একটা-দুটো নয়, ২৪টা সূর্য-ঘড়ি লুকিয়ে রাখা আছে কোণার্কের সূর্য মন্দিরে

দ্য ওয়াল ম্যাগাজিন ব্যুরো: জীবনে একবারও পুরী বেড়াতে যায়নি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর পুরী বেড়াতে গেলে কিছু দূরের কোণার্ক মন্দিরে ঢুঁ মারা বাঙালির অনেকদিনের পুরোনো অভ্যেস। পুরী থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই কোণার্ক বা কোনারক মন্দিরটি আজও ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম পীঠস্থান। কোনারক মন্দিরকে ঘিরে, তার ইতিহাস থেকে শুরু করে মন্দিরগাত্রের ভাস্কর্য- সবকিছু নিয়েই কথা-উপকথার শেষ নেই। সেসব বহুচর্চিত গল্প অনেকেই জানেন। কিন্তু জানেন কি, ভারতের অন্যতম প্রাচীন সূর্যঘড়ির নিদর্শন রাখা আছে এই কোণার্ক মন্দিরেই। একটা-দুটো নয়, এইরকম ২৪টি সূর্যঘড়ি রয়েছে কোণার্ক মন্দিরে। লোকচক্ষুর সামনে থাকলেও আমরা জানতে পারিনা ঘড়িগুলোর অস্তিত্ব।

ঘড়ি আবিষ্কার হওয়ার বহু আগে থেকেই তৈরি হয়ে গিয়েছে সময়ের ধারণা। প্রাচীনকালের বর্বর যাযাবর মানুষের জীবনযাত্রাও ছিল সময়ের নিক্তিতে বাঁধা। তাদের কাছে সময়ের একক ছিল সূর্য। সূর্য উঠলে দিনের কাজকর্ম শুরু হত আর সূর্য অস্ত গেলেই তারা খুঁজে নিত রাত কাটানোর মতো নিরাপদ আশ্রয়। সভ্যতা যত এগিয়েছে ততই প্রগাঢ় হয়েছে সেই সময়চেতনা। কাজের সুবিধের জন্য দিন আর রাতের বিভিন্ন সময়কে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে শুরু করেছে মানুষ। তৈরি হয়েছে ভোর, দুপুর, গোধূলি, সন্ধের ধারণা।

আনুমানিক ছ’হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশর সাম্রাজ্যে সমস্ত দিনকে ১২ ঘন্টায় ভাগ করার রীতি চালু হয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭০০ অব্দে চিনদেশেও একইভাবে সময়ের ভাগ করা শুরু হয়। গ্রীকদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল দিন ও রাতকে ১২ ঘণ্টায় ভাগ করার এই পদ্ধতি। আকাশে সূর্যের অবস্থান দেখেই সময় গণনা করা হত। সূর্যের অবস্থান অনুযায়ী আলো-ছায়ার তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয় সূর্যঘড়ি। আজকের আধুনিক ঘড়ির পূর্বপুরুষ বলা চলে এই সূর্যঘড়িকে।

ধারণা করা হয় মিশরীয়রাই প্রথম প্রকৃতিনির্ভর সময়-গণক বা সূর্য-ঘড়ি নির্মাণ করেছিলেন আর সেই তত্ত্বকে কাজে লাগিয়েই প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কার করেন ইউরোপিয়ানরা। কবে সর্বপ্রথম এই সূর্যঘড়ি আবিষ্কার হয়েছিল তা জানা যায়নি। তবে সবচেয়ে প্রাচীন যে সূর্যঘড়ি পাওয়া যায় তা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০ অব্দে মিশরে নির্মিত হয়। সারা ভারত তথা পৃথিবী জুড়ে এখনও অনেক জায়গায় সূর্য ঘড়ি সেই প্রাচীন সময়গণকের নিদর্শন বহন করে চলেছে, যার মধ্যে অন্যতম কোণার্কের এই সূর্যমন্দির।

