একুশে ব্যান হওয়া হাফডজন বিজ্ঞাপন! হিন্দুত্বের অপমান থেকে শ্রেণিভেদ, অভিযোগ নানারকম

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিড-লকডাউন মিলিয়ে পেরিয়ে গেল আরও একটা বছর। নানা ভালমন্দ, যুক্তিতর্ক পার করে নতুন বছর এসে দাঁড়িয়েছে দোরগোড়ায়। তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সমস্ত মালিন্য পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পালা। কিন্তু পেছন ফিরে তাকালে চোখে পড়ে অজস্র বিতর্ক। এই বিতর্কের তালিকায় উপাদান জুগিয়েছে একাধিক বিজ্ঞাপনও। একুশে এমন কিছু বিজ্ঞাপনও হয়েছে, যা বয়কটেরও ডাক উঠেছিল।

একনজরে দেখে নিন বারোমাসের হাফডজন বিতর্কিত বিজ্ঞাপন।

সব্যসাচীর মঙ্গলসূত্র

ফ্যাশন ডিজাইনার সাম্প্রতিক মঙ্গলসূত্রের একটি বিজ্ঞাপনে ছিল কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ফ্রেম। একটি ছবিতে দেখা যায়, এক মহিলা মডেল কালো অন্তর্বাস পরে সব্যসাচীর ডিজাইন করা মঙ্গলসূত্র পরে রয়েছেন। ঘটনাচক্রে তাঁর গায়ের রং ‘কালো’ এবং তিনি ‘স্থূলকায়’। অর্থাৎ গহনার মডেল বলতেই যে ছবি আমাদের চোখে ভাসে, তার চেয়ে আলাদা। তিনি সরাসরি চেয়ে রয়েছেন ক্যামেরার দিকে। লজ্জিত বা কুণ্ঠিত ভাবে নয়, রীতিমতো বোল্ড ভাবে।এই বিজ্ঞাপন ব্যান করার দাবি তোলেন হিন্দুত্ববাদীরা। তাঁদের বক্তব্য, মঙ্গলসূত্রের পবিত্রতা নষ্ট করা হয়েছে বিজ্ঞাপনে, ধর্মীয় আবেগে আঘাত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের দাবি, ছক ভাঙা বিজ্ঞাপনের আইডিয়া হজম হচ্ছে না সংকীর্ণমনা ডানপন্থীদের। অথচ এমন তো নয়, যে ‘কালো’ ও ‘মোটা’ কোনও মহিলা অন্তর্বাস পরিহিতা অবস্থায় মঙ্গলসূত্র পরে থাকতে পারেন না বা তাঁর সঙ্গীর ঘনিষ্ঠ হন না! কিন্তু বিজ্ঞাপন দেখে বলা হয়, মঙ্গলসূত্রের আড়ালে নগ্নতার প্রচার করছেন সব্যসাচী। এই নিয়েই তাঁরা গেল-গেল রব তুলেছেন।

ফ্যাব ইন্ডিয়ার দীপাবলি

ফ্যাব ইন্ডিয়ার বিজ্ঞাপনে আবার কাঠগড়ায় উঠেছিল উর্দু শব্দ। মূলত এথনিক পোশাকের জন্য ফ্যাব ইন্ডিয়া পরিচিত। দীপাবলির আগে তারা ‘জসন-ই-রিওয়াজ’ নামে দিওয়ালি কালেকশন আনে। এই উর্দু নাম নিয়েই আপত্তি ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়।After Tanishq, Fabindia forced to withdraw advertisementদাবি করা হয়, এই নাম হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত করে। হিন্দুদের উৎসব দীপাবলি, তার কালেকশনের নাম কীভাবে উর্দুতে দেওয়া হতে পারে, তাই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তীব্র জনরোষের মুখে টুইটার থেকে এই ক্যাম্পেনের ছবি সরিয়ে নেয় ফ্যাব ইন্ডিয়া।

ডাবরের করবা চৌথ

ডাবরের বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছিল, দুই তরুণীর একজন অন্যজনের মুখে ক্রিম লাগিয়ে দিতে দিতে আলোচনা করছেন এই করবা চৌথ উৎসবের গুরুত্ব ও তার ব্যাখ্যা নিয়ে। সেই সময় আরও একজন মহিলা ওই দুই তরুণীকে শাড়ি উপহার দেন। এর পরে বিজ্ঞাপনের একেবারে শেষে দেখা যায়, ওই দুই তরুণী করবা চৌথ পালন করছেন, পরস্পরের মুখ দেখছেন। যা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায়, তাঁরা দু’জন পরস্পরের ‘পার্টনার’।Dabur takes down its Fem Bleach ad over the lesbian couple controversy | Advertising | Campaign Indiaঅর্থাৎ দুই সমকামী মেয়ে করবাচৌথ ব্রত পালন করছে পরস্পরের জন্য। এই বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধেও দাবি ওঠে হিন্দুত্বের অপমানের। ব্যান হয় বিজ্ঞাপনটি

