আজও অবিশ্বাস্য লড়াই লড়ছেন প্রথম মহিলা কুলি মঞ্জু, বাহুতে বাঁধা মৃত স্বামীর ব্যাজ

রেলের অফিসারেরা নিশ্চিত ছিলেন, এই কঠিন পেশায় রোগা পাতলা এই যুবতী টিকতে পারবেন না।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

মধ্য রাজস্থানের জয়পুর জংশন রেলওয়ে স্টেশন। দিনে প্রায় ৩৫,০০০ যাত্রী চলাচল করেন এই স্টেশন দিয়ে। নিত্যযাত্রী ছাড়াও এই স্টেশনে পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে বছরভর। এখান থেকে দেশি বিদেশি পর্যটকরা চলে যান হাওয়া মহল, অম্বর প্যালেস, নাহারগড় কেল্লা, জল মহল, জয়গড় দুর্গ ও অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র ভ্রমণে। দামি ক্যামেরায় তোলেন হাজার হাজার ছবি।

সেই ছবিগুলির মধ্যে কখনও জায়গা পায় লাল কামিজ ও সাদা সালোয়ার পরা এক নারীর ছবি। বাজুতে বাঁধা পেতলের ব্যাজ। তাতে লেখা ‘NW RLY JP, NO-15, LICENSED PORTER’। সাংবাদিক ও পর্যটকদের ক্যামেরার লেন্স তাঁকে খুঁজে নেয় জয়পুর জংশন স্টেশনে।

মঞ্জু দেবী

এই নারী হলেন উত্তর-পশ্চিম রেলওয়ের প্রথম মহিলা কুলি মঞ্জু দেবী। সম্ভবত ভারতেরও প্রথম মহিলা কুলি। মধ্যপ্রদেশের কাটনি রেলওয়ে স্টেশনে ৩৬ নম্বর ব্যাজ নিয়ে ৪৫ জন পুরুষ কুলির সঙ্গে একই পেশায় আছেন অপর এক মহিলা কুলি সন্ধ্যা মারোয়াই। সুন্দরী সন্ধ্যার কথা সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে সবাই প্রায় জানেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, পুরুষের পেশায় অনুপ্রবেশের প্রথম লড়াইটি ধূ ধূ মরুর বুকে শুরু করেছিলেন মঞ্জু দেবী।

সালটা ছিল ২০১৩। বেশ কিছু বছর লিভারের দুরারোগ্য রোগে ভুগে, মঞ্জুর জীবন থেকে বিদায় নিয়েছিলেন স্বামী মাধব। তিনি ছিলেন জয়পুর জংশন রেল স্টেশনের কুলি। স্বামীর মৃত্যুর পর তিন সন্তান-সহ মঞ্জুকে বাড়ি ছাড়া করেছিলেন শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে মঞ্জু চলে গিয়েছিলেন বাপের বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও মঞ্জু দেবীকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল চরম দারিদ্র। তিন ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা করানো তো দূরের কথা, দু’বেলা সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই দুষ্কর হয়ে উঠেছিল।

চিন্তায় চিন্তায় শুকিয়ে যেতে শুরু করেছিলেন সুন্দরী মঞ্জু। কয়েক মাসের মধ্যে মঞ্জু দেবীর ওজন কমে দাঁড়িয়েছিল তিরিশ কেজিতে। মঞ্জুদেবী বুঝতে পারছিলেন ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তিনি। কিন্তু তিনিও চলে গেলে ছেলে মেয়েগুলোর কী হবে! এই চিন্তা প্রতিনিয়ত পাগল করে দিচ্ছিল তাঁকে।

একদিন বাড়ির কাউকে না জানিয়ে স্বামী মাধবের কুলির ব্যাজটি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন জয়পুর রেলওয়ে স্টেশনে। এই স্টেশনটিতেই আছে জয়পুর রেলওয়ে ও উত্তর-পশ্চিম রেলওয়ে জোনের হেড কোয়ার্টার। সেখানে পৌঁছে মঞ্জুদেবী স্টেশন কতৃপক্ষের কাছে দাবি করেছিলেন, স্বামীর কুলির লাইসেন্সটি তাঁর নামে করে দিতে হবে।

