বস্তির কিশোর ‘ডন’ আজ নিষিদ্ধপল্লীর ‘দেবতা’, রূপকথা এঁকেছে ‘ফুটবল’

জীবনে বদলে দিয়েছিলেন এক  দেবদূত।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

নাগপুর শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে আছে ‘আজনি’। অসংখ্য ছোটবড় বস্তি আছে আজনিতে। আজ জীবনযাত্রার মান উন্নত হলেও, নব্বইয়ের দশকে বস্তিগুলির অবস্থা ছিল ভয়াবহ। বস্তিগুলির নিরানব্বই শতাংশ ছেলেমেয়ে পড়াশুনা করত না। দিনের বেশিরভাগ সময় রাস্তাতেই কাটাত বালক ও কিশোরেরা। বস্তিগুলির পুতিগন্ধময় গলি দিয়ে হাঁটলে দেখা যেত জায়গায় জায়গায় বালক কিশোরদের জটলা। গাঁজা, মদ ও হেরোইনের নেশায় মশগুল, না হলে জুয়া খেলছে। বস্তিবাসীদের প্রতিবাদ করার অধিকারও ছিল না। কারণ ছেলেপুলেদের কিছুই দেবার ক্ষমতা ছিল না তাঁদের।

এ রকমই এক বস্তির ছেলে ছিল অখিলেশ পাল। নাগপুরের সরকারি হাসপাতালে বাবা পিওনের কাজ করতেন। মা ও দুই দিদি থাকলেও, ছন্নছাড়া পরিবারে নিদারুণ ভাবে অবহেলিত ছিল আট বছরের অখিলেশ। স্কুলে যাওয়ার সময় বস্তির সমবয়সি ছেলেদের নেশা করতে বা জুয়া খেলতে দেখত। অখিলেশ ভাবত, তারই মতো গরীব ছেলেগুলো নেশার টাকা জোগাড় করে কীভাবে। কৌতুহল মেটাতে অখিলেশ নিজেই একদিন গিয়েছিল এক জটলায়। গল্পে গল্পে অখিলেশ জানতে পেরেছিল বস্তির বেশিরভাগ ছেলেই বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত। সেই পথ দিয়েই আসছে কাঁচা টাকার যোগান।

প্রতীকী ছবি

স্কুল ছেড়েছিল অখিলেশ

ক্লাস সিক্স পাশ করার পর, একদিন স্কুলে যাওয়ার জন্য বেরিয়েও স্কুলে যায়নি অখিলেশ। ভিড়ে গিয়েছিল নেশা করতে থাকা একদল কিশোরের সঙ্গে। সেদিন তার সামনে খুলে গিয়েছিল নরকের দরজা। ধীরে ধীরে অখিলেশ জড়িয়ে গিয়েছিল সব ধরণের নেশা ও অপরাধ জগতের পাতা ফাঁদে। বয়সের তুলনায় লম্বা চওড়া অখিলেশ তৈরি করে ফেলেছিল তার ‘কিশোর গ্যাং’।

মারদাঙ্গায় নেতৃত্ব দেওয়া ক্ষমতা থাকায় হিংস্র অখিলেশের ওপর চোখ পড়েছিল রাজনৈতিক নেতা ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের। তাদের কথায় ‘গ্যাং’ নিয়ে গিয়ে মারদাঙ্গা, হুমকি দেওয়া, মারধোর করে ভাড়াটে তোলার মত কাজ করে আসত কিশোর ‘ডন’ অখিলেশ। মাত্র একশো দেড়শো টাকার বিনিময়ে। মুহূর্তের মধ্যেই টাকাটা খরচ হয়ে যেত নেশার পিছনে। নেশা কেটে গেলে, নেশার তাগিদেই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ত অখিলেশ।

