দিয়ে ঐক্যের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল, নেতাদের মধ্যে ঐক্য হলেও জনগণ এই তথাকথিত সংযুক্ত মোর্চাকে কার্যত বিলীন করে দিয়েছে। বিজেপি বিরোধী ভোট এককাট্টা হয়েছে তৃণমূলের দিকে। দিদিকেই বিজেপি বিরোধী মুখ হিসেবে আঁকড়ে ধরেছে বাংলা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, যতই কোনও দল প্রচারে চাকচিক্য দেখাক তাদের যদি রণকৌশলে ভুল থাকে তাহলে তা গোঁত্তা খেয়ে পড়বেই। কারণ মানুষকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। আর যে বামপন্থীরা কথায় কথায় বলেন মানুষই ইতিহাস রচনা করেন তাঁরাই বাস্তব পরিস্থিতি, মানুষের মনোভাব না বুঝে খাতায়-কলমে পাটিগণিত কষে জোট করলে এই হয়।

তা ছাড়া এবার ভোটে সিপিএম অনেক তরুণ মুখকে প্রার্থী করেছিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, সেটাও কেরলকে টুকলি করতে গেছিল বঙ্গ সিপিএম। তাঁদের মতে, কেরল সিপিএম তরুণদের নেতৃত্বে তুলে নিয়ে আসার বিষয়ে ধারাবাহিক অনুশীলন চালায়। কিন্তু বাংলায় ভোটের আগে সিপিএম তরুণদের শোকেস সাজিয়েছিল। মানুষ দেখেছে। প্রশংসা করেছে। আবার চলে গেছে।

সিপিএমের এই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাওয়ার প্রশ্নে চুম্বকে একটা বিষয় স্পষ্ট— কৌশলেই গলদ। ইঞ্জিন খারাপ হলে রেলের বগি যতই চকচকে হোক, চাকা গড়াবে না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More