সুপ্রিয়াকে ছেড়ে গৌরীর কাছে উত্তমকে ফিরে যেতে বলেছিলেন বন্ধু শ্যামল মিত্র

0

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ডাক্তার বাবা চেয়েছিলেন তাঁর ছেলে তাঁর মতোই ডাক্তার হোক! কিন্তু ছেলে তো গানপাগল। ছেলে ছুটল সুরের টানে। আর সেখান থেকেই পিতাপুত্রে বিবাদ শুরু। আর এই বাস্তবের গল্প নিয়েই তৈরি হয়ে গেল সিনেমার চিত্রনাট্য।
আজ বলব উত্তম কুমার-তনুজা অভিনীত কালজয়ী ছবি ‘দেয়া-নেয়া’ তৈরির গল্প।
ছবির গল্পটা মনে করুন! কমল মিত্র বাবার সঙ্গে ছেলে উত্তমকুমারের গান করা নিয়ে বিবাদ তুঙ্গে, মাঝে মা ছায়া দেবী এসেও মধ্যস্থতা করতে পারছেননা। শেষ অবধি বাবার সঙ্গে তুমুল কথা-কাটাকাটি করে ছেলে বাড়ি ছাড়া হচ্ছে। বর্তমান মিম যুগে সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই ‘দেয়া-নেয়া’ ছবির দৃশ্যে কমল-উত্তম বিশাল জনপ্রিয়।আর এই  ‘দেয়া-নেয়া’ ছবি তৈরির পেছনে বাস্তবের গল্পটা ছিল কতকটা এরকমই।
নৈহাটির প্রসিদ্ধ ডাক্তার বাবা সাধন কুমার মিত্রর বাসনা যে ছেলে তাঁর মতোই ডাক্তারিতে আসবে, আর ছেলে শ্যামলের আকাঙ্ক্ষা সে গায়ক হবে। একসময় ছেলে সান্নিধ্যে এল সলিল চৌধুরীর গণনাট্য সঙ্ঘের। মিছিলে গলা মেলালো ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানে এবং ১৯৪৬-এ নৈহাটির বাড়ি ছেড়ে উঠল কলকাতার মেসবাড়িতে। বন্ধু গায়ক সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শেই কলকাতায় এসে ওঠা। এরপর যাওয়া শুরু হল গুরু সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে। কিছুকাল সতীনাথের কাছে তালিমও নিলেন শ্যামল। সুধীরলাল চক্রবর্তীর কাছে বছর পাঁচেকের তালিম। শ্যামলের হিট গানের জয়যাত্রা ১৯৫২-য় সুধীরলাল চক্রবর্তীর মৃত্যুতে ‘স্মৃতি তুমি বেদনা’ গুরুপ্রণাম রেকর্ড দিয়ে। যে গান শ্রোতাদের কাঁদিয়ে ছাড়ল শ্যামলের কণ্ঠে। কিন্তু এই শ্যামলই পরবর্তীকালে হয়ে উঠলেন লাভসঙের আইকন। ‘সাগরিকা’ ছবিতে উত্তমকুমারের লিপে ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’ মেগাহিট গান গেয়েই প্রেমের আরেক নাম হয়ে উঠলেন শ্যামল মিত্র। উত্তম-হেমন্ত জুটির উন্মাদনা ভেঙে উত্তম-শ্যামল জুটিও জনপ্রিয় হয়ে উঠল।
অন্যদিকে আধুনিক গানেও ‘নাম রেখেছি বনলতা’, ‘কার মঞ্জির বাজে’, ‘তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর’ বা ‘ভালবাসো তুমি শুনেছি অনেকবার’,’ভীরু ভীরু চোখে’ শ্যামল কণ্ঠে ‘অনুরোধের আসর’ জমিয়ে দিত।গায়ক শ্যামল মিত্র ছাড়া সুরকার শ্যামল মিত্রকেও আমরা পেয়েছি। তারও আগে বন্ধু উত্তমকুমারের জোরাজুরিতে শ্যামল অভিনয় করে ফেলেছেন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে মেসবাড়ির ছেলের ভূমিকায় ‘আমার এ যৌবন’ গানে। তখন থেকেই উত্তম-শ্যামল-এর বন্ধুত্ব শুরু।

১৯৫৩ সালে ‘লাখ টাকা’ ছবিতে প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন শ্যামল মিত্র। তবে গায়ক-সুরকার রূপে তাঁর বড় সাফল্য আসে ১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দেয়ানেয়া’ ছবিতে। ছবির প্রতিটি গানই তখন শ্রোতা দর্শকদের স্পর্শ করে– ‘জীবন খাতার প্রতি পাতায়’, ’গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে’, ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন’, ‘মাধবী মধুপে হলো মিতালী’, ‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’, ‘এ গানের প্রজাপতি পাখায় পাখায় রং ছড়ায়’।