স্বামী মাধবের সেই ব্যাজ

রোগা পটকা বছর সাতাশের যুবতীর কথায় হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন রেলের অফিসাররা। যে পেশায় প্রচণ্ড কায়িক পরিশ্রম লাগে, শুরুর দিন থেকে যে পেশায় পুরুষদের প্রশ্নাতীত আধিপত্য, সেই পেশায় শীর্ণকায়া এক নারীর অনুপ্রবেশের সাহস দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন তাঁরা।

মঞ্জুদেবীর সাহসকে মনে মনে তারিফ করলেও, অফিসাররা নিরুৎসাহ করেছিলেন যুবতী মঞ্জুকে। তাঁর স্বামীর কুলির লাইসেন্সটি মঞ্জুর নামে ট্রান্সফার করতে রাজি হননি। তাঁরা মঞ্জুকে বলেছিলেন পেশাটি পুরুষদের। তাছাড়া প্রচুর পুরুষ কুলির মাঝে মঞ্জুকে দিনে রাতে থাকতে হবে। অনেক সময় স্টেশন চত্বর ফাঁকা থাকে। তাই তাঁরা যুবতী মঞ্জুর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে পারবেন না।

জয়পুর জংশন রেল স্টেশন

কিন্তু নাছোড়বান্দা ছিলেন মঞ্জু দেবীও। তাঁর ক্রমশ শক্ত হতে থাকা চোয়াল ও কঠোর চাউনির সামনে এক সময় নরম হয়েছিলেন অফিসারেরা। স্বামী মাধবের লাইসেন্স মঞ্জুর নামে করে দিয়েছিলেন রেল কতৃপক্ষ। যদিও তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন এই কঠিন পেশায় রোগা পাতলা এই যুবতী টিকতে পারবেন না। নিজেই সরে যাবেন কয়েকদিনের মধ্যে।

নিজের নামে কুলির লাইসেন্সটি বানিয়ে সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি ফিরেছিলেন মঞ্জু। মা মোহিনীকে বলেছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তের কথা। মঞ্জু ভেবেছিলেন মা বাধা দেবেন। মঞ্জুকে অবাক করেই সম্মতি দিয়েছিলেন মা। চোখের জলে ভেসে গিয়েছিলেন মঞ্জু। জড়িয়ে ধরেছিলেন মা মোহিনীকে। শুরু হয়েছিল মঞ্জুর বাঁচার লড়াই। শিশু সন্তানদের বাঁচানোর লড়াই।

কুলির ইউনিফর্ম বানানোর জন্য পরদিন সকালে মঞ্জু গিয়েছিলেন স্থানীয় এক দর্জির কাছে। কয়েকদিনের মধ্যেই মঞ্জুর হাতে এসেছিল দুটি রক্তলাল কামিজ ও দুটি সালোয়ার। একটির রঙ কালো ও একটি দুধ সাদা। একদিন ভোরে কুলির ইউনিফর্ম পরে মঞ্জু পৌঁছে গিয়েছিলেন জয়পুর জংশন স্টেশনে। তাঁকে দেখে অবাক হয়েছিলেন পুরুষ কুলিরা। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেননি। করেননি ব্যাঙ্গবিদ্রুপ। বরং কুর্নিশ করেছিলেন মঞ্জুর এই লড়াইকে।

শতাধিক পুরুষ কুলির জটলায় মঞ্জু বসে পড়েছিলেন কাজের আশায়। কিন্তু দিনের শেষে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। কোনও প্যাসেঞ্জার সেদিন তাঁকে লাগেজ বইতে দেননি। মঞ্জু বইতে পারবেন না, মাথা থেকে লাগেজ ফেলে দেবেন এই আশঙ্কায়। এভাবে কেটেছিল বেশ কয়েকদিন। রোজ সকালে মঞ্জু হাজির হতেন স্টেশনে, চোখের জল মুছতে মুছতে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসতেন।