মান্যবরের বিজ্ঞাপন

এই পোশাক প্রস্তুতকারী ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে বিয়ের সময় হওয়া ‘কন্যাদান’কে পিছিয়ে থাকা এক সংস্কৃতি হিসেবে দেখানো হয়েছিল এবং কন্যাদানের বদলে ‘কন্যামান’ নামের একটি বিকল্প প্রথা শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই নতুন চিন্তা কন্যার সম্মানের কথা ভেবেই। Manyavar 'Kanyadaan' ad featuring Alia Bhatt paints ritual as 'regressive'তবে কন্যাদান এবং হিন্দু সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মান্যবরের এই অভিযান নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল সমালোচনা হয়। সেই একইভাবে হিন্দু ধর্মকে অপমান করার অভিযোগ ওঠে মান্যবরের বিরুদ্ধে।

আনঅ্যাকাডেমির হিন্দু-মুসলিম

অনলাইনে শিক্ষণ পদ্ধতির অ্যাপ আনঅ্যাকাডেমি। তাদের অনলাইন টেস্টপেপারে থাকা একটি প্রশ্ন নিয়ে আপত্তি ওঠে। তাতে ছিল, ‘মুসলিমরা শোভাযাত্রা বের করেছিলেন। তাঁরা তাঁদের ধর্মীয় স্লোগানও দিচ্ছিলেন। এরপর মুসলিমদের শোভাযাত্রা যখন হিন্দু অধ্যুষিত একটি এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল, সেসময় হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগে ওই শোভাযাত্রার উপর পাথর ছোড়েন স্থানীয় হিন্দুরা। আপনি কি এই বিষয়টিকে সমর্থন করেন?’Unacademy's revenue surges 5.5X during FY20এই প্রশ্নটি সামনে আসতেই নেটদুনিয়ায় রীতিমতো বিতর্ক তৈরি হয়। আনঅ্যাকাডেমি বয়কটের ডাক ওঠে। প্রশ্ন ওঠে, এমনটা সবসময় হিন্দুদের সঙ্গেই কেন হয়? অভিযোগ ওঠে, আনঅ্যাকাডেমি হিন্দু যুবদের মগজধোলাই করছে।

বিতর্কের মুখে পড়ে অনলাইন টেস্টপেপারটি তুলে নেয় সংস্থাটি। এমনকী ঘটনার জন্য ক্ষমাও চায়।

জোম্যাটোর ডেলিভারি

‘হর কাস্টমার হ্যায় স্টার’ অর্থাৎ ‘সব খদ্দেরই তারকা।’ ফুড ডেলিভারি সংস্থা জোম্যাটো এই স্লোগানেই ঝাঁ চকচকে বিজ্ঞাপন বানিয়েছিল ঋত্বিক রোশন এবং ক্যাটরিনা কাইফকে নিয়ে। দেখা যায়, অর্ডার করা খাবার ঋত্বিকের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর ডেলিভারি বয়ের সঙ্গে তিনি সেলফি তুলতে চান। বলেন, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা যে কোনও মরসুমেই সমস্ত বাধা পার করে খাবার পৌঁছে দেন ডেলিভারি বয়রা।Well Intentioned But Misinterpreted: Zomato Responds To Ad Controversy

তবে বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, আরেক খদ্দেরের থেকে খাবারের অর্ডার পেয়ে বেরিয়ে পড়েন ওই ডেলিভারি বয়, সেলফি না তুলেই। আবার ক্যাটরিনা কাইফের জন্মদিনের কেকও না খেয়ে চলে যান আর এক জোম্যাটো ডেলিভারি বয়, এই একই কারণে। নেপথ্যে শোনা যায়, অর্ডার পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে বলেই এত তাড়া তাঁদের।Katrina Kaif's ₹1 lakh one-shoulder bodycon dress is the party outfit you've always wanted | Fashion Trends - Hindustan Timesএতে অভিযোগ ওঠে, ডেলিভারি বয়দের যন্ত্রমানবের মতো দেখানো হয়েছে ওই বিজ্ঞাপনে। তাঁদের ছোটও করা হয়েছে। অভিযোগের মুখে এই বিজ্ঞাপনও তুলে নেয় জোম্যাটো, কৈফিয়ত দিয়ে জানায়, কারও আবেগে আঘাত করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। সমস্ত গ্রাহক তাদের কাছে স্টার, এটাই তারা বোঝাতে চেয়েছিল।

পরপর এত বিজ্ঞাপন ব্যান হওয়ায় অভিযোগ উঠেছে, দেশের সাধারণ নাগরিকের বাকস্বাধীনতার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। অনেকেই বলছেন, বিজ্ঞাপনে কোন ভাষা ব্যবহার করা হবে, কে কেমন পোশাক পরবেন, কে কাকে ভালবাসবেন– এই সমস্তটাই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আওতায় পড়ে। এর উপর ফতোয়া জারি করার অর্থ গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা।

 

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.