প্রতীকী ছবি

জীবনে এসেছিলেন এক  দেবদূত

একদিন বিকেলে ‘গ্যাং’ নিয়ে অখিলেশ বসেছিল হিলসপ কলেজের উল্টোদিকের রাস্তায়। অখিলেশকে রাস্তার ওপার থেকে ডেকেছিলেন এক ব্যক্তি। অখিলেশের ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল। কারণ তার মতো ছেলেকে কোনও ভদ্রলোক ডাকেন না। পুলিশের লোক নয়ত। দোনামনা করে ব্যক্তিটির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল অখিলেশ। ব্যক্তিটি বলেছিলেন,”ফুটবল খেলবে?” তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে অখিলেশ বলেছিল,”খেলে কী হবে? পয়সা পাওয়া যাবে?” অখিলেশকে অবাক করে ব্যক্তিটি বলেছিলেন, “হ্যাঁ ফুটবল খেললে, রোজ প্রত্যেককে পাঁচ টাকা করে দেব।”

নব্বইয়ের দশকে পাঁচ টাকার দাম মোটেও কম ছিল না। আজনি স্টেশনের পাশের ঠেকে পাঁচ টাকায় একগ্লাস দিশি দারু হয়ে যেত। তাই গ্যাং-এর সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ফুটবল খেলবে। প্রথমদিন অখিলেশদের ব্যাকরণ মেনে ফুটবল খেলার হাতেখড়ি দিয়েছিলেন ব্যক্তিটি। দু’ঘণ্টা ফুটবল খেলে অখিলেশরা প্রত্যেকে পাঁচ টাকা করে পেয়েছিল এবং তারা ভেবেছিল লোকটা বদ্ধ উন্মাদ।

প্রফেসর বিজয় বার্সে

 না, বিজয় বার্সে পাগল ছিলেন না

কয়েকবছর আগে, এক বস্তির কিছু ছেলেকে কাগজ ও কাপড়ের পুঁটলি দিয়ে বল বানিয়ে ফুটবল খেলতে দেখেছিলেন হিলসপ কলেজের খেলার শিক্ষক বিজয় বার্সে। সেই সময় মাঠের পাশে বসে নেশা করছিল আরও কিছু ছেলে। প্রফেসর বার্সের মনে হয়েছিল, নেশাগ্রস্থ ছেলেগুলিরও সুস্থভাবে বাঁচবার অধিকার আছে। বস্তির পরিবেশ ছেলেগুলিকে সুস্থ জীবন দিতে না পারলেও, তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পারে একমাত্র ‘ফুটবল’। অতএব ছেলেগুলিকে যেভাবেই হোক ফুটবলের নেশায় জড়িয়ে দিতে হবে। ২০০১ সালে প্রফেসর বার্সে তৈরি করেছিলেন ‘ঝোপোড়পট্টি ফুটবল’ বা ‘স্লাম সকার’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। নাগপুর এলাকার সবচেয়ে বড় বস্তিটির ছেলেদের ফুটবল খেলা শেখাতে শুরু করেছিলেন।

প্রথম দিন অখিলেশদের হাতে পাঁচ টাকা করে দিয়ে প্রফেসর বার্সে বলেছিলেন, “এই যে তোমরা এতক্ষণ ফুটবল খেললে, খেলার সময় একবারও কি মনে পড়েছে নেশা করার কথা? একবারও মনে পড়েছে মারপিট দাঙ্গা করার কথা?” অখিলেশ বলেছিল, “না, পড়েনি।” মুচকি হেসেছিলেন প্রফেসর বার্সে। বলেছিলেন, পরের দিন মাঠে এলে আবার পাঁচ টাকা করে পাবে অখিলেশরা। মাঠে এলেই টাকা পাবে, সেই টাকায় নেশা করা যাবে। তাই রোজ মাঠে যেতে শুরু করেছিল অখিলেশের গ্যাং। প্রফেসর বার্সের তত্ত্বাবধানে ফুটবল খেলে, পাঁচ টাকা নিয়ে চলে যেত দারুর ঠেকে। সন্ধ্যার মধ্যেই নেশা করে টাকাটা উড়িয়ে দিত সবাই। এভাবেই কেটেছিল পনেরোটা দিন।

নতুন এক নেশায় জড়িয়ে পড়েছিল কিশোর ‘ডন’

