‘মেরি বাবা’ বিপ্লবকেতন শুধু অভিনেতা নন এক সুরেলা মানুষও ছিলেন, আজও রয়ে গেছেন সুরেই

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

‘মেরি বাবা’ চরিত্র নাট্যজগত তথা বাস্তবজগতেও হিরো হয়ে রয়ে গেছে আজও। একসময় কলেজ পড়ুয়ারাও গানের অন্তাক্ষরীতে গেয়ে উঠেছে ‘মেরি বাবার গান’। আর এই ‘মেরি বাবা’ চরিত্রে যিনি আজও আইকনিক তিনি বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী। বিধানসভা ভবনের সরকারী চাকরির পাশাপাশি বজায় রেখেছেন তাঁর প্যাশন অভিনয় ও নাটককে ভালোবেসে একনিষ্ঠ সাধক হয়ে কাজ করে গেছেন নাট্যমঞ্চে।

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘চেতনা’ নাট্যগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা হলেন নাট্যকার ও অভিনেতা অরুণ মুখোপাধ্যায়। তিনি তাঁদের নাট্যদলে যখন প্রথম নাটক কী করা যায় ভাবছেন, তখন তাঁর ভাবনায় এল ‘মারীচ সংবাদ’। এই নাটকে মেরি বাবার গান গাইবার জন্য অরুণ বাবু  বললেন তাঁর দলের বিপ্লবকেতন বাবুকে। বিপ্লবকেতন দ্বিধান্বিত ছিলেন প্রথমে। কিন্তু পরে রাজি হন। তার পর তো ইতিহাস। দুর্দান্ত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল মেরি বাবার গান এবং ‘মারীচ সংবাদ’। মূল গায়েন বিপ্লবকেতন। সঙ্গে ওস্তাদ শিবশঙ্কর ঘোষ। দুই শিল্পীই প্রয়াত।

এতটাই জনপ্রিয়তা পায় মেরি বাবার গান যে বিপ্লবকেতনের নামই হয়ে যায় মেরি বাবা। লোকের মুখে মুখে ফিরত মেরি বাবার গান। একটা নাটকের গানও তখন এতটাই জনগনমন গান হয়ে ওঠে। উৎপল দত্ত বলেছিলেন ‘মারীচ সংবাদ’ দেখে, “প্রতিক্রিয়ার দুর্গে কামান দেগেছে মারীচ সংবাদ‌।” আর বিপ্লবকেতন শুধু অভিনেতা হন, একজন সুরেলা মানুষও বটে। মেরি বাবা গানের জনপ্রিয়তা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল একসময়।

তারপর ‘চেতনা’ গোষ্ঠীতে বহু নাটক করেছেন বিপ্লবকেতন। ‘জগন্নাথ’, ‘ভালো মানুষের পালা’, ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’, ‘মা’ প্রভৃতি নাটক। উৎপল দত্তের নাট্য অ্যাকাডেমির প্রথম প্রযোজনা  ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’-তে বিপ্লবকেতনের অভিনয় এখনও দর্শকের মনে গেঁথে রয়েছে।

‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’ নাটকে চারটে কিশোরী মেয়ের দরকার ছিল। যে চারজন বালিকা পরী সেজে ঘুরে বেড়াবে মঞ্চে। তো চারটের মধ্যে তিনটে বালিকা পাওয়া গেল বিপ্লবকেতনের বাড়ি থেকেই। বিপ্লবকেতনের তিন মেয়ে বিদীপ্তা, বিদিশা, সুদীপ্তা।

তখন উৎপল দত্ত বলেছিলেন “ইস বিপ্লব, আর একটা মেয়ে যদি থাকত তোমার!” বিপ্লবকেতনরেও অকাট্য জবাব “ইস উৎপলদা, কটা দিন আগে যদি বলতেন।” এই কথা শুনে উৎপল দত্ত স্বভাবসিদ্ধ অট্টহাসিতে হেসে উঠলেন। আর সেদিন লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেছিল ঐ নাটকের নৃত্য পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দীপালি চক্রবর্তীর, যিনি বিপ্লবকেতনের জায়া। বিদিশা যেমন মায়ের থেকে নাচটা পেয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন, বিপ্লবকেতন স্ত্রী ও কন্যাদের পুরুষতন্ত্রের চিরাচরিত জাঁতাকলে ফেলেননি। বরং নারীদেরও সম্মান দিয়েছেন তাঁদের শিল্পচর্চায় প্রেরণা জুগিয়েছেন তাতে সংসারটা যেন আরও পদ্মের মতো প্রস্ফুটিত হয়েছে। আবার জার্মান পরিচালক ফ্রিৎজ বেনেভিৎজ পরিচালনায় ‘গ্যালিলিওর জীবন’ নাটকে একজন বৃদ্ধ পাদ্রীর ভূমিকায় অভিনয় করে বিপ্লবকেতন সকলকে চমকে দেন। সে নাটকে গ্যালিলিও হতেন স্বয়ং শম্ভু মিত্র।

‘চেতনা’ থেকে বেরিয়ে নিজের নাট্যদল ‘থিয়েটারওয়ালা’ খুলেছেন ১৯৯৩ সালে বিপ্লবকেতন। কিন্তু ‘চেতনা’ গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। বিপ্লবকেতনের নাট্যদলের নাটক ‘বাঘুমান্না’-র নাট্যরূপ দিয়েছিলেন অরুণ মুখোপাধ্যায়ই। এছাড়াও সুচিত্রা ভট্টাচার্য রচিত ‘কাচের দেওয়াল’, ‘দুই বুড়ো’ মঞ্চস্থ করেন বিপ্লবকেতন তাঁর ‘থিয়েটারওয়ালা’য়।