কিন্তু যেটা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, ‘দেয়া নেয়া’র গল্প শ্যামল মিত্ররই শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প, বাড়ি ছেড়ে মেসবাড়িতে ওঠার গল্প। তবে উত্তম-তনুজার প্রেম এগুলো ছবির স্বার্থে করা হয়েছিল।

‘দেয়া নেয়া’তে আরও এক নতুন রূপে আমরা পেলাম তাঁকে। প্রযোজক শ্যামল মিত্র।
১৯৬৩-তে উত্তমকুমার ও তনুজাকে নিয়ে শ্যামল মিত্র প্রযোজিত ও সুরারোপিত ‘দেয়া নেয়া’ ছবি যে কী তোলপাড় ফেলেছিল বাঙালিজীবনে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আজও টেলিভিশনে এই ছবি সর্বাধিক টিআরপি দেয়।

ছবির একটি দৃশ্যে

এই ছবিতেই জড়িয়ে আছে অনেক টুকরো টুকরো গল্প।
যেমন নায়িকার রোলে তনুজার আগে বম্বের অন্য এক অভিনেত্রী ফার্স্ট চয়েস ছিলেন। তনুজার দিদি নূতনকেও ভাবা হয়েছিল। শেষমেষ নতুন মেয়ে তনুজাকেই বেছে নেওয়া হল। কী মিষ্টি বাংলা বললেন অবাঙালি তনুজা!
বাংলা ছবিতে সেই প্রথম ইন্ট্রোডিউসড হল সালোয়ার-কামিজ পরা নায়িকা।আরেক চমকপ্রদ গল্প,
‘দেয়া-নেয়া’র শ্যুটিং চলার সময় উত্তমকুমারের ঘরে বাইরে টানাপোড়েন চলছে। ঐ সময়ে উত্তম কুমার-গৌরী দেবীর মাঝে এসে উপস্থিত সুপ্রিয়া দেবী।

তবে উত্তম কুমারই গেছিলেন সুপ্রিয়া দেবীর কাছে। সুপ্রিয়া যাননি। প্রথম সংসারে বিপর্যস্ত উত্তমকুমার শান্তি খুঁজে পেতে আশ্রয় চেয়েছিলেন সুপ্রিয়া দেবীর ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে। গৌরীর এক জন্মদিনের পার্টিতেই উত্তম কুমার তীব্র অশান্তির থেকে বাঁচতে বাড়িছাড়া হন। ততদিনে অবশ্যি উত্তম-সুপ্রিয়া ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়ে গেছে।সুপ্রিয়া দেবী তাঁর স্মৃতিকথা ‘আমার জীবন আমার উত্তম’-এ লিখেছিলেন ১৯৬৩ সালের ২রা ডিসেম্বর, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে বিয়ের বাঁধনে বাঁধা পড়েছিলেন তাঁরা। যদিও গৌরী দেবীর সঙ্গে আইনত বিবাহবিচ্ছেদ না হওয়ায় সেই বিয়ের মান্যতা ছিল না। পুরোহিত ডেকেই সিঁদুরদান হয়েছিল উত্তম-সুপ্রিয়ার। যদিও এসব মানতে নারাজ উত্তমের পরিবার। কিন্তু সুপ্রিয়া ঘনিষ্ঠরা সিঙ্গল মাদার ডিভোর্সি সুপ্রিয়ার সিঁথিতে উত্তমের সিঁদুর দানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সুপ্রিয়ার বাবা গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তমকে বলেছিলেন এভাবে লিভ ইন করা যাবেনা। তোমরা বিয়ে কর। আগেও তো কৌলিন্য প্রথায় দুজন স্ত্রী থাকতেন তাতে প্রথম জনকে ডির্ভোস দেবার দরকার নেই।