ষোল দিনের মাথায় ফুটবল চাইতে গিয়ে প্রফেসর বার্সের কথায় অবাক হয়েছিল অখিলেশ। তিনি অখিলেশকে বলেছিলেন, তাঁর আর পয়সা নেই, তাই অখিলেশদের আর ফুটবল খেলতে হবে না। কথাটা শুনেও অখিলেশরা নড়ছিল না। তারা বলেছিল,”পয়সা দিতে হবে না, ফুটবলটা দিন।” কিশোর ডনের হাতে ফুটবলটা তুলে দিয়েছিলেন প্রফেসর বার্সে। বলটা নিয়ে অখিলেশেরা পিছন ফিরতেই, আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরকে প্রণাম করেছিলেন প্রফেসর বার্সে। ফুটবলের নেশা ধরে গেছে এই কুখ্যাত গ্যাংটির সদস্যদের। তারা এক নতুন নেশায় জড়িয়ে পড়েছে, বুঝতে পেরেছিল অখিলেশরাও।

প্রফেসর বার্সে আগেই তৈরি করেছিলেন একটি ফুটবল ক্লাব। বিভিন্ন বস্তির ছেলেদের নিয়ে ফুটবল দল গড়ে, স্থানীয় টুর্নামেন্টগুলিতে খেলতেও শুরু করেছিল ক্লাবটি। অখিলেশ হয়ে গিয়েছিল সেই ক্লাবের নিয়মিত খেলোয়াড়। সারাদিন গ্যাং নিয়ে ফুটবল মাঠে পড়ে থাকত অখিলেশ। কিন্তু রাত নামলেই হাতছানি দিত নেশা এবং অপরাধজগৎ। ষোল বছরের অখিলেশের নামে থানায় দায়ের হয়ে গিয়েছিল ৪৫টি মারাত্মক অভিযোগ। নাগপুর পুলিসের হিট লিস্টে চলে এসেছিল অখিলেশ।

হন্যে হয়ে অখিলেশকে খুঁজতে শুরু করছিল নাগপুর পুলিশ

অখিলেশ খবর পেয়েছিল তাকে এনকাউন্টার করে মেরে ফেলা হতে পারে। রাতের অন্ধকারে বস্তি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল অখিলেশ। যাদের হয়ে অখিলেশ অসামাজিক কাজগুলি করত, বিপদের দিনে তারা কেউ তাকে আশ্রয় দেয়নি। তাই জঙ্গল ঘেরা গা ছমছমে এক কবরস্থানে আশ্রয় নিয়েছিল অখিলেশ। সারাদিন লুকিয়ে থাকত কবরস্থানের ঝোপঝাড়ের ভেতর। রাতে কবরস্থানের বাইরে এসে, রাস্তায় ঘুমিয়ে থাকা ভিক্ষুকদের পুঁটলিতে খাবার খুঁজত। কোনও দিন পেত আধখানা রুটি, কোনও দিন আধখাওয়া টোকো পাঁউরুটি। রাতে ভিক্ষুকদের মাঝেই গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ত। ভোর হওয়ার আগেই ফিরে যেত কবরস্থানে।

এভাবেই কাটছিল মাসের পর মাস। কিন্তু এই অসহনীয় জীবন আর কাটাতে পারছিল না অখিলেশ। মশা ও পোকার কামড়ে সারা শরীরে দগদগে ঘা হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে পরিবার ও এক বন্ধুর সাহায্যে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল অখিলেশ। আদালতে বিচারকের সামনে অখিলেশ প্রতিজ্ঞা করেছিল, এরপর সে নতুনভাবে জীবন শুরু করবে, আর ফিরবে না অপরাধ জগতে। তাই জামিন পেয়ে গিয়েছিল অখিলেশ।

  নতুনভাবে জীবন শুরু করাটা সহজ ছিল না

কারণ আদালত অখিলেশকে নির্দেশ দিয়েছিল সূর্যোদয়ের পর এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে ও সূর্যাস্তের মধ্যে এলাকায় ফিরে আসতে। অনেক চেষ্টা করেও কোনও ভাল কাজ জোটাতে না পেরে, মানকাপুরের ‘রেড রোজ’ বারে বাউন্সারের কাজ নিয়েছিল অখিলেশ। বারের মালিক রাজেশ জয়সওয়াল অখিলেশের মতোই একজন ডনকে খুঁজছিলেন। কারণ তাঁর বারে মাতাল ও স্থানীয় সমাজবিরোধীদের হুজ্জতি লেগেই থাকত। বারের পরিবেশ ঠাণ্ডা করে দিয়েছিল অখিলেশ। কারণ নাগপুরের মানুষরা অখিলেশকে একডাকে চিনত।

