‘প্রেমে বরাবর মিডলম্যানের কাজ করতাম’- জিৎ গাঙ্গুলী

শ্রীভূমির পুজোয় বুর্জ খালিফার থিম সং ‘জয় মা দুর্গা’র দৌলতে এই বছরে পুজোর টক অফ দ্য টাউন মিউজিক কম্পোজার জিৎ গাঙ্গুলী। পুজোর মুখেই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিলেন বাংলা গানের এই দিকপাল মিউজিক কম্পোজার। জমিয়ে আড্ডা দিলেন চৈতালি দত্তর সঙ্গেএবার শ্রীভূমির পুজোয় বুর্জ খালিফার থিমে আপনার কম্পোজিশনের থিম সং ‘জয় মা দুর্গা’ তো ইতিমধ্যেই সুপারহিট-
জিৎ গাঙ্গুলী- (মুখের কথা শেষ না হতেই) থ্যাংক ইউ। সব মা দুর্গার আশীর্বাদ। এই গানের কথা লিখেছেন আমার স্ত্রী চন্দ্রাণী। আর আপনি তো জানেন গানটি গেয়েছেন অভিজিৎ ভট্টাচার্য। অনেকেই এই গানটা সম্পর্কে ভালো ফিডব্যাক দিচ্ছেন।তবে তো এবারে পুজো আপনার কাছে খুব স্পেশাল?
জিৎ গাঙ্গুলী- সেটা তো অবশ্যই। সবই মা দুর্গার আশীর্বাদ। মুম্বইতে থাকার দরুণ প্রতি বছর কলকাতার পুজোয় আসতে পারিনা। কিন্তু এই বছরে মায়ের আবদারে পুজোর সময় থাকব। আর পুজোয় কলকাতা থাকা মানেই মায়ের হাতে লুচি, ছোলার ডাল, আলুর দম আমার চাই-ই। মা জাস্ট ফাটাফাটি রান্না করেন। সেটা তো আমাকে খেতেই হবে। আর আমার ক্লাব সুরুচি সংঘে অষ্টমীর দিন আমি পাঞ্জাবি আর আমার স্ত্রী চন্দ্রাণী শাড়ি পরে অবশ্যই অঞ্জলি দেব। সেই সঙ্গে এই ক্লাবে ফুচকা খাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করব। আর ঢাক বাজানো, পেটপুরে খাওয়া-দাওয়া, জমাটি আড্ডা তো মাস্ট। আড্ডা ছাড়া তো বাঙালির কোনও উৎসব অনুষ্ঠানই জাস্ট ভাবা যায় না। আর নবমীর দিন বাড়িতে আমিষ রান্না হবে। মা দারুণ রান্না করেন। কব্জি ডুবিয়ে জমিয়ে খাওয়া দাওয়া হবে। উফ, দারুণ ব্যাপার।

