উপত্যকা পাহারায় চিনের সেনা, খাম্পা যোদ্ধার ছদ্মবেশে ভারতের পথ ধরেছিলেন দলাই লামা

ক্ষ্যাপা হায়নার মতোই দলাই লামাকে খুঁজতে শুরু করেছিল চিনা সেনারা।

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৩৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর, তিব্বতের লাসা শহর সেদিন ভেঙে পড়েছিল পোটালা প্রাসাদে। সেদিন ৫৭ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছিলেন তিব্বতের আধ্যাত্মিক গুরু ও প্রশাসনিক প্রধান, ত্রয়োদশ দলাই লামা থুবতেন গিয়াৎসো। শোকের কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল গোটা তিব্বত। কারণ সেখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন, দলাই লামা হলেন করুণাময় বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বরের অবতার। তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। তিনিই তিব্বতের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ন্ত্রণ করেন।

তিব্বতের মাটিতে বুদ্ধের অবতার হিসেবে প্রথম দলাই লামা গেনদুন দ্রুপ-এর আবির্ভাব ঘটেছিল ১৩৯১ সালে। এরপর একে একে দলাই লামা পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন, গেনদুন গিয়াৎসো, সোনম গিয়াৎসো, য়নতেন গিয়াৎসো, লবসাং গিয়াৎসো, ৎসাংইয়াং গিয়াৎসো, কেলজাং গিয়াৎসো, জামফেল গিয়াৎসো, লুংটক গিয়াৎসো, ৎসুলত্রিম গিয়াৎসো, খেনদ্রুপ গিয়াৎসো, ত্রিনলে গিয়াৎসো ও ত্রয়োদশ দলাই লামা থুবতেন গিয়াৎসো।

ত্রয়োদশ দলাই লামা থুবতেন গিয়াৎসো

কে হবেন চতুর্দশ দলাই লামা!

ত্রয়োদশ দলাই লামার মহাপ্রয়াণের পর, তাঁর শিষ্যরা চতুর্দশ দলাই লামার খোঁজ শুরু করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। মহাযান বৌদ্ধরা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করেন। তাই কোনও দলাই লামার মহাপ্রয়াণের পর, তাঁর পার্থিব শরীরটি সংরক্ষণ করে রাখা হয় বেশ কিছুদিন। সেই সময়ের মধ্যেই তিব্বতের কোনও অংশে পুনর্জন্ম লাভ করবেন ভবিষ্যতের দলাই লামা। তাই লাসার পোটালা প্রাসাদের বিশেষ ঘরে, দক্ষিণ দিকে মুখ করে সযত্নে শুইয়ে রাখা হয়েছিল ত্রয়োদশ দলাই লামার পার্থিব শরীর।

কিছুদিন পরে দেখা গিয়েছিল প্রয়াত দলাই লামার মুখটি নিজে থেকেই ঘুরে গিয়েছে পূর্বের দিকে। একই সময় ঘরের উত্তর-পূর্ব দিকের দেওয়ালে একটি ছত্রাককে গজিয়ে উঠতে দেখা গিয়েছিল। তিব্বতের প্রাজ্ঞ লামারা ঘটনা দু’টি পর্যালোচনা করে বলেছিলেন, চতুর্দশ দলাই লামাকে খুঁজে পাওয়া যাবে তিব্বতের উত্তর-পূর্ব অংশে।

লাসায় দলাই লামার আবাস ‘পোটালা প্যালেস’

প্রথা মেনে এর পর ‘লামোই লাৎসো’ হ্রদের তীরে ধ্যানে বসেছিলেন লামারা। ধ্যানরত লামাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল ভবিষ্যতের দলাই লামার মুখ ও বিশেষ কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য। লামাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতের দলাই লামার মুখাবয়ব ও বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য জেনে নিয়ে, অলৌকিক ক্ষমতাবলে চতুর্দশ দলাই লামার ছবি এঁকেছিলেন প্রধান লামা। সেই ছবি নিয়ে চতুর্দশ দলাই লামার খোঁজে বেরিয়েছিলেন মহাযান লামারা।

