বেণুদি আমাকে সংসার করতে শিখিয়েছেন: সুদীপা চট্টোপাধ্যায়

0

ফুটফুটে গিন্নিবান্নি চেহারার মেয়েটি গত পনেরো বছর ধরে জি বাংলার রান্নাঘর সামলাচ্ছে। সামলাচ্ছে নিজের রান্নাঘরও। রোজ বিকেলে হাসি হাসি মুখে সকলের ঘরে ঘরে চলে আসে মেয়েটি। মেয়েটি  সুদীপা চট্টোপাধ্যায়।  সে তার জীবনের  অনেক না বলা কথা হুড়মুড় করে খুলে বলল সোমা লাহিড়ীকে।

রান্নাঘরের দায়িত্বে কত বছর?

( হাসতে হাসতে) কোন রান্নাঘরের কথা বলছেন? অগ্নিদেবের না জি বাংলার? অগ্নিদেব হলে এগারো বছর, আর জি বাংলার হলে পনেরো বছর। মাঝে আদি হওয়ার সময় কিছু মাস ব্রেক নিয়েছিলাম। দুটো রান্নাঘর থেকেই।

১১ বছর! ২০১৫-তে তোমাদের বিয়ে হল না?

২০১০-এই আমাদের সামাজিক বিয়ে হয়েছিল। বাবার জন্য খুব তাড়া ছিল। তাই আমাদের বালিগঞ্জের বাড়িতেই ছোট্ট অনুষ্ঠান করে কন্যাদান ও বিয়ে হয়েছিল। তার পরপরই বাবা চলে গেলেন। ২০১৫-তে আমাদের বিবাহবার্ষিকীর দিনে আবার রেজিস্ট্রি হল।

২০১৫-তে, রেজিস্ট্রির পরে।

রান্নাঘরের যাত্রা শুরু হল কী করে?

দুটো রান্নাঘরের কিন্তু দুটো আলাদা গল্প।

অগ্নিদেবের সঙ্গে বিয়ের গল্পটা আগে শুনি?

২০১০ সালে সামাজিক বিয়ের পর।

আমি তখন জি বাংলার রান্নাঘর করি, দু’একটা সিরিয়ালেও কাজ করেছি। আর উনি তখন নামী পরিচালক। প্রচুর হিট সিরিয়াল হচ্ছে ওঁর হাতে। সিনেমার পরিচালনাতেও সফল। খুব ঝকঝকে, স্মার্ট। ঠিক অন্য পরিচালকদের মতো নয়। আমি দূর থেকে দেখতাম। খুব ভাল লাগত। উনি খুব একটা পাত্তা দিতেন না। হয়তো শুভ বিজয়া বললাম, উনি একটু হাসলেন, উত্তর দিলেন না। মনটা একটু খারাপ হতো।

তাতেই বিয়ের কথা ভাবলে?

না না, তখন তা ভাবিনি। কারণ তখন অন্য একজনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। উনিও অন্য রিলেশনশিপে ছিলেন। আমার ভালবাসার মানুষটি আমাকে ঠকাল। মানসিক, আর্থিক সব দিক থেকে। আমি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বাড়িতে অশান্তি । চিন্তায়  আমি ঘুমোতে পারতাম না।  অগ্নিদেবের জ্যেঠিমা, দিদিরা আমাকে খুব ভালবাসতেন। ওঁরা আমার এই অবস্থা দেখে অগ্নিদেবকে বলেন আমাকে একটু সাপোর্ট দিতে। দিদি-জামাইবাবুরা যে প্ল্যান করে এটা করেছিলেন অগ্নিদেব বুঝতে পারেননি।

আর এক সন্তান।

অগ্নিদেবের দিদিদের সঙ্গে তোমার যোগাযোগ ছিল?

