‘কোয়েলের কাছে’র যশোবন্ত চরিত্রে ভাবা হয়েছিল উত্তমকুমার থেকে জর্জ বেকারকে

0

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ প্রয়াত হলেন কিংবদন্তি সাহিত্যিক ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বুদ্ধদেব গুহ। যিনি একাধারে সফল চার্টাড একাউনটেন্ট, গায়ক, চিত্রশিল্পী, খ্যাতিমান সাহিত্যিক এবং অবশ্যই বিদগ্ধ মহলে বটগাছসম ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাহিত্য নিয়ে বাংলা ছবি কমই হয়েছে। ঋজুদা নিয়ে তো কোনও পরিচালক ছবি করবার কথা ভাবেনইনি। সদ্য গতবছর মুক্তি পেয়েছিল বুদ্ধদেব গুহর দু’‌টি ছোটো গল্প– ‘‌বাবা হওয়া’‌ এবং ‘‌স্বামী হওয়া’ অবলম্বনে তৈরি ব্রাত্য বসুর ‘‌ডিকশনারি’ ছবি। সেই অর্থে আইকনিক হল না।কিন্তু একসময় বাংলায় ও বলিউডে বুদ্ধদেব গুহর আইকনিক ‘কোয়েলের কাছে’ নিয়ে ছবি হবার কথা পাকা হয় এবং সেটা বারবার। টালিগঞ্জ পাড়ায় কান পাতলে আজও শোনা যায় সেসব গল্প। যা অনেকেরই অজানা।
ষাটের দশকের শেষদিকে বা সত্তরের শুরুতে ‘অগ্রগামী’ গোষ্ঠীর পরিচালক স্বর্গীয় জয়ন্ত ভট্টাচার্য বুদ্ধদেব গুহর চারটি উপন্যাস ‘কোয়েলের কাছে’, ‘একটু উষ্ণতার জন্য’, ‘নগ্ন নির্জন’ ও ‘চবুতরা’ নিয়ে ছবি করার কথা ভাবেন।প্রযোজক অজয় বসু চারটে ছবিতেই উত্তমকুমারকে ভাবেন। ছবিগুলি বড় বাজেটের হওয়ায় সহ-প্রযোজক হতে চান চণ্ডীমাতা ফিল্মসের সত্যনারায়ন খাঁ। ‘চবুতরা’ ছবিতে উত্তমকুমারের বিপরীতে প্রথমবারের জন্য অভিনয় করতেন বম্বের রেখা।
এগুলোর মধ্যে ‘কোয়েলের
 কাছে’র মহরতও হয়ে গেছিল। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে একটা ছবিও হয়নি। তারপর তো উত্তম কুমার চলে গেলেন। বাঙালির আর দেখা হলনা ‘কোয়েলের কাছে’র নায়ক যশোবন্তের ভূমিকায় উত্তমকুমারকে কেমন লাগত!ইতিমধ্যে বম্বেতেও হিন্দিতে ‘কোয়েলের কাছে’ করবার কথা ঠিক হয় অমিতাভ বচ্চন, শত্রুঘ্ন সিনহাকে নিয়ে। সে চেষ্টাও বিফলে যায়।
উত্তম-পরবর্তী যুগে উত্তমকুমার মারা যাবার কিছু বছর পর আশির দশকেই আবার ‘কোয়েলের কাছে’ ছবি করবার কথা ভাবা হয়।
এবার যশোবন্তের ভূমিকায়
ভাবা হয় এমন এক হিরোকে যার চেহারা, বাচনভঙ্গি বাঙালিদের সঙ্গে মেলেনা। বরং অনেকটাই সাহেব ঘরানার তিনি। গ্রিকদের ছায়া যার পৌরুষে। তিনি জর্জ বেকার।জর্জ তখন অন্যধারার অভিনেতা ছিলেন সমসাময়িক রঞ্জিত মল্লিক, দীপঙ্কর দে বা শমিত ভঞ্জদের থেকে। আজ বুদ্ধদেব গুহর প্রয়াণের খবর শুনে তাই বেশ থমকে গেছেন জর্জ বেকার। কারণ বুদ্ধদেবের ‘কোয়েলের কাছে’ জর্জের জীবনের অনেকটা জুড়ে।জর্জ বেকার এই ছবি নিয়ে এযুগে আর আলোচনা করেননা। জর্জের মতে আজকালকার মিডিয়া এত গভীর গবেষণা আজকাল আর করেনা। তবু এবার মুখ খুললেন জর্জ। জর্জ বেকার আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগেকার কথা জানালেন, “আমি তখন আসাম ভবনে থাকি। তার আগে ‘চামেলি মেমসাহেব’ থেকে পরের পর আমার অনেক ছবিই মুক্তি পেয়েছে। রঞ্জিত সরকার বলে একজন পরিচালক কাম প্রযোজক ভদ্রলোক আমার কাছে ‘কোয়েলের কাছে’তে হিরো করার প্রস্তাব নিয়ে এলেন। বুদ্ধদেব গুহ-র জনপ্রিয় উপন্যাস, সেটার মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করার ব্যাপারে আমি স্বভাবতই খুব আগ্রহী হই। দুর্দান্ত গল্প আমি জানতাম। বললেন ‘যশোবন্ত চরিত্র আপনাকে করতে হবে।’ চিত্রনাট্য ভালো লেগে গেল, রাজি হয়ে গেলাম। আউটডোর শ্যুটিং ওড়িশাতে। আমরা বেরিয়ে গেলাম ট্রেন ধরে পুরো ইউনিট ওড়িশার পথে। আমরা একটা নদীর ধারেও শ্যুট করেছিলাম। যতদূর জানি সেই নদীটার নামও কোয়েল। সাহিত্য অনুসারেই আউটডোর নির্বাচন হয়েছিল। একটা পুরো শিডিউল আমরা শ্যুট করেছিলাম। কিছুদিন পর আবারও ওখানে শ্যুট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারপর কী হল আমি জানিনা। আর হল না শ্যুটিং। ‘কোয়েলের কাছে’ ছবিটাই শেষ হলনা। আমি, আলপনা, সঙ্ঘমিত্রা, বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জি সবাই ওড়িশায় গেছিলাম। আমার জীবনের স্মরণীয় কাজ বন্ধ হয়ে গেল। কারণ আমার আজও অজ্ঞাত। অতীতেও ‘কোয়েলের কাছে’ ছবিটার সঙ্গে একই ঘটনা ঘটেছে। জানিনা এটাই ছবিটার ভবিতব্য ছিল কিনা। ছবিটার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে। “