প্রথম প্রথম মা মোহিনী মঞ্জুকে জিজ্ঞেস করতেন, কিছু উপার্জন হল কিনা। কিন্তু পরের দিকে মেয়ের মুখ দেখেই তিনি বুঝে যেতেন, আজও খালি হাতে ফিরে এসেছে মেয়ে। তাই তিনি মঞ্জুকে কিছু আর জিজ্ঞেস করতেন না। দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করতেন, পরের দিন মঞ্জু যেন দেবীর আশীর্বাদ পায়। এভাবেই কেটে গিয়েছিল প্রায় পনেরো দিন।

চেহারা দেখে কেউ কাজ দিতেন না মঞ্জুকে

হাল ছেড়ে দিতে থাকা মঞ্জুকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলেন পুরুষ কুলিরা। নিজেরাই একদিন মঞ্জুকে প্যাসেঞ্জার ধরে দিয়েছিলেন। এক বৃদ্ধের ভারী সুটকেস মাথায় নিয়ে মঞ্জু বেরিয়ে এসেছিলেন স্টেশনের বাইরে। তুলে দিয়েছিলেন বৃদ্ধের গাড়িতে। অবাক হয়ে যাওয়া বৃদ্ধ মানুষটি মঞ্জুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি পঞ্চাশ টাকার নোট। মঞ্জুর জীবনের প্রথম উপার্জন।

বৃদ্ধের সামনেই কেঁদে ফেলেছিলেন মঞ্জু। বৃদ্ধ মানুষটি আশীর্বাদ করেছিলেন মঞ্জুকে। টাকাটা হাতে পেয়েই বাড়ি ছুটে গিয়েছিলেন মঞ্জু। মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন পঞ্চাশ টাকার চকচকে নোটটি। সেদিনও চোখের জলে ভেসে গিয়েছিলেন মা ও মেয়ে। জীবন সমুদ্রে হারিয়ে যেতে বসা এক নৌকা তীরের সন্ধান পেয়েছিল।

শুরুর দিনগুলিতে মঞ্জু দেবী

প্রথম প্রথম মাথায় লাগেজ তোলার পর মঞ্জুর পায়ের নীচের মাটিটা কেঁপে উঠত। চোখে অন্ধকার দেখতেন অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা মঞ্জু। তিরিশ কেজি ওজনের শরীরটা বইতে পারত না তিরিশ কেজি ওজনের লাগেজ। দাঁতে দাঁত চেপে এক পা এক পা করে প্ল্যাটফর্ম ধরে এগোতেন মঞ্জু। স্টেশন থেকে বের হওয়ার গেটটা মনে হত কয়েক মাইল দূরে। পথ যেন আর শেষ হতে চাইত না।

কিন্তু ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েদের মুখগুলি মনে পড়লেই, পায়ের নীচের মাটিটা শক্ত হয়ে উঠত এক নিমেষে। তাঁর মনে হত, হাতে বাঁধা স্বামী মাধবের ব্যবহার করা পেতলের ব্যাজ থেকে ভেসে আসছে স্বামী মাধবের গলা,”এই তো, আর একটু পথ বাকি। এগিয়ে চল মঞ্জু।” এভাবেই কেটে গিয়েছে দিনের পর দিন। মাসের পর মাস।

স্বামীর ব্যাজ কপালে ছুঁইয়ে আজও কাজে বের হন মঞ্জু

রোজ সকালে মঞ্জু হাজির হতেন স্টেশনে। কোনও দিন কাজ জুটত। কোনও দিন জুটত না। কারণ মঞ্জুর সামনে ছিল বাধার পাহাড়। নিরক্ষর মঞ্জু পড়তে পারতেন না ইংরেজিতে লেখা প্ল্যাটফর্ম নম্বর, ডিজিটাল ঘড়ির সময়, বোর্ডে লেখা ট্রেনের নাম। কোন ট্রেন কোন প্ল্যাটফর্মে কখন আসছে তা বুঝতে পারতেন না ঘোষণা শুনে। এসি কোচ ও স্লিপার ক্লাসের পার্থক্য বুঝতেন না। সিট নম্বর পড়তে পারতেন না।