উড়িষ্যায় পুরী ও ভুবনেশ্বরের কাছে বেলাভূমিতে ১৩শ শতকে পূর্ব-গঙ্গা রাজ্যের অধিপতি মহারাজ নরসিংহ দেব সূর্য দেবতার আরাধনার জন্য এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। কত যে ইতিহাস আর উপকথা ছড়িয়ে আছে এই মন্দিরের আনাচে-কানাচে! অভিনব আকার, বিশালত্ব আর কারুকার্যের জন্য এই মন্দির আজ ভারতের সপ্তমাশ্চর্যের অন্যতম। তামিল শব্দ কোণ আর সংস্কৃত শব্দ অর্ক- এই দুই মিলেমিশে কোনার্ক শব্দটির জন্ম। উড়িষ্যা ও দ্রাবিড় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে সমুদ্রের ধারে বিশাল এক রথের আকারে গড়ে তোলা হয়েছিল কোণার্কের সূর্যমন্দিরটি। ধূসর বেলে পাথরে তৈরি মন্দিরটি দেখলে মনে হত যেন সমুদ্র থেকে উঠে আসছে সূর্যদেবের বিশাল রথ, তার সামনে রয়েছে সাত জোড়া ঘোড়া। সময়ের সাথে সাথে সমুদ্র সরে গেলেও এই মন্দিরের রহস্য আর বৈভব এতটুকু কমেনি আজও

কালাপাহাড় প্রভৃতি বিদেশি শক্তির আক্রমণে মন্দিরের গর্ভগৃহের অনেক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। বালির নীচে ডেবে গেছে মূল মন্দিরের অনেকটাই। তবে কালের প্রহার সামলেও যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তাও কম বিস্ময়কর নয়। মন্দিরের সামনে সূর্যদেবের রথের সাতটা ঘোড়া সপ্তাহের সাত দিনের প্রতীক। আর বারো জোড়া বিশাল চাকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে কোণার্কের পুরো মন্দির। রথের দুপাশের এই বারো-বারো চব্বিশটা চাকা, বছরের চব্বিশটা পক্ষের ইঙ্গিতবাহী। মন্দিরগাত্রের পাশাপাশি প্রতিটা চাকার অসাধারণ কারুকাজ দর্শকদের আকর্ষণ করে আজও। কিন্তু জানেন কি, কোণার্ক মন্দিরের এই প্রতিটি চাকাই আসলে একেকটা সূর্যঘড়ি। আর চাকার ভেতরের দাঁড়/স্পোকগুলো সেই সূর্যঘড়ির সময়ের কাঁটা। ৮০০ বছরেরও বেশি আগে তৈরি, তবু এই সূর্যঘড়ির সাহায্যে নিখুঁতভাবে সময় জানা যায় এখনও।

একএকটা চাকা বা সূর্যঘড়ি শুধু সময়ই দেখায়না। এর আরও অনেক ব্যবহার রয়েছে। তবে নিখুঁত সময় দেখার জন্য এই ৯ ফুট ৯ ইঞ্চি ব্যাসের চাকাযুক্ত এক একটা ঘড়ি একেবারে নির্ভুল আজও। ১২ জোড়া বা ২৪ টি চাকার প্রতিটির আলাদা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। একটু লক্ষ করলেই আপনি দেখতে পাবেন প্রতিটি চাকায় ৮ টি বড়ো স্পোক আছে, এই ৮ টি দাঁড় বা স্পোক আসলে অষ্টপ্রহরের প্রতীক। আমরা জানি দিনের ২৪ ঘণ্টাকে প্রাচীন ভারতে ৮ টি প্রহরে ভাগ করা হত। এক প্রহর অর্থাৎ তিন ঘণ্টা। তার মানে চাকার ভিতরের দুটো বড়ো দাঁড় বা স্পোকের মধ্যে সময়ের ব্যবধান তিন ঘণ্টা। ৮ টি বড়ো দাঁড়ের প্রত্যেক দুটির মাঝে আরো ৮ টি ছোট দাঁড় বা সরু স্পোক আছে। এই সরু স্পোকগুলো থাকায় আধপ্রহর বোঝায়। এক প্রহর বা ৩ ঘণ্টার যে ব্যাবধান তাকেই এই সরু স্পোকগুলো অর্ধেক অর্থাৎ দেড় ঘণ্টা বা ৯০ মিনিটে ভাগ করেছে।