আলপনা

‘কোয়েলের কাছে’ ছবিতে যশোবন্তের ভূমিকায় অভিনয় করেন জর্জ বেকার। মারিয়ানা করেছিলেন আলপনা গোস্বামী এবং সুমিতা বৌদির ভূমিকায় সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জি আর লাল-সাহেব বিশ্বজিৎ চ্যাটার্জি। চারজনের জীবনেই বাঁকবদল ঘটাতে পারত এ ছবি। বিশ্বজিৎ বম্বের তাঁকে যদি ছেড়েও দিই, আলপনা গোস্বামী অমন একটি আইকনিক নায়িকা চরিত্র পেতেন। ‘ভ্যাম্প’ স্ট্যাম্প গায়ে লাগা সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জির অন্যধারার অভিনয় আমরা দেখতে পেতাম আর যশোবন্তের রোল করলে জর্জ বেকারের নায়করূপে ফিল্ম ক্যারিয়ারটা আরও অনেক এগিয়ে যেত।

সঙ্ঘমিত্রা ও আলপনা

যদিও যশোবন্ত কিন্তু জর্জকে ছেড়ে যায়নি। পরে জর্জ ‘কোয়েলের কাছে’র যশোবন্ত করলেন, তবে ফিল্মে নয় এবার পেশাদার রঙ্গমঞ্চে। কিছু বছর পর ‘কোয়েলের কাছে’ নিয়ে একজন নাটক লিখে ফেললেন। মির্নাভা থিয়েটারে মঞ্চস্থ হল ‘কোয়েলের কাছে’ নাটক।
জর্জ বেকার বললেন “এবার নাটকে আমি করলাম যশোবন্ত। আমার স্ত্রী অর্পিতা বেকার করলেন মারিয়ানা। সুমিতা বৌদি সুমিতা সান্যাল আর লাল সাহেব করেছিলেন বোধিসত্ত্ব মজুমদার। মির্নাভা থিয়েটারে দুবছর মঞ্চসফল নাটক ‘কোয়েলের কাছে’ করলাম আমরা।যশোবন্ত চরিত্রটা ছিল রিয়্যাল হিরো। যশোবন্ত ফিল্মে করেছিলাম ঘোড়ায় উপর চড়ে অভিনয়। আমি খুব একটা এরকম চরিত্র পরেও আর পাইনি। ঘোড়ায় চড়ে সেটা তো আর থিয়েটারে সম্ভব না।
তাই মির্নাভা থিয়েটারে
মঞ্চে আমার সঙ্গে একটা বড় অ্যালসেশিয়ান কুকুর থাকত। অভিনয় করতে করতে কুকুররা পোষ মেনে যায়। আমি স্টেজে ঢুকলে কুকুরটা আমার সাথে ঢুকত।”অর্পিতা বেকার জানাচ্ছেন “আজকাল ভালো রোল পাইনা বলে সেভাবে কাজ করা হয়ে ওঠেনা। কিন্তু আজও মানুষ আমাকে ‘জননী’র বড় বৌমা বলে মনে রেখেছে। যেখানেই যাই সবাই বলে আমিই সুপ্রিয়া দেবীর বড় বৌমা। ‘কোয়েলের কাছে’ নিয়ে বলব মারিয়ানা চরিত্রটা আমার থিয়েটার ক্যারিয়ারে স্মরণীয়। এই নাটকে একটা সিন ছিল হাফটাইমের আগে জাহাজ ডোবার দৃশ্য। সেটা কতটা দুর্দান্ত যারা দেখেছেন জানেন। তাপস সেন আলো করেছিলেন। সে মানে এক অপূর্ব দৃশ্য। আজকাল বাংলা ছবিতে সব স্পেশাল এফেক্ট। কিন্তু তখন নাটকে অমন একটি দৃশ্য রূপায়ন করা হয়। নাটকটা লিখেছিলেন যতদূর অমল ঘোষ নামে একজন। অমলদা বলতাম আমরা। উনি বুদ্ধদেব গুহর লেখা থেকে নাটকের চিত্রনাট্য লেখেন।
পরেও টেলিভিশনে বুদ্ধদেব গুহর লেখা শেষ গল্প ‘অবেলা’ নিয়ে আকাশ আটে অভিনয় করেছিলাম ‘টাটকা গল্প আটকা মাস’ সিরিজে। সন্তুদা (মুখার্জী), রূপা (গাঙ্গুলি) আর আমি করেছিলাম। সেটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বুদ্ধদেব গুহর দেশের বাড়ির কাছে শ্যুটিং করেছিলাম আমরা।”