অগ্নিদেবের জামাইবাবু প্রডিউসার বিপিন ভোরা। প্রোডাকশন হাউসে ওঁর দিদিরা বসতেন। দোলের পার্টি বা বিজয়া সম্মিলনীতে জ্যেঠিমা আসতেন। আমি প্রণাম করতাম। পরে  শুনেছি, উনি বলতেন , একমাত্র এই মেয়েটা আমাকে প্রণাম করে। কী সরল, সাদামাঠা, নিশ্চয়ই ভাল পরিবারের মেয়ে। অগ্নির সঙ্গে এমন একটা মেয়ের বিয়ে হলে ভাল হতো। আমাকে নিয়ে ওদের পরিবারে আলোচনা হতো। তাই হয়তো অগ্নির মনে একটা বীজ বোনা হয়ে গিয়েছিল।

তারপর কী হল?

আমি তখন রান্নাঘরের শ্যুটেই ছিলাম। হঠাৎ দেখি ফোন বাজছে, স্ক্রিনে ওঁর নাম। আমি তো অবাক।  উনি ফোন করছেন মানে তো আমার কাছে শাহরুখ খান ফোন করছেন। আমাকে ডিরেক্টর বললেন, ধরে দেখো হয়তো কোনও কাজের কথা বলবেন। ধরলাম। সেই শুরু।

এ তো সত্যিই গল্পের মতো লাগছে!

(হেসে) তিন দিন পরেই ওঁর বাড়িতে লাঞ্চে গেলাম। সব শুনলেন। বললেন, তুমি এখানেই একটা ঘরে থাকো। মনে করো পেয়িং গেস্ট রয়েছো। সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম আজ অবধি কখনও এই বাড়ির বাইরে রাত কাটাইনি।

তোমার বাড়ি থেকে আপত্তি হয়নি?

বাবা তো তিন মাস কথাই বলেননি। আমি রোজ কান্নাকাটি করতাম। ব্রাত্যদা (ব্রাত্য বসু) আমার দাদার বন্ধু। অগ্নিদেবেরও। ব্রাত্যদা বাবাকে বোঝালেন। বললেন, ‘অগ্নিদেবের সঙ্গে একবার বসে কথা বলুন, ও খুব ভাল মানুষ।’ বাবা কথা বললেন। খুব ভাল লাগল। তারপর তো আমাদের বিয়ে। কিছুদিনের মধ্যে বাবা চলেও গেলেন। তারপর আমার মাকে উনি নিয়ে এলেন আমাদের বাড়িতে। আসলে দাদাদের বদলির চাকরি,বৌদিরাও চাকরি করে। মাকে একা বাড়িতে রাখতে চায়নি ও।

দুই মায়ের সঙ্গে।

সংসার সামলে কাজ করতে অসুবিধে হয় না?

এখন তো খুব গুছিযে সংসার করছি, কিন্তু প্রথম দিকে আমার কনফিডেন্স লেভেল জিরো ছিল। কেবল মনে হতো ও  আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো? আমাকে সংসার করতে শিখিয়েছেন বেণুদি (সুপ্রিয়া দেবী)। আমাকে খুব বোঝাতেন। কেমন অবুঝ ছিলাম আমি একটু বলি। বিপ্লব চট্টোপাধ্যয়ের ছেলের বিয়ে। ইন্ডাস্ট্রির প্রায় সবাই হাজির। কোনও একটা বিষয় নিয়ে অগ্নি আর দেবুর (দেবলীনা দত্ত) মধ্যে তর্ক হচ্ছিল। আমার শুনে মনে হল দেবুই ঠিক বলছে। সেটা বলতেই অগ্নি রেগে বেরিয়ে গেল। আমি ভাবলাম আমাকে ফেলে চলে গেছে। আমি কেঁদে ফেললাম। সবাই আমাকে বোঝাতে লাগলেন। দেবু বলল, কাঁদিস না।আমি তোকে পৌঁছে দেব। তারপর দেখি ড্রাইভার এসে আমাকে ডাকছে। অগ্নি গাড়িতেই বসেছিল, বলল, ‘তুমি ভাবলে কী করে যে আমি তোমাকে ফেলে চলে যাব?’