আমডো গ্রামের লামো থনডুপ

প্রায় চার বছর পর, ১৯৩৭ সালে উত্তর পূর্ব তিব্বতের আমডো এলাকায় খোঁজ মিলেছিল দুই বছরের এক শিশুর। শিশুটিকে দেখে চমকে উঠেছিলেন ছদ্মবেশধারী লামারা। ছবির শিশুটির সঙ্গে লামো থনডুপ নামের শিশুটির হুবহু মিল। ত্রয়োদশ দলাই লামার জপমালাটি ছিল একজন লামার হাতে। শিশুটি নিজে থেকেই লামার কাছ থেকে মালাটি চেয়েছিল। মালাটি তখনই শিশুকে দেননি লামা। তাঁর মুখে ফুটে উঠেছিল হাসি।

লামো থনডুপ

এর পর শিশুটিকে দেখানো হয়েছিল বিভিন্ন বস্তু। সেগুলির মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল ত্রয়োদশ দলাই লামার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র। শিশুটি অন্য কিছুতে হাত না দিয়ে, হাত দিয়েছিল ত্রয়োদশ দলাই লামার বাজানো ড্রাম ও হাঁটার ছড়িতে। ছদ্মবেশধারী লামারা নিঃসন্দেহ হয়েছিলেন,আমডো গ্রামের লামো থনডুপই হলেন চতুর্দশ দলাই লামা।

এর প্রায় দু’বছর পর, ১৯৩৯ সালে, বুমচেন শহরের কাছে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে সরকারিভাবে চতুর্দশ দলাই লামা হিসেবে জনসমক্ষে আনা হয়েছিল চার বছরের শিশু লামো থনডুপকে। সেদিন থেকে যাঁর নাম হয়ে গিয়েছিল তেনজিং গিয়াৎসো। দলাই লামাদের আবাস লাসার সুবিশাল পোটলা প্যালেসে নিয়ে আসা হয়েছিল চতুর্দশ দলাই লামাকে। তিব্বতের সর্বজনশ্রদ্ধেয় বৌদ্ধ পণ্ডিতদের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছিল চতুর্দশ দলাই লামা তেনজিং গিয়াৎসোর ধর্ম শিক্ষা।

লামো থনডুপ হলেন চতুর্দশ দলাই লামা তেনজিং গিয়াৎসো

লাসার আকাশে কালবৈশাখীর মেঘ

মৃত্যুর ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছিলেন ত্রয়োদশ দলাইলামা। তিনি বলেছিলেন,

“কিছুদিনের মধ্যেই ঘরে ও বাইরে দুঃসহ পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াতে চলেছে তিব্বত। আমরা যদি সেই সময় আমাদের এলাকা, দলাই লামা, পাঞ্চেন লামা সহ আমাদের অন্যান্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের রক্ষা করার সাহস না দেখাই, সব ধ্বংস হয়ে যাবে।

সবচেয়ে বড় কথা তিন মহান ধর্মরাজ, ট্রি সংগৎসেন গামপো, ট্রি সংগডেৎসেন ও ট্রি র‍্যালপাচেনের সৃষ্টি করা রাজনৈতিক ধারা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যাবে। মানুষের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হবে। মানুষকে জোর করে দাস বানানো হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য ভয়াবহ পরিবেশে বাস করতে হবে। সেই দিন আসছে।”

ত্রয়োদশ দলাই লামার কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে, ১৯৫০ সালের পয়লা জানুয়ারি তিব্বতের ওপর তার অধিকার দাবি করে বসেছিল চিন। ঘোষণা করে দিয়েছিল তিব্বতের যেকোনও রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যাপারে চিন হস্তক্ষেপ করবে। চিনের এই অযৌক্তিক দাবি মানতে চায়নি তিব্বত। ১৯৫০ সালের ৭ মার্চ উভয়পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল কালিম্পংয়ে। কিন্তু কোনও সমাধান বেরিয়ে আসেনি। এই বছরেই দলাই লামার বয়স পনেরো পেরিয়েছিল। প্রথা অনুসারে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল তিব্বতের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতা।