জর্জের স্ত্রী অর্পিতা বেকার

কিন্তু আমাদের দেশে তো থিয়েটারের সংরক্ষণ হয়নি তাই এমন সব মণিমুক্ত কাজ হারিয়ে গেছে। নেই কোন ভিডিও সংরক্ষণ। আর আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে ‘কোয়েলের কাছে’ ফিল্ম হলে তরুণ চোখ ঝলসানো সুদর্শন জর্জ বেকারের যশোবন্ত চরিত্রে অভিনয়টা ধরা থাকত।জর্জ বেকারের কথায় “হয়তো পরিচালক আর প্রযোজকের মধ্যে কোনও মতবিরোধ হয়েছিল, তাই ছবিটা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা তো অনেকটা শ্যুট করেছিলাম, সেসব রিলও বোধহয় হারিয়ে গেছে। উত্তমকুমার বা অমিতাভ বচ্চন তো কোনও শ্যুট করেননি যা আমায় বলেছিলেন রঞ্জিৎ সরকার। যশোবন্ত চরিত্রটা যদি ফিল্মে করতে পারতাম আমার অভিনয়-জীবনে মাইলস্টোন হয়ে থাকত। ‘কোয়েলের কাছে’ যদি হত আমার ক্যারিয়ারে অন্য পথ খুলে যেত। নাটক যখন হল এমন একটা শো ছিলনা যেটা হাউসফুল যায়নি। বৃহস্পতি, শনি, রবি আর প্রতিটা ছুটির দিন করতাম। রোজ হাউসফুল। একটা কথাই শেষে বলার, ‘কোয়েলের কাছে’ হিন্দিতে করার সময় অমিতাভ বচ্চন-শত্রুঘ্ন সিনহার ডেট পাওয়া নিয়ে অনেকদিন ঝুলে ছিল। আল্টিমেটলি হলনা। আমাদের বাংলাটা অর্ধেক শ্যুট হয়েও পুরো ছবিটা হলনা। জানিনা ছবিটা বানাতে গেলে কী নিয়তি ছিল! কিন্তু ‘কোয়েলের কাছে’ গল্পটার যে জোর ছিল তার প্রমাণ ‘কোয়েলের কাছে’ যখন মঞ্চসফল নাটক হল। টানা দুবছর হাউসফুল শো চলেছিল। ফিল্মে যশোবন্ত করতে পারলে আমার ক্যারিয়ারে অন্যদিক খুলে যেত। আজ আমি সকালে যখন বুদ্ধদেব গুহর চলে যাবার খবরটা টিভিতে দেখলাম আর অবাক হয়ে গেলাম। মনে পড়ে গেল এইসব চল্লিশ বছর আগের কথাগুলো। বলতে পেরে খুব শান্তি পেলাম।”

‘কোয়েলের কাছে’ কিন্তু আকাশবাণীতেও রেডিও-নাটক হয়েছিল। যশোবন্ত করতেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। জানা নেই সেই অবিস্মরণীয় নাটক আকাশবাণী আর্কাইভে আছে কিনা। আটের দশকে বুদ্ধদেব গুহর ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ শ্রুতিনাটক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয় হয়। কারা করতেন! অপর্ণা সেন আর দীপঙ্কর দে।রবীন্দ্রসদনের অডিয়েন্স তো বটেই সদনের সিঁড়িতে বসেও সেই শ্রুতিনাটক শুনত লোকে।
শুধুমাত্র দূরদর্শনেই আটের দশকে বুদ্ধদেব গুহর ১২টা গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছিল টিভি সিরিজ ‘অয়ন’।

সাহিত্য জগতের নক্ষত্র বুদ্ধদেব গুহর কাহিনির সফল চলচ্চিত্ররূপ অধরাই থেকে গেল। অন্তত লেখক দেখে যেতে পারলেননা তাঁর সৃষ্টির সার্থক চলচ্চিত্রায়ণ।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.