সুপ্রিয়া দেবী তোমাকে সাহস জুগিয়েছেন?

আমাকে পুরোপুরি গাইড করেছেন। তখন তো স্টুডিওগুলো এসি ছিল না। দাসানিতে শ্যুট চলছিল। বিকেলে অগ্নি বাইরের লনে কিছুক্ষণ বসতো। আমি খাবার নিয়ে যেতাম। দেখতাম নামী অভিনেত্রীরা ওকে ঘিরে বসে গল্প করছেন। আমাকে সবাই বসতে বলত। আমি কিছুক্ষণ বসে ভেতরে মেক আপ রুমে বেণুদির কাছে চলে যেতাম।

বাড়ির পুজোয়, সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গে।
বেণুদির সঙ্গে ওঁর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে।

একদিন বেণুদি বললেন, ‘তোর বর বাইরে বসে আছে তুই এখানে কেন?’ আমি বললাম, ‘ওখানে বড় বড় নায়িকারা কথা বলছে তো, আমার কেমন অস্বস্তি হয়।’ বেনুদি বলেছিলেন, ‘শোনো, তুমি স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, সফল একজন মানুষকে বিয়ে করবে আর সুন্দরী মেয়েরা তার পাশে থাকবে না তা তো হয় না। তাহলে তোমার কোনও অফিসের ক্লার্ককে বিয়ে করা উচিত ছিল।’আর কী বলতেন?

বলতেন, হাজব্যান্ড পার্টি থেকে ড্রিংক করে এলে তখনই কিছু বলবে  না। পরের দিন চায়ে চুমুক দেওয়ার পর যা বলতে চাও আস্তে আস্তে বলবে। তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করবে না। আর ঝগড়ার সময় বলা তেতো কথা, পরে উল্লেখ করে কিছু বলবে না।  মনে রাখবে কথায় কথা বাড়ে।

বাড়ির পুজোয়, পি.সি. সরকারের সঙ্গে।

আর বেণুদি বলতেন ঝগড়া বাসি হতে দেবে না।চটপট মিটিয়ে নেবে। সত্যি বলছি সংসার সামলানোর এই সব শিক্ষা আমার মা কখনও আমাকে  দেননি। আর বেণুদি দিয়ে গেছেন ওঁর রান্নার ডায়েরি। আমার অমূল্য সম্পদ। আমি বুকে করে রেখেছি। অসাধারণ রাঁধতেন। শ্যুটিংয়ে অগ্নিদেবের জন্য  কম তেল-মশলায় রান্না করে আনতেন। অনেক আনতেন। সবাই মিলে খেতাম।

বেণুদির প্রথম টেলিভিশনে কাজ, অগ্নিদেবের ধারাবাহিকে।

রান্না নিয়ে কোনও মজার ঘটনা মনে পড়ে?

অগ্নিদেবের ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’ ধারাবাহিকে বেণুদি, সাবুদি (সাবিত্রী চট্টোপাধ্য্যয়) দুজনেই ছিলেন। অগ্নি সাবুদিকে টিজ করত, ‘বেণুদি রোজ রেঁধে আনে, কই সাবুদি তুমি তো কিছু আনো না!’ সাবুদি একদিন সবার জন্য চিকেন রান্না করে আনলেন। খেতে ভাল হলে কী হবে, খুব ঝাল। কিন্তু বলা চলবে না, সাবুদি রেগে যাবেন। সবার নাকের জলে-চোখের জলে অবস্থা দেখে বেণুদি বললেন, সাবু তো চিকেন খাওয়াল আমি রসোগোল্লা খাওয়াচ্ছি। শেষে রসোগোল্লা খেয়ে সবাই শান্ত হল। তুমি বলছিলে সংসার করার ক্ষেত্রে তোমার কনফিডেন্সের অভাব ছিল, কাজের জায়গাতেও কি তাই?

