কোভিডের আর একটি ধাক্কা

1

বিজ্ঞানীরা যা আশঙ্কা করেছিলেন, তাই শেষপর্যন্ত সত্যি হল। কোভিডের আরও একটা ঢেউয়ের মুখে পড়ল ভারত। গত রবিবার নতুন সংক্রমণের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২৬ হাজারের বেশি। ২০২১ সালে একদিনে সর্বাধিক সংক্রমণের রেকর্ড হয়েছে ওই দিন।

গতবছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সংক্রমণের হার ছিল সর্বোচ্চ। তারপর কয়েক মাস ধরে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আস্তে আস্তে কমছিল। চিকিৎসকরা বার বার বলছিলেন, আত্মসন্তুষ্টির কারণ নেই। কোভিড এখনও চলে যায়নি। কিন্তু সেই সতর্কবাণীতে অনেকেই কান দেননি।

এখন রাস্তাঘাটে, বাসে-ট্রেনে মাস্ক ছাড়া অনেককে দেখা যাচ্ছে। অনেক জায়গায় তো দেখা যাচ্ছে অর্ধেক মানুষেরই মুখে মাস্ক নেই। অনেকে আবার মাস্ক নামিয়ে রেখেছেন নাকের নীচে। জিজ্ঞাসা করলে বলছেন, বেশিক্ষণ মাস্ক পরে থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসছে। কেউ আবার মাস্ক পরে ভালভাবে কথা বলতে পারছেন না। এইরকম নানা বিচিত্র যুক্তি চারদিকে শোনা যাচ্ছে। অনেকে তো আরও বেপরোয়া। মাস্কের তোয়াক্কা করছেন না। কেউ মাস্ক পরতে বললে সপাটে শুনিয়ে দিচ্ছেন, আমার অত মরার ভয় নেই মশাই। আপনার যদি বেশি ভয় থাকে, আপনি পরুন মাস্ক।

কেউ মাস্ক না পরলে তিনি যে কেবল নিজেই বিপদে পড়বেন তা নয়, তাঁর কাছাকাছি যাঁরা যাবেন, তাঁরাও সংক্রমিত হতে পারেন। কিন্তু সেকথা ওইসব ‘সাহসী’ লোকজনকে কে বোঝাবে।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন বলেছেন, দেশে কোভিড সংক্রমণ বাড়ার পিছনে একটাই কারণ। মানুষের সতর্কতার অভাব।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, দীর্ঘদিন কোনও বিপদের মধ্যে থাকতে থাকতে ব্যাপারটা মানুষের গা সহা হয়ে যায়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রেও তাই হয়ে থাকতে পারে। তাছাড়া বেশি ভয় করলে অনেকের চলবেও না। অতিমহামারীর মধ্যে অনেকে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করছেন। কিন্তু সকলের পক্ষে বাড়ি থেকে কাজ করা সম্ভব নয়।

প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ রোজ শহরতলি থেকে কলকাতায় চাকরি বা ব্যবসা করতে আসেন। তাঁদের পক্ষে বাড়ি থেকে কাজ করা সম্ভব নয়। লকডাউনের পরে নানা রুটে বাসের সংখ্যা কমে গিয়েছে। কোনও কোনও বাসে অফিস্টাইমে ভাল ভিড় হচ্ছে। কেউ যদি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সেই বাসে না ওঠেন, সময়মতো অফিসে পৌঁছতে পারবেন না।

সুতরাং সবাই যে ইচ্ছা করে কোভিড বিধি ভাঙছেন তা নয়।

গত কয়েকমাসে কোভিডের একাধিক নতুন স্ট্রেন দেখা দিয়েছে। নতুন স্ট্রেন আগের চেয়ে বেশি সংক্রামক। কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পিছনে সেটাও একটা কারণ।

আজ থেকে ১০০ বছরের কিছু আগে বিশ্ব জুড়ে স্প্যানিশ ফ্লু-র প্যানডেমিক দেখা দিয়েছিল। ১৯১৮ সালের মার্চ মাসে বিশ্ব জুড়ে হু হু করে ওই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তার কয়েক মাসের মধ্যে গরম পড়ে যায়। তখন সংক্রমণ কমে। ১৯১৯ সালের গোড়ার দিকে, শীতকালে আসে দ্বিতীয় ওয়েভ। প্রথমবারের চেয়ে বেশি লোকের মৃত্যু ঘটে। ওই অতিমহামারীতে বিশ্ব জুড়ে মোট পাঁচ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

কোভিড ১৯ নিশ্চয় স্প্যানিশ ফ্লু-র মতো অত মারাত্মক নয়। কিন্তু অতিমহামারীর নিজস্ব প্যাটার্ন মেনে চলছে কোভিডও। শুধু ভারতে নয়, আরও কয়েকটি দেশে তার সংক্রমণ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

প্যানডেমিকের দ্বিতীয় ওয়েভ ঠেকাতে ইতিমধ্যে লকডাউনের পথে হেঁটেছে মহারাষ্ট্র। নাগপুরে লকডাউন কার্যকর করার জন্য রাস্তায় নেমেছে তিন হাজার পুলিশ। এছাড়া জলগাঁও, ঔরঙ্গাবাদ, পুনে, নাসিকের মতো শহরেও নানা কড়াকড়ি করা হয়েছে।

আশার কথা হল, করোনা সংক্রমণের বৃদ্ধি দেশের ছ’টি রাজ্যে সীমাবদ্ধ। ভারতে যত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁদের ৮৫ শতাংশ ওই ছয় রাজ্যের। দ্বিতীয়ত, সংক্রমণ বাড়লেও কমেছে মৃত্যুহার।

এখন আর আগের মতো লকডাউন করা সম্ভব নয়। গতবছর লকডাউনের জন্য অর্থনীতিতে মন্দা দেখা গিয়েছিল। ফের লকডাউন হলে অর্থনীতি আর সহজে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

তাহলে সংক্রমণ ঠেকানোর উপায় কী?

টিকাকরণের ওপরে আরও জোর দিতে হবে। সরকার এখন ৬০ বছরের বেশি বয়সী এবং ৪৫ বছরের ওপরে যাঁদের বয়স এবং কো-মর্বিডিটি আছে, তাঁদের টিকা দিচ্ছে। এই শ্রেণিবিভাগ না করে অবিলম্বে দেশের সবাইকে টিকা দেওয়া শুরু হোক। এর পাশাপাশি যাঁরা কোভিড বিধি ভাঙছেন, তাঁদেরও কড়া শাস্তি দেওয়া উচিত।

You might also like
1 Comment
  1. […] your experience. We’ll assume you’re ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read […]

Leave A Reply

Your email address will not be published.