বাড়িতে প্রথম লক্ষ্মীপুজো শুরু করেন মহানায়ক, নেপথ্যে এক দুর্দান্ত কাহিনি

1

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তম কুমারের (UttamKumar) বাড়ির লক্ষ্মীপুজো বহুকাল ধরেই বিখ্যাত। তবে এই লক্ষ্মীপুজো আদতে উত্তম কুমারদের পারিবারিক পুজো ছিল না। উত্তম কুমারের কৈশোরে ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জী রোডের পৈতৃক বাড়িতে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো হত না আদৌ এত ঘটা করে। শুধু তাঁদের গৃহদেবতা দামোদরের পুজোই বড় করে হত। পরে এই লক্ষ্মীপুজোর প্রচলন প্রথম করেন উত্তম কুমার নিজেই।উত্তম কুমার ঈশ্বরবিশ্বাসী হলেও ঠাকুর-দেবতা বা কোনও গুরুর ভক্ত সে অর্থে ছিলেন না। উত্তম কুমারের ভগবান ছিলেন তাঁর বাবা মা এবং তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি মা। উত্তম-সুপ্রিয়ার সংসারেও তাই। ময়রা স্ট্রিটের ওই বাড়ির বৈঠকখানার ঘরে ছিল উত্তম কুমারের বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় ও সুপ্রিয়া দেবীর পিতা গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটো বড় ছবি। উত্তম কুমার রোজ সকালে স্নান সেরে সেই দুটো ছবির সামনে ধূপের গোছা ঘুরিয়ে আরতি করতেন এবং কিছুক্ষণ চোখ বুজে একমনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তখন উত্তম কুমারের মা চপলা দেবী জীবিত। তখন রোজ ঠিক ন’টার সময় স্টুডিওয় যাওয়ার পথে একবার গিরিশ মুখার্জী রোডে যাবেনই উত্তম। মায়ের কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকবেন। তাঁর জীবন দুটো সংসার ভাগ হয়ে গেলেও কখনও মায়ের সঙ্গে দেখা করতে অন্যথা হয়নি। এতটাই ভগবান জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন মহানায়ক মা-বাবাকে। তাঁর কাছে রোজ ঠাকুরঘরে যাওয়ার থেকেও এই কাজ শ্রদ্ধার বিষয়টি অনেক বড় ছিল। যদিও তাঁর দু’বাড়িতেই ঠাকুরঘর ছিল, পুজোপাঠও হত।কিন্তু গৃহদেবতা ছাড়াও হঠাৎ নতুন করে এই লক্ষ্মীপুজো করা নিয়ে উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর বাবার অনেক তর্কবিতর্কও হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছিল, নিজের প্রতিপত্তি দেখাতেই কি উত্তম কুমার আলাদা করে এই লক্ষ্মীপুজো শুরু করেন? এই কোজাগরী লক্ষ্মীর পুজো হতো দুই সংসারেই। উত্তম-গৌরী আর উত্তম-সুপ্রিয়া, দু’বাড়িতেই লক্ষ্মীপুজো শুরু করেন উত্তমকুমার। কিন্তু সেটা গ্ল্যামার জগতের খ্যাতি প্রদর্শনের জন্য নয়। তাহলে কি অতি ভক্তিরস থেকেই এত পুজোর ঘটা? না তাও নয়।