এবার চলে আসা যাক গোল চাকাটির বৃত্তাকার অংশে। এখানে বড়ো এবং সরু দাঁড়ের মাঝখানে ৩০ টি বিড বা পুঁতির মতো দেখতে গোল গোল অংশ আছে। বড়ো দাঁড়ি আর ছোটো দাঁড়ির মাঝের যে ৯০ মিনিটের ব্যবধান তাকে ৩০টা বিড দিয়ে সমান ভাগে করলে এক একটি বিডের সময় দাঁড়ায় ৩ মিনিট। বিডগুলো আকৃতিতে একটু বড়ো হওয়ায় সূর্যের ছায়া যখন এর উপর এসে পরে তখন হয় একদম বিডের মাঝে পড়ে বা তার বাঁদিক অথবা ডানদিকে পরে। তাহলে মাঝখান, ডানদিক আর বাঁদিক মিলে এক একটা বিডকে আরও তিনটি ভাগে ভাগ করা গেল, যার প্রতিটির ব্যবধান হল ১ মিনিট। হ্যাঁ, এইভাবেই কোণার্ক সূর্যঘড়ির এই বিডগুলো নির্ভুলভাবে মিনিট গণনা করতে সাহায্য করে, আজও।

তবে কোণার্কের সূর্যঘড়িতে সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটা কথা ভুললে চলবে না। ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে অর্থাৎ অ্যান্টি-ক্লকওয়াইস ভিত্তিতে সময় নির্ধারণ করে এই ঘড়ি। ঘড়ির একদম উপরের বড় স্পোক রাত্রি ১২ টা বোঝায়, তার বাঁদিকে যে বড় স্পোকটি রয়েছে সেটি রাত ৩ টে, আর তারপরের স্পোকটি সকাল ৬ টা বোঝায়। এইভাবে চলতে থাকে।

ঐতিহাসিকেরা বলেন, সেকালে সময় গণনার উদ্দেশ্যে মন্দিরের একটু দূরে চাকাগুলোর লম্বালম্বি একটা নির্দিষ্ট জায়গায় একটা লম্বা দণ্ড রাখা থাকতো। সেই দণ্ড বা লাঠির গায়ে সূর্যের আলো পড়লে তার ছায়া এসে পরতো চাকার গায়ে। তারপর ঐ ছায়াটির অবস্থান দেখে খুব সহজেই অঙ্ক কষে বের করে ফেলা হত সঠিক সময়। সেই সময় নিরুপক দণ্ডটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল, না কালের নিয়মে নষ্ট হয়ে গেছে তা বলা মুশকিল।

দণ্ডটি নেই ঠিকই, কিন্তু আজও আপনি যদি ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনার আঙুল বা কোনও একটা লাঠি জাতীয় জিনিস সূর্যের দিকে উঁচু করে রাখেন তাহলে তার ছায়া চাকার যে অংশে পড়বে তা দেখে ঘণ্টা, মিনিটের নির্ভুল হিসেব কষে ফেলা যায় সহজেই। ধরুন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনি সূর্যের দিকে আঙুল তুলে ধরলেন। আর তার ছায়া গিয়ে পড়ল বড় দাঁড়ের ছটা আর নটার মাঝখানের কোনও এক জায়গায়। অ্যান্টিক্লকওয়াইজ হিসেবে বাঁদিকের ছয় আর নয় মানে তা সকালবেলা, কারণ উপরের বড় দাঁড়ি রাত ১২টা বোঝালে তার বাঁদিকের অংশ হিসেব মতো শেষরাত আর সকালের সময় দেখায়। এবার আপনাকে দেখতে হবে ভেতরের যে সরু স্পোক বা দাঁড় আছে তার কোনদিকে সেই ছায়াটা পড়েছে। ধরুন ৯টার যে বড়ো দাঁড়ি আছে তার একটু পরে বাঁদিকে ছায়া পড়েছে। বড়ো স্পোকের বাঁদিকে সরু স্পোক যাদের মধ্যে ব্যবধান দেড় ঘণ্টা। ছায়াটি বড় আর সরু স্পোকের মাঝে পড়লে মোটামুটি সকাল ৭ টা ধরা যায় আর বিডগুলো উপর ছায়া দেখে মিনিট নির্ধারণ করে ফেলা যায়।