শপিং নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে কমপ্লিট হয়ে গেছে?
জিৎ গাঙ্গুলী- হ্যাঁ। আমি নিজের জন্য কখনও পুজোতে কিছু কিনি না। মা, চন্দ্রাণী আর বন্ধুবান্ধবেরা যাদের আমি উপহার দিই সব কমপ্লিট হয়ে গেছে। আমাকে মা, চন্দ্রাণী পুজোতে উপহার দেয়। খুব সুন্দর পাঞ্জাবি আমার স্ত্রী উপহার দিয়েছেন। আসলে আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি সেই সময় আমার বাবার মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। ডাবল ডেকার বাসের চাকা আমার বাবার দুপায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। ফলে সেই ছোট্ট বয়স থেকেই আমার সংগ্রাম শুরু হয়। আমি বহু নামীদামি শিল্পীর সঙ্গে সেই ছোটো বয়স থেকেই সঙ্গত করতাম। গিটার বাজাতাম। প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। অনেক বিশিষ্ট শিল্পীর সান্নিধ্য পেয়েছি। ফলে অনেক কিছু শেখার আমার সুযোগ ঘটেছে। পুজোর সময় আমার বয়সী বন্ধুরা যখন নতুন জামাকাপড় পরে ঠাকুর দেখতে বাবা-মার সঙ্গে বেরত, তখন আমি সেইসময় সংসারে অর্থ যোগানের জন্য শো করতে যেতাম। কখনও মাকে দেখেছি আমাকে আড়াল করে তিনি কাঁদছেন। কিন্তু তিনি আমাকে কিছু বুঝতে দিতেন না। যেহেতু তার আমি সন্তান, আমি ঠিক ধরে ফেলতাম। মাও প্রচুর যুদ্ধ করেছেন। ফলে আজ যখন নিজের জন্য কিছু কিনতে যাই পুরনো সেই স্মৃতি আমার সামনে যেন ভিড় করে এসে দাঁড়ায়। ফলে নিজের জন্য আর আমি কিনতে পারি না। আজ পর্যন্ত যেরকম পোশাকেই আপনারা দেখুন না কেন, বুঝবেন তার কোনওটিই আমার কেনা নয়। আমার মা অথবা স্ত্রীয়ের কেনা।ছেলেবেলার পুজোর কোনও স্মৃতি আজ মনে পড়ে?
জিৎ গাঙ্গুলী- (হেসে) কলকাতায় পুজোর সময় থাকা মানেই ছেলেবেলার স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া। অনেক কিছুই মনে পড়ে। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সপ্তমী, অষ্টমী দুদিন আমাদের বাড়িতে নিরামিষ খাওয়ার প্রচলন। আর আমরা বন্ধুরা মিলে লুকিয়ে বাইরে গিয়ে আমিষ খেতাম। সেটা যে কী মজা লাগত কী বলব!