তবে এর পেছনে রয়েছে বিশেষ কারণ। এককথায় বলতে গেলে, এক গণ্ডগ্রামে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েই উত্তম কুমারের বাড়ি শুরু হল কোজাগরী লক্ষ্মীর বন্দনা!অনেক দিন আগে এক প্রত্যন্ত গ্রামে উত্তমকুমারদের নেমতন্ন ছিল। অরুণ, বরুণ, তরুণ তিন ভাই গেছিলেন সেই নেমতন্ন বাড়ি। তখনও উত্তমকুমার মহানায়ক হননি। অত নামডাকও হয়নি তাঁর। তিনি তখন অরুণ। তাঁর মেজো ভাই বরুণ কুমার আর ছোট ভাই তরুণ কুমার।  দুপুরের নেমন্তন্ন রক্ষা করে কথাবার্তা বলতে বলতে সন্ধে হয়ে গেল। তিন ভাই পা চালিয়ে আসছিলেন স্টেশনে, কলকাতার ট্রেন ধরবেন বলে।সেদিন অন্ধকার গ্রামের মেঠো পথ চাঁদনি আলোয় ঝলমল করছে। উত্তমকুমারদের খেয়ালও ছিল না সেদিন ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা। কারণ তখন এই লক্ষ্মীপুজোর চল তাঁদের কলকাতার বাড়িতে ছিল না। গ্রামের রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ একটা মেটে বাড়ির উঠোনে তিন ভাই দেখলেন লক্ষ্মীপুজো হচ্ছে। উত্তম কুমারের হঠাৎ কী যেন খেয়াল হল, বললেন, “আমরা না হয় পরের ট্রেনে ফিরব। আয়, খানিকক্ষণ লক্ষ্মীপুজো দেখে যাই!” এই বলে সেই গৃহস্থের বাড়ি ঢুকে গেলেন উত্তম কুমার। সেই গণ্ডগ্রামে চলচ্চিত্রের আলো তখনও তেমন পৌঁছয়নি। তাই গ্রামের লোকরা কেউই উত্তমকুমারকে চিনতে পারলেন না।কুঁড়ে ঘরের উঠোন চমৎকার লেপাপোঁছা। চারপাশে বেশ সুন্দর করে চালের গুঁড়োর আলপনা দেওয়া। ধূপধুনোর গন্ধে চতুর্দিক ম ম করছে। তার মাঝখানে ছোট্ট একটা লক্ষ্মী ঠাকুর বসানো। বাড়ির মহিলারা মা লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ছেন। উঠোনের চারিপাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন উত্তম কুমার। সঙ্গে দুই ভাই। কিন্তু ভাইদের অবস্থা শোচনীয়। এই অজ পাড়া গাঁ থেকে ট্রেনে করে কলকাতা পৌঁছতে তো দেরি হয়ে যাবে! দাদার কি খেয়াল নেই!

ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে লক্ষ্মী পুজো! আকর্ষণে ঘটি উত্তম, আপ্যায়নে বাঙাল সুপ্রিয়া

কিন্তু এসব ভাবছেনই না উত্তমকুমার। তিনি সেই বাড়ির দাওয়ায় হাত জোড় করে বসে পড়লেন। তরুণ কুমার শেষ পর্যন্ত গিয়ে উত্তম কুমারের কানে কানে বললেন, “দাদা, অনেক রাত হয়ে গেল। বাড়ি ফিরতে হবে না? অনেকগুলো ট্রেন তো মিস হয়ে গেল।” উত্তম চাপা গলায় ধমক দিয়ে বললেন, “চুপ করে বসে থাক বুড়ো। আমরা একেবারে লাস্ট ট্রেনে কলকাতায় ফিরব।”সেদিন লাস্ট ট্রেনেই কলকাতা ফিরেছিলেন তিন ভাই। কিন্তু তখন এক অন্য উত্তম।
সেই গ্রামের পুজো দেখেই উত্তম কুমার স্থির করেন চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো শুরু করবেন। কিন্তু বাবার অনুমতি তো নিতে হবে। সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় কিছুতেই রাজি হলেন না গৃহদেবতা ছাড়া অন্য কোন পুজোর রীতি বাড়িতে শুরু করার। কিন্তু শেষ অবধি সাতকড়ি বাবু ছেলে উত্তমের লক্ষ্মীপুজো করার একাগ্র চিত্ত দেখেই মত দিলেন।উত্তম কুমারের এই লক্ষ্মীপুজো নিয়ে নানা গল্পকথাও আছে। কেউ বলেন, ছবি বিশ্বাসের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো দেখেই উত্তম তাঁর বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর প্রচলন করেন। কেউ বলেন, দেবীদর্শন পাওয়ার পরে উত্তমকুমার এই পুজো শুরু করেন। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শী তরুণ কুমারের কথাটাই প্রকৃত সত্য বলে ধরতে হবে। অর্থাৎ গ্রামের পুজো দেখেই উত্তম কুমার এই কোজাগরী পুজো শুরু করেন।তরুণ কুমার একবার দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন হঠাৎ উত্তমকুমার এই পুজোর সিদ্ধান্ত নিলেন?