দলাই লামার আসনে চতুর্দশ দলাই লামা তেনজিং গিয়াৎসো

তিব্বতে প্রবেশ করেছিল চিনের সেনা

১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর, জিনশা নদী পেরিয়ে তিব্বতে প্রবেশ করেছিল চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি। তিব্বতের সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে, ১৯ অক্টোবর দখল করে নিয়েছিল পূর্ব তিব্বতের চামডো শহর। চর সূত্রে পোটালা প্রাসাদে খবর এসেছিল দলাই লামাকে গুপ্তঘাতক দিয়ে হত্যা করার চক্রান্ত করছে চিন। পনেরো বছরের দলাই লামাকে পোটালা প্রাসাদ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, চিন-ভারত ও চিন-ভুটান সীমান্তে থাকা চুম্বি উপত্যকার নিরাপদ স্থান ড্রোমোতে।

১৯৫১ সালের ২৩ মে, তিব্বতীয় প্রতিনিধি দলকে বেজিংয়ে ডেকে প্রায় জোর করে ১৭ দফা চুক্তিতে সই করিয়েছিল চিন। তবে চুক্তিতে বলা ছিল তিব্বতের অভ্যন্তরীন ব্যাপারগুলি দেখবেন দলাই লামাই। চিনের পক্ষ থেকে লাসায় ফেরার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল দলাই লামাকে। ১৯৫১ সালের ১৭ অগস্ট, ড্রোমো থেকে লাসায় ফিরে এসেছিলেন দলাই লামা।

অহিংস নীতি ও বিশ্বশান্তির প্রচারক দলাই লামা চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন চিনের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার। ১৯৫৪ সালের জুলাই মাস থেকে ১৯৫৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত, চিনের নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছিলেন উনিশ বছরের দলাই লামা। দেখা করেছিলেন মাও জেদং, চৌ এন লাই, দেন জিয়াও পিংয়ের সঙ্গে। মিলেছিল কিছু প্রতিশ্রুতি যা কোনওদিন বাস্তবের আকার নেয়নি।

চিনের সেনাবাহিনী প্রবেশ করেছিল তিব্বতে

ক্রমশ তিব্বতে চিনের আগ্রাসন বেড়েই চলেছিল

বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল একটা সময়। পূর্ব তিব্বতের সিচুয়ান প্রদেশে তৈরি হয়েছিল গেরিলা ফৌজ। যাদের গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেছিল আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)। এরই মধ্যে, ২৫০০ তম বুদ্ধজয়ন্তী উপলক্ষে ১৯৫৬ সালে চার মাসের সরকারি সফরে ভারতে এসেছিলেন দলাই লামা। তাঁর কাছ থেকে ভারত জেনেছিল তিব্বতের প্রকৃত অবস্থা।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দলাই লামা ও তাঁর আত্মীয়দের নিরাপত্তা দিয়ে আসছিলেন খাম্পা উপজাতির দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা। কিন্তু চিন তাঁদের সরিয়ে নিজেরাই নিতে চেয়েছিল দলাই লামার সুরক্ষার দায়িত্ব। ফলে ১৯৫৮ সালের অগস্ট মাসে, পূর্ব তিব্বতে শুরু হয়েছিল সশস্ত্র খাম্পা বিদ্রোহ। খাম্পাদের মতোই চিনের দমননীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে শুরু করেছিলেন তিব্বতের সাধারণ মানুষ।

উঁচু পাহাড় থেকে চিনের সেনার দিকে নজর রাখছে খাম্পা গেরিলারা

ঘৃতাহুতি দিয়েছিল একটি ঘটনা

১৯৫৯ সালের ৯ মার্চ, দলাই লামাকে নাটক দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন লাসার দায়িত্বে থাকা চিনা ব্রিগেডিয়ার। খবরটি ছড়িয়ে পড়েছিল দাবানলের মত। প্রাসাদের সামনে হাজির হয়েছিলেন প্রায় তিরিশ হাজার মানুষ। তাঁদের মনে হয়েছিল এটি একটি ফাঁদ। চিনারা তাঁদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরুকে হত্যা করতে চাইছে। তাই তাঁরা কিছুতেই দলাই লামাকে চিনা সেনার দফতরে যেতে দেবেন না।

চিন্তিত ছিলেন চব্বিশ বছরের দলাই লামাও। মৃত্যুবরণ করতে তিনি পিছপা নন। তবুও প্রভুর আদেশ নেওয়ার জন্য বিশেষ প্রার্থনায় বসেছিলেন। পেয়েছিলেন দু’টি দৈববাণী। দলাই লামাকে বলা হয়েছিল লাসাতে থেকে চিনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে। কিন্তু ১৫ মার্চ রাতে, কান ফাটানো আওয়াজ করে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে পড়েছিল চিনা ট্যাঙ্কের গোলা।

