‘বাবার ভগবান ছিলেন ছবি বিশ্বাস’- ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় পুত্র গৌতম

1

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি বিশ্বাস আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প বললেন ভানুপুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯০০ সালের ১৩ জুলাই ছবি বিশ্বাসের জন্ম। যদিও তাঁর জন্মের সাল নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। কারও মতে তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯০২ সালে। তাঁর আসল নাম শচীন্দ্রনাথ। অভিনয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেন ছবি নামেই। জাগুলিয়ায় তাঁদের আদি বাড়ি। ছবি বিশ্বাসের পড়াশুনো, ছেলেবেলা সবটাই কাটে কলকাতায়। কিন্তু জাগুলিয়ায় তাঁদের নিত্য যাতায়াত ছিল। সে বাড়িও দেখার মতো। যদিও আজ সবটাই ভগ্নপ্রায়।ছবি বিশ্বাসের নাম উচ্চারণে মনে আসে গম্ভীর রাশভারি আভিজাত্যের প্রতিভূ। ঠিক তাঁর বিপরীত আরেক নাম ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। যার নাম শুনলেই আমাদের মুখটা হাসিতে ভরে ওঠে। কৌতুকরসের প্রতিমূর্তি তিনি।
ছবি বিশ্বাস এবং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে অদ্ভুত এক সম্পর্ক ছিল। শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালোবাসা আর ভীষণ ভরসার। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অগাধ শ্রদ্ধা করতেন ছবিদাকে। যেসব ফিল্মে ভানুর আধিপত্য বেশি থাকত বা ভানু নিজেই প্রযোজনা করেন সেসব ছবিতে ছবি বিশ্বাসের জন্য বাঁধা পার্ট থাকতই। যে রোল ছবি বিশ্বাস ছাড়া কারুকে মানাবেই না।ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় ছেলে গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় গল্প শোনালেন তাঁর বাবা ও ছবি জ্যাঠামশাইয়ের। অনেকেই ভাবেন ভানুর ছেলে অভিনেতা সৌমিত্র ব্যানার্জি। যিনি আশির দশকের আইকনিক ভিলেন। না একদমই গুজব এটা। ভানুর দুই ছেলে গৌতম ও পিনাকী এবং এক মেয়ে বাসবী। বাসবী সেই ‘অতিথি’ ছবির চারু। যে রোল করে বাসবী রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন।

তিন ছেলেমেয়ের সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন “ছবি জ্যাঠামশাই (বিশ্বাস)কে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছি কিন্তু উনি কখনও আমাদের পুরনো বাড়িতে ঢুকতেন না। তাঁর একটা কারণ হয়তো আমরা মাত্র দেড়খানা ঘরে থাকতাম।
আরেকটা কারণ তখনও আমার ঠাকুমা, ঠার্কুদা বেঁচে। তাই উনি যখনই আসতেন বাইরে থেকেই ওনার হাম্বার গাড়িতে বাবাকে তুলে নিয়ে চলে যেতেন। উনি আসা মানে ছিল একটা সেনসেশনাল ব্যাপার। আমাদের ঐ পুরনো বাড়িতে ৪টে পরিবার থাকত। নানা লোকের নানা মত। কেউ মোহনবাগান কেউ ইস্টবেঙ্গল। কেউ হেমন্ত ভক্ত আবার কেউ ধনঞ্জয়।  কিন্তু একটা ব্যাপারে সবাই একমত, তা হচ্ছে সবাই ছবি বিশ্বাসের অভিনয়ের ভক্ত। সুতরাং উনি আসলে মবড্ নয় একটা শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভিড় হত। আমি কেবল একবার ওঁনাকে আমাদের পুরনো বাড়িতে আসতে দেখেছিলাম সেটা আমার দাদু অর্থাৎ ঠাকুরদা মারা যাবার পর। এরপর আমরা পুরনো বাড়ি ছেড়ে যখন টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর পাশে জুবিলি পার্কের বাড়িতে উঠলাম তখন উনি আসতে আরম্ভ করলেন। ছবি জ্যাঠামশাই বেশিরভাগই সন্ধ্যেবেলায় আসতেন তার কারণ হল ওঁনাদের রাত্রিবেলায় মদের আসর বসত ওপাড়ার বাসিন্দা নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি বা তাঁর ছাদে। সে বাড়ির ওপর তলার বাসিন্দা অভিনেতা বীরেন চট্টোপাধ্যায় সহ সুশীল মজুমদার, নীতিশ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের সাথে। ছবি জ্যাঠামশাই জানতেন আমার মা মদ্যপান পছন্দ করতেন না তাই আসরে বসবার আগে আমাদের বাড়ি ঘুরে যেতেন আর উনি এলেই মা ওঁনার পছন্দের ডালপুরি বা চিঁড়ের পোলাও বা কাঁচালঙ্কার মাংস-পরোটা এসব বানাতেন।