ঠিক সেরকম নয়,আসলে সেলফ অ্যাসেসমেন্ট একেবারে ছিল না। একটা ফোন আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কোনও কারণে অভিনেত্রী অর্পিতা চট্টোপাধ্য্যয়কে কল করে বলেছি, ‘আমি সুদীপা, অগ্নিদেব চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী কথা বলছি।’  উনি বলেছিলেন, ‘শোনো এরপর থেকে কল  করলে বলবে সুদীপা বলছি, আমি বুঝতে না পারলে বলবে রান্নাঘরের সুদীপা বলছি। তোমার নিজের একটা পরিচয় আছে। বহু বছর ধরে তুমি একটা প্রোগ্রামের সঞ্চালিকা। সারা বাংলা তোমাকে চেনে, এটা মনে রাখবে।’

অর্পিতাদির কথাগুলো নিজেকে চিনতে শিখিয়েছিল। আর অগ্নিদেবের ইন্সপিরেশন তো আছেই।

কী রকম?

আমি তো বাংলা মিডিয়ামে পড়েছি তাই বিদেশে গিয়ে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না। লজ্জা পেতাম। দেখে উনি বললেন, ‘শোনো, তুমি সুদীপা। জানো বাংলার কত মেয়ে তোমার মতো সঞ্চালিকা হতে চায়? তোমার মতো সাজগোজ করতে চায়, তোমার মতো কথা বলতে চায়। মাতৃভাষাই আসল ভাষা। তাই ইংরেজিতে কথা বলতে না পারার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। বি কনফিডেন্ট।’

কথায় আছে না,একজন পুরুষের সাফল্যের পেছনে একজন নারীর অবদান থাকে,আমার মনে হয় ব্যাপারটা রেসিপ্রোকাল। সেই নারীর সাফল্যের পেছনেও তাঁর প্রিয় মানুষটি থাকেন। এই যে আমি বাংলার শিল্পীদের জন্য কিছু করতে চাইছি, তাই ব্যবসা শুরু করেছি, এতেও অগ্নিদেবের যথেষ্ট সহযোগিতা পাচ্ছি। শুধু সহযোগিতাই নয় অগ্নিদেব প্রথম থেকে আমাকে প্যাম্পারও করেছে।

বড় ছেলে আকাশের সঙ্গে।

যেমন!

যেমন ধরুন আমার দুটো হানিমুন হয়েছে। আসলে ও জিজ্ঞেস করেছিল কোথায় যেতে চাই। আমার ইচ্ছে ছিল সুইজারল্যান্ড । কিন্তু লজ্জা পেয়ে বলেছিলাম মানালি কিংবা সুইজারল্যান্ড। ও দু’টোরই টিকিট কেটেছিল। আরও আছে কত বলব।

তোমার ছেলে তো ছোট্ট, সময় পাচ্ছো?

আদির জন্মদিনে।

আমার আদির বয়স তিন। সত্যিই খুব ছোট। তবে আমার স্টোরটা বাড়ির কাছেই। ও ইচ্ছে হলেই বাড়ির কারও সঙ্গে গুটগুট করে চলে আসে। আমার আর এক ছেলেও আছে, আকাশ। অগ্নিদেবের বড় ছেলে। মা দুর্গার আশীর্বাদে সকলকে নিয়ে সুখেই কাটছে দিন।

আজ এই পর্যন্তই থাক। আবার একদিন শুনব তোমার জি বাংলার রান্নাঘরের গল্প।

নিশ্চয়ই। কেমন হুড়মুড় করে নিজের সব কথা আপনাকে  বলে ফেললাম না? দ্য ওয়ালের পাঠকদের জন্য অনেক  শুভেচ্ছা রইল। ভাল থাকুন সবাই।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.