প্রাসাদের বাইরে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

১৬ মার্চ সকাল হতে না হতেই এসেছিল চিনা ব্রিগেডিয়ারের বার্তা, দলাই লামার নরবুলিংকা প্রাসাদ আক্রমণ করার জন্য তৈরি হচ্ছে চিনা সেনারা। প্রিয় মানুষদের জীবনহানির কথা ভেবে বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন দলাই লামা। ১৭ মার্চ ভোরে শেষ আদেশ নেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন প্রভু বুদ্ধের সামনে। ধ্যানরত অবস্থায় শুনেছিলেন তৃতীয় দৈববাণী, “লাসা ছেড়ে চলে যাও। আজ রাতেই।” অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে গিয়েছিলেন দলাই লামা। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রাসাদের বাইরে সশব্দে ফেটেছিল দু’টি গোলা।

উপত্যকায় চিনের সেনা, পালাতে হবে তাদের সামনে দিয়ে

১৭ মার্চ, ১৯৫৯। সন্ধ্যা নেমেছিল লাসায়। রাস্তাঘাট প্রায় শুনশান। উপত্যকার বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চিনা ক্যাম্পে বসে শীতে কাঁপছিল প্রায় দশ হাজার চিনের সেনা। প্রাসাদের একটি ঘরে উপস্থিত হয়েছিলেন দলাই লামার প্রধান পার্ষদ ফালা থুম্পটেন ওডেন, মনাস্ট্রির প্রধান গ্যাডরাং লবসাং রিগজিন ও আরও কয়েকজন। দৈববাণীতে বলা হয়েছিল কোন পথে পালাতে হবে। তাই পালাবার সমস্ত পরিকল্পনা চুড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।

পালাতে গেলে পোটালা প্যালেসের পাশে থাকা এই লাসা নদী পার হতে হবে

দলাই লামার প্রিয় রাঁধুনি পনপো ও তাঁর দলকে লাসা নদী বা কাই-ছু’র নির্দিষ্ট ফেরিঘাটে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ফালা থুম্বটেন। রেডিও মারফৎ ফালা খবর পাঠিয়েছিলেন দক্ষিণ তিব্বত দখল করে রাখা ‘খাম্পা’ বিদ্রোহীদের কাছে। বলা হয়েছিল, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষ যাচ্ছেন। তাঁদের সুরক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব যেন নেওয়া হয়।

তাঁর ঘড়ির সঙ্গে সকলের ঘড়ি কাঁটায় কাঁটায় মিলিয়ে নিতে বলেছিলেন ফালা থুম্পটেন। ঠিক হয়েছিল ছোট ছোট তিনটি দল রাতের অন্ধকারে একঘণ্টা পর পর প্রাসাদ ছাড়বে। প্রথম যে দলটি প্রাসাদ ছেড়েছিল, সেই দলে ছিলেন দলাই লামার মা ডিকি শেরিং, ছোট ভাই তেনজিং চোগিয়াল, বোন ডোলমা শেরিং ও একজন কাকা। সবার পরনেই ছিল প্রাসাদের পুরুষ ভৃত্যের পোশাক।

সন্ধ্যাবেলা প্রাসাদের দক্ষিণ দরজা দিয়ে পুরুষ ভৃত্যেরা দিনের কাজ সেরে বাড়ি ফিরতেন। সেই পথেই উপত্যকার অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল প্রথম দলটি। এর একঘণ্টা পর, ফালা থুম্বটেন, প্রধান মঠাধ্যক্ষ, দেহরক্ষীদের কমান্ডার, কুসিং দেপন ও দলাই লামার ধর্মীয় শিক্ষকরা মালবাহী ট্রাকের খালাসির ছদ্মবেশ ধারণ করে একে একে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