আর ছেলেবেলার পুজোর গান?
জিৎ গাঙ্গুলী- তখন আমি খুব ছোটো। ফোর কি ফাইভ স্ট্যান্ডার্ডে পড়ি। ঠিক করেছি বন্ধুরা মিলে ঠাকুর দেখতে যাব। বাড়ি থেকে মা-বাবার অনুমতি মিলেছে। আমার বরাহনগর আলমবাজারে জন্ম। মা গণ্ডি দিয়ে দিতেন। মায়ের আদেশ ছিল সিঁথির মোড়ের ওপাড়ে যাওয়া চলবে না। যাই হোক বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রায় মিনিট ১৫-২০ হাঁটার পর একটা পুজামণ্ডপে ঢুকতেই আর ডি বর্মনের কম্পোজিশনে ‘কোথা কোথা খুঁজেছি তোমায়’ গানটা শুনে আমি চমকে যাই। এত সুন্দর কম্পোজিশন! ঢাকের বাদ্যি, ধূপ-ধুনোর সৌরভ আর মা দুর্গার উপস্থিতি সব মিলিয়ে পুজো মণ্ডপে যেন স্বর্গীয় অনুভূতি। আমি ওই পুজোমণ্ডপে চেয়ার টেনে বসে পড়ি। পরের পুজো প্যান্ডেলে আমার যাওয়ার আর ইচ্ছা করে না। বন্ধুরা প্রচণ্ড রেগে যায়। কারণ ওরা অন্য প্রতিমা দর্শনে যাবে। ফলে ওরা আমাকে ফেলে রেখে প্রতিমা দর্শনে চলে যায়। কিছুক্ষণ সময় পূজামণ্ডপে থেকে আমি বাড়ি ফিরে আসি। আর কী কারণে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এলাম, সেটাও মাকে বলি। বাবা মা জানতেন আমি একজন গানপাগল মানুষ।এক সময় পুজোয় শিল্পীদের গান শোনার জন্য মানুষ মুখিয়ে থাকতেন। আপনার কাছে সেই স্মৃতি কেমন?
জিৎ গাঙ্গুলী- আমি যাঁর সবথেকে অন্ধ ভক্ত তিনি ছিলেন বাংলা জনপ্রিয় কম্পোজার সুধীন দাশগুপ্ত। যিনি হয়তো ষাট সত্তর দশকে মুম্বইতে সেভাবে বেশি কাজ করেননি। কিন্তু আমি মনে করি ভারতের এক নম্বর মিউজিক কম্পোজার হলেন সুধীন দাশগুপ্ত। বড় হয়েও ওঁর কম্পোজে পুজোর সময় যে গান বের হত, সেগুলো আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আমার মনে হয় যা আজও আধুনিক অ্যারেঞ্জমেন্ট। এছাড়াও আমার খুব প্রিয় শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ওরকম দরাজ মাখনের মতো কণ্ঠ ভারতবর্ষে খুবই বিরল। হেমন্তবাবুর রবীন্দ্রসংগীতে আমি আজও বুঁদ হয়ে থাকি। ওঁর কম্পোজ করা বাংলা এবং হিন্দি গান আমার মনকে স্পর্শ করে। আজও সুযোগ পেলে সলিল চৌধুরীর কম্পোজিশনে ওঁনার কণ্ঠে ‘রানার’ গানটা শুনি। পরবর্তী সময়ে পুজোর গানে নচিকেতা চক্রবর্তী, এমনকি নব্বই দশকে শানুদার পুজোর গান আমার কাছে খুবই হৃদয়স্পর্শী।একটা সময় পুজোমণ্ডপে খুব হিন্দি গান বাজত। ২০০৪-এ যখন আমি মুম্বই থেকে প্রথম কলকাতায় ‘প্রেমী’ ছবির জন্য মিউজিক করতে আসি সেই সময় আমার চ্যালেঞ্জ ছিল ডিস্কে আর পুজোমণ্ডপে বাংলা গান বাজবে। আমি সেটা করতে পেরেছি। আজ কিন্তু মণ্ডপে বাংলা গান বাজে। প্রথম যখন পুজো মণ্ডপে শুনেছিলাম ‘রিমঝিম ধারাতে’ মন ভরে গেছিল। এরপর ‘মন রাগে অনুরাগে’, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, ‘মন মানে না’, ‘পরাণ যায় জ্বলিয়া রে’ তারপর ‘ঢাকের তালে’ পরপর এই গানগুলো আমার কম্পোজিশনে যখন পুজোমণ্ডপে বাজতে শুনি, তখন আমার মনে হয় মা দুর্গার আশীর্বাদ ছাড়া সম্ভব ছিল না। একটা সময় স্টেজ পারফরমেন্সের সময় রাত আটটা পর্যন্ত বাংলার শিল্পীদের মঞ্চে তোলা হত। রাত দশটার পর থেকেই হিন্দি গান শুরু হত। কিন্তু কোভিডের আগে পর্যন্ত আমি রাত দশটার পরে স্টেজে টানা দু’ঘণ্টা পারফর্ম করেছি। আর শ্রোতা দর্শকরা আমার সঙ্গে গলা মেলাতেন। যা সত্যি গুরুজনদের এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদ।‘ঢাকের তালে কোমর দোলে’ গানটি তো এখন দুর্গা পুজোর সঙ্গে সিম্বলিক-

জিৎ গাঙ্গুলী- সত্যি ভীষণ ভালো লাগে। মায়ের আশীর্বাদ এবং গুরুজনদের আশীর্বাদ ছাড়া এটা সম্ভব ছিলনা। ছ’ থেকে ষাট বছর বয়স পর্যন্ত শ্রোতা-দর্শককুল যখন আমার সঙ্গে স্টেজে এই গানটি গায় এবং কোমর দোলায় সেটা আমার কাছে বিরাট প্রাপ্তি। তবে এক্ষেত্রে একটা কথা বলব, আমি কিন্তু প্রথম পুজোর থিম সং আমার ক্লাব সুরুচি সংঘে চালু করি। এরপর বেশ কয়েকটি পুজো তাঁরাও পুজোর থিম সং করেছেন, যা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আমি প্রতিটি পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ করছি, আপনাদের পাড়ায় পরিচিতদের মধ্যে অনেক মিউজিশিয়ান, সিঙ্গার, কম্পোজার আছেন। কোভিডের কারণে গত দু’বছর সেইসব মানুষদের কোনও কাজ নেই। যাঁদের পারফর্ম করে সংসার চালাতে হয়। আজ তাঁদের রুজি রোজগারের রাস্তাটাই বন্ধ হয়ে গেছে। তাই সেই অসহায় মানুষগুলোর স্বার্থে আপনারা এগিয়ে আসুন। তাঁদের দিয়ে পুজোর থিম সং করান। তাঁদেরকে সুযোগ দিন।