অখিলেশ পাল

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আইনগত সমস্যায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ‘রেড রোজ’ বার। তবুও রোজ সকালে বস্তি ছেড়ে বন্ধ বারের সামনে চলে আসত অখিলেশ। কারণ দিনের বেলা এলাকায় থাকা যাবে না। বারের সামনের রাস্তায় সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যাবেলা ফিরে যেত বস্তিতে। একদিন কাছের বস্তির কিছু ছেলেকে বারের সামনে দিয়ে ফুটবল নিয়ে যেতে দেখেছিল অখিলেশ। কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করাতে ছেলেগুলি বলেছিল,পাশের মাঠে ফুটবল খেলতে যাচ্ছে। অখিলেশের চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল বিজয় বার্সে স্যারের মুখ।

অখিলেশকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল সবুজ মাঠ আর সাদাকালো বল

সম্মোহিতের মতো ছেলেগুলির পিছন পিছন মাঠে গিয়েছিল অখিলেশ। বলটা একবার চেয়ে নিয়েছিল। বল নিয়ে অখিলেশের জাগলিং দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিল ছেলের দল। অখিলেশকে খেলায় নিয়েছিল তারা। কিন্তু ফুটবল কীভাবে খেলতে হয় তা জানত না ছেলেরা। তাই ফুটবলটিকে ঘিরে ধরে, যে যেমন খুশি বলে লাথি মেরে যাচ্ছিল। বস্তির ছেলেগুলিকে সেদিন অখিলেশ শিখিয়েছিল ফুটবলের ব্যাকরণ।

সেই শুরু। তারপর থেকে রোজ অখিলেশ ছেলেগুলির সঙ্গে মাঠে যেতে শুরু করেছিল। নতুনভাবে আঁকড়ে ধরেছিল ফুটবলকে। বিভিন্ন দলের হয়ে নাগপুরের বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ‘খেপ’ খেলতে শুরু করেছিল। সৎপথে উপার্জনের একটা পথ সে খুঁজে নিয়েছিল। কোনও এক টুর্নামেন্টে ‘হারানো হিরা’ অখিলেশের সন্ধান পেয়েছিলেন প্রফেসর বিজয় বার্সে। অখিলেশকে বুকে টেনে নিয়ে যুক্ত করেছিলেন তাঁর ‘স্লাম সকার’ সংস্থার সঙ্গে।

অখিলেশের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ২০১০ সাল

প্রত্যেকবছর বিশ্বের গৃহহীন যুবকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপ’। ২০১০ সালের গৃহহীনদের বিশ্বকাপ ছিল ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে। ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিল অখিলেশ। আনন্দে রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেননি। কিন্তু মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল পাসপোর্ট করাতে গিয়ে।

অখিলেশের ক্রিমিনাল রেকর্ড দেখে আঁতকে উঠেছিলেন অফিসারেরা। চূড়ান্ত অপমান করে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অখিলেশকে। পাসপোর্ট অফিসের বাইরে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল অখিলেশ। সেই সময় পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সেই ‘রেড রোজ’ বারের মালিক। আদালতে গিয়ে তিনি অখিলেশের পক্ষে রায় বের করে এনেছিলেন। তৈরি হয়েছিল অখিলেশের পাসপোর্ট।

গৃহহীনদের বিশ্বকাপ ফুটবলের একটি ম্যাচ

ব্রাজিল যাওয়ার আগে একটি সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত হয়েছিল ভারতীয় ‘স্লাম ফুটবল’ দল। সেই বৈঠকে ভারতীয় ফুটবলারদের অতীত সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল। দলের বাকি খেলোয়াড়েরা যখন তাঁদের দুঃখের জীবন বর্ণনা করছিলেন, অসম্ভব ঘামছিলেন অখিলেশ। তিনি জানতেন তাঁকে এবার জনসমক্ষে, ক্যামেরার সামনে অপমানিত হতে হবে।