উত্তমকুমার বলেছিলেন এক অসাধারণ কথা। “লক্ষ্মীর আর একটা অর্থ যে ‘শ্রী’ সেটা আমি এই প্রথম উপলব্ধি করলাম গ্রামে গিয়ে। ওই যে অমন করে নিকোনো উঠোন , ওই যে সুন্দর আলপনা, এ যেন আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে বাঁচার মতো করে বাঁচতে গেলে জীবন আর তার আশপাশটাকে সুন্দর করে তুলতে হবে।
ওই ধূপের গন্ধের মতো নিজের অন্তরের সুগন্ধে চারিদিক আমোদিত করে রাখতে হবে। মা লক্ষ্মীর আরাধনা ছাড়া তাই গতি নেই।”উত্তম কুমারের লক্ষ্মী প্রতিমার মুখ কিন্তু স্ত্রী গৌরী দেবীর আদলে। এইসব অভিনব আইডিয়া উত্তমই ভাবেন যা আজ আইকনিক ইতিহাস ও পরম্পরা হয়ে চলছে।

যে প্রতিমা শিল্পী বর্তমানে উত্তম পরিবারের মূর্তি গড়েন, সেই জয়ন্ত পাল বলছিলেন, “আমার জ্যাঠা নিরঞ্জন পাল নানা পুজোর প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ায় সেটের কাজও করতেন। তখনই তাঁর তৈরি একটি যদুভট্টর মূর্তি দেখে মনে ধরে উত্তমকুমারের। সঙ্গে সঙ্গে বায়না করেন নিজের বাড়ির লক্ষ্মী প্রতিমার জন্য। এই যদুভট্টর মূর্তি আসলে একধরনের সরস্বতী মূর্তি। তবে এই বায়না দেওয়ার পিছনে একটা শর্ত ছিল মহানায়কের। প্রতিমার মুখ হবে একেবারে স্ত্রী গৌরীদেবীর মুখের আদলে। নিরঞ্জন পাল এক লহমায় দেখে নেন গৌরী দেবীর মুখ। তারপর সেই ছাঁচ তৈরি করে নির্মাণ হয় মা লক্ষ্মীর মুখ।

উত্তম কুমার ও গৌরী দেবীর সম্পর্ক একখাতে বয়নি চিরকাল। আরও একটি পুজো শুরু হয়েছিল ময়রা স্ট্রীটের বাড়িতে উত্তম-সুপ্রিয়ার যৌথ উদ্যোগে। কিন্তু চট্টোপাধ্যায় বাড়ির পুজো কখনওই বন্ধ হয়নি বা লক্ষ্মীর মুখে গৌরী ব্যতীত অন্য কারও মুখ বসেনি। দুই সংসারের পুজোতেই নিষ্ঠাভরে উপস্থিত থাকতেন উত্তম কুমার।

এখন পুজো করেন উত্তমকুমারের নাতি গৌরব।

এ বাড়িতে পুজোর ভোগ তৈরির অধিকার শুধুমাত্র দীক্ষিত পরিবারের মেয়ে বা পুত্রবধূদেরই। ভোগে থাকে পোলাও, লুচি, ছোলার ডাল, পাঁচরকম ভাজা, ফুলকপির তরকারি, বাঁধাকপির তরকারি, পায়েস। সেই সময় ভিয়েন বসিয়ে পান্তুয়া, গজা তৈরি হত বাড়িতেই। বালতি করে পান্তুয়া বিতরণ করা হত পাড়াপড়শিদের বাড়িতে। ভোজের আসরে বড় আকর্ষণ ছিল স্বয়ং উত্তমকুমারের উপস্থিতি। টালিগঞ্জের নামীদামী প্রযোজক, গায়ক, অভিনেতারা পাত পেড়ে বসে ভোগ খেতেন।

উত্তম কুমারের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো, আজ। প্রস্তুতিতে উত্তম পুত্রবধূরা, ভাইঝি, নাতনি, নাতবৌমারা।

মহানায়ক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সকল নিমন্ত্রিতকে খাওয়াতেন। তার পরেই নিজে উপবাস ভেঙে খেতে বসতেন। মেনুতে থাকত লুচি, ছোলার ডাল, বেগুন বাসন্তী, আলুর দম, ধোঁকার ডালনা, ছানার ডালনা, মিষ্টি। ইদানীং মেনুতে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে। মিষ্টিও নিয়ে আসা হয় বাইরে থেকে।দিনের বেলায় সাধারণ মানুষের জন্য অবারিত দ্বার ছিল গিরীশ মুখার্জী রোডের এই বাড়ি। বছরের এই দিনটিতেই একযাত্রায় লক্ষ্মী এবং মহানায়কের দর্শন মিলত ভক্তজনের। আজ অরুণ, বরুণ, তরুণ কেউই নেই, কিন্তু তাঁদের নাতি-নাতনিরা নবমিতা, গৌরব, অনির্বাণ, সৌরভ, মৌ-রা এই লক্ষ্মীপুজোর পরম্পরা ধরে রেখেছেন একই ভাবে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like
1 Comment
Leave A Reply

Your email address will not be published.