কোভিড আবহে আজ শিল্পীদের পারফর্ম বন্ধ হয়ে গেছে সেটাকে কতটা আপনি মিস করেন?
জিৎ গাঙ্গুলী (খুব গম্ভীর) খুব ভালো প্রশ্ন। সত্যি বলতে কি আমি ডিজিট্যালে কন্সার্ট করতে পছন্দ করি না। স্টেজে উঠে শ্রোতা-দর্শকদের যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, সেটা প্রায় দুবছর বন্ধ। বড্ড বিষণ্ণ লাগে। আমি এক জায়গায় বসে মিউজিক করতে পারি না। এই যে স্টেজে ঘুরে ঘুরে গান গাই এটাতেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এ বছরে মা দুর্গার কাছে অঞ্জলি দেওয়ার সময় আবদার করব যেন আগামী বছর থেকে আর কাউকে মাস্ক পরে অঞ্জলি দিতে না হয়। মানুষ যেন নির্ভয়েই আগের মতো সুস্থ পৃথিবীতে চলাফেরা করতে পারেন। আগামী বছর আমরা আগের মত বিজয়া দশমীতে সকলের সঙ্গে কোলাকুলি, গুরুজনদের প্রণাম করতে পারি। আর যেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে না হয়। গতবছর চারপাশে মৃত্যুর মিছিল আর মানুষের অসুস্থতার খবরে আমি বড্ড বিহ্বল হয়ে পড়ি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি সেই দিন যেন আর ফিরে না আসে। গত বছর কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক যেন নিমেষে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিল। আজ এই সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলতে গিয়ে মনটা বড্ড ভারী হয়ে আসছে। চোখের জল চলে আসছে। আর মনে করতে চাই না। ভাবলে যেন এখনও দমবন্ধ হয়ে আসে। সেইসব প্রিয় মানুষদের বিদায়ের স্মৃতি আজও অমলিন (চোখের কোণে জল)।
পুজায় কোনও প্রেমের স্মৃতি?
জিৎ গাঙ্গুলী-  আমি বরাবর মিডলম্যানের কাজ করতাম। বন্ধুরা কাউকে ভালো লাগলে আমাকে বলত, তুই গিটার বাজাবি অথবা গান গাইবি। নচেৎ তুই এমন একটা গান লিখে দে, সেটাই চিঠি হয়ে যাবে। আমি তাই করতাম। এ ব্যাপারে আমি কিন্তু খুব সফল। আর বন্ধুরা আমার সাহায্য ছাড়া কিছু করত না। আমার জীবনেও যে প্রেম আসেনি তা কিন্তু নয়। কিন্তু যে জীবনযুদ্ধে আমাকে ছেলেবেলা থেকে লড়াই করতে হয়েছে, কোনও প্রেমে আমি সাড়া দিতে পারিনি। যা আজ বলতে কোনও দ্বিধা নেই। তখন মনে একটাই প্রশ্ন ছিল কাল কী করব? কীভাবে চলবে? তাই বন্ধুদের মধ্যস্থতা করেই আমি আনন্দ পেতাম।

 

কেমন হতে চলেছে এই বছর ছেলেদের ট্রাডিশনাল ফেস্টিভ কালেকশন? কী বলছে ফ্যাশন ট্রেন্ড?

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More