তবুও অখিলেশ সেদিন তার ভয়াবহ অতীত নিয়ে সত্যি কথা বলেছিল। জল চলে এসেছিল সবার চোখে। উঠে দাঁড়িয়ে এবং করতালি দিয়ে অখিলেশকে অভিবাদন জানিয়েছিলেন সাংবাদিকেরাও। সেই প্রথম নিজেকে মানুষ মনে হয়েছিল অখিলেশের। প্রবল হর্ষধ্বনির মধ্যে, দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল অখিলেশের নাম।

দ্বিতীয় দেবদূত হয়ে জীবনে এসেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল কোচ

ব্রাজিলে গিয়ে অখিলেশের সঙ্গে দেখা হয়েছিল প্রাক্তন স্কটিশ ফুটবলার ও কোচ ডেভিড মোয়েসের। যিনি বর্তমানে ম্যাঞ্চেষ্টার ইউনাইটেডের কোচ। অখিলেশকে মোয়েস জিজ্ঞেস করেছিলেন অখিলেশের ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কথা। অখিলেশ বলেছিল, সে বড় ফুটবলার হতে চায়।

মোয়েস বলেছিলেন, অখিলেশ ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তার যা বয়স, সে বড় ফুটবলার হওয়ার চেষ্টা না করে, বড় কোচ হওয়ার চেষ্টা করলে সফল হবে। কারণ ম্যাচের আগে প্র্যাকটিসের সময় অখিলেশের মধ্যে মধ্যে কোচের কিছু গুণ খুঁজে পেয়েছিলেন মোয়েস। বিশ্বের প্রথিতযশা কোচের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনেছিল অখিলেশ। ভারতে ফিরে ফুটবল কোচিং সংক্রান্ত সব কটি কোর্স একে একে করে ফেলেছিল।

ডেভিড মোয়েস

নিষিদ্ধপল্লীর দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছিল ফুটবল 

জীবনের ‘দ্রোণাচার্য’ বিজয় বার্সের ‘স্লাম সকার’ সংস্থায় কোচ হিসেবে ফুটবল খেলা শেখাতে শুরু করেছিলেন ‘একলব্য’ অখিলেশ। নাগপুরের নিষিদ্ধপল্লীর বালক ও কিশোরদের ফুটবল শেখাতে চলে গিয়েছিলেন অখিলেশ। অত্যন্ত কঠিন ছিল সেই কাজ। নিষিদ্ধপল্লীর মায়েরা চাইতেন না তাঁদের ছেলেরা ফুটবল খেলা শিখুক। কারণ তাঁদের ছেলেরা নিষিদ্ধপল্লীর দালালদের ইনফর্মারের কাজ করত। এলাকায় খদ্দের ঢুকলেই ছেলেরা তার মায়ের দালালকে খবর দিত। তাই মায়েরা চাইতেন না তাঁদের ব্যবসার ক্ষতি হোক। অনেক কাকুতি মিনতি করে কিছু মা’কে রাজি করিয়েছিল অখিলেশ। ফুটবল খেলা শেখাতে শুরু করেছিলেন নিষিদ্ধপল্লীর অবহেলিত ও নেশাগ্রস্ত ছেলেদের।

কোচের ভূমিকায় অখিলেশ

ফুটবল খেলা শেখানোর সঙ্গে কড়ানজর রেখেছিলেন ছেলেগুলির পড়াশুনার ওপরও। কারণ অখিলেশ চাননি, তাঁর মতো পড়াশুনা ছেড়ে অন্ধকার জীবনের অতলে ছেলেগুলি তলিয়ে যাক। তাই নিয়মিত ছেলেগুলির পড়াশুনার খোঁজখবর নিতেন, তাদের স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে। পড়াশুনায় গাফিলতি দেখলেই প্রচণ্ড বকাবকি করতেন ছেলেদের।

