‘৬৭-র ভোট : দমদম দাওয়াই, কাঁচকলা, কানা বেগুন ও কংগ্রেসের ভরাডুবি

দ্য ওয়াল ব্যুরো : স্বাধীনতার পরে দুই দশক অতিক্রান্ত। বাংলায় প্রবল খাদ্যাভাব। আগে আমেরিকা থেকে পি এল ৪৮০ প্রকল্পে ভারতে গম পাঠাত। লালবাহাদুর শাস্ত্রী যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন পাঠানো বন্ধ করে দিল।

শোনা যায়, এক আমেরিকান সাংবাদিক শাস্ত্রীজিকে প্রশ্ন করেছিল, মিস্টার প্রিমিয়ার, ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে আপনার মতামত কী? তিনি সোজাসাপটা জবাব দিয়েছিলেন, আপনার দেশই তো ওখানে একতরফা হামলা চালাচ্ছে। একথা শুনে বেজায় চটে যান তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন। তারপরেই তিনি গম পাঠানো বন্ধ করে দেন।

বিপদের ওপরে বিপদ। ১৯৬৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টি হয়েছিল কম। ধানের ফলন ভাল হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন বললেন, সরকার চালকল মালিকদের থেকে চাল কিনে রেশনে গরিবদের মধ্যে বন্টন করবে। কিন্তু এভাবে বেশি চাল সংগ্রহ করা গেল না।

তারপর বাজার থেকে উধাও হয়ে গেল কেরোসিন। তখনকার দিনে গ্রামে বেশিরভাগ বাড়িতে বিদ্যুতের আলো ছিল না। ছেলেমেয়েরা সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করত। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার আগে তাদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল।

পরিস্থিতির মোকাবিলায় সরকার চালু করেছিল চালের কর্ডনিং। অর্থাৎ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় চাল পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অনেক গরিব ছেলেমেয়ে লুকিয়ে গ্রাম থেকে শহরে চাল আনত। তাদের তাড়া করত পুলিশের ‘হল্লাগাড়ি’।

সরকার খাদ্য সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ। মানুষের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। এমন সময় দমদমে স্থানীয় ছেলেরা মজুতদারের গুদামে ঢুকে চাল উদ্ধার করল। সেই চাল বিলিয়ে দিল গরিবদের মধ্যে। ওই ঘটনাকে বলত দমদম দাওয়াই।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা ভারতরক্ষা আইনে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাঁরা তখনও ছাড়া পাননি। বাম দলগুলির ছোট ও মাঝারি নেতারা খাদ্যের দাবিতে ছোট ছোট মিছিল-মিটিং সংগঠিত করছিলেন।

বড় ধরনের গণ্ডগোল শুরু হল ‘৬৬-র ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। ১৬ ফেব্রুয়ারি একদল লোক বসিরহাটে বিডিও-র কাছে স্মারকলিপি জমা দিতে গিয়েছিল। বিডিও অফিসের বাইরে রক্ষীরা তাদের বন্দুক উঁচিয়ে ভয় দেখায়। উত্তেজিত জনতা পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে বিডিও-র অফিসে ঢুকতে চেষ্টা করে। পুলিশ গুলি চালায়। আহত হয় ছ’জন।

পরদিন বসিরহাটে স্বতঃস্ফূর্ত বন্‌ধ পালিত হয়। সেদিন সকালে স্বরূপনগরে বিডিও অফিসের বাইরে অনেকে জড়ো হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল। তাদের মধ্যে স্কুলের ছেলেরাও ছিল। পুলিশ ওই জমায়েতের ওপরে গুলি চালায়। মারা যায় তেঁতুলিয়া মাল্টিপারপাস স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র নুরুল ইসলাম। এর পরে বনগাঁ, ব্যারাকপুর, নৈহাটি থেকে শুরু করে পুরো বাংলায় শুরু হয় আন্দোলন। প্রফুল্ল সেন নাকি রাইটার্স থেকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, কাঁচকলা খাও। তাতে আগুনে ঘৃতাহুতি হয়। আন্দোলন আরও তেজি হয়ে ওঠে।