দলাই লামার অতি বিশ্বস্ত ছয় পার্ষদ। বাম দিক থেকে দ্বিতীয় ফালা থুম্বটেন

তৃতীয় দলে থাকা চব্বিশ বছরের দলাই লামা পরে নিয়েছিলেন ‘খাম্পা’ নিরাপত্তারক্ষীর পোশাক। তাঁর বাম কাঁধে ঝুলছিল একটি ছড়ি। সেটি আসলে সিল্কের কাপড়ে আঁকা দেবী পালদেন লামোর একটি ছবি, দ্বিতীয় দলাই লামা গেনদুন গিয়াৎসোর ( ১৪৭৫-১৫৪১) সম্পত্তি। নিখুঁতভাবে পাকিয়ে ছড়ির মতো আকার দেওয়া হয়েছিল ছবিটিকে। দলাই লামার ডান কাঁধে ঝুলছিল রাইফেল।

যুবক দলাই লামার চোখে সবসময় থাকত পুরু লেন্সের চশমা। পালাবার সময় সেটা পরলে সবাই চিনে ফেলবে, অথচ খুলে ফেললে তিনি কিছুই দেখতে পাবেন না। দলাই লামা চশমা খুলে লুকিয়ে রেখেছিলেন পোশাকের ভেতর। তাঁর কাছে খবর এসেছিল পূর্ববর্তী দল দুটি নিরাপদে নদীর ওপারে পৌঁছে গিয়েছে।

রাত দশটা নাগাদ দলাই লামার কাছে এসেছিলেন তিব্বত সরকারের দুই উচ্চপদস্থ অফিসার। প্রাসাদের নিরাপত্তার তদারকি করতে এঁরা রোজ রাতেই একবার করে প্রাসাদে ঢুঁ মেরে যেতেন। দলাই লামা দুই অফিসারের পিছন পিছন চলতে শুরু করেছিলেন। যেন তিনি ওই দুই অফিসারের নিরাপত্তারক্ষী। নরবুলিংকা প্রাসাদের প্রধান ফটকের কাছে এসে একজন অফিসার চেঁচিয়ে ফটকটি খুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। অফিসার দু’জনকে সবাই চিনত। তাঁদের চিনত চিনা সেনারাও। তাই খুলে গিয়েছিল প্রধান ফটক। চিনা সেনাদের সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, আগের দলগুলির মতোই তিনজন হারিয়ে গিয়েছিলেন উপত্যকার অন্ধকারে।

ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিয়ে, দশ হাজার চিনা সেনার মাঝখান দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে তাঁরা এসেছিলেন নদীর ধারে। তারপর ইয়াকের চামড়া ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা ছোট নৌকায় নিরাপদে পেরিয়ে গিয়েছিলেন কাই-ছু নদী। দলাই লামা পরে নিয়েছিলেন চশমা। নদীর ওপারে মিলিত হয়েছিল তিনটে দল।

প্রাসাদের বৈভব ছেড়ে পাথুরে পথে দলাই লামা ও তাঁর ছোট ভাই

লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ তিব্বত

তিরিশ জন সশস্ত্র খাম্পা যোদ্ধার পাহারায় সবাই মিলে এগোতে শুরু করেছিলেন দক্ষিণ তিব্বতের দিকে। যেখানে ঘাঁটি গেড়ে আছে আশি হাজার বিদ্রোহী খাম্পা যোদ্ধা। দলাই লামা পিছন ফিরে শেষবারের মতো আশ মিটিয়ে দেখেছিলেন রাতের আলোয় ভাসা লাসার প্রাসাদকে। চিনা প্রহরীদের হাতে ধরে পড়ার ভয় প্রতি মুহূর্তে। তাই দলটি দিনের বেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে লুকিয়ে থাকত গিরিখাতের গুহায়, গ্রামের গুম্ফার ভেতর, খাম্পা মেষপালকদের তাঁবুতে। রাতে আবার সবাই একত্রিত হওয়ার পর শুরু হত পথ চলা।

দক্ষিণ তিব্বতের দিকে এগিয়ে চলেছেন দলাই লামা (কালো পোশাকে)

ওদিকে ১৯ মার্চ জানা গিয়েছিল, লাসার প্রাসাদে দলাই লামাকে পাওয়া যাচ্ছে না। দাবানলের মতো খবরটি ছড়িয়ে পড়েছিল সারা তিব্বতে। ক্রোধে উন্মত্ত উঠেছিল তিব্বতের মানুষ। তুমুল আক্রমণের মুখে পড়েছিল চিনের সেনা। পরদিনই প্রত্যাঘাত হেনেছিল চিন। লাসায় প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় দু’হাজার মানুষ।

