‘স্বাতীলেখাকে প্রথম দেখে মনে হল এ যেন আরেক কেয়া’ – বিভাস চক্রবর্তী

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা থিয়েটার জগতের নাট্যসম্রাজ্ঞী স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত আজ প্রয়াত হলেন। শুধু বাংলার নয়, তিনি সর্বভারতীয় নাট্যভূমির অসামান্যা অভিনেত্রী। যার জীবনাবসানে শেষ হল এক বিশাল নাট্য অধ্যায়। স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর স্মৃতিচারণায় তাঁর বন্ধু, বহুদিনের সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী প্রখ্যাত নাট্যকার অভিনেতা বিভাস চক্রবর্তী।  শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়… বাংলা থিয়েটারে এই সব দিকপালদের পরে যাঁদের নাম সগর্বে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রদ্ধেয় বিভাস চক্রবর্তী।

স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর অভিনয় জীবন শুরু এলাহাবাদে মাত্র ৫ বছর বয়সে মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ নাটকে। যেহেতু এলাহাবাদে বড় হওয়া তাই স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি থেকে আশেপাশের মানুষ সবাই হিন্দিভাষী। সেই কারণে হিন্দি, ইংরাজি, বাংলা তিন ভাষার নাটকেই পারদর্শিনী ছিলেন স্বাতীলেখা। ১৯৭৮-এ এলাহাবাদ থেকে কলকাতায় চলে আসেন এবং ‘নান্দীকার’ নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত হন। স্বাতীলেখার প্রথম নাটক নান্দীকারে ‘খড়ির গণ্ডি’। এরপর ‘আন্তিগোনে’ এবং তারপর তো ইতিহাস। একদিকে যিনি ‘আন্তিগোনে’ করেন মঞ্চে দাপিয়ে, তিনিই আবার ‘বেলাশেষে’তে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়েন। দুটো কত আলাদা অথচ এক অভিনেত্রী। এখানেই স্বাতীলেখা শ্রেষ্ঠা।বহুদিনের সহকর্মী বন্ধু নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তী জানালেন “স্বাতীলেখা আমাদের থিয়েটারে অন্য হাওয়া নিয়ে ঢুকেছিলেন। স্বাতীলেখার সঙ্গে প্রথমে কলকাতা থিয়েটারের নাড়ির যোগাযোগ বোধহয় ছিল না। কারণ এলাহাবাদ থেকে একটা বাঙালিদের গ্রুপ কলকাতায় নাটক করতে এসেছিল, সেই গ্রুপে আমি প্রথম দেখি স্বাতীকে। বুদ্ধদেব বসুর ‘কলকাতার ইলেকট্রা’ নাটকে প্রথম আমি স্বাতীলেখাকে ওখানে দেখি। ‘কলকাতার ইলেকট্রা’ ছিল গ্রিক দেশের ইলেকট্রা ও তাঁর ইতিহাসের একটা বাংলা রূপান্তর। কলকাতা দূরদর্শনের প্রযোজক হিসেবে ঐ নাটকটা আমি দেখেছিলাম। ওঁরা দূরদর্শনের কাছে আবেদন করেছিলেন যাতে ‘কলকাতার ইলেকট্রা’ দূরদর্শনে দেখানো হয়। আমি যেহেতু নাট্যবিভাগের দায়িত্বে ছিলাম, আমি গিয়েছিলাম নাটকটা দেখতে। দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম স্বাতীর অভিনয়। সবদিক থেকে তাঁর বডি ল্যাঙ্গোয়েজ, বাচিক অভিনয়, চরিত্রে নিজেকে আত্মস্থ করা এমন আমি খুব কম দেখেছি। বাঙালি অভিনেত্রীদের মধ্যে যে বেশি ঘরোয়া ব্যাপারটা এসে যায় স্বাতী সেসবের থেকে অনেক উচ্চতার উন্নত অভিনেত্রী ছিলেন। আমি স্বাতীলেখার প্রথম যে অভিনয় দেখে মুগ্ধ হই তা ছিল বাঙালি চলতি ধারার অভিনয় থেকে অনেক যেন আলাদা।
তখন আমার মন বলছে এরকম একটা মেয়ে যদি আমাদের দলে পেতাম খুব ভালো হত। ও মা! তারপরই স্বাতীকে ‘নান্দীকার’এ আবিষ্কার করলাম। রুদ্রপ্রসাদ (সেনগুপ্ত) আমাকে আলাপ করিয়ে দিলেন স্বাতীর সঙ্গে, ‘বিভাস আমাদের দলে নতুন একজন সদস্যা অভিনেত্রী এসেছেন, তিনি হলেন স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত’। আমি বললাম যে একে তো আমি দেখেছি ‘কলকাতার ইলেকট্রা’ নাটকে। যাই হোক, আমার দলে না পেলেও রুদ্রপ্রসাদের দলে স্বাতী যুক্ত হয়েছেন দেখে ভালো লাগল। বাংলা নাট্যজগত এমন এক অভিনেত্রী পেল।