মার্চ মাসের প্রায় ১৫ দিন খাদ্য আন্দোলনে গোটা রাজ্য অচল হয়ে পড়েছিল। গণ বিক্ষোভ মারাত্মক রূপ নিয়েছিল নদিয়ায়। কলকাতাতেও ট্রামে, বাসে আগুন দিয়ে, ট্রামলাইন উপড়ে ধুন্ধুমার হয়েছিল।

এইসময় বিদ্বজ্জনেরাও কংগ্রেসের প্রতি বিরূপ হয়েছিলেন। কলকাতায় মিছিল করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, মৃণাল সেন। মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার। তাঁরা খাদ্য আন্দোলনে শহিদ পরিবারগুলির জন্য চাঁদা তুলছিলেন।

‘৬৭ সালে যখন পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট হয়, তখন খাদ্য আন্দোলনের প্রভাব ছিল পুরোমাত্রায়। মনে হচ্ছিল, বাঙ্গালার সব লোকই কমিউনিস্টদের সমর্থক হয়ে গিয়েছে। ‘৬২ সালে চিনযুদ্ধের সময় রাজ্যে কমিউনিস্ট বিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ‘৬৭ সালে হয়েছিল উল্টো।

ভোটের আগে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন বাম নেতারা। কংগ্রেস ভেঙে আলাদা দল গড়েছিলেন অজয় মুখোপাধ্যায়। শোনা যায়, অতুল্য ঘোষের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হচ্ছিল না। রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল ঘোষও কংগ্রেস ছেড়ে নির্দল হিসাবে লড়েছিলেন।

কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল দু’টি জোট। একটি জোটের নেতৃত্বে ছিল সিপিএম। অপরটির নেতৃত্বে ছিল সিপিআই।

সেই প্রথমবার ভোটে কুৎসার বান ডেকেছিল। বামপন্থীরা রটিয়েছিল, প্রফুল্ল সেন ও অতুল্য ঘোষ বেনামে অনেক টাকার মালিক হয়েছেন। ডালহৌসির স্টিফেন হাউসের মালিক প্রফুল্ল সেন। পরে এই অভিযোগগুলি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।

সেবারের ভোটেই প্রথমবার গুন্ডাদের বড় ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। তারা ছিল মূলত শাসক দলের অনুগামী।

রাজ্যে এত কংগ্রেস বিরোধী হাওয়া সত্ত্বেও ভোটে তারা পেয়েছিল সবচেয়ে বেশি আসন। মোট ১২৭ টি। সিপিএম পেয়েছিল ৪৩ টি। অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৪ টি, সিপিআই পেয়েছিল ১৬ টি, ফরওয়ার্ড ব্লক ১৩ টি। বামপন্থী হাওয়ার মধ্যেও জনসংঘ পেয়েছিল একটি আসন।

ভোটের ফল বেরোতে কংগ্রেসবিরোধী দু’টি জোট ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকার গড়ার দাবি জানায়। বামপন্থী ছাত্র-যুবরা লাল কাঁচকাগজ দিয়ে মুড়ে দেয় ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলি। রাস্তায় রাস্তায় টাঙানো হয় কাঁচকলা আর কানা বেগুন। প্রফুল্ল সেন জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, কাঁচকলা খাও। তাই তাঁকে বিদ্রুপ করে কাঁচকলা টাঙানো হয়েছিল। কানা বেগুন টাঙিয়েছিল অতুল্য ঘোষের জন্য। তিনি একটা চোখে ভাল দেখতে পেতেন না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে বলত কানা অতুল্য।

১৯৪২ সালে অতুল্য ঘোষ ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। পুলিশ তাঁকে হিজলি জেলে বন্দি রেখেছিল। জেলের ভিতরে সেপাইরা লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁর চোখ অন্ধ করে দেয়।

দেশের কাজ করতে গিয়ে অতুল্যবাবুর চোখ গেল, সেই দেশের লোকই তাঁকে বলত কানা অতুল্য।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More