বিপ্লবকেতন পরে চলচ্চিত্রে, টেলিভিশনেও এসেছেন। প্রথম কাজ জোছন দস্তিদারের ‘সোনেক্স’-এ। জনপ্রিয় হয়েছে ‘জন্মভূমি’তে তাঁর এককড়ি চরিত্র বা চুনি-পান্নার মতো কমেডি রোল। তরুণ মজুমদারের ‘ভালোবাসার অনেক নাম’ ছবিতেও কামোন্মত্ত প্রৌঢ়ের রোলে নজর কেড়েছিলেন বিপ্লবকেতন। কিন্তু মেরি বাবা রূপে আজও সেরা বিপ্লবকেতন। ইটিভি বাংলায় একটি উৎসবে টেলিভিশন মাধ্যমেও মেরি বাবার গান মেরি বাবা সেজে উপস্থাপিত করেছিলেন বিপ্লবকেতন।

বিপ্লবকেতন নিজের দল গঠন করার পর ‘মেরি বাবা’র অভিনয়ে তাঁকে আমরা সেভাবে পেলাম না। যে চরিত্র যে ‘মারীচ সংবাদ’ নাটক হাজার হাজার রজনী অতিক্রান্ত হিট দিয়েছিল। বিপ্লবকেতনের মেরি বাবা চরিত্র এর পর অরুণ পুত্র সুমন আর সুজন মুখোপাধ্যায় দুজনেই করেছেন। সুজন নীল মুখোপাধ্যায়ও মেরি বাবাতে অনবদ্য। পরম্পরা তো আসাই উচিত। তবে বিপ্লবকেতন তো মেরি বাবার ভূমিকায় একটি প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু এইসব মঞ্চ একটা সময়ের পর বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করল এবং নাটক গুলোর তো কোন সংরক্ষণ নেই। তাই হারিয়ে গেছে বড় বাবু শিশির ভাদুড়ি, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, কেয়া চক্রবর্তী, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্রর অবিস্মরণীয় সব নাটক।

সেই কথা ভেবেই ‘চেতনা’ গোষ্ঠী ‘মারীচ সংবাদ’ নাটককে ডিজিটালি সংরক্ষণ করে রাখবে চিন্তাভাবনা করে এবং তা বাস্তবায়িত হয়। ৪৮ বছরে প্রায় ১২০০ রজনী অভিনীত হয়েছে ‘‌মারীচ সংবাদ’‌। মঞ্চের অনুভূতি কখনই ডিজিটালি অ্যাপে বা ইউটিউবে আসে না। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে ‘মেরি বাবা’ ও ‘মারীচ সংবাদ’কে বাঁচিয়ে রাখতে এই উদ্যোগ।

১৯৮৩ সালে মঞ্চনাটকের আঙ্গিক রেখেই ১৬ মিলিমিটারে চলচ্চিত্রায়িত করা হয় ‘‌মারীচ সংবাদ’‌। পরবর্তীকালে প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গেছিল। একটা ভিএইচএস কপি থেকে ডিজিটাল ফর্মাটে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সেটাই দর্শকদের ডিজিটালি উপহার দেওয়া হয়েছে ‘‌মাই সিনেমা হল অ্যাপ’-এ।  ‘মারীচ সংবাদ’-এর মতো প্রতিটি স্মরণীয় নাটক যদি ডিজিটালাইজড করা হয় তাহলে বাংলার শিল্প, সাহিত্য, রুচি, ক্লাস হয়তো আর একটু সমৃদ্ধ হবে।

একটা সময় বিপ্লবকেতন স্মৃতিভ্রংশতা রোগের কারণে নিজের অভিনীত ‘মেরি বাবা’ চরিত্রটাও ভুলে গেছিলেন। প্রথমদিকে নিজের নাট্যদলে রিহার্সালে যেতেন পরে সেটাও আর পারতেন না। বোধহীন, স্থবির হয়ে পড়লেন ওমন প্রাণশক্তিময় মানুষটা। আগলে রেখেছিলেন স্ত্রী দিপালী চক্রবর্তী এবং তিন মেয়ে বিদীপ্তা, বিদিশা ও সুদীপ্তা। বাবার মেয়ে হয়ে তাঁরাও বজায় রেখেছেন বাবার অভিনয়সত্বা। তাঁরা নিজেরাও এক এক জন দুরন্ত অভিনেত্রী ও পারফর্মার।

২০১৮ সালের ৩০ নভেম্বরে প্রয়াত হন বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী।

তবে বিপ্লব আজও রয়েছেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কাজের মধ্যে। বিদীপ্তার দুই কন্যাই যেমন অভিনয়ে উৎসাহী, তাঁদের দেখাও গেছে বিভিন্ন চলচ্চিত্রে। সুদীপ্তার কন্যা শাহিদা আবার সেভাবে বিপ্লবকেতনকে না পেলেও, ডিজিটালি ‘মেরি বাবার গান’ শুনে সে এত ছোট বয়সেও তা তুলে ফেলেছে অবিকল দাদাইয়ের মতোই।

এভাবেই বিপ্লবকেতন আর তাঁর মেরি বাবা তো বেঁচে আছেন নাতনিদের মধ্যেই এবং যেসব ছাত্রছাত্রী তৈরী করে গেছেন তাঁদের মধ্যে। নামেই যার বিপ্লব সেই বিপ্লব চিরদিন দীর্ঘজীবি থাকবেই।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More