পুরুষজনিত বন্ধ্যত্ব সারানো সম্ভব, অনেক আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আছে

চৈতালী চক্রবর্তী

প্রচলিত কিছু ধ্যানধারণার কারণে বন্ধ্যত্বের সঠিক চিকিৎসায় সমস্যা থেকে যায় অনেক সময়ে। এমনই একটি ধারণা হল, বন্ধ্যত্ব নারীর একার সমস্যা। তা আদতে কখনওই নয়। সম্প্রতি ভারতে সন্তানহীন দম্পতির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তার ‘দায়’ মহিলাদের ওপরেই চাপানো হয় বেশিরভাগ সময়ে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই ইরেকটাইল ডিসফাংশন, সেক্সুয়াল ডিসফাংশন নিয়ে আদতে বন্ধ্যত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ান পুরুষরাই।

বস্তুত, সন্তানধারণের জন্য যেমন সুস্থ ও স্বাভাবিক ডিম্বাশয় ও উৎকৃষ্ট ডিম্বাণু প্রয়োজন, তেমনই সুস্থ-সচল শুক্রাণুও দরকার। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরুষজনিত বন্ধ্যত্ব বা মেল ইনফারটিলিটির একাধিক উন্নত থেরাপি রয়েছে। স্বল্প সংখ্যক শুক্রাণু থাকলেও তার চিকিৎসা করা সম্ভব। এমনকি একেবারেই শুক্রাণু না থাকলেও, পিতৃত্বের স্বাদ পেতে পারেন কোনও পুরুষ।

আধুনিক চিকিৎসায় পুরুষজনিত বন্ধ্যত্ব দূরীকরণে কীভাবে সাফল্য এসেছে সে নিয়ে দ্য ওয়ালের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ক্রেডেল ফার্টিলিটি সেন্টারের স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ ডক্টর এসএম রহমান ও সায়েন্টিফিক ডিরেক্টর ও চিফ ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজিস্ট ডক্টর পরাগ নন্দী।

পুরুষদের বন্ধ্যত্ব বাড়ছে নানা কারণে

মেয়েদের তুলনায় এখন বন্ধ্যত্বের সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে পুরুষদের। ৫০ শতাংশ বন্ধ্যত্বের কারণ মেল-ইনফার্টিলিটি ফ্যাক্টর। মহিলাদের পেলভিক ইলফ্ল্যামেটরি ডিজিজ বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের কারণে বন্ধ্যত্ব আসতে পারে। তার চিকিৎসা আছে, সঠিক থেরাপিতে সারিয়ে তোলা যায়। কিন্তু পুরুষজনিত বন্ধ্যত্ব নানা কারণে অবহেলিত থেকে যায়।

সঙ্কোচ, লজ্জা, মেল ইগো ইত্যাদি নানা কারণে রোগ লুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা মেল ইনফার্টিলিটি বা পুরুষজনিত বন্ধ্যত্বের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এখন বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা অনেক উন্নত। মেল ফ্যাক্টর টেস্টের স্ট্যান্ডারাইজেশনে কোনও স্বাভাবিক বা নরম্যাল, কোনটা অ্যাবনরম্যাল, কী কারণে বন্ধ্যত্ব আসছে, কী কী ফ্যাক্টর দায়ী ইত্যাদি এখন অনেক সহজে বের করা যায়।

কী কী অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে

পুরুষদের শুক্রাণু তৈরি হয় শুক্রাশয় বা টেস্টিস থেকে। প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটির বেশি শুক্রাণু তৈরি হয়। এই শুক্রাণুর গঠন ও গতিশীলতা ঠিক আছে কিনা তা জানতে নানা রকম পরীক্ষা করা হয়। শুক্রাণুর ঘনত্ব, স্পার্ম কাউন্ট, স্পার্ম কনসেনট্রেশন, স্পার্ম মটিলিটি, ভাইটালিটি, মরফোলজি ইত্যাদি নানা ফ্যাক্টর দেখে নিতে হয়। তাছাড়া শুক্রাণুতে কোনও কম সংক্রমণ হয়েছে কিনা তাও পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয়।

এই ফ্যাক্টরগুলো যদি অস্বাভাবিক বা অ্যাবনরমাল হয়, তাহলে বন্ধ্যত্ব আসার সম্ভাবনা থাকে।

নরমোজুস্পার্মিয়া— যখন স্পার্ম ও সিমেন প্যারামিটার ঠিকঠাক থাকে, কাউন্ট, ভলিউম, মটিলিটি, মরফোলজি স্বভাবিক মাত্রাতেই থাকে।

অ্যাস্পার্মিয়া— যখন ইজাকুলেশন হয় না এবং স্পার্ম তৈরি হয় না, তখন সেই অবস্থা হল অ্যাস্পার্মিয়া। কোনও জেনেটিক ডিসঅর্ডার, জন্মগত সমস্যা, হরমোনের গণ্ডগোল, ডায়াবেটিস, পোস্ট-টেস্টিকুলার ক্যানসার থেরাপির পরে এই সমস্যা হতে পারে।