এরপর তো পরের পর ‘নান্দীকার’ নাটক স্বাতী করেছেন। মনে পড়ছে ‘নান্দীকার’এর বাইরেও আমার পরিচালনায় থিয়েটার ওয়ার্কশপের ‘শোয়াইক গেলো যুদ্ধে’ নাটকে ম্যাডাম কোপেজকার ভূমিকায় অভিনয় করেন স্বাতী। অশোক মুখোপাধ্যায় নাটকটা অনুবাদ করেছিলেন বাংলায়। ম্যাডাম কোপেজকা, শুঁড়িখানা অর্থাৎ বারের মালকিনের চরিত্রে অসামান্য অভিনয় করেন স্বাতী। ঐ বারের মালকিন যে গান গাইছে, ওরকম সাহসী চরিত্র সবমিলিয়ে মঞ্চে একটা ঝকঝকে ব্যাপার নিয়ে আসেন স্বাতী। যে কোন বাঙালি অভিনেত্রীর কাছে যা ছিল কষ্টসাধ্য।তারপর ১৯৮০ সালে কলকাতায় মঞ্চস্থ হয় ব্রেখটের নাটক ‘গ্যালিলেও’। নির্দেশক ছিলেন বার্লিন অঁনসম্বল থেকে আসা জার্মান নাট্য পরিচালক ফ্রিৎজ বেনেভিৎস। এই নাটক মঞ্চস্থ হয় ‘কলকাতা নাট্যকেন্দ্র’র ব্যানারে।
নামভূমিকায় ছিলেন শম্ভু মিত্র। আমি, জোছন দস্তিদার, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, অরুণ মুখোপাধ্যায়, অশোক মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়দের পাশে এ’নাটকে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মহিলা চরিত্রটিতে অভিনয় করেন তুলনামূলকভাবে নবাগতা স্বাতীলেখা চট্টোপাধ্যায়(তৎকালীন পদবী)। চরিত্রটির নাম ছিল সেনোরা সার্তি।” আর এই ‘শোয়াইক গেল যুদ্ধে’ ও ‘গ্যালিলিও’ থেকেই স্বাতীলেখা সেনগুপ্তর সত্যজিৎ-সংযোগ। যে দুটো নাটকে স্বাতীলেখার অভিনয় দেখেই তাঁকে ‘ঘরে বাইরে’র বিমলার জন্য নির্বাচন করেন সত্যজিৎ রায়।

সত্যজিতের ‘ঘরে-বাইরে’র বিমলা

সেই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রসঙ্গে বিভাস চক্রবর্তী জানালেন ” শোয়াইক গেলো যুদ্ধে ও গ্যালিলিও- এই দুটো নাটক সত্যজিৎ রায় দেখতে এসেছিলেন। আমি ওঁকে নাটক দেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। দুটো নাটক নিয়ে সত্যজিৎ রায় আমার সঙ্গে আলোচনাও করেছিলেন। স্বাতীর মধ্যে আলাদা কিছু লক্ষ্য করেছিলেন মানিকদা এবং সেটা উনি আমাকে বলেছিলেন। তারপরই স্বাতীকে উনি ‘ঘরে-বাইরে’তে বিমলার রোলে নিলেন। মানুষ স্বাতীরও ভীষণভাবে নাটকের ছেলেময়ের কাছে আলাদা একটা সম্মানের জায়গা ছিল। সবাই স্বাতীদি স্বাতীদি করে ডাকত। বন্ধু হিসেবেও স্বাতী খুব ভালো, পরের মঙ্গল চাইতেন। স্বাতীকে হারিয়ে বড় ক্ষতি হল বাংলা থিয়েটারের।”

স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত যখন বাংলা থিয়েটারে পদার্পণ করছেন তখন সবে সবে আরেক আইকনিক নাট্য অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তীর অধ্যায় শেষ হচ্ছে। কেয়া কেয়া চতুর্দিকে। কেয়ার শূন্যস্থান পূরণ করা কতটা কঠিন ছিল স্বাতীলেখার পক্ষে? কেয়া চক্রবর্তীর ছায়া নয়, বরং কেয়ার বিকল্প হয়ে উঠলেন স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত।

কেয়া চক্রবর্তী

এই সময়ের সাক্ষী বিভাস চক্রবর্তী জানাচ্ছেন “খুব ভালো প্রসঙ্গ এটা। আমি আজও অবধি এ কথা কোথাও বলিনি। সেসময় তো বলিইনি। যখন প্রথম দেখি স্বাতীলেখাকে ‘কলকাতার ইলেকট্রা’ নাটকে তখন আমার কেয়ার কথাটাই মাথায় এসেছিল। মনে হল এ যেন আরেক কেয়া। যদিও একইরকম দুজন নন, দুজন দুরকম, কিন্তু তখন যেন মনে হল কেয়ার পরে আরেকজন যেন এল কেয়ার মতোই। একদম এটাই মনে হয়েছিল আমার। আমি এটা কোথাও বলিনা কারণ দুই বিখ্যাত অভিনেত্রীকে ঐভাবে ব্র্যাকেট করা উচিত নয়।  কিন্তু কেয়ার ব্যক্তিত্বর বিকল্প স্বাতীকে মনে হয়েছিল। ঐসময় এঁনাদের খুব অবদান আছে। নাটকে নারী চরিত্রে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করছেন এরকম অভিনেত্রী তো খুব কম সেসময়ে। তৃপ্তি মিত্র, তারপর কেয়া, মায়া, তারপর এলেন স্বাতীলেখা। তো আজ সেই নাট্যজগতে নারীদের অবদানের এক উজ্জ্বল তারা খসে গেল। “

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More