বিদায়বেলায় সোনার গয়না খুলে ফুলের সাজে অপরূপা উত্তমকুমারের লক্ষ্মী

0

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় প্রতিবারই চমক থাকে সেলেব্রিটিদের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো নিয়ে। তবে এই সব পুজোরই মধ্যমণি উত্তমকুমারের (Uttamkumar) বাড়ির লক্ষ্মীপুজো। আজ বলে নয়, ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জী রোডে উত্তমকুমারের পৈতৃক বাড়ির এই পুজো চিরকালই বিখ্যাত।

এই পুজো শুরু করেছিলেন উত্তমকুমার নিজে। একমাত্র এইদিন এই বাড়িতে এলে মা লক্ষ্মী সহ মহানায়ক দর্শনও পাওয়া হত ভক্তদের। এইদিনটা মহানায়ক হাত খুলে খরচ করতেন। মহানায়কের আমলে এই বাড়ির পুজোর ছিল সুবর্ণযুগ। মাঝে জৌলুস কিছুটা কমলেও বর্তমানে উত্তম নাতি-নাতনিরা আবার পুজোর গ্ল্যামার ফিরিয়ে এনেছেন তাঁদের নিজেদের মতো করে। বর্তমানে তাঁরাও রয়েছেন গ্ল্যামার ইন্ডাস্ট্রিতে।

এ বছর ছিল উত্তম কুমারের নাতি গৌরব চট্টোপাধ্যায় ও নাতবৌমা দেবলীনা কুমারের বিয়ের পর প্রথম কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো। একসঙ্গে জোড়ে বসে মা লক্ষ্মীর পুজো ও সংকল্প করেন গৌরব-দেবলীনা। এইদিন গৌরবের সাথে দেবলীনাও করেছেন নির্জলা উপোস। পাশাপাশি নজর কেড়েছে তাঁর স্টাইল স্টেটমেন্টও। পুরোপুরি সাবেকি সাজে সেজেছিলেন দেবলীনা।চট্টোপাধ্যায় বাড়ির কুলদেবতা দামোদর। কুলদেবতাকে গঙ্গাস্নান করিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় মায়ের পাশেই। এবারেও সেই রীতি পালিত হয়েছে, সঙ্গে হয়েছে মায়ের ভোগ রান্নাও। তবে নিজের শ্বশুড়বাড়ির ভোগ রান্নায় হাত লাগাতে পারেননি দেবলীনা। কারণ, পরিবারের নিয়ম, কুলদেবতার দীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত ভোগ রান্না করা যায় না। তাই আর দেবলীনা ভোগের রান্নায় হাত দিতে পারেননি।

বাড়িতে প্রথম লক্ষ্মীপুজো শুরু করেন মহানায়ক, নেপথ্যে এক দুর্দান্ত কাহিনি

পুজোর দায়িত্ব বর্তমানে উত্তম-পৌত্র গৌরব সামলান নিষ্ঠাভরে। বরুণকুমার ও তরুণকুমারের নাতি-নাতনি-নাতবৌরাও এই পুজোয় যোগদান করেন মুখ্য কাণ্ডারী হয়ে।

প্রতিমাকে এ বাড়িতে ঘরের মেয়ের বা বৌয়ের মতোই দেখা হয়। উত্তমকুমারের ইচ্ছানুসারে প্রতিমার মুখ উত্তম-জায়া গৌরী দেবীর আদলে। কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পীরা প্রতিমাকে আলাদা করে কোন শাড়ি পরান না। মা বেনারসী পড়েন চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে এসে। সঙ্গে সোনার অলঙ্কারে সাজানো হয় মাকে। এই ঠাকুরকে উৎসর্গ করা শাড়ি পরে বাড়ির মেয়ে-বৌদের কাউকে আশীর্বাদী উপহার স্বরূপ দেওয়া হয়।পুজো মেটার পরে বিসর্জন পর্ব। বিসর্জনেও অভিনবত্বের ছোঁয়া উত্তম কুমারের বাড়ির পুজোয়। লক্ষ্মী প্রতিমাকে নতুন ভাবে আবার সাজানো হয়ে বিসর্জনের আগে। সে আটপৌরে সাজ দেখার মতো। ভীষণ মিষ্টি সেই রূপমাধুরী। বেনারসী শাড়ি ও সোনার অলঙ্কার খুলিয়ে লাল-সাদা ডুরে ধনেখালি শাড়ি আর অপূর্ব ফুলের সাজে সাজানো হয় মা লক্ষ্মীকে। তাঁতের শাড়ি পরানো হয় বিসর্জনের আগে একদম সাবেকি স্টাইলে।সোনার গয়নাগুলির মধ্যে আছে উত্তমকুমারের গড়িয়ে দেওয়া অনেক গয়নাও। তাই সেগুলো খুলে রাখা হয় পরম্পরা মেনে। রজনীগন্ধা ফুলের মুকুট, ফুলের অলঙ্কারে সেজে ওঠেন লক্ষ্মী প্রতিমা। খুব সহজ সরল সাজ, অথচ তাতে আছে আন্তরিকতার ছোঁয়া। বাড়ির এয়োস্ত্রী, মেয়ে, বৌরা মা লক্ষ্মীকে প্রদক্ষিণ করেন বরণ শুরুর আগে। তারপর বরণ সারার পরে পানপাতায় মায়ের চোখ মুছিয়ে সিঁদুর, মিষ্টি দেওয়া হয় মাকে। মায়ের কানে কানে বাড়ির মহিলারা বলেন “আসছে বছর আবার এসো মা।”
এর পর চলে বাড়ির বৌ-মেয়েদের সিঁদুরখেলার পর্ব।বাড়ির মেয়েরা যেমন লালপাড় সাদা শাড়ি পরেন বিসর্জনের দিন, তেমন বাড়ির ছেলেরাও সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি বা ধুতি-পাঞ্জাবি পরেন। সিঁদুর মাখেন ছেলেরাও।
শেষমেষ মাকে বিসর্জন দেওয়া হয় গঙ্গায়। উত্তমকুমার কিন্তু রীতিমতো প্রধান ভূমিকা পালন করতেন এই বিসর্জন পর্বে। তিনি নিজে বিসর্জন ঘাটে যেতেন। এখনও তাঁদের নাতি-নাতনিরা সকলে একই রীতি মেনে চলেছেন। বিসর্জনের পর মিষ্টিমুখ ও শান্তিজল।

এবারেও একই রীতিতে উত্তম কুমারের বাড়ির লক্ষ্মীপুজোর বিসর্জন পর্ব সারা হল।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.