ছায়া দেখে সময় নির্ধারণ, সূর্যঘড়ির বিশেষত্ব

পূর্বদিকের সূর্যের আলো সকালে রথের চাকায় পড়লে দিনের প্রথমভাগের সময় সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু রথের চাকাগুলো যেহেতু মন্দিরগাত্রের দেওয়ালের সঙ্গে গাঁথা, তাই দুপুরবেলা সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়ে তখন পুবদিকের দাঁড়িগুলোয় আর রোদ এসে পড়েনা। তাহলে দুপুরের পর সময় গণনা করবেন কীভাবে? এই সমস্যার সমাধানের জন্যই রথের অপর পাশেও একইরকম আরও বারোটি চাকা আছে যার সাহায্যে অপরাহ্ণেও সময়ের হিসেব করা যায় সঠিক আর নির্ভুলভাবে।

খটকাটা আসলে অন্যত্র। দিনের বেলা নাহয় সূর্যের বিপরীতে ছায়ার অবস্থান দেখে সময় নির্ধারণ হল, কিন্তু সূর্যাস্তের পর? সূর্য ডুবে গেলে রাতেরবেলা কি কোণার্কের এই সূর্যঘড়ি অচল? মোটেও না, চাইলে রাত্তিরেও আপনি সময় নির্ধারণ করতে পারেন এই সূর্যঘড়ির সাহায্যে। শুধু সূর্যের আলোর বদলে সেসময় দরকার পড়বে চাঁদের আলোর। আসলে কোণার্কের মন্দির রথে যে ২৪ টি চাকা আছে তার দুটি চাকায় যেমন সূর্যের আলো পড়লে দিনের বেলার সময় বোঝা যায় তেমন বাকিগুলোর এক একটিতে চাঁদের আলো পড়লেও একইরকমভাবে অঙ্ক কষে সময় বের করে ফেলা যায়। যদিও চাকাগুলো সূর্যঘড়ি নামে পরিচিত কিন্তু রাতের সময়ও এতে নির্ভুলভাবে দেখা যায়। ষোলকলা চাঁদ একের রাত্রে একেকরকম আকৃতি ধারণ করে বলে চাঁদের আলোর রকমফেরও অনেক, আর তাই দিনের সময় অপেক্ষা রাতের সময় নির্ধারণ করতে চাকার সংখ্যাও বেশি।

আলোর রকমফের ঘটায় চাঁদের নানান কলা

কালের গ্রাসে এই মন্দিরের অনেকটাই নিশ্চিহ্ন। ইতিহাস ঘাঁটলে এই মন্দিরের ওপর আক্রমণের কাহিনীও কম পাওয়া যায় না। ১৫০৮ সালে সুলতান সুলায়মান খান করনানির নৃশংস সেনাপতি কালাপাহাড় আক্রমণ করে ভেঙে দেন এই মন্দির। তারপর দ্বিতীয় নরসিংহবর্মন এবং তারও পর নরশিমাদেব কোণার্ক মন্দির থেকে বহু কারুকাজ, স্তম্ভ, কলস এমনকি নবগ্রহশিলা অব্দি তুলে নিয়ে গিয়ে পুরীতে স্থাপন করেন। মারাঠা শাসনকালেও রক্ষা পায়নি এই মন্দির। বারবার আঘাত নেমে এসেছে এই মন্দিরের ওপর। সমুদ্র সরে গেছে। বদলে গেছে আবহাওয়াও। তারপরও অটুট রহস্য নিয়ে কীভাবে যেন আজও কোনারকের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৭৫০ বছর আগের এই প্রাচীন স্থাপত্য। চলমান সময়কে বুকে নিয়েই সময় যেন থমকে আছে এখানে। প্রাচীন ভারতবর্ষের জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, জ্যামিতি আর ভাস্কর্যের এক অদ্ভুত সহাবস্থান এই মন্দির। স্থাপত্যের কথা যদি বাদও দিই, শুধু জোর্তিবিজ্ঞান ও গণিতেই সেসময় আমাদের দেশ কতখানি উৎকর্ষ সাধন করেছিল, তাঁরই নিদর্শন রয়ে গেছে চাকার আদলে গড়া এই সূর্যঘড়িগুলোর গায়ে। এরপর কখনও কোনার্কের মন্দিরে বেড়াতে গেলে মন্দিরের চাকায় সূর্যের ছায়া দেখে সময় মেপে নিতে ভুলবেন না।

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More