ভানু-জায়া নীলিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও পুত্র গৌতম

বাবার কাছে ছবি জ্যাঠামশাই ছিলেন ভগবানের মত। বাবা সিনেমা প্রোডাকশন করার সময় সব সময় ওনার পরামর্শ নিতেন। আমি সে সময়ে পাড়ার দাদাদের সঙ্গে খুব স্টুডিও পাড়ায় যেতাম ওখানে দেখতাম ছবি জ্যাঠামশাই সিনেমাপাড়ার সম্রাট এর মত। উনি স্টুডিওতে ঢুকলেই গেট থেকে সেলাম আর নমস্কার এর ধুম পড়ে যেত।”সেকালের থিয়েটার-প্রেমীরা বলতেন, অহীন্দ্র চৌধুরী-শিশিরকুমার ভাদুড়ির পর বাংলার মঞ্চে ছিল ছবি বিশ্বাস যুগ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’, মনোজ বসুর ‘ডাকবাংলো’, দেবনারায়ণ গুপ্ত-র ‘শ্রেয়সী’, ‘ঝিন্দের বন্দি’- কত ঐতিহাসিক নাটকে মঞ্চে দাপিয়ে অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাস। অথচ সেসবের ইতিহাস কোনওকিছুই সংরক্ষণ হয়নি। শুধুমাত্র উত্তরসূরীদের স্মৃতিতেই রয়ে গেছে সেই রমরমা যুগের গল্প।
গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই থিয়েটার পাড়ার গল্প বলতে গিয়ে চোখ চিকচিক করে উঠল, বললেন “একটা সময় ছবি জ্যাঠামশাই নাটক করা বন্ধ করেছিলেন। কিন্ত তাঁকে নাটকে নামাবার জন্য দেবনারায়ন গুপ্ত বাবাকেও (ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) ধরে ছিলেন যাতে ওঁনাকে রাজি করাতে পারে। অনেক চেষ্টার পর উনি রাজি হন, কিন্তু এমন এক অঙ্কের মাসিক মাইনেতে যেটা সেসময় বাংলার থিয়েটারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছিল। এই থিয়েটার নিয়ে অনেক মজার ঘটনা আছে। ছবি জ্যাঠামশাই মঞ্চে যা ইচ্ছে নিজের মন মত ডায়লগ বলতেন তা সামাল দিতে অন্য অভিনেতারাও ডায়লগ বানাতেন, তাতে নাটকের সময় বেড়ে যেত। এতে বিপদে পড়তেন তুলসী চক্রবর্তী। উনি রাতে হাতিবাগান থেকে হাওড়ার বাড়িতে ফিরতেন ট্রামে। রোজই প্রায় ১২টা বেজে যেত। উনি সলিল মিত্রর কাছে অভিযোগও করতেন কিন্তু কে শোনে কার কথা। ‘ডাকবাংলো’ নাটকে একটা সিন ছিল বাড়িওয়ালা চরিত্রে বাবা বাড়ি ভাড়া চাইতে গেছেন ছবি জ্যাঠামশাইয়ের কাছে। উনি বললেন ‘আজকে নয় অন্য আরেকদিন আসুন।’ বাবা ফিরে চলে যাচ্ছেন উনি খেলতে আরম্ভ করলেন ‘যাচ্ছেন কোথায় চা খেয়ে যান। বাবা বললেন ‘না চা খাবোনা।’
‘তাহলে ডাব খেয়ে যান।’ বাবা বললেন ‘ডাব খাবো না।’ উনি তখন ‘তাহলে চা-ই খেয়ে যান।’ বাবা বললেন ‘বেশ তাহলে চা, ডাব দুটোই দিন।’ ছবি জ্যাঠা মৃদুস্বরে বললেন ‘বাঃ বেশ দিলি তো।’