কার্ফু জারি করা হয়েছিল লাসায়। লাসার ভারতীয় দূতাবাসে কামানের গোলা ছুঁড়েছিল চিন। নরবুলিংকা প্রাসাদে ছোঁড়া হয়েছিল প্রায় ৮০০ গোলা। তিব্বতের সরকার ভেঙে দওয়া হয়েছিল। তিব্বতকে চিনের সীমানার মধ্যে থাকা একটি স্বশাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করে দিয়েছিল চিন। একই সঙ্গে ক্ষ্যাপা হায়নার মতোই দলাই লামাকে খুঁজতে শুরু করেছিল চিনা সেনারা।

খাম্পা গেরিলাদের সঙ্গে দলাই লামা ( কালো পোশাকে)

অপরদিকে প্রবল ঠান্ডা, বরফঢাকা পথ ও উচ্চতাজনিত শারীরিক কষ্টকে উপেক্ষা করে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে চলেছিল দলাই লামার দল। তাঁদের সাহায্য করে চলেছিলেন গ্রামবাসীরা, খাদ্য দিয়ে আশ্রয় দিয়ে। পথের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশে বিছিয়ে রাখতেন খড় ও গোবর। তবুও অমানুষিক পরিশমের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন দলাই লামার মা। দলাই লামা নিজেও আক্রান্ত হয়েছিলেন আমাশায়। সেই অবস্থাতেও এগিয়ে যাচ্ছিল দলটি।

রামে নামে একটি স্থানে, দ্বাদশ শতাব্দীর একটি গুম্ফায় আশ্রয় নিয়েছিলেন দলটি। অনভ্যস্ত পরিবেশে চলার ক্লান্তিতে দলের সঙ্গে থাকা ঘোড়াগুলিতে একে একে মারা গিয়েছিল। মালবহনের জন্য স্থানীয় ঘোড়ার খোঁজ করেছিল দলটি। গরীব গ্রামে মেলেনি ঘোড়া। পরিবর্তে গ্রামের চল্লিশ জন নারী ও পুরুষ এগিয়ে এসেছিলেন, দলটির মালপত্র পর্বতের ওপারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

গ্রামবাসীদের সঙ্গে দলাই লামা

এবার লক্ষ্য দক্ষিণ তিব্বতের ‘লুনৎসে জঙ্গ’ মনাস্ট্রি

দলাই লামা যখন তাঁর দল নিয়ে তিব্বতের দক্ষিণে চলেছিলেন, তখন দক্ষিণ দিক থেকে তাঁরই দিকে আরেকটি দল নিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন দু’জন খাম্পা গেরিলা নেতা। তাঁরা ছিলেন বাহিনীর রেডিও অপারেটরও। যাঁদের সাংকেতিক নাম আথার ও লোটসে। তাঁরা চলেছিলেন দক্ষিণ তিব্বতে দলাই লামাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। দু’টি দলের দেখা হয়েছিল ২২ মার্চ রাতে। আথার ও লোটসে দলাই লামাকে জানিয়েছিলেন, কীভাবে ক্যাম্প হালেতে বিদ্রোহীদের ট্রেনিং দিচ্ছে সিআইএ। কীভাবে আথার আর লোটসে বেতারের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। কীভাবে তিব্বতের খবর প্রতি মুহূর্তে পৌঁছে যাচ্ছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ারের কাছে।

আমেরিকার সিআইএ প্রশিক্ষিত তিব্বতীয় গেরিলা বাহিনী ‘চুসি গ্যাঙ্গড্রুক’

এই গেরিলা বাহিনীর দখলেই ছিল ‘লুনৎসে জঙ্গ’ মনাস্ট্রি। সেই মনাস্ট্রির দিকেই এগিয়ে চলেছিলেন দলাই লামা। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল লুনৎসে জঙ্গ মনাস্ট্রিতে অস্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করা এবং সেখান থেকে চিনের চাপিয়ে দেওয়া ১৭ দফা চুক্তি প্রত্যাখ্যান করা। এ ছাড়াও ভারত সীমান্তের কাছাকাছি থেকে নতুন ভাবে চিনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা। ২৬ মার্চ দলাই লামা পৌঁছে গিয়েছিলেন লুনৎসে জঙ্গ মনাস্ট্রিতে। এখান থেকে ভারত-তিব্বত সীমান্ত ‘ম্যাকমোহন লাইন’ মাত্র দু’দিনের হাঁটাপথ।