অখিলেশকে ছেলেরা বলেছিল, গার্জেন মিটিংয়ে তাদের মায়েরা অচেনা লোককে বাবা সাজিয়ে নিয়ে যান। তারা জানে না তাদের বাবা কে। ছেলেদের কথাগুলো মারাত্মকভাবে আঘাত করেছিল অখিলেশকে। নিষিদ্ধপল্লীর ছেলেদের জন্য একটি সর্বাত্মক লড়াই শুরু করেছিলেন অখিলেশ। প্রত্যেকটি ছেলের কাছে তিনিই একদিন হয়ে উঠেছিলেন ‘বাবা’।

কাটতে শুরু করেছিল অন্ধকার

অখিলেশের অনেক ছাত্র জেলা স্তরে খেলতে শুরু করেছিল। প্রাইজ ও মেডেল ঢুকতে শুরু করেছিল নিষিদ্ধপল্লীতে। সেই প্রথম অন্ধকার কানাগলিতে প্রবেশ করেছিল সম্মানের সূর্যালোক। আজ অখিলেশ পাল, প্রফেসর বিজয় বার্সের ‘স্লাম সকার’ সংস্থার সিনিয়ার কোচ। আজও তিনি নাগপুরের নিষিদ্ধপল্লীর ছেলেদের ফুটবল খেলা শেখান।

তাঁর ছাত্ররা দাপিয়ে খেলছে ভারতের বিভিন্ন ক্লাবে। অখিলেশের অনেকে সফল ছাত্রই তাঁদের মাকে নিষিদ্ধপল্লীর বাইরে নিয়ে গিয়ে সম্মানের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাই আজ অখিলেশ পাল নিষিদ্ধপল্লীর ‘দেবতা’। নাগপুরেই একটি ছোটখাটো জুতোর দোকান চালান। স্ত্রী কবিতা ও ছেলে ইমানুয়েলকে নিয়ে কেটে যাচ্ছে তাঁর মধ্যবিত্ত জীবন।

এক সময় হিট লিস্টে থাকা ডন, আজ পুলিশের পরম বন্ধু

২০১৫ সালে অখিলেশ ডাক পেয়েছিলেন আমির খানের ‘সত্যমেব জয়তে’ টেলিভিশন শো’তে। সেদিন সারা ভারত জানতে পেরেছিল কুখ্যাত ডন থেকে ‘মসিহা’ হয়ে যাওয়া অখিলেশের কথা। ২০১৯ সালে মুক্তি পেয়েছে তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি তামিল সিনেমা ‘বিগিল’। ‘ঝোপোড়পট্টি ফুটবল’ ও প্রফেসর বিজয় বার্সেকে নিয়ে বলিউড বানিয়ে ফেলেছে ‘ঝুন্ড’ নামে একটি সিনেমা। যে সিনেমায় অভিনয় করেছেন অমিতাভ বচ্চন। ২০২০ সালের মে মাসে ছবিটির মুক্তির পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার জন্য ছবিটির মুক্তি পিছিয়ে গিয়েছে। সেই সিনেমাতেও উঠে এসেছে অখিলেশের জীবন।

আমির খানের শোয়ে প্রফেসর বার্সে ও অখিলেশ

তবে অন্যায় ছেড়ে ন্যায়ের পথে ফেরার পরেও মানুষটিকে দিনের পর দিন চরম অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। অভাব থেকে অখিলেশকে মুক্তি দেওয়ার জন্য, অখিলেশের মনের দরজায় বার বার আছড়ে পড়েছে তাঁর কুখ্যাত অতীত। প্রলোভন দেখিয়েছে প্রচুর অর্থের।

না, চরম অভাবও ভাঙতে পারেনি অখিলেশকে। ছুঁড়ে ফেলা অস্ত্র আর হাতে তুলে নেননি অখিলেশ। আরও শক্ত করে দুই হাতে আঁকড়ে ধরেছেন ‘ফুটবল’। যে ফুটবল তাঁকে অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে দিয়েছে। যে ফুটবল তাঁর অন্ধকার জীবনের পাতায় লিখেছে, এক সোনালি  রূপকথা।

অখিলেশ পালের জীবন নিয়ে তৈরি সিনেমা ‘বিগিল’
You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More