এতে বাবার সাহস বেড়ে গেল। একদিন বাবা অনুপ কাকা, আশীষকুমার এদেরকে বললেন ‘আজ ছবি দাকে আমি খেলাবো। আশীষ কুমার গিয়ে ছবি জ্যাঠাকে বলে দিলেন। উনি কিছু না বলে শুধু মুচকি হাসলেন। ওঁর নাম ছবি বিশ্বাস। একটা সিনে বাবাকে উনি জিজ্ঞেস করলেন ‘আপনার নাম কি?’ বাবা বললেন ‘কৃতান্ত বিশ্বাস।’ উনি বললেন ‘কাউকে বিশ্বাস করবেন না।’ বাবা আচ্ছা বলে বেড়িয়ে যাচ্ছেন সিন থেকে। ছবি জ্যাঠা বললেন ‘আবার শুধু শুধু কাউকে অবিশ্বাসও করবেন না।’ বাবা বেশ বলে বেড়িয়ে যাচ্ছেন।  উনি বললেন ‘আরে যাচ্ছেন কোথায় আগে উত্তর দিন বিশ্বাস করবেন না আবার অবিশ্বাসও করবেন না তাহলে কি করবেন?’ বাবাতো ফিউজ্! মৃদুস্বরে বলেন ‘ভুল হয়ে গেছে আর কোনোদিন করবনা।’ ছবি জ্যাঠামশাই বলেন ‘বল্ বাড়ি গিয়ে ভেবে পরে বলব।’
সে যাত্রা রক্ষা পেয়ে আর কোনদিন বাবা ছবি জ্যাঠার সঙ্গে টক্কর নিতে  যায়নি।

আরেকটা ঘটনা আছে ‘শ্রেয়সী’ নাটকে। সেদিন ১০-১২ জন চাইনিজ ডেলিগেট নাটক দেখতে এসেছেন। সিনে বসন্ত চৌধুরী ছবি জ্যাঠাকে কী জিজ্ঞেস করেছেন কিন্তু উনি কোনো উত্তর না দিয়ে ইশারায় সামনের রো-এর দিকে দেখাচ্ছেন। বসন্ত চৌধুরী আবার বলেন ‘কি হল উত্তর দিচ্ছেন না কেন?’ উনি আস্তে করে বলেন ‘সামনের রো তে দেখ্ চাইনিজগুলোকে।’ বসন্ত চৌধুরী আস্তে বলেন ‘দেখেছি তো’। আবার জোরে বলেন ‘আমার কথার উত্তর দিচ্ছেন না কেন?’ উনি এবার বলেন ‘আমি ভাবছি।’ বসন্ত বলেন কী ভাবছেন?’ উনি আস্তে আস্তে বলেন ‘ভাবছি চাইনিজগুলো জেগে আছে না ঘুমোচ্ছে?’ অপ্রস্তুত হয়ে বসন্ত চৌধুরী তাড়াতাড়ি ভেতরে চলে যান। উইংসের ওপারে সবাই তখন হো হো করে হাসছে। বসন্ত চৌধুরী এসে বলেন ‘দেখলি বুড়োটা কেমন আমায় বেইজ্জত করল।’বাবার (ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) ভগবান ছিলেন শিশির ভাদুড়ি আর ছবি বিশ্বাস। আমাদের খাবার টেবিলে এমন কোনোদিন হয়নি যেদিন বাবা ছবি জ্যাঠার অভিনয় নিয়ে আলোচনা করেননি। বাবার যেসব ছবি হাতে ছিল যেমন অনন্ত সিংহর ছবিগুলো বা বাবা যেগুলো প্রডিউস করেন সবেতে ছবি বিশ্বাস আছেন। ছবি বিশ্বাস ছাড়া বাবা কাউকে ভাবতেই পারতেননা।”