লুনৎসে জঙ্গ মনাস্ট্রিতে বসে চিন ও তিব্বতের মধ্যে হওয়া চুক্তি ভেঙে দিয়েছিলেন দলাই লামা। ঘোষণা করেছিলেন, তিব্বতের অন্তর্বতী সরকার। এই রাগে চিন লুনৎসে জঙ্গ মনাস্ট্রিতে বিমান হানার পরিকল্পনা করেছিল। দক্ষিণ তিব্বতের আকাশে উড়তে শুরু করেছিল চিনের বিমান। কিন্তু প্রভু বুদ্ধের আশীর্বাদে আচমকাই খারাপ হতে শুরু করেছিল আবহাওয়া। দলাই লামা এরপর চিঠি লিখেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকে। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, “ … আমরা ভারতে প্রবেশ করছি। আমি আশা করব, আপনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আমরা আপনার উদারতার ওপর ভরসা করি।”

২৮ মার্চ রাতে, জন গ্রিনে নামক এক সিআইএ অফিসার তাঁর বসের কাছ থেকে একটি টেলিগ্রাম পেয়েছিলেন। সেটি পাওয়ার পর, জন গ্রিনে দিল্লিতে একটি গোপন মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। মেসেজে লেখা ছিল দলাই লামা ভারতে আশ্রয় চাইছেন। প্রায় একই সময়, তৎকালীন আইবি চিফ বি এন মল্লিকের সহায়তায় দলাই লামার দাদা গ্যালো থনড্রু্‌প ভারতের পার্লামেন্ট ভবনে গিয়ে দেখা করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে। নেহেরু জানিয়েছিলেন দলাই লামাকে স্বাগত জানাতে ভারত তৈরি।

আশ্রয় মিলবে প্রভু বুদ্ধের আপন দেশে

২৯ মার্চ সন্ধ্যায়, ‘লুনৎসে জঙ্গ’ মনাস্ট্রি ছেড়ে দলাই লামা রওনা হয়েছিলেন ভারত সীমান্তের দিকে। অমানুষিক পরিশ্রম করে দলটি রাতের অন্ধকারে পার হয়েছিল ১৭, ০০০ ফুট উঁচু কারপো-লা। তিব্বতের দিকে থাকা শেষ গিরিপথ। সকালবেলা মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল একটি চিনা বিমান। দলটি দ্রুত লুকিয়ে পড়েছিল গিরিখাতের গভীরে।

ভারতে প্রবেশের আগে শেষ গিরিপথে দলাই লামা

এরপর দু’টো ভাগে ভাগ হয়ে রাতের অন্ধকারে সেই দলটি এগিয়েছিল ভারত সীমান্তের দিকে। ‘মাংমাং’ নামের ছোট্ট একটি গ্রামে এসে দলাই লামা বিদায় জানিয়েছিলেন তাঁদের, যাঁরা থেকে যাবেন তিব্বতে। লড়াই করবেন তিব্বতের স্বাধীনতার জন্য। তিনি আশীর্বাদ করেছিলেন দুই লড়াকু খাম্পা নেতা আথার ও লোটসেকেও।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই গভীর রাতে ভারত সীমান্তের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন দলাই লামা। ৩১ মার্চ ১৯৫৯, প্রায় আশি জনের দল নিয়ে দলাই লামা সীমান্ত পেরিয়ে প্রবেশ করেছিলেন ভারতের তাওয়াং জেলায়।

ভারতের মাটিতে  দলাই লামা। তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছেন ভারতের সরকারি আধিকারিকেরা (বাম দিকে দাঁড়িয়ে)

অসম রাইফেলসের চুথাঙ্গমু আউটপোস্টে নেহেরুর হয়ে দলাই লামাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন ভারতের অ্যাসিস্টান্ট পলিটিকাল অফিসার। নিচু হয়ে প্রভু বুদ্ধের দেশের মাটি ছুঁয়েছিলেন চতুর্দশ দলাই লামা, চব্বিশ বছরের তেনজিং গিয়াৎসো। পিছন ফিরে শেষবারের মতো দেখেছিলেন নিজের জন্মভূমিকে। যেখানে তাঁর আর কোনও দিন ফেরা হবে না।

You might also like
Comments
Loading...

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More