লাগেজ নিয়ে ভুল প্ল্যাটফর্ম বা ভুল কামরায় চলে যেতেন। ফলে প্যাসেঞ্জারদের গালাগাল ও ব্যঙ্গবিদ্রুপ শুনতে হত নিয়মিত। এসব ক্ষেত্রে বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জার পয়সা না দিয়ে চলে যেতেন। মঞ্জুকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতেন পুরুষ কুলিরা। কিন্তু তাঁরাও সব সময় সাহায্য করতে পারতেন না। কারণ তাঁদেরও প্যাসেঞ্জার ধরার জন্য ব্যস্ত থাকতে হত।

সত্যিই একদিন হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন মঞ্জু। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পরের দিন থেকে আর স্টেশনে আসবেন না। তবুও শেষ চেষ্টা হিসেবে, মঞ্জু তাঁর অসুবিধার কথা জানিয়েছিলেন স্টেশন কর্তৃপক্ষের কাছে। সব শুনে সহৃদয় স্টেশন কর্তৃপক্ষ মঞ্জুকে ছ’মাস ট্রেনিং দিয়েছিলেন।

ট্রেনিং-এ কঠোর পরিশ্রম করে সব বাধা কাটিয়ে উঠেছিলেন মঞ্জু। তারপর স্বামী মাধবের ‘নম্বর ১৫’ লেখা ফলকটি বাহুতে বেঁধে আত্মবিশ্বাসী মঞ্জু মিশে গিয়েছিলেন লাল উর্দির ভিড়ে। সেইদিন থেকে আজ অবধি ৩৫ বছরের মঞ্জু দেবী বয়ে চলেছেন প্যাসেঞ্জারদের লাগেজ। টেনে চলেছেন লাগেজ ভর্তি ট্রলি। জয়পুর জংশনের ১৭৮ জন পুরুষ কুলির মধ্যে আজও তিনি একমাত্র মহিলা কুলি।

সকাল থেকে সন্ধ্যা তিনটি শিফটে কাজ করেন মঞ্জু। প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করেন অন্যান্য পুরুষ কুলিদের সঙ্গে। যখন তাঁর পালা আসে, মাথায় ভারী সুটকেস নিয়ে প্ল্যাটফর্মের ভিড়কে মেসির মতো অনায়াসে ডজ করতে করতে এগিয়ে চলেন। কখনও টানেন লাগেজ ভর্তি ট্রলি। লাগেজের দিকে সব সময় খেয়াল থাকে তাঁর। ট্রলি থেকে একটা লাগেজও যেন পড়ে না যায় বা কেউ তুলে না নেয়। ট্রলিতে তোলার সময় ও ট্রলি থেকে নামানোর সময় গুনে নেন লাগেজের সংখ্যা। সংখ্যা মিলিয়ে লাগেজ বুঝিয়ে দেন প্যাসেঞ্জারদের।

প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে পারিশ্রমিক নিয়ে দর কষাকষি করেন না মঞ্জু। প্যাসেঞ্জারেরা যে যা দেন তাই নিয়ে নেন। তবে বেশিরভাগ প্যাসেঞ্জারই মঞ্জুর পরিস্থিতি বুঝতে পেরে নিজেরাও দর কষাকষিতে যান না। সঠিক পারিশ্রমিকই দেন মঞ্জুকে। কেউ কেউ নিজেই মঞ্জুর মাথায় সব লাগেজ না চাপিয়ে, নিজেও নিয়ে নেন কিছুটা। কিন্তু মঞ্জু একদমই চান না কেউ তাঁকে দয়া করুক। কারণ তাঁর ওজন এখন আর তিরিশ কেজি নেই। লাগেজ বইতে ও মালভর্তি ট্রলি টানতে আর অসুবিধা হয় না মঞ্জুর।

দুটো শিফটের মাঝের সময়টুকুতে মঞ্জু বাড়ি ফিরে যান। স্টেশনের পাশেই কুলি লাইনের একটি বিল্ডিং-এর চারতলার একটি ছোট্ট ঘরে থাকেন তিন সন্তানকে নিয়ে। তিনজনই পড়াশুনা করে। পড়াশোনায় খুব আগ্রহ তাদের। মঞ্জু চান তাঁর তিন সন্তানই শিক্ষক হোক। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেছিলেন স্বামীর মৃত্যুর পর। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন স্টেশনে পা দিয়ে। তাই তিনি চান তাঁর তিন ছেলে মেয়ে শিক্ষক হয়ে তাঁর মত গরিবদের ঘরে শিক্ষার আলো জ্বালাক।