হাইপোস্পার্মিয়া— যখন ইজাকুলেশন খুব কম হয়, (১.৫ মিলিলিটার বা তারও কম), সেটাও একধরনের অ্যাবনরমাল ফ্যাক্টর।

অ্যাজোস্পার্মিয়া— এক্ষেত্রেও স্পার্ম কাউন্ট প্রায় শূন্যে থাকে। জেনেটিক ডিসঅর্ডার, সেক্সুয়াল ডিসফাংশন, হরমোনের গণ্ডগোলের কারণে এই অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।

অলিগোস্পার্মিয়া— যখন স্পার্ম কাউন্ট স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়।

পুরুষের বন্ধ্যত্বে অ্যাজোস্পার্মিয়া, অলিগোস্পার্মিয়া, অ্যাস্থেনোস্পার্মিয়া, টেরাটোস্পার্মিয়া বা স্পার্মের ইনফেকশন এই সবই চিকিৎসার সাহায্যে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া ইরেকটাইল ডিজফাংশন বা ইজাকুলেশনের সমস্যা থাকলে তাঁর চিকিৎসাও ইউরোলজিস্টরা করেন।

শুক্রাণুতে কী সমস্যা হচ্ছে, সহজ কিছু টেস্টের মাধ্যমে বোঝা যায়

এখন খুব সহজ কিছু পরীক্ষা করা হয় যেমন ‘হাজব্যান্ড সিমেন অ্যানালিসিস’। মাস্টারবেশন করে শুক্রাণু স্যাম্পেল কালেক্ট করা হয়। স্টেরাইল কন্টেইনার দিয়ে দেওয়া হয়, দেখিয়ে দেওয়া হয় কীভাবে স্যাম্পেল কালেক্ট করতে হবে। তার পর সেই স্যাম্পেল নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। স্পার্ম কাউন্ট, মটিলিটি, মরফোলজি, ভলিউম ইত্যাদি সবই পরীক্ষা করা হয়। যদি দেখা যায়, কোনও অস্বাভাবিকতা রয়েছে তাহলে নিশ্চিত হওয়ার জন্য চার সপ্তাহ পরে ফের একই ভাবে টেস্ট করা হয়। তাছাড়া টিএসএইচ, থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট, ইমেজিং, স্পার্ম ফাংশন টেস্ট ইত্যাদি পরীক্ষাও করিয়ে নেওয়া হয়।

পুরুষজনিত বন্ধ্যত্বের এখন অনেক আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি আছে

পুরুষ বন্ধ্যত্বের অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি হল ইকসি বা ইন্ট্রা-সাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইঞ্জেকশন দিয়ে থেরাপি। শুক্রাণুর সংখ্যা যদি ১৪-১৫টিও থাকে, মানে খুব কম স্পার্ম কাউন্ট থাকলেও ইন্ট্রা-সাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইঞ্জেকশন দিয়ে থেরাপি করলে সুফল মেলে।

পুরুষজনিত বন্ধ্যত্বের আরও কয়েকটি চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে– যেমন আইইউআই (ইন্ট্রা ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন), ডিআই (ডোনার ইনসেমিনেশন), ইকসি (ইন্ট্রা সাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইঞ্জেকশন) এবং টেসা (টেস্টিকুলার স্পার্ম অ্যাসপিরেশন)। এর মধ্যে ইকসি বা টেসা বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় অসাধারণ কার্যকরী হয়েছে বলা যায়।

ইকসি পদ্ধতি অনেকটা ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফের মতো। ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বানু বের করে তার মধ্যে শুক্রাণু প্রবেশ করিয়ে নিষেক করানো হয়। ভ্রূণ তৈরি হলে তা গর্ভে স্থাপন করা হয়। শুক্রাণু গণগত মান যদি কমে যায় তাহলে ইকসি পদ্ধতি ছাড়া অন্য উপায় থাকে না।

অনেক রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, শুক্রাশয়ে অনেক শুক্রাণু তৈরি হয়, কিন্তু সিমেনে শুক্রাণু থাকে না। কারণ যে নলের মাধ্যমে শুক্রাণ টেস্টিস বা শুক্রাশয় থেকে আসে সেখানে কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। সেটা জন্মগত কারণ বা সংক্রমণজনিত কারণ হতে পারে। তখন, টেসা পদ্ধতিতে শুক্রাশয় থেকে শুক্রাণু বের করে ইকসা করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

এখন তো প্রতিটা স্পার্ম পরীক্ষা করা সম্ভব, চিকিৎসা পদ্ধতি এতটাই উন্নত। এই স্পার্ম ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ডিম্বাণুর খোলসের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। যদি এমনও দেখা যায়, শুক্রাণু তৈরি হচ্ছে কিন্তু কোনও বাধার কারণে বাইরে আসতে পারছে না, তাহলেও সেই ব্লকেজ অস্ত্রোপচার করে সারানো যায়।

কাজেই পুরুষজনিত বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা এখন অনেক আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত। তাই রোগ পুষে রাখবেন না। ডাক্তারের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন। যে কোনও জটিলতাই চিকিৎসায় সারানো সম্ভব। সন্তানহীন দম্পতিদের অবসাদে ভোগার কোনও কারণ নেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More