দুটি সংসার দুটি ভালবাসা

সুপ্রিয়া স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স কিন্তু করেছিলেন। উত্তম করেননি। দুই নারী নিয়েই তিনি থাকতে চেয়েছেন। আর এই নিয়েই উত্তমের জীবনে ঝড় বয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ছিল উত্তমের অভিনয় জীবনেও। মনসংযোগের অভাব ঘটছিল কাজে। যার কারণে ‘দেয়া নেয়া’ ছবির শ্যুটিং বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, ছবির প্রযোজক শ্যামল মিত্র। বলেছিলেন “বেণুকে ছেড়ে উত্তম-কে ফিরতে হবে নিজের বউ গৌরীর কাছেই”।বন্ধুর দাম্পত্য জীবনে নেমে আসা ঝড় সামলাতেই একথা বলেছিলেন শ্যামল মিত্র। শ্যামলপুত্র গায়ক সৈকত মিত্র জানিয়েছেন, ‘দেয়া নেয়া’ ছবির শ্যুটিংয়ের সময়ই ভবানীপুরের বাড়ি ছেড়ে ময়রা স্ট্রিটে সুপ্রিয়া দেবীর বাড়িতে লিভ ইন করতে শুরু করেছিলেন উত্তম কুমার। শ্যামল মিত্রর কানে সে খবর পৌঁছতেই তিনি উত্তম কুমারকে ডেকে বলেন, ‘ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে ফিরে না গেলে ছবির শ্যুট বন্ধ।’ সেইমতো শ্যুটিং বন্ধ হয়ে যায় ‘দেয়া নেয়া’র।উত্তমকুমারের পাশে গৌরী দেবীকেই দেখতে অভ্যস্ত শ্যামল মিত্র মেনে নিতে পারেননি সুপ্রিয়া দেবীকে। যদিও বন্ধু শ্যামলকে আশ্বস্ত করে উত্তম কুমার জানিয়েছিলেন, “এখনই বেণুকে ছেড়ে যেতে পারব না, একটু সময় দে আমায়”। সৈকত মিত্রর কথায়, ”আমার বাবা-ই বোধহয় উত্তম কাকুকে এই নির্দেশ দিতে পেরেছিলেন। পেশাদার সম্পর্কের বাইরেও উত্তম কুমার ও শ্যামল মিত্রের মধ্যে যে অধিকারবোধের সম্পর্ক ছিল তার জেরেই এই নির্দেশ।”

যদিও শেষমেষ নিজের শর্ত ফিরিয়ে নিয়েছিলেন শ্যামল মিত্র। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সুপ্রিয়া দেবীর প্রতি উত্তমের টান ক্ষণস্থায়ী নয়, এটা চিরকালীন প্রেম ভালবাসা।
এক মাস পরে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাওয়ার পর নতুন করে শ্যুটিং শুরু হয় ‘দেয়া নেয়া’-র। মিউজিক্যাল ছবি সুপার-ডুপার-হিট। প্রযোজক হিসেবেও সফলতা পেলেন শ্যামল মিত্র।তবে রক্ষিতা সঙ্গিনী তকমা থেকে এক অন্য সুপ্রিয়া দেবীকে আবিষ্কার করেছিলেন শ্যামল মিত্র। যে নারী তাঁর ভালোবাসা ও সেবা দিয়ে বিপর্যস্ত উত্তমকে আগলে রাখেন। সুপ্রিয়ার সাহচর্যেই নতুনভাবে উত্তম নিজেকে গড়ে তোলেন। একটা সময়ের পর তো উত্তম-সুপ্রিয়ার ময়রা স্ট্রিটের বাড়ির জলসায় নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন শ্যামল মিত্র। গানের পর গান। সঙ্গে কব্জি ডুবিয়ে শ্যামল মিত্রই খেয়েছেন সুপ্রিয়ার হাতের রান্না। ছেলে সৈকতও ছোটবেলায় কতবার গান শুনতে উত্তম কাকু সুপ্রিয়া আন্টির বাড়ির জলসায় উপস্থিত থেকেছেন। আবার শ্যামল মিত্রর বাড়ির অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হতনা, যতক্ষণ না উত্তম কুমার শ্যামল মিত্রর স্ত্রীকে বৌঠান বলে ডেকে ঢুকতেন।

শ্যামল মিত্রর ছেলের অন্নপ্রাশন ভোজে তরুণকুমার,উত্তমকুমার ও সাবিত্রী চ্যাটার্জি

এক নম্বর ভালবাসা, দু নম্বর ভালবাসা এসব গসিপের অনেক ঊর্ধ্বে গিয়ে যেন সবাইকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন উত্তমকুমার। জ্বলেছেন পুড়েছেন তবু গৌরী-সুপ্রিয়া দুজনকেই তিনি স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছেন। সে সমাজ সংসার মানুক আর না মানুক।

মহানায়কের জীবন বেদনা যেন উঠে এসেছিল শ্যামল মিত্রর কণ্ঠে এই গানেই,

“কাঁদতে গিয়ে হাসি কেনে, হাসতে গিয়ে কাঁদি
ভালোবাসা’র আদালতে হইলাম আমি বাদী!
সংসারে’তে সাজিলাম রে সং, এই বুঝেছি সার
মনের কথা কারে বলি আর?”

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.