সন্তানদের সঙ্গে মঞ্জু দেবী

কেন্দ্রীয় সরকারের নারী ও শিশুকল্যান দফতর ২০১৮ সালে দেশের ১১২ জন নারীকে সম্মান জানিয়েছিল। যাঁরা ভারতের নারীদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন অনুপ্রেরণা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ‘মিসাইল ওম্যান’ স্টেসি থমাস, ঐশ্বর্য্য রাই, নিকোল ফারিয়া, পর্বতারোহী বাচেন্দ্রি পাল, আনসু জামসেনপা, গোয়েন্দা রজনী পণ্ডিত সহ আরও অনেক স্বনামধন্যা নারী।

সেই তালিকায় ছিল অখ্যাত মঞ্জু দেবীর নামও। যাঁর দাঁতে দাঁত চাপা লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়েছিল ভারত সরকার। রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল মঞ্জু দেবীর। মঞ্জু দেবীর মুখে তাঁর জীবন যুদ্ধের কাহিনি শুনে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও। প্রচারের সব আলো সেদিন ঘুরে গিয়েছিল মঞ্জু দেবীর দিকে। ম্লান হয়ে গিয়েছিলেন বাকিরা।

রাষ্ট্রপতি ভবনে মঞ্জু বলছেন তাঁর জীবন যুদ্ধের কাহিনি

মঞ্জু জানতেন প্রচারের আলো ক্ষণস্থায়ী, খিদের স্থায়ীত্ব জীবনভর। তাই রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ফিরেই সোজা চলে গিয়েছিলেন স্টেশনে। তিনি জানেন দিনভর লড়াই করে কিছু টাকা হাতে নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। তবে কুলি মহল্লায় পালটে গেছে মঞ্জু দেবীর সামাজিক অবস্থান। আজ স্বামীহারা মঞ্জুকে তাঁর মহল্লায় সবাই ‘প্রধান’ নামে ডাকে। জয়পুর স্টেশন কর্তৃপক্ষ আজ গর্বিত মঞ্জু দেবীকে নিয়ে।

তবে প্রচারের আলো তাঁর ওপরে পড়লেও পাল্টাননি মঞ্জু। আজও সারাদিন তাঁর চোখ ঘোরে রেল লাইন, ঘড়ি ও ডিজিটাল টাইম টেবলে। কান থাকে ঘোষকের ঘোষণার ওপর। রাজস্থানী গ্রীষ্মের ভয়ঙ্কর দুপুরই হোক বা হাড়কাঁপানো শীতের ভোর। জয়পুর জংশন স্টেশনে অন্য কুলির দেখা না মিললেও দেখা মিলবে মঞ্জু দেবীর।

তবুও মাঝে মাঝে আনমনা হয়ে যান মঞ্জু। মিস করে ফেলেন ট্রেন। কারণ তখন মঞ্জু দেবীর মনে পড়ে যায় স্বামী মাধবের কথা। মানুষটা বড় ভালোবাসত তাকে। মা মোহিনীর পর মাধবই একমাত্র বুঝত মঞ্জুকে। আনমনা মঞ্জু বাম হাত বোলান ডান হাতে বাঁধা পেতলের ফলকটার ওপরে। যাতে লেগে আছে স্বামীর স্পর্শ। নম্বর-১৫ লেখা পেতলের ফলকটির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া স্বামীকে খুঁজে ফেরেন মঞ্জু, বিষণ্ণ কোনও দুপুরে।

মঞ্জু কি দেখেছেন অমিতাভ বচ্ছনের ‘কুলি’ সিনেমাটি! দেখলে বুঝতেন, ‘সারি দুনিয়া কি বোঝ হাম উঠাতে হ্যায়’ গানটির এই কলিতে লুকিয়ে আছে তাঁরই মনের কথা।

“জিনা মুস্কিল তো হ্যায়,
আপনা ভি দিল তো হ্যায়,
দিল মে আরমান হ্যায়,
হাম ভি ইনসান হ্যায়’

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More