‘কাঞ্চনমূল্য’ ছবিতে যে কিশোর অভিনেতা লিড চরিত্রে অভিনয় করেন তিনিই হলেন গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। ঐ ছবির শ্যুটিং নিয়ে বললেন ” ‘কাঞ্চনমূল্য’র যখন শ্যুটিং করতাম তখন ছবি জ্যাঠামশাইয়ের জন্য স্পেশাল খাবার আসত তৎকালীন অভিজাত রেস্টুরেন্ট ‘স্কাইরুম’ থেকে। সেই খাবারের থেকে ছবি জ্যাঠা আমার আর বাবার জন্য তুলে রাখতেন রোজ। আমার বোন আরও ছোটো ছিল তাই উনি আমার বোনকেও খুব ভালোবাসতেন।”১১ জুন, ১৯৬২। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন ছবি বিশ্বাস। যাবার বয়স তো হয়নি। সেদিনকার অবিশ্বাস্য খবর! অথচ নির্মম সত্যি! সাদা অ্যাম্বাসাডরটা তুবড়ে গিয়েছিল। অ্যাম্বাসাডরে চেপে যাচ্ছিলেন জাগুলিয়ার বাড়ি। নিজেই চালকের আসনে তখন। মধ্যমগ্রামের কাছে গঙ্গানগরে ওল্ড যশোর রোডে উলটো দিক থেকে আসা ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি… সব শেষ। সামনের সিটে বসা ছবি বিশ্বাস চিরতরে ছবি হয়ে গেলেন। গাড়ির পেছনের লোকেরা আহত হলেও বেঁচে গেছিলেন।

সেই অভিশপ্ত দিনের গাড়ি

এ প্রসঙ্গে ভানু পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন “ছবি জ্যাঠার সঙ্গে সেদিন যাবার কথা ছিল বাবা আর জোজো কাকার ( তৎকালীন বসুশ্রী হলের বিখ্যাত নাম)। বাবার সেদিন রেডিও নাটক ছিল। যেটা ক্যানসেল করা যেতনা। বাবা বললেন যে আমি তো যেতে পারবনা। জোজো কাকাও গেলেননা। তখন ছবি জ্যাঠাই চালান গাড়ি। ওঁনার মৃত্যুটাকে নিয়তি বলবনা। কারণ গাড়ি চালাবার সময় উনি পেছন ফিরে পেছনের সিটে বসা নাতির সঙ্গে কথা বলছিলেন। একটা বাঁক ছিল। সেখানেই মুখোমুখি অ্যাক্সিডেন্ট। আমি তো ওঁকেই চিরকাল গাড়ি চালাতে দেখেছি। ওঁর যে ড্রাইভার ছিল তাই তো জানতাম না। বাবা ওঁর অ্যাক্সিডেন্টের খবর পেয়েই যান। পরে শ্রাদ্ধতেও গেছিলেন বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে।

ছবি বিশ্বাসের শ্রাদ্ধে বাঁশদ্রোনীর বাড়িতে তদারকিতে ব্যস্ত ভানু ও হেমন্ত

পরবর্তীকালে ছবি জ্যাঠামশাই নেই তাই ওঁদের বাড়ি যেতেও বাবার ভালো লাগতনা। সম্পর্কটা কমে আসে। এটা তো আমাদের ক্ষেত্রেও হয়েছে বাবা চলে যাবার পর ইন্ডাস্ট্রির লোক আসা কমে গেছে আমাদের বাড়ি। সাবু পিসিই (সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়) যা আসেন। সবিতা পিসি (বসু) যতদিন বেঁচেছিলেন ওঁর বাড়িতেও আমার যাতায়াত ছিল।”দাদাঠাকুর, বিশ্বম্ভর রায়, কালীকিঙ্কর, বিশু, হারান, মাস্টারমশাই, রহমত, শশীবাবু প্রতিটি চরিত্রে ছবি বিশ্বাস আজও জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছেন বাঙালির মনে। তাঁর শূন্যস্থান আজও পূরণ হয়নি বাংলা ছবিতে।

ছবি সৌজন্যে – ভানু ব্যানার্জী আর্কাইভ

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.